শুক্রবার ১৪ই আগস্ট ২০২০ |
গালফবাংলা স্ববিশেষ

অধরার চোখ ছুঁয়েছে চোখে

ঢাকা প্রতিনিধি |  শনিবার ৯ই মে ২০২০ দুপুর ০২:৩৮:০৯
অধরার

অধরা খান

২০১৯ সালের ৭ মে অধরা খানের ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিলো, ‘ভয়াবহ খারাপ সময়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে আসা হলো!!’ বাংলাদেশে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দীর প্রয়াণে ছিলো তার এই দুঃখগাঁথা। কিন্তু জনপ্রিয় এই শিল্পীর মহাপ্রয়াণের আরও এক বছর আগেই অধরা খান তার গল্পটি শুরু করেছিলেন, যার প্রস্তুতি ছিলো আঁটঘাটবাঁধা। ২০১৮ সালের অক্টোবরে। বাংলা সিনেমার দুর্দিনগুলো ততদিনে অনেকটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে যেখানে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৩৫টির মতো সিনেমা হল সচল ছিল, সেখানে ২০১৮ সালে এসে আড়াইশ’র কম। আর এই কমসংখ্যক সিনেমা হলের মধ্যেই সময়ের দুই পরিচিত ও জনপ্রিয় নায়ক বাপ্পী ও সায়মনকে পেলেন অভিনয়ের সঙ্গী হিসেবে। দুর্দিনেও প্রায় শতহলে আড়ম্বরে ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর নায়ক আর ২৬ অক্টোবর মাতাল সিনেমা দুটো মুক্তি পায়। এই যে, মুক্তি সিনেমার; এই মুক্তির আগেই সিনেমার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন অধরা খান। নাচের ক্লাসের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন মিরপুরের একটি ডান্সস্কুলে। অভিনয়ের প্রথম কলাও সেখানেই রপ্ত করা তার।

‘নায়ক’ আর ‘মাতালে’ ডায়লগের সময় হাত বা চোখের ব্যবহার নিয়ে দোটানায় থাকেনি অধরা খান। অভিনয়, নাচ, ডায়লগ আর চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের সবটুকু সদিচ্ছা দিয়ে, কিন্তু এই সদিচ্ছা পরিস্ফূটনে ফুরসত পেলেন কোথায়? কয়েকমাস আগে সেন্সর-সার্টিফিকেট পেয়ে এই রমজানের ঈদে হলের পর্দা আলোকিত করার কথা থাকলেও করোনাভাইরাসের কারণে মুক্তির প্রক্রিয়া স্থগিত। 

ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিক গত ফেব্রুয়ারিতে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সারাদেশে এখন ৭০ টি হল চালু রয়েছে। সে হিসেবে অপেক্ষায় থাকা ‘পাগলের মতো ভালোবাসি’ সিনেমাটি আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো। এই সিনেমাটির প্রতি অধরা খানের একটু ভিন্নরকম দুর্বলতা। শাহীন সুমন পরিচালিত এই মুভি তার প্রথম সিনেমা, যেখানে নিজের বৈভব নিয়ে জানান দিয়েছিলেন, বাংলা সিনেমার ক্যান্ডেললাইট হচ্ছেন অধরা খানই।

করোনাকালে হলবন্ধের এই দুঃসময়ে অবশ্য নিজের হাসিমুখ গোপন করেননি অধরা খান। বন্ধের মধ্যেও নিজের আশা আর আকাঙ্ক্ষার মিশেল দিলেন তিনি- গালফবাংলাকে ঢালিউডসুন্দরী বললেন, ‘ভালো-খারাপ মিলিয়ে সবকিছু হয়তো এই সময়টা থাকবে না। যেহেতু আমাদের সিনেমা শিল্পটির এই অবস্থা ছিলো না, হয়ে গেছে। তাই বলছি, হল যেমন বন্ধ হচ্ছে তেমন অনেক নতুন-নতুন সিনেপ্লেক্সও হচ্ছে। একদিকে ভাঙবে, অন্যদিকে গড়ে উঠবে-- এটাই নিয়ম। এভাবেই হয়। এখন সময়টা আসলে ভালো না। পুরো পৃথিবী অসুখে পড়ে গেছে হুঁট করেই। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিটাও হয়তো সাময়িকভাবে অসুখে পড়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার প্রচেষ্টায় যেকোনও নতুন কিছুর সাথে অ্যাডজাস্ট হতে সময় লাগে। আমরা ডিজিটালাইজড হয়েছি, সেটার সাথেও অ্যাডজাস্ট হতে হয়তো সময় বেশি লেগে যাচ্ছে।’  

