১৪ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু : দিনে গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ এসেছে, কোন দেশে বেশি

প্রকাশ: বুধবার, অক্টোবর ০৭, ২০২৬
প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু : দিনে গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ এসেছে, কোন দেশে বেশি

কম্বোডিয়ার টাইলস কারখানায় কাজ করতেন পাবনার আল আমিন। কাজের সময় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে আসে তাঁর মরদেহ। তিনি মারা যান ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল। মরদেহ দেশে আসতে সময় লেগে যায় প্রায় দেড় বছর।

মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকায় এসে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান।

তিনি বলেন, কম্বোডিয়ায় দূতাবাস নেই। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে। মরদেহটি কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি দূতাবাস। এটি জানতে পেরে তিনি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করেন।

মরদেহ আনতে এমন হয়রানির ঘটনা অহরহ নয়। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি বলছে, বিদেশে প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। সৌদি আরবে কিছু কর্মীকে দাফন করা হয় স্থানীয়ভাবে। তবে অধিকাংশ মরদেহ দেশে আনতে চায় পরিবার। নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে; কিন্তু কর্মী কোনো কারণে অনিয়মিত হয়ে গেলে (বৈধ কাগজ না থাকা) দীর্ঘ সময় লেগে যায় মরদেহ আনতে।

প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ আনার আগে একাধিক দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এতে কিছুটা সময় লেগে যায়। তবে এটি আগের চেয়ে কমেছে; আর যেসব দেশে দূতাবাস নেই, সেখান থেকে মরদেহ আনতে বেশি সময় লাগে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় ৩ হাজার ১৪০ জন। মূলত করোনা মহামারির সময় অনেকে মরদেহ দেশে না এনে স্থানীয়ভাবে দাফন করেন। ২০২১ সাল থেকে দেশে আসা মরদেহ বাড়তে থাকে। করোনাকাল বাদ দিয়ে সাধারণ সময় মৃতের ১ শতাংশের কম দাফন হয় গন্তব্য দেশগুলোতে।

এ বছর জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। এ হিসাবে দিনে মরদেহ এসেছে গড়ে ১৪টির বেশি। সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদি আরবে। এ বছর দেশটিতে মারা গেছেন প্রায় ২ হাজার। যদিও বিদেশে বৃহত্তম কর্মসংস্থান হলো সৌদি আরব। এ বছরও সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন দেশটিতে। এরপর সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা গেছেন মালয়েশিয়ায়। দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে আছে।

অভিবাসন খাত নিয়ে নিয়মিত কাজ করে, এমন বেসরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মী যে দেশে মারা যান, সেখান থেকে মৃত্যুর একটি কারণ লিখে পাঠানো হয়। রোগসহ স্বাভাবিক মৃত্যু দেখানো হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, খুন, আত্মহত্যায় বাধ্য করার অভিযোগ আছে; কিন্তু বিদেশে কর্মীদের মৃত্যুর কোনো কারণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয় না। এভাবে দায়সারাভাবে মৃত্যুর কারণ বলে দেওয়াটা পরিবারের জন্য অসম্মানজনক।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে। মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। যাঁরা অনিয়মিত কর্মী, তাঁদের মরদেহ আনতেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাই করতে করণীয় ঠিক করা হবে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, মৃত্যুর পর কর্মীর পরিবার থেকে আবেদন করতে হয়। কর্মী যদি দেশ থেকে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকেন বা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাস থেকে সদস্য নিবন্ধন নেন; তাহলে তাঁর মরদেহ আনার খরচ কল্যাণ বোর্ডের। এর কোনোটি না থাকলেও বোর্ডে আবেদন করতে পারে পরিবার। সে ক্ষেত্রে বোর্ড থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে মরদেহ দেশে আনতে খরচ দেওয়া হয়, এটি প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে।

দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৬ শতাংশের বেশি

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগে প্রায় ৭০ শতাংশ মরদেহের সঙ্গে আসা কাগজপত্রে কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যু লেখা থাকত। এ বছর প্রথম ৯ মাসে ৬৬ শতাংশের মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক উল্লেখ করা হয়েছে; আর দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে।

মোট মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনা, কাজের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পরে যাওয়া ও বিদ্যুতায়িত হয়ে এ বছর মারা গেছেন ১৬ শতাংশের বেশি।

এর আগে ২০২৩ সালে প্রবাসে মৃত কর্মীদের পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহ দেশে আসে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বৈদ্যুতিক শকে মারা গেছেন ৩ হাজার ৬৯৮ জন।

সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৪৯ জন। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি প্রবাসী মারা যান কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। কর্মক্ষেত্রে আসা–যাওয়া ও কাজের সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নোয়াখালীর ফয়েজ আহম্মেদ ১০ বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করতেন। সাত মাস ধরে তাঁর সঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছিলেন ছোট ভাই সুজন আহম্মেদ। দুজন মিলে একই গাড়িতে করে খেজুর পরিবহনের কাজ করতেন। গত ১৬ জুলাই এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান দুই ভাই। ২৮ জুলাই দেশে আসে মরদেহ। তাঁদের বাবা আবদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, হঠা সব শেষ হয়ে গেল। মরদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা করে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছে কল্যাণ বোর্ড।

দেশে আসা প্রতিটি মৃতদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয় কল্যাণ বোর্ড। এরপর তিন লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এর বাইরে এখন জীবন বিমার সুবিধা পায় কর্মীর পরিবার; আর বিদেশে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি থাকলে তা দূতাবাসের মাধ্যমে আদায় করে দেওয়া হয়। মৃত কর্মীর বকেয়া থাকলে তা-ও আদায়ের উদ্যোগ নেয় দূতাবাস। কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, এ বছর প্রথম ৬ মাসে মরদেহ দাফনে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে; আর আর্থিক অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কর্মীদের বিমাসুবিধা দেওয়া হয়েছে ৪৪ কোটি টাকার বেশি। বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও বিমা আদায় করে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।

কর্মীদের আর্থিক অনুদান, ক্ষতিপূরণ, বিমাসুবিধা আদায় নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবেদন করার পর দিনের পর দিন কল্যাণ বোর্ডে ঘুরতে হয়। কারও কারও সহায়তা পেতে পেতে পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে যায়; আর বিদেশ থেকে সব হারিয়ে ফিরে আসা অনিয়মিত কর্মীরা সরকারের এসব সুবিধা পান না।

কারণ জানা গেলে কমতে পারে মৃত্যু

অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে মূলত অবকাঠামো নির্মাণ খাতে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপের মধ্যে তাঁদের কাজ করতে হয়। এতে তাপজনিত নানা রোগে শুধু কিডনি নয়, মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে শরীরের সব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দেশে তাপ আরও বাড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে অতিরিক্ত তাপ। প্রচণ্ড তাপ ও সূর্যালোকে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। যে জন্য আজীবন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দিনে ও রাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি শরীরে ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে এবং শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্‌রোগ, বহুমূত্র ও কিডনি রোগের প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে অকালমৃত্যুও ঘটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মৃত্যুর কারণ জানা গেলে প্রতিরোধে নানা ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে বিএমইটি প্রশিক্ষণ দেয়। এতে গন্তব্য দেশের নিয়মকানুন, আচার-আচরণসহ নিরাপত্তা সচেতনতা বিষয়ে বিদেশগামী কর্মীদের ধারণা দেওয়া হয়। এটি মাত্র তিন দিনের কর্মশালা, যাতে কোনো কিছুই ভালো করে শেখানো হয় না। যে দেশে কাজে যাচ্ছেন, সে দেশের কাজের ধরন, পরিবেশ ও চাপ সামলানোর কৌশল, কর্মঘণ্টা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাসহ কীভাবে ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে সুস্থ রাখা যায়, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, প্রতিবছর মৃত্যু বাড়ছে। ২৫ থেকে ৩০ বছরের যুবকেরাও মারা যাচ্ছেন। ৭০ শতাংশের বেশি মরদেহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, সৌদি থেকেই বেশি। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ জানা গেলে মৃত্যু কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে সরকার; আর জীবনযুদ্ধে লড়াই করা নারীরা বিদেশে যান।

তাঁদের আত্মহত্যার কারণগুলো অবশ্যই জোরালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, মরদেহ দেশে আনতে কোনোভাবেই কালক্ষেপণ করা যাবে না। অনিয়মিত কর্মী হলেও তাঁর মরদেহ আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

প্রথম আলো

প্রবাসী বাবার দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন ফয়সাল, সড়কেই ঝরলো প্রাণ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
প্রবাসী বাবার দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন ফয়সাল, সড়কেই ঝরলো প্রাণ

প্রবাসে কাজ না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বাড়িতে টাকা পারছেন না প্রবাসী বাবা। তাই চারজনের ছোট্ট সংসারটির দায়িত্ব এসে পড়ে ১৮ বছরের তরুণ মো. ফয়সালের কাঁধে। কিন্তু হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় সড়কের ঝরে গেল সেই ফয়সালের প্রাণ।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। প্রবাসী বাবার সংসারের হাল ধরা ফয়সালের মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ছগুড়া-হাতিমারা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত ফয়সাল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা গ্রামের জমশের বাড়ির প্রবাসী খোরশেদ আলমের বড় ছেলে। তিনি দেবিদ্বার জেলা পরিষদ মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন।

নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন ১৮ বছরের তরুণ। কিন্তু আর ফেরা হলো না ১৮ বছর বয়সী তরুণ মো. ফয়সালের। কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দেবিদ্বারগামী একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে কুমিল্লাগামী মর্ডান পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলচালক ফয়সাল ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন ফয়সাল। তার বাবা খোরশেদ আলম প্রবাসে থাকলেও কাজ না থাকায় নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারতেন না। ফলে অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল ফয়সালকে। কাপড়ের দোকানে কাজ করে পরিবারের খরচ চালাতে সহযোগিতা করতেন তিনি।

ফয়সালের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যে তরুণের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল পরিবার, তার চলে যাওয়া শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ঘটনার পর ফয়সালের বাড়িতে চলছে মাতম। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।

ফয়সালের ছোট ভাই সিয়াম (১৪) জানায়, সকালে খাওয়া-দাওয়া করে বাড়ি থেকে বের হয় তার ভাই। পরে তারা খবর পান, ফয়সাল সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

মিরপুর হাইওয়ে থানার ওসি মো. আনিছুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে আমাদের টিম গিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। ঘাতক বাসটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীর চুল কাটার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীর চুল কাটার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক গৃহবধূকে আটকে রেখে মারধর, মাথার চুল কেটে দেওয়া এবং গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

ঘটনাটি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামের। নির্যাতনের শিকার নারী রিক্তা বেগম (২৮)। তিনি ওই গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী রাজিব বেপারীর স্ত্রী।

রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে পুলিশ।

ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক গৃহবধূকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক তার হাত ধরে রেখেছেন। এ সময় চেক টি-শার্ট পরা আরেক যুবক ধারালো কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল কাটছেন। ওই নারী চিৎকার করে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করলেও চুল কাটা বন্ধ করেননি তারা। ভিডিওর শেষ দিকে ওই নারীর মুখে থাপ্পড় মারতেও দেখা যায়।

অন্যদিকে, ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে রাতে ওই নারী ও এক যুবককে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় ওই নারীকে মারধর করতেও দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন রিক্তা বেগম। ওই রাতেই তার কক্ষে এক যুবককে দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। তারা দুজনকে আটক করেন। এ সময় ওই যুবক পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাকে ধরে রাখেন।

স্থানীয়দের দাবি, এরপর ওই নারী ও যুবককে আটকে রাখা হয়। পরদিন রোববার বিকেলে গৃহবধূর চুল কেটে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আটক যুবককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও জানান তারা।

স্থানীয় সূত্রে নির্যাতনে জড়িত হিসেবে সুমন হোসেন (২৬) ও জয় হোসেন (২৮) নামে দুই যুবকের নাম এসেছে। সুমন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ বেপারীর নাতি বলে জানা গেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নির্যাতনের শিকার রিক্তা বেগমের বাবার বাড়ি সদরপুর উপজেলার পাশের ভাষাণচর ইউনিয়নের কারীরহাট গ্রামে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আ. জলিল মোল্যা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে নির্যাতনের শিকার নারী ও তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভিডিও দুটি কে বা কারা ধারণ করেছেন এবং কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নির্যাতনের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং এর পেছনে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহ বলেন, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচারের জন্য আইন রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযানে রয়েছেন।

মালদ্বীপে বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু, পলাতক ৩ রুমমেট

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
মালদ্বীপে বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু, পলাতক ৩ রুমমেট

মালদ্বীপে মো. সজীব (২৭) নামের এক বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তার মরদেহ কক্ষ থেকে উদ্ধারের সময় সেখানে থাকা তিন প্রবাসীকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পরিবার।

তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশের কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার এবং অন্যজন নেপালের নাগরিক। তাদের অনুপস্থিতি ঘিরে সজীবের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে স্বজনদের মধ্যে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহত সজীব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া উত্তরপাড়া এলাকার পুরাতন মকিমের বাড়ির আবদুল খালেকের ছেলে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছায়। পরে পরিবারের সদস্যরা মালদ্বীপ থেকে ফোনে তার মৃত্যুর খবর পান বলে জানা গেছে।

সজীবের চাচাতো ভাই মো. সোহেল তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সজীবকে তার কক্ষে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে মালদ্বীপের পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।

