প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি, পাসপোর্ট জটিলতা, দালালচক্র, ভিসা প্রতারণা, দূতাবাসে সেবা সংকট, লাশ দেশে আনা, পুনর্বাসন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি প্রশ্নে জাতীয় সংসদে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।
এ সময় প্রবাসীদের সমস্যা সরেজমিনে দেখতে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তার এই প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ অনুযায়ী প্রবাসী কর্মীদের নিয়ে সাধারণ আলোচনার প্রস্তাব তোলেন শফিকুর রহমান।
স্পিকার আলোচনার জন্য দেড় ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করেন।
সে আলোচনায় অংশ নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, “যেসব দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা বেশি, সেখানে এই টাস্কফোর্স গিয়ে প্রবাসী কর্মী ও দূতাবাস কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনতে পারে। আমরা যদি একটা ‘টোটাল প্যাকেজের’ দিকে যাই, আমি রেমিটেন্স বাড়ার উদ্দেশ্যে বলছি না; মানবতাকে সম্মান করার উদ্দেশ্যে বলছি।
“প্রবাসীদের আমরা টাকার মেশিন হিসেবে না দেখি। আমরা যেন আমাদের প্রাণ হিসেবে, কলিজা হিসেবে দেখি।”
‘শ্রমিক রপ্তানি’ ও ‘মানুষ রপ্তানি’ ধরনের পরিভাষা নিয়েও আপত্তি তোলেন তিনি। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “পণ্য রপ্তানি হয়, মানুষ রপ্তানি না হোক। এটাকে একটা সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাই।”
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও পেশাজীবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তারা টাকা চান না; তারা সম্মান ও কাজ করার পরিবেশ চান। ফাইন্যান্সিয়াল রেমিটেন্স তো অবশ্যই লাগবে। কিন্তু তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ইন্টেলেকচুয়াল রেমিটেন্স।”
প্রবাসীদের ই-পাসপোর্ট করতে গিয়ে এমআরপি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিল না থাকার কারণে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন দাবি করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “নামের বানান, বয়সের সামান্য অমিল বা তথ্যগত ত্রুটির কারণে অনেকের ই-পাসপোর্ট হচ্ছে না। এতে বহু প্রবাসী বিদেশে অবৈধ হয়ে পড়ছেন বা পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। এই সংখ্যা শত নয়, হাজার হাজার।”
বিদেশ থেকেই এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্যগত জটিলতা সহজে নিরসনের ব্যবস্থা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
প্রবাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ দ্রুত দেশে আনার দাবিও তোলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
একই বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসুদ বলেন, প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও তারা পদে পদে হয়রানির শিকার হন। তিনি অভিযোগ করেন, বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ কেটে মালামাল চুরি, ভিসা প্রতারণা, টিকিট জালিয়াতি, রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা ও দূতাবাসে সেবা না পাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি ও বিদেশে ভুয়া কোম্পানির নামে শ্রমিক পাঠানোর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসবের সঙ্গে দূতাবাস, মন্ত্রণালয় ও বিদেশি সিন্ডিকেটের যোগসাজশ থাকে। আহত হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী এবং প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য কর্মপরিকল্পনা তৈরির দাবি তোলেন তিনি।
নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য বরকতউল্লাহ বুলু হজের সময় সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের দুরবস্থার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “হারাম শরিফ ও মিনায় অনেক বাংলাদেশি অত্যন্ত কম মজুরিতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। বাংলাদেশিরা ৪০০ রিয়াল বেতন পায়। পাকিস্তানি, নেপালি, ভারতীয়রা পায় দুই-তিন হাজার রিয়াল।” মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে যেন আগের মতো সিন্ডিকেট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেন তিনি। দূতাবাসে পাসপোর্ট নবায়নে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর দাবিও জানান বুলু।
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, প্রবাসী শ্রমবাজারের সমস্যা নতুন নয়; এর পেছনে দীর্ঘদিনের আদম ব্যবসায়ী ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও মানব পাচার, দালালচক্র ও ভিসা প্রতারণা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ইউরোপগামী অনিরাপদ রুটে অনেক বাংলাদেশির মৃত্যু হলেও মানব পাচারকারীদের বিচার হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি। “মানব পাচারের যে হত্যা হয়, তাদের বিচারও দ্রুত করতে হবে।”
