২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে বৈশ্বিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়: গুতেরেস

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে বৈশ্বিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়: গুতেরেস

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট এখন আরও গভীর ও জটিল রূপ নিয়েছে। শুধু সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে এসব সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সংকট মোকাবিলায় পুনর্গঠিত ও সর্বজনীন জাতিসংঘের অধীনে নতুন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রয়োজন।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে এসব কথা বলেন আন্তোনিও গুতেরেস। প্রায় ১০ বছর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন শেষে দেওয়া ভাষণে তিনি যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

৭৭ বছর বয়সী পর্তুগিজ এই কূটনীতিক বলেন, তাঁর দায়িত্বকালে বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং দীর্ঘায়িত হয়েছে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা হয়েছে।

গুতেরেস বলেন, ভূরাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কমেছে। জলবায়ু সংকট এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সতর্কবার্তা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের বিষয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

গাজা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, মহাসচিব হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন পরিস্থিতি আগে দেখেননি।

তাঁর ভাষণে ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ত্রাণ সরবরাহের পথ উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেন গুতেরেস। তাঁর ভাষায়, সেখানে সহিংসতা, উচ্ছেদ ও ইহুদি বসতি স্থাপনের কার্যক্রম শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং জাতিগত নিধনের আশঙ্কা তৈরি করছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার কিছু অঞ্চলে বাড়িঘর, বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার ঘটনাও ঘটছে, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে।

গুতেরেস বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, পরাশক্তিগুলোর নিজেদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা যায় না, অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় না এবং প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়েও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে বিভাজন এবং আধিপত্যবাদী প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হলেও শাসনব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।

গুতেরেস বলেন, রাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষমতার একটি অংশ গুটিকয়েক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ধনকুবেরের হাতে চলে গেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে মানুষ ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে এবং স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ব কি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও কমে যাওয়া সহযোগিতার কারণে আরও বিভক্ত হবে, নাকি জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে এগোবে।

গুতেরেস বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পরিচালিত হবে, নাকি আইনের বাইরে। দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক সনদ রক্ষা এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে অন্যায্য বলেও মন্তব্য করেন গুতেরেস। তহবিল সংকট ও নানা সমালোচনা সত্ত্বেও জাতিসংঘই এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে শক্তিশালী পক্ষগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাতিসংঘে নারী-পুরুষের সমতা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রধান কার্যালয় ও পেশাদার পদগুলোতে নারী ও পুরুষের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সমতা কোনো স্বপ্ন নয়; এটি একটি সিদ্ধান্ত। জাতিসংঘ পরিবর্তিত হতে পারলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পার্লামেন্ট, সরকার ও শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

জাতিসংঘে ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য আচরণ

প্রকাশ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
জাতিসংঘে ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য আচরণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে সিএনএনের সাংবাদিক কেইটলান কলিন্সকে দেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আপনার এখানে থাকা উচিত নয়।’ মঙ্গলবার জাতিসংঘে প্রবেশের সময় কলিন্সকে উদ্দেশ করে এ মন্তব্য করেন তিনি। হোয়াইট হাউস থেকে সম্প্রতি সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ট্রাম্পের এই মন্তব্য সামনে এলো।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগে জাতিসংঘ প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় সিএনএনের সাংবাদিক কেইটলান কলিন্সের সঙ্গে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় সিএনএন সেখানে তাঁর সংবাদ সংগ্রহ করতে আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি অবাক হচ্ছি যে সিএনএন এখানে আমার সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেছে। আপনাদের এখানে আমার সংবাদ সংগ্রহ করার কথা না। আপনারাই তো বলেছিলেন যে আমার সংবাদ সংগ্রহ করবেন না।’

তবে সম্প্রচারে ফিরে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করেন কেইটলান কলিন্স। তিনি জানান, সিএনএন প্রতিদিনই প্রেসিডেন্টের সংবাদ সংগ্রহের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

সম্প্রতি হোয়াইট হাউস থেকে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে এসব গণমাধ্যমের কর্মীরা কার্যত হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে পারছেন না।

তবে হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে সিএনএনকে নিষিদ্ধ করে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও জাতিসংঘে নিয়মিত স্বীকৃত গণমাধ্যম হিসেবে তাদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে।

