বৃহঃস্পতিবার ৯ই এপ্রিল ২০২০ |

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ

 বৃহঃস্পতিবার ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ভোর ০৫:৩৪:০৯
ট্রাম্পের

প্যালেস্টাইন ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন জানুয়ারির আটাশ তারিখে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক, দু’টি অংশে বিভক্ত শান্তি পরিকল্পনার নামকরণ করা হয়েছে-‘দ্য ডিল অব দ্য সেঞ্চুরী’ বা ‘শতাব্দীর ডিল’ বলে।

শতাব্দীর ডিল খ্যাত শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে ইতোমধ্যেই। বিশেষ করে, যাদের উদ্দেশ্যে শান্তি পরিকল্পনা-সেই প্যালেস্টাইনিরাই এই শান্তি পরিকল্পনা মূলত: দুটি কারণে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো, প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিষয়টা উপেক্ষিত হয়েছে এবং দ্বিতীয়ত: প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা একপেশে-কেবলমাত্র ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে এ শান্তি পরিকল্পনায়।

খোদ আমেরিকাতেই প্রস্তাবিত এ শান্তি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কথা ওঠেছে। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ডেমোক্রেট প্রার্থী জু বাইডেন, এলিজাবেথ ওয়ারেন প্রমুখ এটার সমালোচনা করেছেন। এটা একটা রাজনৈতিক স্ট্যান্ট এবং এর দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপন সম্ভব নয় বলেই মনে করেন তাঁরা।

প্যালেস্টাইনী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস-প্রস্তাবিত পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে এ পরিকল্পনাকে-‘শতাব্দীর চাপড় (স্লাপ অব দ্য সেঞ্চুরী)’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে, ফিলিস্তিনি জনগণের বহুল কাংখিত স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র, তার নির্দিষ্ট একটা সীমান্ত, আকাশের ওপর অধিকার এবং ভূখন্ডগত জলসীমার অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকৃত না হওয়া পর্যন্ত প্যালেস্টাইন সংক্রান্ত কোনো শান্তি পরিকল্পনাই কার্যকর কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে পারে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। অর্থাৎ স্বাধীন-সার্বভৌম প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রই কেবল শান্তি আনতে পারে।

এছাড়া, বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘে পাস হওয়া ফিলিস্তিন সংক্রান্ত প্রস্তাবাবলি, ১৯৯৩ সালের অসলো এ্যাকর্ডস এর মাধ্যমে ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যেকার সংকট সমাধানের চেষ্টা, ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে পারে না বলে রাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত। অথচ ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় এসব বিষয় গণনার মধ্যেই আনা হয়নি-বা এসবের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা আরো মনে করেন, যেকোনো শান্তি পরিকল্পনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে, আরো যেসব বিষয়ের সমাধান দেওয়া আবশ্যক তাহলো, জেরুজালেমের স্টেটাস কী হবে, কার অধীনে থাকবে, ইসরাইলি অধিকৃত ভূখন্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের আইনগত অবস্থান এবং নিজ ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ভবিষ্যত নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তার স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা না করে কোনো শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না, শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে এ বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় মূলত: এ বিষয়সমূহ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর এটা সত্য যে, এ সকল ভোকাল পয়েন্টগুলো এড়িয়ে গিয়ে কোনো শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেবে না নতুন প্রজন্মের ফিলিস্তিনিরা। সংক্ষিপ্তভাবে বললে এটাই সত্য যে, স্বাধীন আবাসভূমি ব্যতীত কোনো পরিকল্পনাই তরুণ প্রজন্মের ফিলিস্তিনিরা মেনে নেবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যত প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের রাজধানী করা হবে মর্মে ভাবতে থাকে এবং কয়েক বছর ধরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এটি ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যত রাজধানীতে পরিণত হবে; এখানে থাকবে ফিলিস্তিনি আইন সভার মূল কেন্দ্র। আসলে পূর্ব জেরুজালেম (গ্রীণ লাইনের পূর্বে শহরটার অর্ধেক অংশ’-যার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত) রাজধানী হিসেবে গৃহীত হবে এমনটা সবারই ধারণায় ছিলো। তাই বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে ইসরাইলের দখলীকৃত ভূমি হিসেবে দেখে এবং তাই সর্বসম্মত ঐকমত্য ছিলো যে, এর পরিণতি চূড়ান্ত-স্থিতির আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কিন্তু ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় গ্রীণ লাইনটাকে অর্থহীন করে তুলবে এবং পূর্ব জেরুজালেমের সীমানাকে প্রকৃত শহরের সীমা পেরিয়ে তার আন্ত:সীমান্তে ফিরিয়ে আনবে। এতে করে পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনির রাজধানী না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের নিকট অগ্রহণযোগ্য।