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেই কম মজুরি, অস্বাস্থ্যকর আবাসন ও পাসপোর্ট জটিলতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, পাসপোর্ট নবায়নে সাত-আট মাস লেগে যায়। এতে অনেকের ভিসা শেষ হয়ে তারা বিদেশে অবৈধ হয়ে পড়েন। প্রতিটি মিশনে প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সহায়তার জন্য আইনজীবী প্যানেল রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ হিসেবে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের বড় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। এ সময় তিনি রেমিটেন্স আসার তথ্যও তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডে ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ে যুক্ত থাকবে। প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্য নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সেই টাকা ব্যবহার করতে পারবেন। প্রবাসীদের আবাসন সুবিধা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘প্রবাসী সিটি’ গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রথমে পূর্বাচলে, পরে জেলা পর্যায়ে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। গুলশানে ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের জায়গায় প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নুরুল হক নুর বিভিন্ন সময় প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের কয়েক ক্ষেত্রে সহায়তার হিসাবও তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স আছে; যাচাই-বাছাই করলে ৪০০ থেকে ৫০০টির বেশি টিকবে না বলে তার ধারণা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রবাসীদের সমস্যা জাতীয় সমস্যা, এটি সরকার ও বিরোধী দল মিলে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন, বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা রোধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো মাইগ্রেশন উইং খোলা হয়েছে। অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যা, বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের ফেরত আনা, বিদেশে আটক নাগরিকদের সহায়তা এবং শ্রমবাজার-সংক্রান্ত কূটনৈতিক তৎপরতা সমন্বয়ে কাজ করবে তারা।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম।
এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও সহজলভ্য পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বিশ্বের ৭৩টি বাংলাদেশ মিশনের মধ্যে ৭১টিতে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু রয়েছে।
গত ছয় মাসে বিদেশি মিশনগুলো থেকে ইস্যু করা পাসপোর্টের প্রায় ৮৬ শতাংশ ই-পাসপোর্ট এবং ১৪ শতাংশ এমআরপি পাসপোর্ট ছিল। তিনি বলেন, বিদেশে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশিরা এনআইডির পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেও পাসপোর্টের আবেদন করতে পারবেন। তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে জন্মনিবন্ধন সংশোধনের মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন, বিদেশি মিশনগুলোতে পাসপোর্ট সেবা পেতে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। ‘মাল্টিপল অ্যাকটিভ বায়োমেট্রিক’, তথ্যের অমিল, হারানো পাসপোর্ট, পূর্ববর্তী পাসপোর্ট যাচাই বা বিশেষ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক সময় প্রয়োজনীয় নথি যথাসময়ে আপলোড না করা, সমস্যার প্রকৃতি না বোঝা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় প্রবাসীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাসপোর্ট সেবায় ভোগান্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
টাস্কফোর্স হতে পারে
প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারে।
তিনি বলেন, শ্রমবাজারের সমস্যা, রিক্রুটিং এজেন্সি, পাসপোর্ট, বিমানবন্দর, দূতাবাস সেবা—এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও আলোচনা হতে পারে।
প্রবাসীদের বিমানবন্দরসহ সব জায়গায় যথাযথ সম্মান দিতে স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্র ও বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় মিলে একটি ওয়ার্কিং কমিটি করতে পারে বলেও মত দেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা। এর আগে শ্রমবাজার নিয়ে দুই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে মালয়েশিয়া পাঠানোর বিষয়টি তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনেক ক্ষেত্রে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও শ্রমিক প্রতারণা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ১০০ জনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
ভোট হয়নি