এদিকে হোয়াইট হাউসের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাকে অসাংবিধানিক উল্লেখ করে সোমবার আদালতে যৌথ মামলা করেছে তিনটি সংবাদমাধ্যম। আগামী বুধবার বিকেলে এ মামলার শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

ট্রাম্প অবশ্য তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। নেতিবাচক সংবাদ প্রচারকে তিনি ‘দেশের জন্য বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। আদালত হোয়াইট হাউসের বিপক্ষে রায় দিলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে আবারও প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন জেলা বিচারক টিমোথি কেলিকে ‘অপেক্ষাকৃত কম নিরপেক্ষ’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সুতরাং আপনি কখনোই বলতে পারবেন না (ভুয়া তথ্য)। আমি মনে করি ভুয়া খবর মুছে ফেলার অধিকার আমাদের আছে।’

হোয়াইট হাউসের এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোও সংহতি প্রকাশ করেছে। সিএনএনের পরিবর্তে অন্য কোনো নেটওয়ার্ককে দায়িত্ব না দিয়ে সব ধরনের ‘পুল’ সংবাদ সংগ্রহ স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে অন্যান্য নেটওয়ার্কগুলো।

এর পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ কয়েকটি সংবাদ সংস্থা প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি প্রকাশ না করার বিষয়ে সম্মিলিতভাবে একমত হয়েছে।

সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির ব্লেয়ার সেন্টার ফর টেলিভিশন অ্যান্ড পপুলার কালচারের পরিচালক রবার্ট থম্পসন মনে করেন, সবসময় প্রচারের আলোয় থাকতে পছন্দ করা প্রেসিডেন্টের জন্য সংবাদ সংগ্রহবিহীন এই পরিস্থিতি ক্ষতিকর হতে পারে। সে কারণে নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তবে সংবাদমাধ্যমের মৌলিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রেসিডেন্টের এ ধরনের মন্তব্যকে অত্যন্ত গুরুতর ও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন এই বিশ্লেষক।

নেতানিয়াহুর ভাষনের আগে নিউইয়র্কে তীব্র বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
নেতানিয়াহুর ভাষনের আগে নিউইয়র্কে তীব্র বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের আগে নিউইয়র্কে তীব্র বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভ চলাকালে নিউইয়র্কের বাসিন্দা ডেভিড ফেল্ডম্যান নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘নেতানিয়াহু কোনোভাবেই বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের বা ইহুদি ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন না।’

এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফেল্ডম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক অপকর্মের বৈধতা দিতে নেতানিয়াহু ধর্মকে অপব্যবহার করছেন। এটি পুরো ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং পবিত্র তোরাহ ও ইহুদি ধর্মের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

ফেল্ডম্যানের মতে, এই বিক্ষোভের মূল উদ্দেশ্য ছিল চলমান সংঘাতে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সরব হওয়া এবং বিশ্ববাসীর কাছে আসল সত্যটা তুলে ধরা।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনস্থলের বাইরে ইসরায়েলপন্থী ও ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় পাল্টাপাল্টি স্লোগানও দেওয়া হয়। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের অধিবেশনে বিশ্বনেতারা যখন নানা বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করছেন, তখনই অধিবেশনস্থলের ঠিক বাইরে নেতানিয়াহুর উপস্থিতির বিরুদ্ধে এই ইহুদি বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

নেতানিয়াহুর ভাষণকে ঘিরে জাতিসংঘের ভেতরের ওয়াকআউট ও বাইরের বিক্ষোভ গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তীব্র মতবিরোধকে আবারও সামনে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকি, জাতিসংঘে আসলে কী হয়েছিলো?

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকি, জাতিসংঘে আসলে কী হয়েছিলো?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হলেও তা স্বস্তির বদলে তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা। একদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।ফলে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথটি একই সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার চাপের মধ্যেও এগোচ্ছে।

২৩ সেপ্টেম্বর ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তার জবাব আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে তেহরানের কয়েকটি শর্ত রয়েছে।

