শুক্রবার ১৪ই আগস্ট ২০২০ |

মরুর শাসক: আসমা বিনতে শিহাব

 শুক্রবার ১৯শে জুন ২০২০ দুপুর ০১:৩৭:৫৯
মরুর

ইউরোপ নারী স্বাধীনতা, অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে যত অহংকারই করুক মধ্যপ্রাচ্যের মরুর রানী আসমা বিনতে শিহাব ইউরোপের অষ্টসহস্র বছর আগে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন তা তখন তাদের নারীরা কল্পনাও করতে পারেনি।

ইয়েমেনের আসমা বিনতে শিহাব আল-সালেহি ১০৪৭-৮৭ সাল পর্যন্ত রাজার স্ত্রী রানী হিসেবে নয় বরং ক্ষমতা প্রয়োগের রানী হিসেবে রাজত্ব করেছেন। আর ক্যাস্তিলের রানী ইসাবেলার রাজত্বকাল ১৪৭৪ থেকে ১৫০৫। ক্যাস্তিলে বর্তমান স্পেনের অংশ। সে হিসেবে স্পেনের রানী প্রথম ইসাবেলা।

আসমাকে বুঝতে হলে তার সময় ও পরিবেশ কিছুটা জানা প্রয়োজন। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম। তার জন্মকালে আরবের যে বর্ণনা আমাদের সবার মনে গাঁথা আছে তা হচ্ছে: আরব দেশ বালির দেশ, প্রচণ্ড গরমের দেশ, হানাহানি ও খুনোখুনির দেশ—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হচ্ছে যে সময় কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে জীবন্ত কবর দেয়া হতো, বঞ্চনার শীর্ষে ছিল নারী। যখন ইসলাম প্রচার ও ইসলাম ধর্মগ্রহণ শুরু হয়ে যায়, কন্যাশিশু জীবন্ত কবরদান মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও রাতারাতি নারীর মর্যাদার পরিবর্তন ঘটে।

৬৩০ সালের দিকে মহানবী তার চাচা আবু তালিবের পুত্র ও নিজ কন্যা ফাতিমার স্বামী হযরত আলীকে ইয়েমেনে বিরাজমান গোত্রদ্বন্দ্ব নিরসন করতে পাঠান। সে সময় আরব অঞ্চলের সবচেয়ে উন্নত ও অগ্রগামী এলাকা ছিল ইয়েমেন। সমষ্টিগতভাবে প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা গোত্রই ইয়েমেনের বানু হামদান। ইয়েমেনি মুসলমানরাই মিসর, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, উত্তর আফ্রিকা, সিসিলি ও আন্দালুসিয়ায় ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করে। খোলাফায়ে রাশেদিন যুগে ইয়েমেন বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। এরপর আন্তঃগোত্রীয় ক্ষমতার লড়াই বরাবরই ছিল। আলী বিন মুহাম্মদ বিন আলী আল সালেহি নামের উচ্চাভিলাষী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তরুণের হাতেই ইয়েমেনে প্রতিষ্ঠিত হলো সালেহি সুলতানাত। তার বাবা ছিলেন শাফিই মাজহাবভুক্ত বিশিষ্ট সুন্নি কাজি। কিন্তু আলী বিন মুহাম্মদ শিয়া সম্প্রদায়ের ইসমাইলিয়া গোত্রভুক্ত হন এবং নতুন করে দীক্ষা নেন। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের উত্থান ও বিকাশে সুলতান আলী বিন মুহাম্মদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে ক্ষমতা দখলের জন্য তার হাতও রক্তাক্ত করতে হয়েছে।

সে আমলে ইয়েমেন তুলকমূলকভাবে যথেষ্ট উন্নত হলেও সেখানে দ্বিতীয় সহস্রাব্দে একেবারে সূচনায় কোনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল না। স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরগনার রাজাদের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে সাম্রাজ্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা লেগেই থাকত। একদল ক্ষমতাসীন হলে আরো তিন দল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠত।