আলোচনা শেষে স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সাধারণ আলোচনা চেয়েছেন, প্রস্তাবে সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় না থাকায় তা ভোটে দেওয়া হচ্ছে না।
দীর্ঘ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে একমত হন। বিভিন্ন বক্তা সংসদীয় টাস্কফোর্স, প্রবাসী কার্ড, দূতাবাস সংস্কার, পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণ এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। এরপর আলোচনা সমাপ্ত ঘোষণা করেন স্পিকার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মরত এক নেপালি নিরাপত্তা কর্মীর ভাগ্য বদলে গেছে রাতারাতি। লটারিতে তিনি ৩০ মিলিয়ন দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১০০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা) জিতেছেন। ২৬ বছর বয়সী ওই ভাগ্যবানের নাম তোয়াব খান। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রমের কাজ করা এই যুবক হুট করেই একটি টিকিট কিনেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের গণমাধ্যম খালিজ টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তোয়াব খান ‘দ্য ইউএই লটারি’র ‘লাকি ডে’ ড্র-তে এই বিশাল অঙ্কের পুরস্কার জেতেন। তায়েব জানিয়েছেন, তিনি নিজে ড্র অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখেননি। পরবর্তীতে একটি ই-মেইলের মাধ্যমে খবর পান। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে তিনি বেশ কয়েকবার ফলাফলটি যাচাই করেন।
লটারি জয়ের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় তায়েব খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এর আগেও আমি ছোটখাটো পুরস্কারের জন্য এই ধরনের ই-মেইল পেয়েছিলাম, তাই প্রথমে বিষয়টি নিয়ে তেমন ভাবিনি। কিন্তু যখন আমি ই-মেইলটি খুললাম এবং ৩০ মিলিয়ন দিরহাম দেখলাম, তখন হাত-পা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি।’
তায়েব জানান, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি একাই পাচ্ছেন না। মূলত পাঁচ বন্ধু মিলে নিয়মিত টাকা জমিয়ে যৌথভাবে এই লটারির টিকিটগুলো কিনতেন। সেই নিয়ম অনুযায়ী, এই জ্যাকপটের টাকা তাঁদের পাঁচজনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হবে। ফলে প্রত্যেকে পাবেন ৬০ লাখ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২০ কোটি ৮ লাখ টাকা)।
বন্ধুদের সঙ্গে টিকিট কেনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তায়েব বলেন, ‘আমরা মোট পাঁচজন ছিলাম। আমরা টাকা জমিয়ে নিয়মিত টিকিট কিনতাম। প্রতি সপ্তাহে আমাদের মধ্যে একেকজন পালা করে লটারির নম্বরগুলো বেছে নিত।’
লটারি জেতার পর তায়েব প্রথম কথা বলেন তাঁর চাচার সঙ্গে। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘আমার চাচার কারণেই আমি প্রথম কাজের সন্ধানে এই দেশে (ইউএই) এসেছিলাম। যখন আমি তাঁকে জানালাম যে আমরা কত টাকা জিতেছি, তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান এবং তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।’
এই লটারি জয়ের পর তায়েব নিরাপত্তা রক্ষীর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন তিনি ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে চান। এ ছাড়া পরিবারের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করা এবং নিজের কিছু দীর্ঘদিনের অপূর্ণ শখ পূরণ করাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য। আর তাঁর এই শপিং তালিকার সবার ওপরে রয়েছে একটি জিপ গাড়ি এবং একটি রোলেক্স ঘড়ি।
তায়েব বলেন, ‘আমার প্রথম লক্ষ্য সব সময় ছিল পরিবারের জন্য একটি ভালো বাড়ি তৈরি করা। এখন আমি একটি ভালো জায়গায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করতে পারব।’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চার বছর ধরে অন্যের অধীনে চাকরি করছি। এখন আমি পরবর্তী ধাপে যেতে চাই। আমি উদ্যোক্তা হতে চাই এবং বিনিয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলো ঘুরে দেখতে চাই।’
বাকি অর্থ দিয়ে তায়েব তাঁর সব ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধ করবেন, দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সাহায্য করবেন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন। আবারও কোনো নিরাপত্তা কর্মীর কাজে না ফিরে তিনি নিজ দেশেই ছোটখাটো একটি ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবছেন।
লটারিতে এই ধরনের বড় জয় খুবই বিরল হলেও, তায়েবের এই গল্পটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে উন্নত জীবনের আশায় থাকা লাখো প্রবাসী শ্রমিকের মাঝে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে।