এ প্রসঙ্গে আল কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রুলা হাউল বলেছেন, ‘আবু দিসকে রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়; পূর্ব জেরুজালেমই হবে স্বাধীন প্যালেস্টাইনের রাজধানী।’

গাজায় হামাস ইসলামপন্থী আন্দোলন বলেছে যে, জেরুজালেমকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের রাজধানী হওয়ার বিষয়ে তারা কখনো আপসকে মেনে নিতে পারে না। ‘আমেরিকানরা যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে ফিলিস্তিনি জনগণ এটা ব্যর্থ করে দিবে’-বলেছেন ফিলিস্তিনি বাসিন্দা খালেদ সাওফাতা।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে ভিন্ন মত তৈরী হয়েছে। ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে তার প্রস্তাব সাবধানতার সাথে পর্যালোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বৃটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডোমিনিক রাব এটাকে গুরুতর প্রস্তাব বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান অবশ্য ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে-‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে সৌদি আরব সংকট সমাধানে ইসরাইল-ফিলিস্তিনির মধ্যে সরাসরি আলোচনার আহবান জানিয়েছে। তবে আরব লীগ সর্বসম্মতিক্রমে শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। লীগ বলেছে, এ পরিকল্পনা অন্যায্য। লীগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমেরিকার সাথে সহযোগিতা না করার বিষয়ে সম্মত হয়ে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ১৯৬৭ সালের সীমান্তের সীমানার ভিত্তিতে একটা প্যালেস্টাইনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোও এ পরিকল্পনার বিরোধীতা করে মতামত ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। ফাইনানসিয়াল টাইমস ট্রাম্পের ইসরাইল-প্যালেস্টাইন চুক্তিকে প্রতারণা বলে অভিহিত করেছে।

জে-স্ট্রিট-‘এটা পিস প্ল্যান নয়, এটা একটা সংযুক্তির স্মোকস্ক্রিন।’ অ্যাসোসিয়েটড প্রেসের ম্যাথু লি এবং অ্যারন হেলার মনে করেন-‘ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা ইসরাইলিদের আনন্দিত করেছে এবং ফিলিস্তিনিদেরকে ক্ষুব্ধ করেছে। লস এঞ্জেলেস টাইমস সম্পাদকীয় অভিমতে বলেছে-‘ট্রাম্পের দীর্ঘ অপেক্ষিত শান্তি পরিকল্পনা এখন আলোর মুখ দেখেছে-তবে পানিতে ডুবে এর মৃত্যু ঘটেছে।’

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-‘মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা প্যালেস্টাইনিদের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে-এতদিন ধরে তারা যেসব অধিকারের জন্য লড়াই করে আসছিলো। যেমন পূর্ব জেরুজালেম যেখানে তাদের জাতীয় রাজধানী হবে, ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে ইসরাইলী বসতি উচ্ছেদ এবং টেরিটরিয়াল সার্বভৌমত্ব এর ওপর কর্তৃত্ব-নিয়ন্ত্রণ, সীমান্তের এবং আকাশ ও জলের ওপর নিয়ন্ত্রণ-প্রায় সব কিছু থেকেই প্যালেস্টাইনি জনগণ বঞ্চিত হবে।’