পরিবারের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় সজীবের সঙ্গে একই কক্ষে থাকা তিন প্রবাসী সেখানে ছিলেন না। তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় সজীবের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন স্বজনেরা। তাদের আশঙ্কা, তাকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মালদ্বীপের পুলিশের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ফলে সজীবের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সজীব অবিবাহিত ছিলেন। তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না বলে দাবি স্বজনদের। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় তিন বছর আগে তিনি মালদ্বীপে পাড়ি জমান। সেখানে উপার্জন করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।

সজীবের আকস্মিক মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মহালক্ষ্মীপাড়া উত্তরপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও এলাকাবাসী তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে সজীবের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।

মালয়েশিয়ায় ভিসা কোটা জালিয়াতি চক্র উন্মোচিত: ২৬৫ বাংলাদেশির পাসপোর্টসহ আটক ২০

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
মালয়েশিয়ায় ভিসা কোটা জালিয়াতি চক্র উন্মোচিত: ২৬৫ বাংলাদেশির পাসপোর্টসহ আটক ২০

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। এ ঘটনায় দুই ব্যবসায়ী, ছয় স্থানীয় নারী কর্মী ও ১২ বিদেশি গ্রাহকসহ মোট ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে বাংলাদেশি নাগরিকদের ২৬৫টিসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৩৫২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় সেলাঙ্গর রাজ্যের আমপাংয়ের তামান দাতো আহমাদ রাজালি এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জেআইএম জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ডের সহযোগিতায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। জনসাধারণের দেওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানের ভিত্তিতে অভিযানটি চালানো হয়।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন পুরুষকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছয়জন স্থানীয় নারী কর্মী এবং নয়জন পুরুষ ও তিনজন নারীসহ ১২ বিদেশি গ্রাহককে আটক করা হয়েছে। আটক বিদেশি গ্রাহকদের জাতীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

অভিবাসন বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি ‘মালিক এ থেকে মালিক বি’ পদ্ধতিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার করছিল। এ পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অনুমোদন করিয়ে অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাসের মাধ্যমে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসত। পরে ওই কর্মীদের কোটা অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য সরবরাহ করা হতো।

তদন্তকারীদের ধারণা, এভাবে প্রতিজন বিদেশি কর্মীর কাছ থেকে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত আয় করত চক্রটি। কোটা অনুমোদন পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে অসংগতিপূর্ণ তথ্য জমা দিয়েছিল বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

অভিযানকালে বাংলাদেশি নাগরিকদের ২৬৫টি, ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের ৬৩টি, পাকিস্তানি নাগরিকদের ১২টি এবং ভারতীয় নাগরিকদের ১২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে জব্দ করা পাসপোর্টের সংখ্যা ৩৫২টি।

এ ছাড়া সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত হিসাবের তুলনায় কম মুনাফা দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসাথে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত আয় ঘোষণা না করার অভিযোগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ড

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির আইন লঙ্ঘন করে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার, অবৈধভাবে কর্মী সরবরাহ এবং এসব কর্মকাণ্ড থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। শুধু আইন লঙ্ঘনকারী বিদেশি কর্মী নয়, বরং এসব কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, পরিচালনাকারী ও সুবিধাভোগীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রবাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘরে ফিরেও জীবন নিয়ে স্বস্তিতে নেই বিদেশফেরত নারী শ্রমিকরা। শূন্য হাতে দেশে ফেরার পরও তাদের নতুন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর সন্দেহ, কটূক্তি আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের।

ভুক্তভোগী নারী কর্মীরা জানান, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার পর নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আরেকটি বিপর্যয় নেমে আসছে জীবনে। সবাই দূরে থাকে, মিশতে চায় না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরূপ সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন তারা।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু ঠিক কতজন নারী কর্মী বিদেশফেরত হয়েছেনÑএর কোনো তালিকা নেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে।

এদিকে বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ শীর্ষক নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তা নিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, এসব নীতিমালা কেবল কাগজে-কলমে। সরকার থেকে কোনো খোঁজখবর রাখা হয় না।

বিদেশে গিয়ে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন নরসিংদীর রনি বেগম। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে—এমন আশায় কাজের ভিসায় গত জুলাইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ না পাওয়া, নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হন। প্রায় দেড় মাস বন্দি থাকার পর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে।

রনি বেগম বলেন, আমার স্বামী রিকশা চালায়। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ ও স্বামীর কষ্ট দেখে বিদেশ যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। ভালো কাজের আশায় ঋণ করে সৌদি আরবে গেলেও তা সুখকর হয়নি। কিন্তু দেশে আসার পর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরা বিদেশযাত্রা ও ফিরে আসার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলে প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা ও মানসিক সমর্থনের বদলে মুখোমুখি অপমান, অবিশ্বাস কিংবা সামাজিক দূরত্বের মুখে পড়তে হচ্ছে।