সম্ভ্রান্ত বংশজাত আলী ইবনে মুহাম্মদ আল সালেহিকেও সালেহি রাজবংশ প্রতিষ্ঠায় একই কাজ করতে হয়েছে। ১০৬০ সালে আলী বিন মুহাম্মদ জাবিদ বিজয় করে নাজাহ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আল নাজাহকে হত্যা করেন, পালিয়ে যাওয়ায় তার ছেলেরা প্রাণে বেঁচে যায়। আলী বিন মুহাম্মদের সামরিক দক্ষতায় বৃহত্তর ইয়েমেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আলী তার চাচাতো বোন আসমা বিনতে শিহাবকে বিয়ে করেন এবং তাকে সহশাসক ঘোষণা করেন। আসমার উপাধি হয় ‘আল-সাইয়েদা আল হুররাতুল’। অর্থাৎ মহীয়সী নারী, যিনি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম যাকে কোনো ঊর্ধ্বতন শাসন কর্তৃপক্ষের কাছে মাথা নত করতে হয় না। পুত্ররাজতান্ত্রিক নারীবিদ্বেষী সমাজে সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সার্বভৌম হিসেবে মসজিদের খুতবায়ও আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে। সারা মুসলিম বিশ্বে আসমা বিনতে শিহাবের আগে কখনো কোনো নারীর নাম খুতবায় উচ্চারিত হয়নি। তিনি রাজকার্য পরিচালনা করতেন এবং ঘোমটা উঠিয়ে সভাসদদের সঙ্গে বৈঠক করতেন বলে ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেছেন।

১০৪৭ সালে বাদশাহ হয়ে আলীই তাকে রাজনৈতিক অংশীদার ঘোষণা করেন। তিনি স্বামী, পুত্র ও পুত্রবধূর সঙ্গে সহশাসক হয়ে দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রের শাসন পরিচালনা করেন, প্রজামহলে ব্রতী হন, প্রতিবেশী, রাজন্যদের সঙ্গে সফল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শাসনের যে ধরন তাতে আলী বিন মুহাম্মদ ও তার স্ত্রীকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের পুরো শাসনকার্য পরিচালিত হয়েছে যৌথ শাসনে। ছেলে আল-মুকাররাম ও বউমা আরওয়ার সঙ্গেও একইভাবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করে গেছেন। বন্দিদশার প্রায় এক বছর বাদে ১০৪৭-৮৭ পর্যন্ত ইসলামের কেন্দ্রভূমি আরবের তিনিই ছিলেন সবচেয়ে দীর্ঘকালীন শাসক।

তার সৌন্দর্যের খ্যাতি ছিল, তিনি শিল্পমনা ছিলেন, তিনি কবিতা লিখতেন। এ রচনাটিতে ১০৪৭-এ ক্ষমতারোহণ থেকে ১০৮৭-তে তার মৃত্যুবরণ পর্যন্ত বৃহত্তর ইয়েমেনের যে কাহিনী বিবৃত হচ্ছে মূলত তা হবে আসমার শাসনকালের কথা। তিনি ও তার পুত্রবধূ দুজনই মালিকা হাজিমা বা সহশাসক। আরবের এক কবি আসমার প্রশংসায় লিখেছেন—

আমি বলি মানুষ যখন বিলকিসের সিংহাসনের গৌরবগাথা

রচনা করে, আসমা তো সেই সিংহাসনও ম্লান করে দেয়,

তারকাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল সে-ই।

এ কবিতার বিলকিস মানে কুইন অব শেবা বাদশাহ সোলায়মানের পত্নী। আধুনিক ইয়েমেনি ইতিহাসিক মুহাম্মদ আল-তাওয়ার লিখেছেন: আসমার সময়ে তার সমকক্ষ এবং তার মতো ক্ষমতাশালী কেউ ছিলেন না। তিনি সবার বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলেন। তার পরামর্শ নিয়েই ৪০ বছর ইয়েমেন শাসিত হয়েছে।

