শুক্রবার ১৪ই আগস্ট ২০২০ |
শুক্রবারের লেখা

দূর পরবাসে আমার বন্ধুরা-০১

তামীম রায়হান |  শুক্রবার ১০ই জুলাই ২০২০ বিকাল ০৩:৩৬:১৫
দূর

তারুণ্যে বন্ধুত্ব বলতে যা বুঝায়, কাতারে আসার পর আমার বেলায় তা প্রথম গড়ে ওঠে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে আকিল ও দুকের সঙ্গে। আকিলের বাড়ি চীনে, দুকের ভিয়েতনামে। আকিল মুসলিম বলে এটি তার ইসলামি ডাকনাম, আদতে চীনা পরিচয়পত্রে তাঁর নাম ভিন্নকিছু (হাইফেং থায়)।

একদিন ক্যান্টিনে খেতে বসে প্রথমে দুকের সঙ্গে হালকা আলাপচারিতা, এরপর ধীরে ধীরে সখ্যতা। ভিয়েতনামের তরুণ দুক রুমের চাবি বানাতে চেয়েছিল, আমারও বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, দু জন মিলে পরদিন গিয়েছিলাম সুক ওয়াকিফের বিপরীতে এক দোকানে। ও চাবি বানাতে দিয়েছিল, আমি আমার কাজ সেরেছিলাম। এই যাওয়া-আসার পথে আমরা গল্প করি, পরিচিত হই।

এর কিছুদিন পর আকিল যোগ দেয় আমাদের সঙ্গে। আমরা তিনজন তখন নিয়মিত আড্ডা দিতে শুরু করি। হোস্টেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতকালে তিনজন একসঙ্গে বসি, গল্পে গল্পে পথ পেরিয়ে যায়।

দুকের ছবি-


রাতে হোস্টেলের ক্যান্টিনে আরবীয় স্বাদের খাবার ওদের ভালো লাগে না। নিজেদের মতো করে চীনা খাবার রান্না করতো ওরা ওদের রুমে, সেখানে আমি নিমন্ত্রিত হতাম প্রায়ই। বেশিরভাগ সময় নুডলস দিয়ে তৈরি নানা রকমের তরল ও শুকনো খাবার খেতাম, প্রথম প্রথম বিস্বাদ লাগলেও বন্ধুত্বের খাতিরে খেতে খেতে সয়ে গেল সেসব। আকিল আমাকে শেখাতে শুরু করলো, আঙুলে দুটি লম্বা শলাকা ধরে কিভাবে নুডলস স্যুপ খেতে হয়, এমনকি ভাত-মাংসও।

ধীরে ধীরে আকিল ও দুকের সঙ্গে আমার বেশ জমে ওঠে। বৃহস্পতিবার এলে আমরা তিনজন হোস্টেল থেকে বের হয়ে যাই। উদ্দেশ্যহীন পথচলা, কথা বলা।

আকিলের ছবি


আকিল তার পরিবারের গল্প করতো খুব কম। চীনের সন্তান-নীতির ফলে সে মা-বাবার আদর পেয়েছে কম, তাই তাদের নিয়ে তাঁর স্মৃতি খুব বেশি নেই। বরং দাদীই ছিল তার আপনজন। দাদীকে ঘিরে সে তার পরিবারের গল্প করতো।

দুক ছিল স্বল্পভাষী, সে বলতো ভিয়েতনামে তার পরিবারের কথা, বিশেষত মায়ের কথা। এলাকার বন্ধু-বান্ধবীদের কথাও। আমি বেশিরভাগ সময় ছিলাম তাদের শ্রোতা।

ধর্মীয় বিশ্বাসে গৌতম বুদ্ধের অনুসারী দুককে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তুমি কী জানো?

কিছুক্ষণ ভেবে দুকের উত্তর ছিল, ইসলাম তোমাদেরকে চারটি বিয়ে করতে বলে। এটুকু জানি। এই বলে ওর মুখে জ্ঞানের হাসি। আমি সেদিন আর কথা বাড়াইনি।

আমি খাবার খেতে পছন্দ করি হাত দিয়ে, ওরা অভ্যস্ত চামচ দিয়ে। কাউকে হাত দিয়ে খেতে খেতে দেখলে ওদের বমির উদ্রেক হয়। আমি সেজন্য কখনো ক্যান্টিনে ওদের সঙ্গে এক টেবিলে বসতাম না। আমি জানতাম, আমাকে দেখলে ওরা এড়িয়ে যেতে পারবে না, আবার আমিও চামচে খেয়ে ভোজনপর্ব নষ্ট করবো না। তাই নানা অজুহাতে ওদের আগে-পরে খেতে যেতাম।

কিন্তু এভাবে বেশিদিন চললো না। ওরা খেতে যাওয়ার আগে আমার রুমে এসে ডাকতে শুরু করলো। ফলে আর এড়িয়ে যাওয়া গেল না। একদিন ওদের বললাম, তোমাদের সঙ্গে বসলে আমাকেও চামচ দিয়ে খেতে হয়, এতে আমার সয় না। পেট তো ভরে, কিন্ত মন মানে না। আমি হাত দিয়ে খেয়ে বড় হয়েছি, সেভাবেই খেতে হবে আমাকে।

আমি হাত দিয়ে খেতে শুরু করলাম। ওরা আমার হাত দিয়ে খাওয়া মেনে নিল বিনা বাক্যব্যয়ে। খেতে খেতে গল্পের আনন্দ যেখানে মুখ্য, চামচ আর হাতের পার্থক্য সেখানে তুচ্ছ।

বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিনও সন্ধ্যার পর আমরা তিনজন একসঙ্গে হাঁটতে বের হতাম। তখনো মোবাইলের নেশা বুঁদ করেনি মানবজাতিকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল ল্যাপটপে। ফলে একাডেমিক অ্যাসাইনমেন্টের কাজ শেষ হলে আমরা প্রাণখুলে আড্ডা দিতাম, হাসি আনন্দে উৎফুল্ল সময় পার করতাম। কখনো ছাত্রাবাসের দু ভবনের মাঝখানে খোলা আঙিনায়, কখনো হেঁটে হেঁটে রাস্তায়।


অঘোষিতভাবে কিছু রেওয়াজ শুরু হলো আমাদের মধ্যে। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আমরা তিনজন একসঙ্গে বাইরে ঘুরতে বের হতাম। ফেরার পথে রাতের খাবার খাওয়া হতো কোনো রেস্তোরাঁয়। 

রেওয়াজ হলো, আমাদের একেকজন একেক সপ্তাহে নিজ নিজ দেশের খাবার খাওয়াবে এবং সে বিল দেবে। সুতরাং এক সপ্তাহে আমি ওদেরকে নিয়ে যেতাম বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয়, পরের সপ্তাহে আকিল আমাদেরকে খাওয়াতো চায়নিজ রেস্তোরাঁয়। ভিয়েতনামের কোনো রেস্তোরাঁ তখন দোহায় ছিল না বলে পূর্ব-এশীয় অন্য কোনো দেশীয় রেস্তোরাঁয় আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানাতো দুক।

আমার ভাগ্য ছিল ভালো। ওদের সঙ্গে চায়নিজ বা অন্য দেশীয় রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে খাবারের বিল একশ রিয়ালের বেশি হতো। কখনো দেড়শ ছাড়িয়ে তা দু শতে গিয়ে ঠেকতো। সেকালে ছাত্র হিসেবে এই পরিমাণ অর্থ আমাদের কাছে বেশিই মনে হতো। আমরা তখন মাস শেষে কাতার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পকেট খরচ হিসেবে পাঁচশ রিয়াল বৃত্তি পেতাম।

আমি ওদের পছন্দের রেস্তোরাঁয় খেতে বসলে খাবারের বিল এলে উঁকি দিয়ে দেখেও না দেখার ভান করতাম। ওদের দেশের খাবার, ওরা সামলাক। বরং ওদের খুশির জন্য আমি বাঙালি হয়ে আধসেদ্ধ লতাপাতা আর কীসব যে খাচ্ছি, এই তো বেশি। মুসলিম দেশ কাতারে বলে হয়তো সাপ-কচ্ছপ খেতে হচ্ছে না ওদের সাথে।

পরের সপ্তাহে আমার পালা এলে আমি ওদেরকে নিয়ে যেতাম পুরনো দোহায় বা নাজমা এলাকায় কোনো বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয়। একাধিক রকমের খাবারে ওদেরকে ভরপেট খাইয়ে বিল দিতে হতো মাত্র ৫০-৭০ রিয়াল। এরপরও জিজ্ঞেস করতাম, তোমাদের আর কিছু লাগবে?

কপালের ঘাম মুছতে মুছতে দু জনই বলতো, গলায় এসে ঠেকেছে খাবার, আর কতো হে!

অবশ্য এত সস্তা বিল যেন ওরা টের না পায়, আমি সেজন্য ওদেরকে রেস্তোরাঁর বাইরে দাঁড়াতে বলে সবার শেষে টেবিল থেকে উঠতাম। এরপর কাউন্টারে গিয়ে তড়িঘরি করে বিল দিয়ে বেরিয়ে যেতাম। 

মনে মনে আমার তখন কী যে আনন্দ হতো, অল্পের উপর দিয়ে সেরে গেল।

আকিল ও দুকের সঙ্গে আমার নানারকম স্মৃতি রয়েছে। হোস্টেল থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে আলসাদের ফুড প্যালেস পেরিয়ে মোবাইল মার্কেট এলাকার দিকে গিয়েছি অসংখ্যবার, গল্পে গল্পে কেটে যেত সেইসব দিনরাত। আমার মতো শ্রোতা পেয়ে গল্প জমিয়ে রাখতো ওরা দুজন।

চলবে...

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

তামীম রায়হান

তামীম রায়হান

কাতার প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর