সৌদি আরব এবং তুরস্কের সঙ্গে ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক একদিন পরই ইসরায়েলকে ‘অবৈধ রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। শনিবার নিজ দেশের এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরায়েলকে পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য সরাসরি বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এই ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব মুসলিমকে একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক ফ্রন্ট বা জোট গঠনের জোর আহ্বান জানান।
এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে খাজা আসিফ বলেন, ইসরায়েলের প্রেক্ষাপটে সমস্ত মুসলিম দেশকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এ নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। ১৯৪০-এর দশকের বালফোর ঘোষণার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও যোগ করেন, ইসরায়েল হলো বালফোর ঘোষণারই এক ফসল, যা ১৯৪০-এর দশকে একটি অবৈধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি এই অঞ্চলের যেকোনো দেশের জন্যই সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯১৭ সালের ব্রিটিশ ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও, তার ঠিক এক বছর আগে ১৯৪৭ সালে একই রকম ব্রিটিশ ঘোষণার মধ্য দিয়েই পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল।
পূর্বে ইসরায়েলকে ‘মানবজাতির জন্য অভিশাপ’ এবং ‘ক্যানসার আক্রান্ত রাষ্ট্র’ বলে আখ্যা দেওয়া এই পাকিস্তানি মন্ত্রী জানান, আসন্ন ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পরাজিত হলেও ইসরায়েলের প্রতি তার এই কঠোর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, জেরুজালেমের ক্ষমতায় কে আসল—নফতালি বেনেট নাকি অন্য কোনো নেতা—তাতে পরিস্থিতির খুব সামান্যই ফারাক ঘটবে।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের বৈরী মনোভাব এবং ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা কখনো দূর হবে না। তারা একের পর এক মুসলিম দেশকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে চলেছে। যতক্ষণ না ফিলিস্তিন-সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ পুরো ইসলামিক বিশ্বকে এক হয়ে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
খাজা আসিফের এই নতুন হুমকির বিষয়ে ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসিফের দেওয়া এক বিতর্কিত পোস্টের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
সে সময় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ইসলামাবাদের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, মধ্যস্থতাকারী কোনো দেশের মন্ত্রীর মুখে ইসরায়েল ধ্বংসের এমন ডাক অত্যন্ত মর্মান্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।
উল্লেখ্য, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ১৯৬৭ সালের আগের সীমানা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার নীতিতে অটল রয়েছে ইসলামাবাদ।
এদিকে, শনিবার এক পৃথক বিবৃতিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, শুক্রবার তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা কার্যত ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫-এর মতো একটি যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এর অর্থ হলো, এই তিন দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে তা সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি জানান, আঙ্কারা, রিয়াদ ও ইসলামাবাদের এই জোটে ন্যাটোর আদলে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠিত হবে এবং এর প্রধান সচিবালয় থাকবে সৌদি আরবে। কারিগরি কিছু বিষয় সমাধান হলে মিসরও এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে জানান তিনি। প্রায় দুই বছর আট মাসের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই জোটটি ন্যাটোর বিকল্প নয় এবং আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের জন্যও এটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বলে আঙ্কারা নিশ্চিত করেছে।