জানা যায়, ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ নীতিমালায় উল্লেখ আছে, প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের যৌক্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং সুরক্ষিতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিবাসী নারী কর্মীকে বৈষম্যহীন ও সমান সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে আরো বলা হয়, প্রত্যাগত নারী অভিবাসীকর্মীরা অভিবাসনজনিত যেসব সামাজিক সমস্যা, নেতিবাচক ধারণা ও মনোভাবের সম্মুখীন হন তা দূর করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের (বিএমইটি) তথ্যনুযায়ী, ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের ১০ তারিখ পর্যন্ত এক লাখ ৭২ হাজার ২০৮ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে বিদেশ গেছেন ৬১ হাজার ২৫৬ জন নারী শ্রমিক। ২০২৫ সালে গেছেন ৬২ হাজার ৩৫৫ জন ও ২০২৬ সালের অক্টোবর ১০ তারিখ পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৬৯৭ জন বিদেশে পাড়ি জমান।

ওই সময়ে যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে বেশি নারী শ্রমিক গেছেন তার মধ্যে সৌদি আরবের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ আড়াই বছরে সৌদি গেছেন এক লাখ ১৮ হাজার ২৮ জন নারী শ্রমিক, জর্ডান গেছেন ৩৭ হাজার ২৮৭ জন, কাতারে ৫,৮৯৯ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২,৪৮১ জন, লেবানন ১,১৩০ জন ও কুয়েতে গেছেন ১,১৩০ জন নারী শ্রমিক।

কতজন নারী শ্রমিক প্রত্যাগত হয়েছেন তা জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সিস্টেম অ্যানালিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবু রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রত্যাগত নারী কর্মীদের তালিকা এন্ট্রি নেই তাদের কাছে।

সাতক্ষীরার সুমি বেগম। ২০২৩ সালে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ভালো বেতনের প্রস্তাবে কাজের ভিসায় তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে একটি বাসায় কাজের জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর সুখের বদলে জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ নির্যাতন। তিনি বলেন, একটা বাসায় কাজ করতাম। তারা আমাকে ঠিকমতো বেতন দেয়নি। শেষে যখন আট মাসের বেতন পুরোটাই আটকে ফেলেছে, তখন অনেক কান্নাকাটি করার পর আমি মুক্তি পাই।

সুমি বলেন, দেশে আসার পর আমাকে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রতিবেশীরা ভিন্নদৃষ্টিতে দেখে। অথচ আমার অপরাধ কী সেটাই তো আমি জানি না। সংসারের হাল ধরতেই তো আমি বিদেশে গেছি। এটাই কি আমার অপরাধ? সরকার যদি আমাদের সম্মান দিতে না পারে, তাহলে বিদেশে কেন নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছে?

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাহিরুন্নেসা বলেন, আমার স্বামীর দুর্ঘটনার পর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য গৃহপরিচারিকার কাজে আমি সৌদি আরবে যাই। সেখানে আমাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে দেশে ফিরতে হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে ফেরার পর আত্মীয়স্বজনরা আমার থেকে দূরে থাকে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেও সেভাবে তারা আমাকে দাওয়াত দেয় না। মনোভাব এমন, আমি তাদের সঙ্গে মিশলে সম্মানহানি হবে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত মানসিক যুদ্ধ করে বেঁচে আছি।

তাহিরুন্নেসা বলেন, ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলাম, নিঃস্ব হয়ে ফিরেছি। কিন্তু সরকারের কোনো চিন্তা নেই আমাদের জন্য। কোনো সহায়তাও মিলছে না। আমি অসুস্থ স্বামী ও চারজন সন্তান নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবÑসে চিন্তায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি।

সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসন জরুরি

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর আমার দেশকে বলেন, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের পুনর্বাসন বলতে শুধু আর্থিক সহায়তা বা প্রশিক্ষণ বোঝালে চলবে না। তাদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেউ বিদেশ গেলেই যে তাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে হবে, সে মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করতে হবে, যাতে তারা ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ না করে পুনর্বাসনে সহযোগিতা করেন।

সরকারি উদ্যোগ নিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের নিয়ে সরকারি উদ্যোগগুলো যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে প্রচার ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এছাড়া ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ নীতিমালা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। কতজন প্রত্যাগত হয়েছেন, এর তালিকা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন, তাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। বিশেষ করে যারা বিধবা ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, তাদের কীভাবে স্বাবলম্বী করা যায় এবং এজন্য ডিসেম্বরের মধ্যেই ভালো কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

সূত্র: আমার দেশ