১৪ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরবে হুতি হামলায় নিহতদের সম্পর্কে সর্বশেষ যা জানা গেল

প্রকাশ: সোমবার, অক্টোবর ১২, ২০২৬
সৌদি আরবে হুতি হামলায় নিহতদের সম্পর্কে সর্বশেষ যা জানা গেল

সৌদি আরবের রিয়াদে বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলায় ঝুঁকিতে পড়েছেন বাংলাদেশিরা।

বিমানবন্দরে হামলাস্থলে নিহত হয়েছেন দুই বাংলাদেশি। এদের একজন ছিলেন ওমরাহ যাত্রী। অন্যজন চাকরি করতেন রিয়াদে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও চার বাংলাদেশি।

সংকট তৈরি হয়েছে ঢাকায়ও। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় শিডিউল লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে। এতে ৩ হাজার বাংলাদেশি আটকা পড়েছেন দেশে।

ঢাকায় এসে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছানো প্রবাসী কর্মীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। আটকা পড়াদের অনেকেরই সৌদি আরবে প্রবেশের সময়সীমা শেষের দিকে থাকায় তৈরি হয়েছে তাদের কাজের অনিশ্চয়তা। সৌদির বিমানবন্দরে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গতকাল বিকাল পর্যন্ত বাতিল হওয়া ৮টি ফ্লাইটের মধ্যে রয়েছে- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ২টি, ইউএস-বাংলার ১টি, সৌদিয়ার ৩টি, রিয়াদ এয়ারের ২টি। এসব ফ্লাইটের প্রায় ৩ হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আজ দুপুর ১২টায় পরবর্তী ফ্লাইট শিডিউল ঘোষণা করবে।

শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতি বিদ্রোহীরা। এতে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বিমানবন্দরের কার্যক্রম। বাতিল করা হয় তিন শতাধিক ফ্লাইট। এ ছাড়াও হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। নিহত বাংলাদেশিরা হলেন- কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি ও বগুড়ার শাহজাহানপুরে মো. শাহেদ আহম্মেদ। তাদের বাড়িতে চলছে এখন শোকের মাতম।

গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিরা সৌদির কিং খালেদ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সবার পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও বলেন, আহতদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস। আর যারা নিহত হয়েছেন তাদের লাশ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ হামলায় বাংলাদেশি কোনো বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলেও জানান শামা ওবায়েদ।

ফ্লাইট শিডিউল লন্ডভন্ড, অনিশ্চয়তায় ৩ হাজার বাংলাদেশি :

রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ঢাকা-রিয়াদ আকাশপথের যোগাযোগ। লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে ফ্লাইট শিডিউল।

গত শনিবার রাত থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত রিয়াদগামী ৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছানো প্রবাসী কর্মীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। কারও গন্তব্য কর্মস্থল, কারও ফেরার কথা পরিবারের কাছে। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সবার যাত্রাই আটকে গেছে অনিশ্চয়তায়।

গতকাল দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দেখা যায়, রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। কেউ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব প্রবাসীর অনেকেই জানেন না, কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন, কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পেয়ে তাদের চোখেমুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ। বিদেশে কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার আশঙ্কার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচের চাপ।

বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদ প্রবাসী শাহ আলম বলেন, রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। রবিবার দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। দেশের বাড়ি কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে, সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ম্যানেজার (ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট) স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বলেন, বাতিল হওয়া ৮টি ফ্লাইটে মোট ২ হাজার ৯৫১ জন যাত্রীর রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে।

যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ফ্লাইটের সময়সূচি আজ দুপুরে জানাবে বিমান :

সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট পুনর্র্নির্ধারণের সময়সূচি জানিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময়সীমা ১১ অক্টোবর ইউটিসি ২১টা পর্যন্ত, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় ১২ অক্টোবর রাত ৩টা পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১১ ও ১২ অক্টোবর ঢাকা রিয়াদ ও রিয়াদ ঢাকা রুটের নির্ধারিত ইএ৩৩৯ ও ইএ৩৪০ ফ্লাইট দুটি স্থগিত করা হয়েছে। ফ্লাইট এবং সময়সূচি সম্পর্কে আজ বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় সবাইকে অবহিত করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

বাংলাদেশের তীব্র নিন্দা :

বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় দুজন বাংলাদেশিসহ ১২ জন হতাহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের বিস্তারিত তথ্য পেতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে রিয়াদের বাংলাদেশ মিশন। বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্নকারী এবং বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যেকোনো হামলা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

এ ঘটনায় সৌদি আরবের সঙ্গে সংহতি জানানোর পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সমাধান বের করার আহ্বান আবারও জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ।

প্রবাসী বাবার দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন ফয়সাল, সড়কেই ঝরলো প্রাণ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
প্রবাসী বাবার দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন ফয়সাল, সড়কেই ঝরলো প্রাণ