কী সিনেমা বা মিডিয়া অথবা গণমাধ্যম। সর্বত্রই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন লাস্যমুখী এই চিত্রতারকা। সিনেমার ছোট জার্নি, কিন্তু ক্যারিয়ারের ভূমিকাপর্বে সিনেমার সঙ্গে বাইরের বাস্তবতাও ছুঁয়ে যায় তার হৃদয়জুড়ে।  বাংলাদেশে যখন মার্চে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হলো, গোপনে দরিদ্র-অসহায় মানুষের দরোজায় গিয়ে খাদ্য তুলে দিয়েছেন অধরা খান। সে কথা আর গোপন থাকলো কোথায়-- নেটিজেনরা গোগ্রাসে প্রিয় নায়িকার ওয়ালভর্তি করে দিলেন অভিনন্দনবার্তায়, কয়েকদিন টানা চললো শুভেচ্ছাবিনিময়।

এরমধ্যেমধ্যেই গত মাসের ২৩ তারিখ বাবা হারানোর এক বছর পার করলেন অধরা। গত বছরের এই দিনে ঢাকা বিভাগের শরীয়তপুর জেলায় গ্রামের বাড়িতে তার পিতা সিরাজুল ইসলাম খান ইন্তেকাল করেন। নিজের সবচেয়ে প্রিয়স্বজনদের হারিয়েও অটল অধরা খান। পাশে পান তার ভক্তজনদের, যাদের অনুরাগ নিয়ে বেঁচে চলেছেন তিনি। এই বেঁচে থাকায় নিত্যসঙ্গী যিনি, তার মা। অধরা খানের মত, তার মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো, যদিও মা অল্পতেই রেগে যান। তাতে কী, অধরা যে হাসিতে তার দর্শকেরা পাগল, সেই হাসিই নাকি তার মায়ের সবথেকে প্রিয়। তারও অনুযোগ, অধরাও অল্পতেই রেগে যায়।  নাহ, এই রাগারাগি একান্তই ঘরের ব্যাপার।

এই করোনাকালে ঘরে বসেই সময় পার করছেন বাংলা চলচ্চিত্রের ক্যান্ডেললাইট অধরা খান। কী করছেন, ঘরবন্দিসময়ে? শুক্রবার (৮ মে) বিকালে গালফবাংলাকে দিলেন ফিরিস্তি-- ‘‘রোজা রাখছি, এখন পর্যন্ত সবগুলোই। বাকিগুলোও রাখবো আল্লাহ সহায় হলে। আসলে করোনার আগেও শুটিংয় বা অন্য কাজ না থাকলে আমি বাসাতেই থাকতাম অধিকাংশ সময়। কাজ ছাড়া বাইরে তেমন আড্ডা দেয়া হয় না। সবসময় আমার কাজিন বা বন্ধুদের নিয়েই বাসাতেই সময় পার করা হয়। একসাথে মুভি দেখা, গল্প করা, কোনও গেমস খেলা, ইয়োগা করা, জিম করা, সবকিছু আমরা দলবেঁধে করেই করতে পছন্দ করি। ছাদে গেলেও একসাথে যেতাম। সেক্ষেত্রে নিজের বাসার চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে, তাই না। করোনা এসে সবার একসাথে বাসায় দেখা হওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছি। যেহেতু আমরা সবাই প্রপার লকডাউন মেনে চলছি প্রায় দুই মাস হতে চললো। আমরা সবাই সবাইকে অনলাইনে ভিডিও কলে দেখি বা চ্যাটিং করি। নিজের মতো করে সময় পার করছি। এই প্রথম একদম একা-একা যার যার বাসায়। ওরা থাকলে বই কম পড়া হতো। এখন বইটা বেশি পড়তে পারছি।’