এর আগের দিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, শান্তি চুক্তি না হলে তিনি ইসলামিক রিপাবলিককে ‘অ্যানিহিলেট’ বা ধ্বংস করে দিতে পারেন। একই ভাষণে তিনি অবশ্য একটি চুক্তির সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও নৌপথটি যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল পুনঃস্থাপন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে তেহরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে নিতে হবে। এরপরই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, আগের ধরনের কূটনৈতিক কাঠামোয় ইরান আর ফিরবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং এরপরই হরমুজ খোলা ও আলোচনা নিয়ে অগ্রগতি সম্ভব।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন সামরিক অভিযান থামানো, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের অবসান এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে যোগাযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা করেন। উইটকফ পরে জানান, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে দীর্ঘ আলোচনা চালিয়েছেন এবং আলোচনার একটি পর্ব শেষ হয়েছে।

তবে ইরানের বক্তব্যে বিষয়টিকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। তেহরান বলেছে, কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে এবং মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার অস্তিত্ব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে অস্বীকার নেই, কিন্তু সেটি সরাসরি বৈঠক নাকি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ—তা নিয়ে বয়ানে পার্থক্য রয়েছে।

নিউইয়র্কের যোগাযোগ ইরানের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন পক্ষের অনুরোধে আরাগচি উইটকফের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে ইরানের শর্ত তুলে ধরেন।

কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম এই ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছে। তাসনিম নিউজ আরাগচির ব্যাখ্যাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে প্রশ্ন তুলেছে—মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যদি ইরানের শর্ত আগেই জানানো হয়ে থাকে, তাহলে সরাসরি বৈঠকের প্রয়োজন কেন হলো?

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাইও আরাগচির কাছে জানতে চেয়েছেন, তিনি কী ধরনের অনুমোদন নিয়ে এ যোগাযোগ করেছেন।

অন্যদিকে পার্লামেন্ট সদস্য মোজতবা জারেই আরাগচির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, তাঁর পর্যালোচনা অনুযায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ যোগাযোগের অনুমোদন ছিল। তিনি একই সঙ্গে দাবি করেছেন, কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি; বরং ইরানের সাতটি শর্ত মার্কিন প্রতিনিধির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, কূটনৈতিক উদ্যোগটি শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মতপার্থক্যের মধ্যেই আটকে নেই; ইরানের অভ্যন্তরেও আলোচনার ধরন ও সীমা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘের ভাষণেও এই দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য শোনার পর তিনি নিজের প্রস্তুত করা ভাষণ পরিবর্তন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং যুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধের কথা তুলে ধরেন।

তবে একই সঙ্গে তিনি শান্তির জন্য আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান আলোচনায় যেতে পারে, কিন্তু চাপ বা জবরদস্তির ভাষার ভিত্তিতে নয়।

এটি ইরানের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তেহরান একদিকে সামরিক প্রতিরোধের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার সম্ভাবনাও ধরে রাখছে। ওয়াশিংটনের অবস্থানও পুরোপুরি একমাত্রিক নয়।

জাতিসংঘে ট্রাম্প ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করলেও একই সময়ে তিনি একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কে আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরও তিনি ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

তবে ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হুমকিও দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান কোলাং ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কার্যক্রম চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে হামলা চালাতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ ও খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার জানায়, নতুন হামলা হলে ইরান আরও শক্তিশালী ও অনির্দেশ্য পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত।

ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি ধারা দেখা যাচ্ছে—আলোচনার দরজা খোলা রাখা এবং সামরিক বিকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দুই পক্ষের শর্তগুলো কি এমন কোনো জায়গায় এসে মিলতে পারে, যেখানে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি হবে?

ইরান চাইছে যুদ্ধ বন্ধ, সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধের অবসান এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করার মতো বিষয়গুলোকে আলোচনার ভিত্তি করতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে নিরাপত্তাগত নিশ্চয়তা চায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির প্রশ্ন। তেহরান এটিকে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে। ওয়াশিংটনের জন্য আবার হরমুজের অবাধ চলাচল শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

আরেকটি সমস্যা হলো—কে ইরানের হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। নিউইয়র্কে আরাগচির যোগাযোগ নিয়ে তেহরানের ভেতরে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তা দেখাচ্ছে যে আলোচনার কূটনৈতিক অংশের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে সরলভাবে ‘শান্তির আলোচনা’ কিংবা ‘নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি’—কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। বরং ওয়াশিংটন ও তেহরান একই সময়ে দুটি পথ অনুসরণ করছে।