এদিকে, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস শান্তি পরিকল্পনাকে অপমানজনক বলে অভিহিত করেছেন। রাজধানী জেরুজালেম বিক্রির সাথে নিজের নাম জড়াবেন না বলে তিনি ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার শর্তানুযায়ী ফিলিস্তিনিরা-গাজা, ফালা ও পশ্চিম তীরের কিছু অংশ নিয়ে একটা রাষ্ট্র পাবে-এটার যাবতীয় সুরক্ষার অর্থাৎ এর সীমান্ত, আকাশ, জলসীমা ইত্যাদির ওপর দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরাইলের। এ পরিকল্পনায় আল কুদস হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী। এ ধরণের পরিকল্পনা ফিলিস্তিনীদের অধিকারের ওপর চপেটাঘাত স্বরূপ বলে ফিলিস্তিনিদের অভিমত।

মাহমুদ আব্বাস বলেন, ‘এ ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা ফিলিস্তিনিদের আশ্বস্ত করতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিতে বিশ্বাসী এবং আমরা আন্তর্জাতিক বৈধতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং আরব শান্তি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য একটা আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’ আমরা আমাদের ইস্যুটার জন্য এর ন্যায়সঙ্গত সমাধানের সন্ধান করছি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বৈধতা, কিন্তু আমরা কখনো মেনে নেব না যে, আমেরিকা একমাত্র শান্তি মধ্যস্থতাকারী’-বলেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এ শান্তি উদ্যোগ প্রতিরোধ করা হবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ উদ্যোগ ব্যর্থ হবে।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রের এল.এস.ই-এর সিনিয়র ফেলো আয়ান ব্লাক এই বলে মন্তব্য করেছেন যে, ‘ইসরাইলের জোটবদ্ধকরণকে সমর্থন করে এবং ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বা তাদের অধিকার অস্বীকার করে ট্রাম্প কেবল সংঘাত এবং দ্বন্দ্বকেই জিইয়ে রাখছে। ইসরাইলিদের মতো ফিলিস্তিনিদেরও স্ব-সিদ্ধান্তের অদম্য অধিকার রয়েছে-এ মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করে স্থায়ী শান্তি স্থাপন কখনো সম্ভব নয়।’

মূলত: ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও দৃঢ়ভিত্তি দেবে যে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটের একমাত্র সমাধান হলো ভূমধ্যসাগর ও জর্ডানের মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা-যেখানে আরবরা ইসরাইলিদের ন্যায় সমান অধিকার ভোগ করবে।

ফিলিস্তিন-আমেরিকান ঐতিহাসিক রশিদ খালিদি তার সদ্য প্রকাশিত এক বইয়ে বলেন, প্যালেস্টাইনে এখন দু’জন লোক রয়েছে, যতক্ষণ না একে অপরের দ্বারা প্রত্যেকটার জাতীয় অস্তিত্ব অস্বীকার করে ততক্ষণ তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সমাধান হতে পারে না।’

আসলে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় নতুনত্ব কিছু নেই। এটা পূর্বের আমেরিকান ও পাশ্চাত্যের প্রস্তাবগুলোর চেয়ে আলাদা কিছু নয়; বরং এটা সাদৃশ্যপূর্ণ। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাটা গত দেড়শ বছরের ফিলিস্তিন সম্পর্কিত অন্যান্য আমেরিকান ও পশ্চিমা প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত বিষয়ের ন্যায় একই দেউলিয়া নীতির জন্ম দিয়েছে। পৃথকভাবে ও সম্মিলিতভাবে ফিলিস্তিনিদের অধিকারগুলো ইসরাইলিদের অধিকারের চেয়ে নিকৃষ্ট। তাই ট্রাম্পের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা কখনো শান্তি স্থাপনে সক্ষম হবে না।

সংশ্লিষ্ট খবর