প্রবাসে কাজ না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বাড়িতে টাকা পারছেন না প্রবাসী বাবা। তাই চারজনের ছোট্ট সংসারটির দায়িত্ব এসে পড়ে ১৮ বছরের তরুণ মো. ফয়সালের কাঁধে। কিন্তু হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় সড়কের ঝরে গেল সেই ফয়সালের প্রাণ।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। প্রবাসী বাবার সংসারের হাল ধরা ফয়সালের মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ছগুড়া-হাতিমারা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত ফয়সাল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা গ্রামের জমশের বাড়ির প্রবাসী খোরশেদ আলমের বড় ছেলে। তিনি দেবিদ্বার জেলা পরিষদ মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন।

নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন ১৮ বছরের তরুণ। কিন্তু আর ফেরা হলো না ১৮ বছর বয়সী তরুণ মো. ফয়সালের। কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দেবিদ্বারগামী একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে কুমিল্লাগামী মর্ডান পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলচালক ফয়সাল ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন ফয়সাল। তার বাবা খোরশেদ আলম প্রবাসে থাকলেও কাজ না থাকায় নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারতেন না। ফলে অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল ফয়সালকে। কাপড়ের দোকানে কাজ করে পরিবারের খরচ চালাতে সহযোগিতা করতেন তিনি।

ফয়সালের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যে তরুণের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল পরিবার, তার চলে যাওয়া শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ঘটনার পর ফয়সালের বাড়িতে চলছে মাতম। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।

ফয়সালের ছোট ভাই সিয়াম (১৪) জানায়, সকালে খাওয়া-দাওয়া করে বাড়ি থেকে বের হয় তার ভাই। পরে তারা খবর পান, ফয়সাল সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

মিরপুর হাইওয়ে থানার ওসি মো. আনিছুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে আমাদের টিম গিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। ঘাতক বাসটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীর চুল কাটার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীর চুল কাটার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক গৃহবধূকে আটকে রেখে মারধর, মাথার চুল কেটে দেওয়া এবং গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

ঘটনাটি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামের। নির্যাতনের শিকার নারী রিক্তা বেগম (২৮)। তিনি ওই গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী রাজিব বেপারীর স্ত্রী।

রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে পুলিশ।

ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক গৃহবধূকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক তার হাত ধরে রেখেছেন। এ সময় চেক টি-শার্ট পরা আরেক যুবক ধারালো কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল কাটছেন। ওই নারী চিৎকার করে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করলেও চুল কাটা বন্ধ করেননি তারা। ভিডিওর শেষ দিকে ওই নারীর মুখে থাপ্পড় মারতেও দেখা যায়।

অন্যদিকে, ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে রাতে ওই নারী ও এক যুবককে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় ওই নারীকে মারধর করতেও দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন রিক্তা বেগম। ওই রাতেই তার কক্ষে এক যুবককে দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। তারা দুজনকে আটক করেন। এ সময় ওই যুবক পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাকে ধরে রাখেন।

স্থানীয়দের দাবি, এরপর ওই নারী ও যুবককে আটকে রাখা হয়। পরদিন রোববার বিকেলে গৃহবধূর চুল কেটে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আটক যুবককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও জানান তারা।

স্থানীয় সূত্রে নির্যাতনে জড়িত হিসেবে সুমন হোসেন (২৬) ও জয় হোসেন (২৮) নামে দুই যুবকের নাম এসেছে। সুমন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ বেপারীর নাতি বলে জানা গেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নির্যাতনের শিকার রিক্তা বেগমের বাবার বাড়ি সদরপুর উপজেলার পাশের ভাষাণচর ইউনিয়নের কারীরহাট গ্রামে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আ. জলিল মোল্যা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে নির্যাতনের শিকার নারী ও তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভিডিও দুটি কে বা কারা ধারণ করেছেন এবং কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নির্যাতনের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং এর পেছনে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহ বলেন, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচারের জন্য আইন রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযানে রয়েছেন।

মালদ্বীপে বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু, পলাতক ৩ রুমমেট

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
মালদ্বীপে বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু, পলাতক ৩ রুমমেট

মালদ্বীপে মো. সজীব (২৭) নামের এক বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তার মরদেহ কক্ষ থেকে উদ্ধারের সময় সেখানে থাকা তিন প্রবাসীকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পরিবার।

তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশের কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার এবং অন্যজন নেপালের নাগরিক। তাদের অনুপস্থিতি ঘিরে সজীবের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে স্বজনদের মধ্যে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহত সজীব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া উত্তরপাড়া এলাকার পুরাতন মকিমের বাড়ির আবদুল খালেকের ছেলে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছায়। পরে পরিবারের সদস্যরা মালদ্বীপ থেকে ফোনে তার মৃত্যুর খবর পান বলে জানা গেছে।