একদিকে নিউইয়র্কে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে, ইরানের শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং মার্কিন প্রশাসনও সম্ভাব্য সমঝোতার কথা বলছে। অন্যদিকে দুই দেশের নেতারা প্রকাশ্যে সামরিক হুমকি দিচ্ছেন এবং নতুন হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

এ অবস্থায় কূটনীতির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু আলোচনার টেবিলে কী বলা হচ্ছে তার ওপর নয়; বরং দুই পক্ষ কতটা সামরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে পারে এবং হরমুজসহ যুদ্ধ-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে—তার ওপর।

অর্থাৎ, নিউইয়র্কে আলোচনার দরজা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে শান্তির পথে হাঁটার আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে এখনো অনেক কঠিন রাজনৈতিক ও সামরিক বাধা অতিক্রম করতে হবে।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন ভিসা বিধিনিষেধ নীতি

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন ভিসা বিধিনিষেধ নীতি

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন ভিসা বিধিনিষেধ নীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা বিদেশিদের দেশটির ভিসা নীতির অপব্যবহার করতে দেবে না। একই সঙ্গে বার্থ ট্যুরিজম বা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত বা এতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে একটি নতুন ভিসা বিধিনিষেধ নীতি ঘোষণা করেছে দেশটি।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, বিদেশি বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজম নেটওয়ার্কগুলো মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বিক্রি করতে দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে।

এই নেটওয়ার্কগুলো বিজ্ঞাপন দেয় এবং বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার আবেদনে মিথ্যা বলতে উদ্বুদ্ধ বা পরামর্শ দেয়। কেবল মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থার বিনিময়ে তারা ১০ হাজার ডলার সংগ্রহ করে।

রুবিও বলেন, ‘আজ আমি অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের ২১২(এ)(৩)(সি) ধারার অধীনে একটি নতুন ভিসা বিধিনিষেধ নীতি ঘোষণা করছি।’

এই নীতি এমন ব্যক্তিদের প্রতি লক্ষ্য রেখে তৈরি করা হয়েছে, যাঁরা জেনেশুনে যুক্তরাষ্ট্রে বার্থ ট্যুরিজমে লিপ্ত হন, আগে লিপ্ত হয়েছেন অথবা এতে সহায়তা করেন। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজম সুবিধা প্রদানকারী নেটওয়ার্কের মালিক, পরিচালনাকারী ও ম্যানেজাররা; ভিসা ফিক্সার বা দালাল, যারা আবেদনকারীদের জালিয়াতি করার কৌশল শেখায়; বিদেশি চিকিৎসা প্রদানকারী যারা জেনেশুনে এ ধরনের ভ্রমণ এবং আমাদের মেডিকেড ব্যবস্থার জালিয়াতিমূলক ব্যবহারে মদদ ও সহায়তা দেয়; এবং অন্যান্য ব্যক্তিরা যারা বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজমকে সমর্থন, মদদ ও সক্ষম করে তোলে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মার্কিন নাগরিকত্বের মর্যাদা রক্ষা, মার্কিন জনকল্যাণ সুবিধা ও করদাতাদের শোষণ থেকে রক্ষা এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসন আমাদের হাতে থাকা প্রতিটি হাতিয়ার ব্যবহার করছে।’

রুবিও বলেন, যারা এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত এবং তা থেকে মুনাফা অর্জন করে—উভয় পক্ষের জন্যই ভিসা ইস্যু সীমিত করার মাধ্যমে তারা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন।

এই ভিসা বিধিনিষেধ নীতিটি অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের ২১২(এ)(৩)(সি) ধারা অনুযায়ী কার্যকর করা হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের সদস্যরাও এই বিধিনিষেধের আওতায় আসতে পারেন।

ভেনেজুয়েলায় স্বল্পমেয়াদি কাজের সুযোগ, চালু হলো নতুন ই-ভিসা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
ভেনেজুয়েলায় স্বল্পমেয়াদি কাজের সুযোগ, চালু হলো নতুন ই-ভিসা

স্বল্পমেয়াদি বিশেষায়িত কাজের জন্য বিদেশি পেশাজীবীদের নতুন ইলেকট্রনিক প্রো-ভি-৯০ মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা চালু করেছে ভেনেজুয়েলা। বৈশ্বিক অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্র্যাগোমেনের এক ইমিগ্রেশন অ্যালার্ট অনুযায়ী, নতুন এই ভিসার মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকরা সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় অবস্থান করতে পারবেন।