লিবিয়ায় অপহরণের পর আলমগীর হোসেন নামে এক বাংলাদেশি যুবককে হত্যা করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ঘটনার আড়াই মাস পর মৃত্যুসংবাদ পায় তার পরিবার। পরিবারের দাবি, মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকা না দেওয়ায় সন্ত্রাসীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) তার মৃত্যুর সংবাদ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে।
নিহত আলমগীর হোসেন (৩৫) নওগাঁর মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ গ্রামের মৃত দিদার বক্স খাঁনের ছেলে। তিনি দীর্ঘ সাত বছর ধরে লিবিয়ায় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পারিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলমগীর হোসেন লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলীর তাজুয়ারা ডিসি পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। গত ২৮ মার্চ মাগরিবের নামাজের পর ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশের পোশাক পরিহিত একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাইক্রোবাসে করে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিহত আলমগীরের ভাই লিবিয়া প্রবাসী জিল্লুর রহমান বলেন, আলমগীরকে অপহরণের পর তাকে উদ্ধারের জন্য লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি। সন্ত্রাসীদের ওই আস্তানায় আলমগীরসহ আরও ৩১ জন বাংলাদেশিকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ওই আস্তানা থেকে কয়েকজন বাংলাদেশি মুক্তিপণ দিয়ে সম্প্রতি ছাড়া পেয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, আলমগীরের কাছেও ২৫ লাখ টাকা দাবি করেছিল সন্ত্রাসীরা। কিন্তু সেই টাকা দিতে অস্বীকার করায় অন্তত এক মাস আগে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। সোমবার দূতাবাসের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের মোবাইলে থাকা ছবি দেখে আলমগীরের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার এবং দেশে পাঠানোর জন্য দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
নিহতের স্ত্রী শাহিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২৮ মার্চ কাজে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ওনার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। কোনো সন্ত্রাসী আমাদের কাছে মুক্তিপণও চায়নি। হঠাৎ ওনার মৃত্যুর খবর পাই।
স্বামীর মরদেহ দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্ত্রী শাহিনা আক্তার ও শোকসন্তপ্ত পরিবার।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বিভিন্ন অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মালয়েশিয়ায় ৩০ হাজার ৮০১ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ (জেআইএম)।
মঙ্গলবার (৯ জুন) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান।
তিনি জানান, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২ হাজার ৩২৪ জন তাদের ভিসা বা পাসের শর্ত ভঙ্গ করেছেন। তদন্তে দেখা গেছে, অনেকেই মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সময় যে উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছিলেন, বাস্তবে তারা তার বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
জাকারিয়া শাবান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশিদের আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে পাসের শর্ত অমান্য করা, অনুমোদন ছাড়া কাজ করা এবং বৈধ অনুমতি ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, অভিবাসন আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হবে। একইসঙ্গে দেশজুড়ে অভিযান ও তদারকিও আরও বিস্তৃত করা হবে।
এ লক্ষ্যে ইমিগ্রেশন বিভাগ একটি বিশেষ ইনস্পেক্টরেট অব এনফোর্সমেন্ট গঠন করেছে। পাশাপাশি বিদেশি অধ্যুষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান, আইন লঙ্ঘনকারী নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার যৌথ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহাপরিচালক বলেন, বিদেশি কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের অভিবাসন-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বার্ষিক কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) নির্ধারণ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, বিদেশিদের দেওয়া অভিবাসন সুবিধা যেন শুধুমাত্র অনুমোদিত উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে ইমিগ্রেশন বিভাগ বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা রক্ষা এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতেও বিভাগটি কাজ করে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভিসার অপব্যবহার, অবৈধ কর্মসংস্থান এবং বিদেশিদের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ বাড়ায় মালয়েশিয়া সরকার অভিবাসন আইন প্রয়োগে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশজুড়ে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।