বুধবার ২১শে অক্টোবর ২০২০ |

শিল্প আন্দোলন ও মুর্তজা বশীর

 রবিবার ২৩শে আগস্ট ২০২০ রাত ০১:৫৬:১৯
শিল্প

বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পুরোধা এবং শিল্পকলার উজ্জ্বল এক নক্ষত্র মুর্তজা বশীর। বাংলাদেশের শিল্পকলার বিকাশে তিনি এক অপরিহার্য ব্যক্তি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সদ্য বিকাশমান এই অঞ্চলের দ্বিধাগ্রস্ত নড়বড়ে শিল্পকলাকে যারা আস্থার উপাদান জুগিয়েছেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি চিত্রকলায় সব সময় স্থাপন করতে চেয়েছেন দৃঢ়তা আর পৌরুষ, ফলে প্রায় সব সময় তেল মাধ্যমের রঙেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। চিত্রশিল্পের পাশাপাশি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও রেখেছেন সৃজনপ্রতিভার স্বাক্ষর। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং প্রতিবাদে মুর্তজা বশীর ছিলেন অগ্রভাগে। তিনি যেখানেই গিয়েছেন আলো ছড়িয়েছেন।

প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে মর্তুজা বশীর অন্যতম। বহুমাত্রিক মুর্তজা বশীর বাংলাদেশি শিল্পকলার একেবারে প্রথম সারির শিল্পীদের একজন। তিনি শিল্পচর্চার পাশাপাশি লেখক হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় তার জন্ম। পিতা খ্যাতিমান পন্ডিত বহুভাষাবিদ লেখক গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুলস্নাহ। খ্যাতিমান পিতার ছায়া থেকে বের হওয়ার তাগিদে মুর্তজা বশীর শহীদুলস্নাহ থেকে হন মুর্তজা বশীর। পিতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হতে চাননি তিনি। পিতার পরিচয়ে নয়, নিজের পরিচয় তিনি নিজেই। তার পরিচয় চিত্রকলায়। তার পরিচয় লেখালেখিতে, চলচ্চিত্রে ও গবেষণায়। তবে সব ছাপিয়ে তিনি একজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী। বাংলাদেশি চিত্রকলার কিংবদন্তী শিল্পী তিনি। কাইয়ুম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী, এদের সমসাময়িক ছিলেন তিনি। তারা ছিলেন তার সহপাঠী। ১৯৪৯ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কর্তৃক চারুকলা প্রতিষ্ঠার পর দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। পাস করেন ১৯৫৪ সালে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারির ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ২১ ফেব্রম্নয়ারির ওপর 'রক্তাক্ত ২১' শিরোনামে ১৯৫২ সালে তিনি লিনোকোটে চিত্রটি আঁকেন। 'রক্তাক্ত ২১'-কে ভাষা আন্দোলনের ওপর আঁকা প্রথম ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ শহিদ মিনার থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত বাংলাদেশে চারু ও কারুশিল্পী পরিষদের উদ্যোগে 'স্বাধীনতা' মিছিলে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ১৯৫৮ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৬২ সালে আমিনা বশীরের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে স্বৈরাচারী শাসনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাকা ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন। ১৯৯৭ সালে মুর্তজা বশীরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের কয়েক বছর পর স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসেন। 'দেয়াল', 'শহীদ শিরোনাম', 'কালেমা তাইয়ে্যবা', 'পাখা' শিল্পী মুর্তজা বশীরের আঁকা উলেস্নখযোগ্য সিরিজ। তিনি 'বিমূর্ত বাস্তবতা' নামে একটি শিল্পধারার প্রবর্তক। এছাড়া ফিগারেটিভ কাজে পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধনে তিনি অসাধারণ স্বকীয়তার সাক্ষর রেখেছেন। চিত্রকলার ওপর তার পঠনপাঠন ছিল গভীর ও স্বচ্ছ।

এ কথা বলা প্রাসঙ্গিক যে, শিল্পবিপস্নবের ফলে যেসব মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে যেমন- রিয়ালিজম, ইমপ্রেসনিজম, পোস্ট ইমপ্রেসনিজম, সিম্বলিজম, এক্সপ্রেসিনিজম, ফভিইজম, কিউবিজম, ফিউচারিজম, সুরিয়ালিজম, বিমূর্ত প্রকাশবাদ ও অধিবাস্তববাদ। আধুনিক শিল্পীরা অ্যাচিংয়ের ওপরও কাজ করেছে, বিশেষ করে ফরাসি শিল্পীরা। শিল্পকলায় পোস্ট মর্ডানিজমের ব্যবহারও হচ্ছে। আধুনিক শিল্পের অগ্রদূতরা রোমান্টিক, বাস্তববাদী ও প্রভাববিদ ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের আন্দোলনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফাওভিজম, কিউবিজম, এক্সপ্রেশনবাদ এবং ফুতুরাজম। আমরা জানি, শিল্পকলার ইতিহাস বলতে নান্দনিকতা বা ভাব-বিনিময়ের উদ্দেশ্যে মানুষের দ্বারা নির্মিত সেই সমস্ত দৃশ্যমান বস্তুর ইতিহাসকে বোঝায়- যেগুলোর মারফত বিভিন্ন ধারণা, আবেগ বা সাধারণভাবে কোনো দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকসমক্ষে উপস্থাপিত হয়েছে- তা নির্ণিত হয়। শিল্পকলার ইতিহাস হলো বিভিন্ন বিজ্ঞান ও শিল্পের একটি বহুশাস্ত্রীয় শাখা। এর উদ্দেশ্য হলো সময়ের নিরিখে শিল্পের নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন। শিল্পীগোষ্ঠীগুলো কলা, স্থাপত্য, নকশা ও শিল্প শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন ধারণা তৈরি করে।