কী বই? গালফবাংলার প্রশ্নে নিজের সংক্ষিপ্ত কিন্তু জৌলুসভরা হাসি দিয়ে বলেন, ‘আমি প্রচুর পড়তে পছন্দ করি। যেকোনও বই পড়ি। হোক সেটা গল্প কিংবা কবিতা বা কারও আত্মজীবনী।’ বই পড়ার পাশাপাশি সিনেমাও দেখছেন অধরা খান। বলেন, ‘কেবল মুভিই দেখছিনা, সিরিজ দেখছি, ওয়েবফিল্ম দেখছি, অ্যানিমেটেড মুভি, কার্টুন মুভিও দেখছি। এই চলে যাচ্ছে সময়, সুস্থ সময়ের অপেক্ষায়।’ সিনেমা নিয়ে অধরা খানের দীর্ঘ বিবরণ, 

‘‘প্রচুর মুভি দেখছি। এত মুভি দেখছি, নাম বলবো কিনা, বুঝতে পারছি না। তবে উল্লেখযোগ্য একটা মুভির নাম অবশ্যই বলতে চাই। একটা তুর্কি সিনেমা দেখছিলাম ইংরেজি সাবটাইটেলসহ। ছবিটি শুরু হওয়ার ত্রিশ মিনিট পর থেকে কান্না শুরু হয়েছিলো আমার। শেষ অব্দি কান্না কন্টিনিউ ছিলো। কোনওভাবেই নিজের ইমোশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। চোখের পানি আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। অথচ, খুব সিম্পল একটা গল্প। অদ্ভূত মায়ামেশানো।’’

বাংলা সিনেমার হাসিমুখ নায়িকাকে কাঁদিয়ে দেওয়া এই তুর্কি সিনেমার নাম, ‘মিরাকল ইন সেল নং ৭’। অধরার প্রিয় তিনটি সিনেমা অবশ্য বাংলাদেশের; ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘বিরাজ বউ’ ও ‘পদ্মা নদীর মাঝি’।

সব ঠিকঠাক থাকলে চলতি রমজান ঈদের পর বড়পর্দায় আবারও ঝড় তুলতেন অধরা খান, মুক্তির কথা ছিলো সেন্সরবোর্ডে সাধুবাদ পাওয়া শাহীন সুমন পরিচালিত ‘পাগলের মতো ভালোবাসি মুভিটি। সে আর হলো কোথায়, এখনও হল মালিক আর প্রযোজকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, ঈদুল ফিতরে হলের কী হবে। কেউ বলছেন, করোনাকালে পুরো পরিস্থিতি না দেখে হল খোলা ঠিক হবে না, আর কারও যুক্তি, সামাজিক দুরত্ব মেনে হল দোকানপাট চালু হলে হলে সমস্যা কোথায়? অধরা খান অবশ্য এ প্রসঙ্গে কবির মতো নীরব। বললেন, ‘সেন্সর পেয়েছে পাগলের মতো ভালোবাসি মুভিটি। এই ঈদের পর রিলিজ হওয়ার কথা ছিলো। এখন যেই পরিস্থিতি, তাতে পরিচালক বা প্রযোজক ভালো বলতে পারবেন পরে কখন সিনেমা মুক্তি পাবে।’ 

এই ছবিটি দিয়েই বাংলা সিনেমার আনপ্রেডিক্ট্যাবল ফিল্ডে পা দিয়েছিলেন অধরা খান। ২০১৬ সালের জানুয়ারির একেবারে শেষ দিকে ছবিটির কাজ শুরু হয়। আতিকুর রহমান লাভলুর প্রযোজনায় সিক্সডি প্রডাকশন হাউজের এ ছবিটি মুক্তির জন্য আর অপেক্ষা সইছে না অধরা খানের, তবে অপেক্ষাই এখন সম্বল। এই অপেক্ষার শক্তি তার প্রথম দুই ছবি। অধরা খানের কৃতজ্ঞতাবদ্ধভাষ্য, ‘মাতাল ও নায়ক- দুটো সিনেমার জন্যই আমার জায়গা থেকে আমি রেসপন্ডস ভালো পেয়েছি। সেদিক থেকে পুরো কৃতজ্ঞতা আমার পরিচালক, প্রযোজকদের।’

ইন্ডাস্ট্রিতে ক্লিন ইমেজ নিয়ে মাত্র দুই বছরে নিজের পরিচিতি আর খ্যাতির বৈভব কিছুটা সামলেছেন অধরা খান। নতুনেরা কতটা নির্ভরযোগ্যতা তৈরি করতে পারছে ঢাকাই সিনেমায়, গালফবাংলার এমন প্রশ্নের উত্তরে নতুনের জন্য অধরার পক্ষপাত। অধরা খানের ব্যাখ্যা, ‘‘নতুন নির্ভরযোগ্য শিল্পী নিয়ে এই বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, আসলে নতুন তো নতুনই। নতুনদের নির্ভরযোগ্য করে নিতে হয় এবং প্রপার কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। নতুন শিল্পীদেরও একটু সময় দিতে হয় সেই প্রপার কাজটা করার জন্য। একজন শিল্পী কিন্তু একটি বা দুটি কাজ করেই তৈরি হন না। সেক্ষেত্রে নতুনদের সাথে নির্ভরযোগ্য শব্দটা বসতেও সময় দেওয়া উচিৎ বলেই আমি মনে করি। কারণ, এখন অডিয়েন্স রিচ করা অবশ্যই কঠিন। তাদের ধরে রাখা আরও কঠিন। এখন দর্শকগণ অনেক অপশনে অভ্যস্ত। বাকিটা অডিয়েন্স চয়েসের উপর ডিপেন্ড করে।’’


‘‘তোমাকে ভালোবাসি, তাই

আমি এলোমেলো হয়ে যাই

ও, তোমাকে ভালোবাসি তাই

আমি এলোমেলো হয়ে যাই’’

আহমেদ হুমায়ূনের সঙ্গীতায়োজনে নায়ক সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় এ গানটি গেয়েছেন কনা আর ইমরান । নিজের সিনেমার গানের মতো বাংলা মুভির এই মানবিকার মনও নতুনভাবে এলোমেলো হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের মহাপ্রয়াণে অধরার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ‘‘আমাদের করোনার কারণে যে ক্ষতি হয়ে গেলো সবার, পুরো পৃথিবী উলটপালট হয়ে গেলো। আমরা না হয় আগের চেয়ে বেশি কাজ করে আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো কিন্তু যেভাবে আমরা স্বজন হারা হচ্ছি, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো মানসিক শক্তি আমরা কোথায় পাবো?’’


সেই শক্তির কথা শোনালেন বাংলাদেশের সিনেমার দ্বিতীয় দশকের শেষপ্রান্তে আসা এই নায়িকা, সমস্ত ব্যকুলতা ছড়িয়ে দিলেন, ‘‘প্রত্যেকদিন কতজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে, সবারই তো একটা পরিবার। নিউজে প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি ছোট-ছোট বাচ্চাদের রেখে তাদের বাবা-মা মারা যাচ্ছে, এইযে দুঃসময় টা আমরা পার করছি ব্যাখ্যাহীনভাবে এটা আমাদের পাওনা ছিলো না। এখন আসলে নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। আমরা অন্যকে নিয়েই বেশি ভাবতে চাই। দেখুন না, কত মানুষ শুধুমাত্র নিজের চেষ্টায় নিজ অর্থে অন্যকে সহযোগিতা করছেন। অন্য একটি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার যেই আকুতি, ভালোবাসা-আনন্দ এটা অব্যাহত থাকুক। আসলে যারা এখনও এমন, তারা আগেও এমন ছিলেন বলেই বিশ্বাস করি। মানুষ মানবিক। বিধাতার কাছে চাওয়া আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিন। আমাদেরসহ পুরো পৃথিবীটাকে সুস্থ করে দিন।’’

অধরা খানের মতো সারা পৃথিবীর মানুষের আকুতি-- পৃথিবীটা আবার হাসুক, আঙুল ছুঁয়ে যাক, চোখ ছুঁয়ে যাক চোখে, আবারও মুঠোর ভেতরে আশার ফুল ফুটুক।

অধরা খানের দুটি গানের ভিডিও

এলোমেলো গান

আঙুল ছুঁয়েছে 

ছবি: সোমনাথ রায়

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

সংশ্লিষ্ট খবর