ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু "বর্বরদের" বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের "সাহসী নেতৃত্ব" ও অংশীদারত্বের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এছাড়া গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে "এই শতাব্দীর সেরা মিথ্যা" বলেও অভিহিত করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে "সভ্যতাকে রক্ষা করার" জন্য কাজ করেছে। তারা গাজা থেকে বন্দিদের ফিরিয়ে আনতে একসঙ্গে কাজ করেছেন।' গত বছর মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া একটি চুক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে বন্দি থাকা জীবিত ও মৃত সকল বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তার মতে, 'ইসরায়েল হলো "একই ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা একটি জাতি—তা সে বামপন্থী বা ডানপন্থী, তরুণ বা প্রবীণ, ধর্মীয় কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ যে-ই হোক না কেন। সংকটময় মুহূর্তে ইতিহাসের শিক্ষা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং সাহসের জোরে ইসরায়েলিরা একসূত্রে গেঁথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'একটি এক টনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যদি জাতিসংঘ সদরে আঘাত হানে, তবে তার ফল কী হবে?' উত্তরে তিনি নিজেই বলেন—'পুরো কম্পাউন্ড ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।'
তিনি বলেন, 'আমি ইসরায়েলের জনগণের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই। আমি আমাদের বীর সেনাদের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই—তারা ইহুদি, মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ। আইডিএফ হলো বিশ্বের সবচেয়ে নীতিবান ও নৈতিক সেনাবাহিনী।'
এরপর নেতানিয়াহু ইসরায়েলের যুদ্ধের "অষ্টম ফ্রন্ট"-এর প্রসঙ্গে আসেন। ইসরায়েলের প্রতি বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সমালোচনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, 'কাতার—যারা হামাস নেতাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল অর্থায়ন করে এবং আল জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যমগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল সম্পর্কে "মিথ্যা ছড়াতে" কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। তিনি বলেন, তারা ইসরায়েল, আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বকে ঘৃণা করার জন্য তরুণদের মগজধোলাই করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'তুরস্ক হলো নতুন দেশ যারা হামাসকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং মিথ্যা ছড়াচ্ছে। তুরস্কের "স্বৈরাচারী" প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান হাজার হাজার কুর্দিদের হত্যা করেছেন, উত্তর সাইপ্রাস অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন, গ্রিসকে হুমকি দিচ্ছেন এবং সাংবাদিকদের কারাগারে বন্দি করছেন। তিনি প্রতিদিন ইসরায়েল ধ্বংসের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তিনি হবেন জেরুজালেমের শাসক। না মহাশয়, আপনি তা পারবেন না। এটি আমাদের শহর।'
৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে এবং অনেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা আঙ্কারাকে তাদের অঞ্চলের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখেন।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে "এই শতাব্দীর সেরা মিথ্যা" বলে অভিহিত করেছেন।
বক্তব্যে তিনি গাজায় পোলিও টিকা প্রদান এবং ইসরায়েলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ খাদ্য সরবরাহ প্রবেশের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করতে আমরা অগণিত পদক্ষেপ নিয়েছি।'
ইসরায়েল যুদ্ধের অধিকাংশ সময় গাজায় খাদ্য প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল, তবে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ত্রাণ সরবরাহ আটকে রাখে, যার ফলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ে। ত্রাণ সংস্থাগুলো এখনও জোর দিয়ে বলছে যে গাজায় আরও সরবরাহ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত।
যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলে, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'আপনাদের লজ্জা হওয়া উচিত।' এরপর তিনি নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহারান মামদানির দিকে ঘুরে বলেন, 'বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইহুদি জনসংখ্যার এই শহরে ইহুদিরা এখন আর নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।'
তিনি মামদানিকে হামাসের সমর্থক বলে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন যে মেয়র তার বাড়িতে এমন একজন সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যিনি "হামাস সন্ত্রাসীদের ইসরায়েলি জিম্মিদের প্রহার ও নির্যাতনের" দৃশ্য প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি ইসরায়েলবিরোধী পোস্টে লাইক দেওয়ার জন্য মামদানির স্ত্রীরও সমালোচনা করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর গ্রেফতারের দাবি জানানো এবং তাকে "যুদ্ধাপরাধী" আখ্যা দেওয়ায় মামদানির উদ্দেশ্যে নেতানিয়াহু বলেন, 'আপনি আমাকে স্তব্ধ করতে পারবেন না। আপনি সত্যকে চেপে রাখতে পারবেন না।' তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
নেতানিয়াহু বলেন, 'ইসরায়েল গণহত্যা চালায়নি, বরং গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে।' তিনি আরও বলেন, 'মামদানির "হামাস সহযোগীরা" যদি সুযোগ পেত, তবে তারা শেষ ইহুদি পর্যন্ত সবাইকে হত্যা করত।'
তিনি মামদানিকে "ইহুদিবিদ্বেষী" বলে অভিহিত করেন এবং বলেন তার শহরে কেবল ইহুদি হওয়ার অপরাধেই ইহুদিদের ছুরিকাঘাত করা হয় এবং লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। তিনি বলেন, 'অসহায় শিকার হিসেবে ইহুদিদের কসাইখানায় নিয়ে যাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। আজ আমাদের একটি রাষ্ট্র আছে, আজ আমাদের একটি সেনাবাহিনী আছে।'
তিনি ইহুদিদের "মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর" আহ্বান জানান এবং "বর্বরদের" বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাকি সবাইকে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান।