কাতার-সৌদি-ইন্দোনেশিয়ায় রোজায় পণ্যের দাম কমে, বাংলাদেশে বাড়ে কেন

Loading...

কাতার-সৌদি-ইন্দোনেশিয়ায় রোজায় পণ্যের দাম কমে, বাংলাদেশে বাড়ে কেন

রমজানে বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াটা এক প্রকার ‘নিয়ম’হয়ে দাঁড়ালেও বিশ্বের অনেক মুসলিম প্রধান দেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে এ সময় নিত্যপণ্যের দাম কমানো হয় বা স্থিতিশীল রাখা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজান উপলক্ষে বিপুল পরিমাণ পণ্যের দাম কমানো হয়েছে। দেশটির সুপারমার্কেটগুলো প্রায় দশ হাজার পণ্যের ওপর ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট ঘোষণা করেছে। এমনকি ৯টি মৌলিক খাদ্যের দাম সরকারের অনুমতি ছাড়া বাড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কাতারে বিভিন্ন কোম্পানিতে নতুন চাকরির খবর

Loading...

কাতারে রমজানে এক হাজারের বেশি পণ্যের দাম কমানো হয়েছে। কাতারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় একটি তালিকা প্রকাশ করেছে যেখানে চাল, চিনি, আটা, মুরগী, দুধ, তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে নিচে রাখা হয়। পাশাপাশি টিস্যু, ডিটারজেন্ট, ওয়াশিং পাউডার ও অন্যান্য গৃহস্থালি পণ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সৌদি আরবে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ কোম্পানি এবারের রমজানে ১২ হাজার পণ্যে মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। খাদ্যপণ্যে সর্বোচ্চ ৭৭ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্য না হলে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে তারা। সৌদি আরবে সুপারমার্কেটগুলোতে রমজানে বিশেষ ‘অফার’ থাকে। এ বছর অনেক রিটেইল চেইন শপে নিত্যপ্রয়োজনীয় গ্রোসারি আইটেমে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে। এছাড়া রমজানে দেশটির সরকার কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করছে।

Loading...

ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ। দেশটিতে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বছর রমজানে ইন্দোনেশিয়া সরকার প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বাজেট বরাদ্দ করেছে শুল্ক ছাড়, পরিবহন খরচ কমানো এবং সরাসরি খাদ্য সহায়তা (চাল ও তেল) প্রদানের জন্য।

কেন এসব দেশে দাম কমে
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সরকার রমজানের কয়েক মাস আগে থেকেই আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করে সরবরাহ ও দাম ঠিক করে দেয়। আইন অমান্য করলে বিশাল অঙ্কের জরিমানা বা ব্যবসা বন্ধের বিধান থাকে।
এছাড়া এসব দেশে ব্যবসায়ীরা রমজানকে দেখেন কাস্টমারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ার সুযোগ হিসেবে।

তারা বিক্রির পরিমাণ বাড়িয়ে মুনাফা করতে চান, একক পণ্যে লাভ বাড়িয়ে নয়। রমজান শুরুর আগে এসব দেশের সরকার চিনি, ডাল, তেল ও মাংসের মতো পণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেয় বা কমিয়ে দেয়।

Loading...

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পণ্যের দাম কমার আরেকটি কারণ হচ্ছে, এসব দেশের বড় বড় সুপারমার্কেট চেইনের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে। রমজান উপলক্ষে তারা ডিসকাউন্ট ও বিশেষ অফার দেয়। এতে বাজারদর নিয়ন্ত্রিত থাকে। মুসলমানেরা রমজানকে ত্যাগের মাস হিসেবে দেখেন। তাই এসব দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, রোজাদারদের কষ্ট কমিয়ে সাহায্য করা সওয়াবের কাজ।

কাতারের সব আপডেট হোয়াটসঅ্যাপে পেতে এখানে ক্লিক করুন

Loading...

আমাদের দেশের চিত্র কী
রমজান এলে বাংলাদেশের দৃশ্যপট থাকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, পর্যাপ্ত আমদানি ও উৎপাদন থাকার পরও রোজার আগমুহূর্তে ছোলা, খেজুর, ব্রয়লার মুরগি, লেবু, শষা ও ইফতারসামগ্রীর দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। দুই দিনের ব্যবধানে ছোলার কেজিতে ১০ টাকা ও ব্রয়লারের কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে।

রোজায় কেন বাড়ে পণ্যের দাম
আমাদের দেশে রমজান মাসে পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে যেখানে রমজানে দাম কমানোর প্রতিযোগিতা চলে, আমাদের দেশে চিত্রটি ঠিক উল্টো। এর পেছনে কয়েকটি প্রধান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে।

চাহিদার আকস্মিক উল্লম্ফন
রমজান মাসে খাদ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হঠাৎ একসঙ্গে ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে খেজুর, ছোলা, তেল, চিনি, ফলসহ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা দৈনিক ভিত্তিতে বাড়ে। অনেক পরিবার মাসের শুরুতেই বড় পরিমাণে পণ্য কিনে মজুত করে, ফলে অল্প সময়ে বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ইফতার ব্যবসায়ীরাও বেশি পরিমাণে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। কিন্তু সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দাম বেড়ে যায়।

কাতারের সব আপডেট হোয়াটসঅ্যাপে পেতে এখানে ক্লিক করুন

Loading...

শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ও কৃত্রিম সংকট
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম হলো সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট। বিশেষ করে রমজান এলে এসব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গুটি কয়েক বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছে সারা দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা জিম্মি থাকে। রমজান আসার আগেই তারা চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়িয়ে দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা গেল এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে। বিইআরসি নির্ধারিত দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাঠপর্যায়ে সিলিন্ডার প্রতি ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাখতে দেখা গেছে।

রমজানে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেজুর। অথচ গত এক বছরে খেজুরের দাম প্রকারভেদে ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি করা খেজুরের বিশাল মজুদ গুদামে রেখে রোজা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে দাম বাড়ানো হয়েছে।

কাতারের সব আপডেট হোয়াটসঅ্যাপে পেতে এখানে ক্লিক করুন

Loading...

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগী
রমজানে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে পরিবহন খাতেও বড় ভূমিকা থাকে। চালক ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে চাঁদাবাজি এবং অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হয়। এছাড়া পাইকারি ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে পণ্য ধরে রাখে এবং সরাসরি ভোক্তার কাছে বেশি দামে বিক্রি করে। এতে উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে আসা পণ্য দামী হয়ে যায়। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দাম স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বাড়ে।

ডলার সংকট ও আমদানি খরচ
বাংলাদেশে রমজানে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে ডলার সংকট ও আমদানি খরচও বড় কারণ। যেসব পণ্য যেমন তেল, চিনি, ডাল খালি দেশে উৎপাদিত হয় না সেগুলো আমদানি করতে ডলারের প্রয়োজন হয়। ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে আমদানির খরচ বাড়ে এবং সেটি সরাসরি বাজার মূল্যে প্রভাব ফেলে। ফলে দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়।

কাতারের সব আপডেট হোয়াটসঅ্যাপে পেতে এখানে ক্লিক করুন

Loading...

বাজার মনিটরিংয়ের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে রমজানে দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিংয়ের সীমাবদ্ধতাও বড় ভূমিকা রাখে। যদিও সরকার মাঝে মাঝে অভিযান চালায় কিন্তু সব বাজারে কার্যকর ও ধারাবাহিক তদারকি করা সম্ভব হয় না। এতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে পণ্য মজুত বা দাম বাড়িয়ে দেয়। মনিটরিংয়ের ঘাটতির কারণে চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয় এবং দাম দ্রুত বাড়ে।

সরকার কী বলছে
সম্প্রতি বাজার পরিদর্শনে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নির্ধারিত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে পণ্য ৪০-৫০ টাকা ছিল, তা হঠাৎ ১২০ টাকায় উঠে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে যারা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করছে, সরকার তাদের কঠোরভাবে দমন করবে।

ফেসবুকে আমাদের সাথে থাকতে লাইক দিন এখানে

Loading...

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ,বাংলাস্ট্রিম,সৌদি গেজেট, আমিরাতের অর্থমন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও বিপিএস ইন্দোনেশিয়া

Loading...

Loading