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, আধুনিক শিল্প শুরু ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, পল সেজান, পল গোগাঁ, জর্জ সেরাট এবং অঁরি দ্য তুলুজ-লোত্রেকের মতো চিত্রশিল্পীদের হাত ধরে, যাদের সবাই আধুনিক শিল্পের কারিগর। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বখ্যাত এসব শিল্পীকে প্রাধান্য দিতেন। শিল্পচিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যদের থেকে অগ্রগামী। তিনি ইতালিতে ছিলেন। প্রথম দিকে কিউবিক ধারায় কাজ করতেন। রেখাভিত্তিক ছিল তার ফিগারগুলো। পরের দিকে তিনি বিমূর্ত কাজ করা শুরু করেন। তিনি পাথর দেখে কিছু ছবি আঁকেন এপিটাফ নামে। এগুলো তার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলার লোকচিত্রধারা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে একটি অর্থবহ পথ রচনায় তার আগ্রহ ও নিবিষ্টতা ছিল।

বেশ কিছু উলেস্নখযোগ্য দেয়ালচিত্র করেছেন মুর্তজা বশীর। ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে ঝামা ইটের টুকরার মোজাইকে করা শহিদবৃক্ষ আমাদের দেয়ালচিত্রের অঙ্গনে একটি অনন্য ও শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। একেবারে দেশীয় ঐতিহ্যকে বহন করে এমন একটি উপাদান পোড়ামাটির ইটের ব্যবহারে বশীর ভাই তার চিন্তা ও প্রয়োগে বিশিষ্টতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

তিনি ১৯৬৩ সালে উর্দু চলচ্চিত্র 'কারোয়াঁ'র কাহিনী ও চিত্রনাট্য রচনা করেন। ১৯৬৪ সালে হুমায়ূন কবীর রচিত 'নদী ও নারী'র চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক ছিলেন। ১৯৬৫ সালে উর্দু চলচ্চিত্র 'ক্যায়সে কহু'র শিল্প নির্দেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুর্তজা বশীরের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, 'কাঁচের পাখির গান', 'গল্প সমগ্র'। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'ত্রসরেণু', 'তোমাকেই শুধু', 'এসো ফিরে অনুসূয়া', 'সাদায় এলিজি'। উপন্যাস 'আল্ট্রামেরিন', 'মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে', 'অমিত্রাক্ষর'। নির্বাচিত রচনার মধ্যে রয়েছে 'মূর্ত ও বিমূর্ত', 'আমার জীবন ও অন্যান্য'। 'রুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ' শিল্পীর গবেষণাগ্রন্থ। এছাড়া ভারতের বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জার্নাল অব দ্য নিউম্যাসটেকি সোসাইটি অব ইন্ডিয়া'য় প্রাক-মোগল যুগের মুদ্রার ওপর তার বেশ কয়েকটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তার অনেক শখ ছিল। যেমন তিনি বিভিন্ন দেশের কয়েন সংগ্রহ করতেন, ডাকটিকিট ছিল তার কাছে প্রচুর।

চিত্রকলায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক ও ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমি পদক পেয়েছেন তিনি। তিনি বলতেন, 'আমি আমার মতু্যর পরও বেঁচে থাকতে চাই।'

তার কাজের মাধ্যমে নিশ্চয়ই তিনি বেঁচে থাকবেন। কিংবদন্তি শিল্পী মুর্তজা বশীরের তার অনন্য শ্রম-সাধনা- যা শিল্পের জন্য অপরিহার্য। জন্মদিনের মাত্র দুদিন আগে ১৫ আগস্ট, ২০২০ মুর্তজা বশীর পরপারে চলে যান। তিনি রেখে গেছেন তার অমূল্য সৃষ্টিসম্ভার। তার মৃতু্যতে শিল্পাঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

মোবাইলে সবার আগে খবর পেতে হলে এখানে ক্লিক করুন

ফেসবুকে গালফবাংলার সাথে থাকতে এখানে ক্লিক করে লাইক 

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

মুর্তজা বশীর,বাংলাদেশ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সালাম সালেহ উদদীন

সংশ্লিষ্ট খবর