২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি-হুথি সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগে বাংলাদেশ

প্রকাশ: সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
সৌদি-হুথি সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যে ছয় মাস ধরে চলমান অস্থিরতা গত কয়েকদিনে নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে এবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইয়েমেন ফ্রন্ট। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব।

ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার বিপরীতে সৌদি ভূখণ্ডে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। একই সঙ্গে লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের কৌশলগত দখল এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় সংঘাতের পরিধি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি দুটোই বেড়েছে। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার চলমান যুদ্ধাবস্থা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশেরও।

সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস। একই সঙ্গে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশটি। সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আনার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে সৌদি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করলে এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রেমিট্যান্স, শ্রমবাজার, জ্বালানি ব্যয় ও বিনিয়োগেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ বাংলাদেশী কর্মসংস্থানের জন্য সৌদি আরবে গেছেন, যা ওই বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। চলতি বছর প্রথম আট মাসে সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন। দেশটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়েও দেশটি থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের নির্মাণ, সেবা ও অন্যান্য শ্রমঘন খাতে প্রকল্পের গতি কমা, নতুন কর্মী নিয়োগ হ্রাস কিংবা বিদ্যমান কর্মীদের আয় ও কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সে রকম কিছু হলে দেশটি থেকে আসা রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। আর তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে বিদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক জনশক্তি সৌদি আরবে কাজ করে। ফলে অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত এলে শ্রমবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হবে। তখন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করবে। রেমিট্যান্স যেভাবে আসছিল, সেটি ব্যাহত হলে রিজার্ভ বাড়ার গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কভিডের সময় আমরা দেখেছি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হলে সেবা ও শিল্প—দুই খাতেই শ্রমের চাহিদা কমে যায় এবং অনেক প্রবাসীকে দেশে ফিরে আসতে হয়। সৌদি আরবের এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের সংকোচন ঘটালে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতিতে একটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে।’

সম্প্রতি হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চার শহরে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। খামিস মুশাইতে একটি বিমানঘাঁটি এবং আবহা, নাজরান ও জিজানে সৌদি আরামকোর সংশ্লিষ্ট স্থাপনা আক্রান্ত হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর নাজরান, খামিস মুশাইত, জিজান ও আবহায় জরুরি সতর্কতা জারি করে সৌদি সিভিল ডিফেন্স।

পরদিন মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফেও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে নিরাপদ থাকতে বলা হয়। একই দিনে জেদ্দা, আবহা, জিজান, আলউলা, তায়েফ ও গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি বন্দর ইয়ানবুতেও সতর্কতা জারি হয়েছিল। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মক্কা নগরীর কাছাকাছি ড্রোন ধ্বংসের ঘটনায়। মক্কায় হামলার চেষ্টাকে ‘রেড লাইন’ বলে উল্লেখ করেছে সৌদি আরব। অবশ্য হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গতকালও তায়েফ প্রদেশে আটকানো একটি হুথি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ইয়েমেনি নাগরিক নিহত হয়েছে। একের পর এক হামলা ও জরুরি সতর্কতায় সৌদি আরবের স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবন অনেকটা স্বাভাবিক।

মক্কায় অবস্থানরত বাংলাদেশী সাব্বির রহমান গতকাল বলেন, ‘মসজিদুল হারামে প্রথমবারের মতো জরুরি সতর্কতার সাইরেন বাজানোর পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমরা সবাই মনে করতাম, সংঘাত যতই হোক, মক্কা নগরীতে হামলার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু এখন কাছাকাছি এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা ও ড্রোনের খবর আসায় সেই ধারণা বদলেছে। প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই বাইরে বের হচ্ছেন না। আমরা সতর্কভাবে চলাফেরা করছি।’

শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের পাশাপাশি সৌদি সংকটে বাংলাদেশের উদ্বেগের আরেকটি বড় জায়গা জ্বালানি তেল। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস সৌদি আরব। দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকোর ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন। এ অপরিশোধিত তেল দেশের রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন ও পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়।

চলমান সংঘাতে সৌদি আরবের জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামোও এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন রিফাইনারিতে তেল সরবরাহ বন্ধ করেছে সৌদি আরব। সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত বেশ কয়েকটি কার্গোও বাতিল করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সৌদি অপরিশোধিত তেল সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়ে সৌদির সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে হুমকি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উচ্চ হারে বাড়তে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সৌদি আরব নিজেও এ সংকটের অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত নয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ও তেল পরিবহনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ফেব্রুয়ারির দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল থেকে আগস্টে নেমে প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেলে এসেছে, যা তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশটির ২০২৬ সালের বাজেটে ১৬৫ বিলিয়ন রিয়াল বা প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ধরা হয়েছিল।

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ানো এবং তেল রফতানি সীমিত করার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। সৌদি অর্থনীতির ওপর চাপ যদি স্বল্পস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশী কর্মীদের ওপর বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। কিন্তু সরকার বা বেসরকারি খাত নতুন প্রকল্প, নির্মাণ ও সেবা খাতে ব্যয় কমালে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি এবং বিদ্যমান শ্রমিকের কাজ ও আয়—দুটিই প্রভাবিত হতে পারে। সেই প্রভাব শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্সেও পৌঁছাতে পারে।

সৌদি আরবের জেদ্দায় ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসা করেন ফেনীর নুরুল আফসার। তিনি বলেন, ‘কভিডের পর সৌদি অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ব্যবসা-বাণিজ্য আগের অবস্থায় ফিরতে না ফিরতেই নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে প্রবাসী ব্যবসায়ীরা আরো চাপে পড়েছি। সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা সতর্কতার পর দোকানে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে, বেচাকেনাও অনেক কম। এখন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসার আয় দিয়ে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য নিয়মিত খরচ মেটানো কঠিন। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে আমাদের ক্ষতি আরো বাড়বে।’

সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আকর্ষণে সাম্প্রতিক সময়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে সরকার। জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করা সৌদি আরবের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের বন্দরসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে আগ্রহের কথা জানায়। রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল বে টার্মিনাল নির্মাণে ১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশের বন্দর খাতে মোট বিনিয়োগ ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

গত আগস্টে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে ওই সফরের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন অস্থির থাকলে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সূচিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

সৌদিতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর নানামুখী প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। একই সঙ্গে ইউরোপে আমাদের যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়, সংঘাতের কারণে সেখানেও বিঘ্ন তৈরি হতে পারে। সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটলে প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। পরিস্থিতির খুব বেশি অবনতি হলে তাদের সরিয়ে আনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমাদের মতো তুলনামূলক কম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের জন্য এটি বড় ঝুঁকি।’

দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। সৌদি সরকারের তথ্যভাণ্ডার ডেটাসৌদির হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রফতানি ছিল ১৪০ কোটি ডলার। এর বড় অংশ ছিল সার, খনিজ জ্বালানি ও তেল এবং প্লাস্টিক। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব ৪৫ দশমিক ৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার প্রধান অংশ তৈরি পোশাক। ফলে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত হলে এর প্রভাব বাণিজ্য ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এখনই পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা। কেজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ও ফ্রান্সভিত্তিক জিওপলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের প্রধান ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুদ্ধ আরো বড় আকার ধারণ করার দিকে যাচ্ছে। এতে সৌদি আরবের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। হুথিদের প্রশ্নে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটি এখন তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে। তারা একের পর এক এলাকা দখল করছে। আপাতদৃষ্টিতে সৌদি আরবের পক্ষে এককভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রও এখনই এ সংঘাতে জড়াতে ইচ্ছুক নয়। সে সুযোগে হুথিরা জাতিসংঘ ও সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারকে আরো কোণঠাসা করে ফেলতে পারে।’

হুথিদের সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার আবহা, নাজরান ও জিজানসহ সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কাজ করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রচুর বাংলাদেশী কৃষি, খামার ও ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এসব এলাকায় পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে প্রথমে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হতে পারে। সংঘাত তীব্র হলে দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্সেও পড়বে। এতে প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও চাপে পড়বে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হবে।’

চলমান সংঘাতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

সূত্র: বণিক বার্তা

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: তিন দেশের সেনাপ্রধানদের বৈঠক, হুতিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা

প্রকাশ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: তিন দেশের সেনাপ্রধানদের বৈঠক, হুতিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা

ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করা এবং সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সামরিক সমন্বয় সুদৃঢ় করতে সৌদি আরবে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ভুক্ত তিন দেশের সেনাপ্রধানেরা।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরব। এর আগে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তাদের চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারোগলু এ বৈঠকে যোগ দিতে সৌদি আরব সফর করছেন এবং শুক্রবার আঙ্কারা তিন দেশের সামরিক প্রধানদের উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক ছবি প্রকাশ করে।

প্রায় দেড় মাস আগে প্রতিষ্ঠিত এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা জোরদার, প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র শিল্পের বিকাশ এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। চুক্তির অন্যতম প্রধান কৌশলগত শর্ত অনুযায়ী, সদস্যভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর বহিরাগত সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা জোটভুক্ত তিনটি দেশের ওপরই যৌথ হামলা হিসেবে গণ্য হবে। জোটটিকে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ধারাবাহিকতায় গত আগস্টের শেষভাগে ইস্তাম্বুলে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠকের পর এবার শীর্ষ সামরিক পর্যায়ে এ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হলো।

এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে এক যৌথ বৈঠকে বসেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ওই বৈঠকে তিন দেশের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠকের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি জোটের সচিবালয় ও বিভিন্ন ওয়ার্কিং কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। মন্ত্রীরা পবিত্র মক্কা নগরী ও সৌদি আরবের বেসামরিক-অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিশানা করে চালানো হুতিদের হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজের ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদের প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের গুরুত্ব তুলে ধরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান চুক্তিটিকে ‘সঠিক পথে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘একটি কঠিন ভৌগোলিক অঞ্চলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘নতুন কোনো ধারণা সামনে আনা হলে কিংবা নতুন কোনো সদিচ্ছা প্রকাশ করা হলে, এমন মানুষ থাকাটাই স্বাভাবিক, যারা তা মেনে নেবে না।’ তবে এই জোটের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা সম্পন্ন হলে তিন দেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালীভাবে এগিয়ে যাবে—এ বিষয়ে তাঁর ‘কোনো সন্দেহ নেই’ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে স্থায়ী সদর দপ্তর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম তিন বছর মেয়াদের জন্য পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নওমান মাহমুদকে জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে অন্য দুই দেশের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে।

এর আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন যে, ইয়েমেন সংঘাতের প্রভাব রিয়াদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করলে যেকোনো মুহূর্তে এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোটকে সম্মিলিতভাবে মাঠে নামানো হতে পারে।

লেবাননে ভয়াবহ ফসফরাস হামলা ইসরায়েলের

প্রকাশ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
লেবাননে ভয়াবহ ফসফরাস হামলা ইসরায়েলের

দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি শহরে গোলাবর্ষণের সময় বিপজ্জনক ফসফরাস অস্ত্র ব্যবহার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ-র বরাত দিয়ে আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নাবাতিহ জেলার জওতার আল-শারকিয়াহ, মেফাদুন এবং নাবাতিহ আল-ফাওকার বহির্ভাগে এই গোলার আঘাত হানে। বিশেষ করে নাবাতিহ আল-ফাওকায় সরাসরি ফসফরাস শেল ব্যবহার করা হয় এবং পরবর্তীতে জওতার আল-শারকিয়াহ এলাকায় একই ধরনের অস্ত্র দিয়ে পুনরায় আক্রমণ চালানো হয়। পাশাপাশি, টায়ার জেলার ওয়াদি জিবকিন এবং হারিস ও হাদাসার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও ভারী কামানের গোলা বর্ষণ করে ইসরায়েল।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লেবানন সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল মারজায়ুন ও বিনত জবেইল জেলার মাজদাল সেলম এবং আল-ঘান্দুরিয়াহ এলাকা থেকে ইসরায়েলের নিক্ষেপ করা দুটি অবিস্ফোরিত বিমান বোমা নিষ্ক্রিয় করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।

লেবাননের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে অন্তত ৪,৩৮৬ জন নিহত, ১২,৪০৭ জন আহত এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত জুনে একটি সমঝোতা হয়েছিল— যার শর্ত ছিল সংঘাতপূর্ণ লেবাননি ভূখণ্ড থেকে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং হিজবুল্লাহর অস্ত্রসংবরণ। তবে এই সমঝোতা সত্ত্বেও দেশটিতে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি, ফাঁস হলো উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি

প্রকাশ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি, ফাঁস হলো উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি

ইসরায়েলের সরকারি মানচিত্রে সাময়িকভাবে প্রকাশিত হয়ে গেল গাজার উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি। এতে উত্তর গাজার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একাধিক ঘাঁটি ও স্থাপনার অবস্থানও দেখা গেছে। যদিও পরে মানচিত্রে গাজার অংশগুলো আবার ঝাপসা করে দেওয়া হয়।

ইসরায়েলের সরকারি পাবলিক মানচিত্র সেবা গভম্যাপে এই ভুলটি গত সোমবার একটি এক্স অ্যাকাউন্টের নজরে আসে। ওই অ্যাকাউন্টটি গাজা উপত্যকার বিভিন্ন ঘটনার ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করে থাকে।

গভম্যাপে সাধারণত পুরো গাজা উপত্যকার পাশাপাশি ইসরায়েল ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য সংবেদনশীল স্থান ঝাপসা রাখা হয়। ফলে অল্প সময়ের জন্য স্পষ্ট ছবি প্রকাশ পাওয়ার ঘটনাটি ছিল ব্যতিক্রমী।

প্রকাশিত ছবিগুলোতে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া ও বেইত হানুনের বিভিন্ন এলাকা দেখা যায়। ছবিগুলো ২০২৫ সালের হওয়ায় সামরিক স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা এতে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। তবে এসব ছবিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি সামরিক বাফার জোনের ভেতরে অন্তত ১১টি ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনা দেখা গেছে।

আরেক এক্স ব্যবহারকারী ছবিগুলোর সংরক্ষিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। তবে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, তারা ছবিগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। একই সঙ্গে আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি ও ধ্বংসযজ্ঞের যে চিত্র উঠে এসেছে, এসব ছবির সঙ্গে তার মিল রয়েছে।