খ্রিস্টীয় ১০৬৬ সালে আলী বিন মুহাম্মদ স্ত্রী আসমা বিনতে শিহাবকে নিয়ে হজব্রত পালনের জন্য রাজকীয় কাফেলায় ইয়েমেন থেকে মক্কার পথে রওনা হলেন। ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও রাজকীয় উৎসব দুই-ই ছিল কাফেলায়। উমমাবাদে পৌঁছাতে অপরাহ্ন গড়িয়ে যায়। সেখানেই রাতযাপনের জন্য তাঁবু খাটাতে হয়। আসমা ব্যস্ত ছিলেন নারী সখীদের সঙ্গে আর আলী বিন মুহাম্মদ তাঁবুতে তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সুলতান মনে করতেন তার আমির-ওমরাহদের কেউ তার অনুপস্থিতকালে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে, সেজন্য তিনি তার পুত্র আহমাদ-আল-মুকাররামকে সায়িকভাবে তার রাজত্বের ভার দিয়ে তার পরিষদের সবাইকেই হজ কাফেলায় শরিক হতে বাধ্য করেছিলেন। এ কাফেলায় প্রতিরক্ষার জন্য সঙ্গে নিয়েছিলেন পাঁচ হাজার আরিমিনিয়া (এখনকার ইথিওপিয়া) সৈন্য। ইবনে খালদুন মনে করেন, দলবলসহ এ হজের ভিন্ন একটি উদ্দেশ্যও ছিল, সেটিই মুখ্য উদ্দেশ্য—মক্কা শরিফে শিয়াবাদ পুনরুদ্ধার ও কায়েম করা। কারণ সেখানকার শাসক বানু হাসিম গোত্রের মুহাম্মদ ইবনে জাফর ফাতেমিয় খেলাফত-ইসমাইলিয়া অনুশাসন মানতে নারাজ। এটা সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের তুল্য। তিন বছর আগে ১০৬৩ সালের শেষ দিকে আলী বিন মুহাম্মদ সসৈন্যে হেজাজ গমন করেন এবং আব্বাসীয়দের চ্যালেঞ্জ প্রতিহত করে ১০৬৪ সালে মক্কা বিজয় করেন। এ মক্কা বিজয় শিয়া ভাবাদর্শের প্রচারে এর ফাতেমীয় খলিফাদের নাম খুতবায় পাঠ করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

বিলাসবহুল কাফেলায় সুলতান ও তার সহশাসক আসমা বিনতে শিহাবের ইয়েমেন ত্যাগের বার্তাটি বহুল প্রচারিত হয়। আলী বিন মুহাম্মদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত নাজাহর পুত্র সাইদ আল-আওয়াল এ কাফেলার রুট সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতির নেন।

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন লিখেছন, জাবিদের শাসক ও আলী বিন মুহাম্মদের সম্বন্ধি আসাদ বিন শিহাব তার বোনের স্বামীকে সঙ্গোপন বার্তা দিয়েছেন যে নিহত শাসক নাজাহর দুই পুত্র আল-আওয়াল ও জায়াজ ইবনে নাজাজ তাদের গোপনি আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং সুলতানের কাফেলা আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। বার্তা পেয়ে তিনি তার ইথিওপিয়া সৈন্যদের কাফেলা প্রতিরক্ষা ও মুখোমুখি হলে নাজাহর দুই পুত্রকে হত্যা করার নির্দেশ দেন।