সজীবের চাচাতো ভাই মো. সোহেল তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সজীবকে তার কক্ষে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে মালদ্বীপের পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।

পরিবারের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় সজীবের সঙ্গে একই কক্ষে থাকা তিন প্রবাসী সেখানে ছিলেন না। তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় সজীবের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন স্বজনেরা। তাদের আশঙ্কা, তাকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মালদ্বীপের পুলিশের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ফলে সজীবের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সজীব অবিবাহিত ছিলেন। তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না বলে দাবি স্বজনদের। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় তিন বছর আগে তিনি মালদ্বীপে পাড়ি জমান। সেখানে উপার্জন করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।

সজীবের আকস্মিক মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মহালক্ষ্মীপাড়া উত্তরপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও এলাকাবাসী তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে সজীবের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।

মালয়েশিয়ায় ভিসা কোটা জালিয়াতি চক্র উন্মোচিত: ২৬৫ বাংলাদেশির পাসপোর্টসহ আটক ২০

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
মালয়েশিয়ায় ভিসা কোটা জালিয়াতি চক্র উন্মোচিত: ২৬৫ বাংলাদেশির পাসপোর্টসহ আটক ২০

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। এ ঘটনায় দুই ব্যবসায়ী, ছয় স্থানীয় নারী কর্মী ও ১২ বিদেশি গ্রাহকসহ মোট ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে বাংলাদেশি নাগরিকদের ২৬৫টিসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৩৫২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় সেলাঙ্গর রাজ্যের আমপাংয়ের তামান দাতো আহমাদ রাজালি এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জেআইএম জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ডের সহযোগিতায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। জনসাধারণের দেওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানের ভিত্তিতে অভিযানটি চালানো হয়।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন পুরুষকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছয়জন স্থানীয় নারী কর্মী এবং নয়জন পুরুষ ও তিনজন নারীসহ ১২ বিদেশি গ্রাহককে আটক করা হয়েছে। আটক বিদেশি গ্রাহকদের জাতীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

অভিবাসন বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি ‘মালিক এ থেকে মালিক বি’ পদ্ধতিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার করছিল। এ পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অনুমোদন করিয়ে অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাসের মাধ্যমে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসত। পরে ওই কর্মীদের কোটা অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য সরবরাহ করা হতো।

তদন্তকারীদের ধারণা, এভাবে প্রতিজন বিদেশি কর্মীর কাছ থেকে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত আয় করত চক্রটি। কোটা অনুমোদন পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে অসংগতিপূর্ণ তথ্য জমা দিয়েছিল বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

অভিযানকালে বাংলাদেশি নাগরিকদের ২৬৫টি, ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের ৬৩টি, পাকিস্তানি নাগরিকদের ১২টি এবং ভারতীয় নাগরিকদের ১২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে জব্দ করা পাসপোর্টের সংখ্যা ৩৫২টি।

এ ছাড়া সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত হিসাবের তুলনায় কম মুনাফা দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসাথে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত আয় ঘোষণা না করার অভিযোগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ড

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির আইন লঙ্ঘন করে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার, অবৈধভাবে কর্মী সরবরাহ এবং এসব কর্মকাণ্ড থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। শুধু আইন লঙ্ঘনকারী বিদেশি কর্মী নয়, বরং এসব কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, পরিচালনাকারী ও সুবিধাভোগীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রবাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘরে ফিরেও জীবন নিয়ে স্বস্তিতে নেই বিদেশফেরত নারী শ্রমিকরা। শূন্য হাতে দেশে ফেরার পরও তাদের নতুন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর সন্দেহ, কটূক্তি আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের।

ভুক্তভোগী নারী কর্মীরা জানান, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার পর নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আরেকটি বিপর্যয় নেমে আসছে জীবনে। সবাই দূরে থাকে, মিশতে চায় না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরূপ সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন তারা।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু ঠিক কতজন নারী কর্মী বিদেশফেরত হয়েছেনÑএর কোনো তালিকা নেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে।

এদিকে বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ শীর্ষক নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তা নিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, এসব নীতিমালা কেবল কাগজে-কলমে। সরকার থেকে কোনো খোঁজখবর রাখা হয় না।

বিদেশে গিয়ে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন নরসিংদীর রনি বেগম। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে—এমন আশায় কাজের ভিসায় গত জুলাইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ না পাওয়া, নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হন। প্রায় দেড় মাস বন্দি থাকার পর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে।