বেইত হানুনের বিভিন্ন এলাকায় পুরো ব্লক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার চিত্র দেখা যায়। একইভাবে গাজা সিটির শুযাইয়া এলাকায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন ও রাস্তাঘাটের চিত্রও উঠে এসেছে।

ছবিতে গাজা সিটির জাইতুন এলাকার দক্ষিণ-পূর্বে কার্নি ক্রসিং এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিও দেখা যায়। পূর্ব জাবালিয়ায় মাটির তৈরি প্রতিবন্ধক ও সামরিক যানবাহনের উপস্থিতিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এদিকে, আলাদা এক প্রতিবেদনে সিবিসি নিউজ জানিয়েছে, গাজার কয়েকটি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সেখানে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি তৈরির চিত্র স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। ফোরেনসিক আর্কিটেকচারের গবেষক জুলিয়া নুয়েনো গিতার্তের দাবি, তাদের সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ থাকার ৪৩টি ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, সামরিক প্রয়োজন ও সেনাদের ঝুঁকি কমানোর জন্য গাজায় স্থাপনা ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এসব কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইন ও সামরিক নির্দেশনা মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।

‘যুদ্ধ শেষ হলেও ট্রাম্প-নেতানিয়াহুকে শাস্তি দেবে ইরান’

প্রকাশ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
‘যুদ্ধ শেষ হলেও ট্রাম্প-নেতানিয়াহুকে শাস্তি দেবে ইরান’

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে শাস্তির আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র জেনারেল আবুল ফজল শেকারচি।

টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেকারচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উসকানি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তেহরানের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজই নিরাপদে ওই জলপথ অতিক্রম করতে পারবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে শেকারচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ওই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাপক প্রাণহানির মধ্য দিয়ে সংঘটিত ওই যুদ্ধ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে বাসিজ বাহিনীর মাধ্যমে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততাকে তিনি অন্যতম অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।

শেকারচির ভাষ্য অনুযায়ী, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রচলিত যুদ্ধকৌশলের পরিবর্তে দেশটি অসম যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করে, যেখানে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ও সহজ সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল ভারী অস্ত্র মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আহত সেনাদের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক চিকিৎসাসামগ্রী কেনার সক্ষমতাও ইরানের ছিল না। তবে বর্তমানে দেশটি আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে অনেকাংশে স্বনির্ভর হয়েছে।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অতীতের যুদ্ধগুলো শুরুর সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি শক্তিশালী বলেও দাবি করেন শেকারচি। তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি আরো উন্নত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আগ্রাসন হলে তা মোকাবিলায় নতুন সামরিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইরানের হাতে ‘চমক’ রয়েছে।

শেকারচি আরো দাবি করেন, ইরান প্রতিবেশী কোনো মুসলিম দেশের সার্বভৌমত্বে হামলা করেনি, বরং দেশটির পাল্টা হামলাগুলো ওই সব দেশের ভেতরে থাকা মার্কিন স্বার্থ ও স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। শত্রুর মুখে ইরান ‘সামান্যতমও পিছু হটবে না’ বলেও সতর্ক করেন তিনি।

হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে শেকারচি বলেন, ইরানের নির্ধারিত রুটের বাইরে দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটি নিরাপদ থাকবে না। প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করলে তার জবাব শক্ত হাতে দেওয়া হবে বলেও ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেন তিনি।

ইরানকে একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে শেকারচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার আগের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ দেবে না তেহরান। পশ্চিম এশিয়া থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারকেই তাদের জন্য নিরাপদ পথ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা যত দ্রুত অঞ্চলটি ছাড়বে, তাদের ক্ষয়ক্ষতিও তত কম হবে।

যুক্তরাষ্ট্র সব প্রস্তাব মানলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেবে না ইরান

প্রকাশ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র সব প্রস্তাব মানলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেবে না ইরান

যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে নৌঅবরোধ প্রত্যাহারসহ ইরানের অন্য প্রস্তাব মেনে নিলেও নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেবে না তেহরান। শুক্রবার দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত তেহরান। এর বিনিময়ে সাত দিনের মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, দেশটির জব্দ করা অর্থ ছাড় এবং ইরানের ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এসব শর্তের কথা জানান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাত মাসের যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একটি সমঝোতা হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্তগুলো মেনে নেয়ার পর দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তারা। তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার বা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না ইরান। অন্যদিকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি।

ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার অভিযোগ করে আসছে। এর মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার বিষয়টিও তারা উল্লেখ করে। বেসামরিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় এ হার অনেক বেশি এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানোর সময় দেশটির কাছে ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। এর কতটা এখনো অবশিষ্ট আছে, তা স্পষ্ট নয়।

এর আগে মে মাসে রয়টার্স জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচইইউ) বিদেশে পাঠানো যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছেন। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন দেশটির দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।