ঐতিহাসিক ইবনে খলিকান লিখেছেন, হেজাজের একটি খামারের সামনে তাঁবু গেড়ে কাফেলার সাম্যকরা যখন অবস্থান করেছিলেন সৈন্যদের প্রহরার ভেতর দিয়েই আল-আওয়াল এবং হাতেগোনা তার ক’জন দক্ষ অনুসারী লুকিয়ে তাবুতে প্রবেশ করল। সুলতানের প্রহরীরা তাদের স্বপক্ষীয় সৈন্য মনে করে বাধা দেয়নি। কিন্তু সুলতানের ভাই আব্দুল্লাহ চেঁচিয়ে উঠলেন, গতকাল আসাদ ইবনে শিহাব তাদের কথাই বলেছেন, তারা এসে গেছে। সন্ত্রস্ত আলী বিন মুহাম্মদ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তার অবস্থান থেকে এক পাও সরতে পারলেন না, আল-আওয়াল তাকে হত্যা করল।

ইবনে খালদুন মনে করেন, ইথিওপিয়া সৈন্যরা সাবেক সুলতানের পুত্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অস্বীকার করে এবং অনেকে নিজের অবস্থান থেকে পালিয়ে যায়। অবরোধকারীরা সুলতান তার ভাই আব্দুল্লাহ এবং আরো ১৭০ জন পুরুষকে হত্যা করে বিশিষ্টজনদের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

আসমা বিনতে শিহাবকে বন্দি করে। তাকে যে কক্ষে রাখা হয় তার জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি গেলে দেখা যায় সুলতানের দেহবিচ্ছিন্ন মাথা একটি লম্বা লাঠিতে গেঁথে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ব্যক্তির মাথাও এভাবে গেঁথে রাখা হয়েছে। ইবনে খালদুন মনে করেন, জায়াজ ইবনে নাজাজ সুলতানকে হত্যা করেছিল। এ হত্যাকাণ্ড ইয়েমেনবাসীকে ক্ষব্ধ করে। প্রজাদরদি হিসেবে আলী বিন মুহাম্মদ ও আসমা বিনতে শিহাব নাগরিকদের কাছে প্রিয় ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর নারী ও অন্যান্য জীবিত সদস্যদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। নিহত সুলতানের ইথিওপীয় বাহিনীকে আল-আওয়াল সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের জাবিদ শহরে মার্চ করিয়ে নেয়া হয়।

সুলতানের পুত্র আল-মুকাররাম হতভম্ব হয়ে যান। কারাগার থেকে গোপনে পাঠানো মায়ের একটি চিঠি পান। এ চিঠি তাকে আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনে। চিঠিতে আসমা কাপুরুষতার কারণে ছেলেকে ধিক্কার দেন। শক্তিশালী হয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাকে এবং গোটা আরব জাতিকে উদ্ধার করার নির্দেশ দেন। নতুবা সবাইকে কলঙ্ক বয়ে বেড়াতে হবে।

ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ মনে করেন, কারারুদ্ধ আসমাকে আল-আওয়াল ধর্ষণ করেন এবং তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। সেজন্যই তিনি ছেলেকে লেখেন আমার নামে কলঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে আমাকে উদ্ধার করো। অবশ্য আসমা বিনতে শিহাবের গর্ভবতী হয়ে পড়া নিয়ে বিতর্ক আছে; কারো মতে তিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটেনি।

আল-মুকাররামের পেছনে তিন হাজার অশ্বারোহী সৈন্য প্রস্তুত হয়ে জাবিদ শহরের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। নগর রক্ষায় নিয়োজিত ২০ হাজার সেনা দিশেহারা হয়ে পড়লে আর প্রতিরোধ গড়ে তোলতে পারেনি। আল-মুকাররাম মা যেখানে বন্দি সে প্রকোষ্ঠের সামনে যুদ্ধের শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় জিন্দানখানায় প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলেন।

নিরুদ্বেগ কণ্ঠে আসমা বিনতে শিহাব জিজ্ঞেস করলেন, কে তুমি?