রনি বেগম বলেন, আমার স্বামী রিকশা চালায়। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ ও স্বামীর কষ্ট দেখে বিদেশ যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। ভালো কাজের আশায় ঋণ করে সৌদি আরবে গেলেও তা সুখকর হয়নি। কিন্তু দেশে আসার পর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরা বিদেশযাত্রা ও ফিরে আসার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলে প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা ও মানসিক সমর্থনের বদলে মুখোমুখি অপমান, অবিশ্বাস কিংবা সামাজিক দূরত্বের মুখে পড়তে হচ্ছে।

জানা যায়, ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ নীতিমালায় উল্লেখ আছে, প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের যৌক্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং সুরক্ষিতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিবাসী নারী কর্মীকে বৈষম্যহীন ও সমান সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে আরো বলা হয়, প্রত্যাগত নারী অভিবাসীকর্মীরা অভিবাসনজনিত যেসব সামাজিক সমস্যা, নেতিবাচক ধারণা ও মনোভাবের সম্মুখীন হন তা দূর করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের (বিএমইটি) তথ্যনুযায়ী, ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের ১০ তারিখ পর্যন্ত এক লাখ ৭২ হাজার ২০৮ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে বিদেশ গেছেন ৬১ হাজার ২৫৬ জন নারী শ্রমিক। ২০২৫ সালে গেছেন ৬২ হাজার ৩৫৫ জন ও ২০২৬ সালের অক্টোবর ১০ তারিখ পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৬৯৭ জন বিদেশে পাড়ি জমান।

ওই সময়ে যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে বেশি নারী শ্রমিক গেছেন তার মধ্যে সৌদি আরবের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ আড়াই বছরে সৌদি গেছেন এক লাখ ১৮ হাজার ২৮ জন নারী শ্রমিক, জর্ডান গেছেন ৩৭ হাজার ২৮৭ জন, কাতারে ৫,৮৯৯ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২,৪৮১ জন, লেবানন ১,১৩০ জন ও কুয়েতে গেছেন ১,১৩০ জন নারী শ্রমিক।

কতজন নারী শ্রমিক প্রত্যাগত হয়েছেন তা জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সিস্টেম অ্যানালিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবু রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রত্যাগত নারী কর্মীদের তালিকা এন্ট্রি নেই তাদের কাছে।

সাতক্ষীরার সুমি বেগম। ২০২৩ সালে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ভালো বেতনের প্রস্তাবে কাজের ভিসায় তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে একটি বাসায় কাজের জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর সুখের বদলে জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ নির্যাতন। তিনি বলেন, একটা বাসায় কাজ করতাম। তারা আমাকে ঠিকমতো বেতন দেয়নি। শেষে যখন আট মাসের বেতন পুরোটাই আটকে ফেলেছে, তখন অনেক কান্নাকাটি করার পর আমি মুক্তি পাই।

সুমি বলেন, দেশে আসার পর আমাকে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রতিবেশীরা ভিন্নদৃষ্টিতে দেখে। অথচ আমার অপরাধ কী সেটাই তো আমি জানি না। সংসারের হাল ধরতেই তো আমি বিদেশে গেছি। এটাই কি আমার অপরাধ? সরকার যদি আমাদের সম্মান দিতে না পারে, তাহলে বিদেশে কেন নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছে?

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাহিরুন্নেসা বলেন, আমার স্বামীর দুর্ঘটনার পর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য গৃহপরিচারিকার কাজে আমি সৌদি আরবে যাই। সেখানে আমাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে দেশে ফিরতে হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে ফেরার পর আত্মীয়স্বজনরা আমার থেকে দূরে থাকে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেও সেভাবে তারা আমাকে দাওয়াত দেয় না। মনোভাব এমন, আমি তাদের সঙ্গে মিশলে সম্মানহানি হবে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত মানসিক যুদ্ধ করে বেঁচে আছি।

তাহিরুন্নেসা বলেন, ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলাম, নিঃস্ব হয়ে ফিরেছি। কিন্তু সরকারের কোনো চিন্তা নেই আমাদের জন্য। কোনো সহায়তাও মিলছে না। আমি অসুস্থ স্বামী ও চারজন সন্তান নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবÑসে চিন্তায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি।

সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসন জরুরি

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর আমার দেশকে বলেন, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের পুনর্বাসন বলতে শুধু আর্থিক সহায়তা বা প্রশিক্ষণ বোঝালে চলবে না। তাদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেউ বিদেশ গেলেই যে তাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে হবে, সে মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করতে হবে, যাতে তারা ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ না করে পুনর্বাসনে সহযোগিতা করেন।

সরকারি উদ্যোগ নিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের নিয়ে সরকারি উদ্যোগগুলো যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে প্রচার ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এছাড়া ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ নীতিমালা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। কতজন প্রত্যাগত হয়েছেন, এর তালিকা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন, তাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। বিশেষ করে যারা বিধবা ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, তাদের কীভাবে স্বাবলম্বী করা যায় এবং এজন্য ডিসেম্বরের মধ্যেই ভালো কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

সূত্র: আমার দেশ