আল-মুকাররাম জবাব দিলেন, আমি আহমেদ, আলীর পুত্র।

সন্দিহান রানী বললেন, আরবদের মধ্যে অনেক আলী ও আলীর পুত্র আহমেদ আছে।

ঠিক তখনই আল-মুকাররাম শিরস্ত্রান খুলে মাকে তার চেহারা দেখালেন, তিনি রজকীয় প্রথা অনুযায়ী স্বাগত প্রভু আল-মুকাররাম বলে তাকে আমন্ত্রণ জানালেন।

একসময় তার শরীরে এমন ঝাঁকুনি অনুভব করলেন যে কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরের একাংশ স্থায়ীভাবে অসার হয়ে গেল। আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় তাকে জিন্দানখানা থেকে তোলা হলো। বাকী জীবনে তিনি আর সেরে ওঠেননি। অশ্বারোহী সৈন্যরা রানী আসমা বিনতে শিহাব ও তাদের সুলতান আল-মুকাররামকে নিয়ে রাজধানী সানায় রওনা হলো।

শয্যাশায়ী পুত্রের পাশে থেকে তিনি রাজন্য পরিচালনা করতে থাকলেন। একসময় আল-মুকাররাম আনুষ্ঠানিকভাবে তার স্ত্রী আরওয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। আসমা বিনতে শিহাব তার পাশেও দাঁড়ালেন এবং কিছুটা আড়ালে থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার জটিল বিষয়গুলো সামাল দিতে থাকলেন।

আল-মুকাররাম যখন রানীকে উদ্ধার করার যুদ্ধে বিজয়ী হন, পিতার ঘাতক ও মায়ের সম্ভ্রমহানির খলনায়ক সায়িদ তখন সমুদ্রপথে পালিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে তার পুত্রবধূ নতুন রানী আরওয়ার মনে। কৌশলগত কারণে নতুন রানী রাজধানীর সানা থেকে জাবালায় স্থানান্তর করেন—জাবালা একটি ছোট সুরক্ষিত দুর্গনগরী। তিনি সায়িদ ইবনে নাজাহর চারদিকের রাজন্যদের সঙ্গে গোপন কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অন্যদিকে সায়িদকে জাবালা আক্রমণে প্ররোচিত করেন। তার আক্রমণাত্মক আচরণ প্রতিবেশী রাজারা পছন্দ করছিল না। তবে তারা আরওয়ার সঙ্গে আঁতাতের বিষয় গোপন রাখল। সায়িদ নিশ্চিত হলে সমরশক্তিতে আরওয়া তার সমকক্ষ নয়, এমনকি তাকে সমর্থন করার মতো কোনো প্রতিবেশীও নেই।

সায়িদ জাবালা আক্রমণ করল, ইয়েমেন বাহিনীর হাতে পরাস্ত হলো এবং তাকে হত্যা করা হলো। তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে এনে সায়িদের মাথা গলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে লাঠির শীর্ষে গেঁথে তার কারাগারে জানালার সামনে লাঠিতে এমনভাবে পোঁতা হলো যেন এই নারী তার প্রতাপশালী স্বামীর দেহহীন মুণ্ডটি পুরোপুরি দেখতে পায়।

এ নির্মমতার জন্য তিনি সমালেচিতও হন। কিন্তু সেকালের আইনই ছিল চোখের বদলে চোখ। ইয়ামিন আল খাতিব তার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন: রাষ্ট্র ও যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, আরওয়ার চেয়ে ভালো কারো জানা নেই।

তবে ঐতিহাসিকরা কখনো দ্বিমত হননি যে স্বামীর সঙ্গে সহশাসক হিসেবে, ছেলের সাথে এবং বৌমার সঙ্গে সহশাসক হিসেবে আসমা বিনতে শিহাবই ছিলেন শাসনকার্যের প্রধান হুকুমদাতা। সে কালে দুনিয়ার আর কেনো নারী এত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেনি।

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

সংশ্লিষ্ট খবর