এই ভিসা মূলত এমন পেশাজীবীদের জন্য, যারা স্বাধীনভাবে কাজ করেন অথবা ভেনেজুয়েলার বাইরের কোনও প্রতিষ্ঠানের হয়ে দেশটিতে গিয়ে স্থানীয় ক্লায়েন্টদের হয়ে স্বল্পমেয়াদি বিশেষায়িত সেবা দেন। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলার কোনও প্রতিষ্ঠানে সরাসরি চাকরিতে যোগ না দিয়েও নির্দিষ্ট পেশাগত কাজের জন্য দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ থাকছে।

বাংলাদেশি পেশাজীবী, পরামর্শক এবং দেশের কোনও প্রতিষ্ঠানের হয়ে সাময়িক কাজের জন্য ভেনেজুয়েলা যেতে হয়, এমন কর্মীদের জন্যও নতুন এই ভিসা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বিশেষ করে যাদের স্বল্পমেয়াদি পেশাগত কাজের জন্য দেশটিতে যেতে হয়, কিন্তু সেখানে কোনও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে চাকরি করার প্রয়োজন নেই, তারা এই ভিসার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

প্রো-ভি-৯০ ভিসা কী?

প্রো-ভি-৯০ ভিসা এমন বিদেশি নাগরিকদের জন্য, যারা ভেনেজুয়েলায় নির্দিষ্ট ধরনের পেশাগত কাজে অংশ নেবেন, কিন্তু দেশটির কোনও প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরি করবেন না।

এই ভিসার আওতায় প্রযুক্তিগত সহায়তা, পরিচালনাগত সহায়তা, বক্তব্য বা বক্তৃতা প্রদান, সাংবাদিকতা এবং বিনিয়োগ তদারকিসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত পেশাগত কাজ করা যেতে পারে।

উদাহরণ হিসাবে, বাংলাদেশে কোনও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন পেশাজীবী ভেনেজুয়েলার কোনও ক্লায়েন্টকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশটিতে যেতে পারেন। তবে এ ধরনের সফর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা প্রো-ভি-৯০ ভিসার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।

এই ভিসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, যে বিদেশি পেশাজীবীকে ভেনেজুয়েলার কোনও প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, তার সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো আনুষ্ঠানিক চাকরির সম্পর্ক থাকা যাবে না। একইভাবে, ভেনেজুয়েলার আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ওই পেশাজীবীকে চাকরিসংক্রান্ত কোনও বেতন, পারিশ্রমিক বা অন্যান্য কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থ দিতে পারবে না। অর্থাৎ, কাজের সম্পর্ক ও পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে তা ভেনেজুয়েলার প্রতিষ্ঠানে সরাসরি চাকরির আওতায় না পড়ে।

বাংলাদেশিদের জন্য যা জানা জরুরি

বাংলাদেশি পেশাজীবীদের মধ্যে যারা দেশের কোনও প্রতিষ্ঠানের হয়ে স্বল্পমেয়াদি কাজের জন্য ভেনেজুয়েলা যেতে চান, তাদের জন্য প্রো-ভি-৯০ ভিসা একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। স্বাধীনভাবে বিশেষায়িত পেশাগত সেবা দেওয়া ব্যক্তিরাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এই ভিসার জন্য বিবেচিত হতে পারেন।

তবে নতুন এই ভিসা ভেনেজুয়েলার অন্যান্য কর্মসংস্থান বা কাজের ভিসার স্বয়ংক্রিয় বিকল্প নয়। তাই বাংলাদেশি কোনও পেশাজীবী ভেনেজুয়েলায় যাওয়ার আগে তিনি কী ধরনের কাজ করবেন, কার হয়ে কাজ করবেন এবং তার পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা কীভাবে হবে এসব বিষয়ের সঙ্গে ভিসার শর্ত মিলিয়ে দেখা জরুরি।

প্রো-ভি-৯০ ভিসার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় থাকা যাবে। নির্ধারিত ৯০ দিনের মেয়াদ শেষ হলে বিদেশি নাগরিককে দেশ ছাড়তে হবে। পরবর্তী সময়ে আবার ভেনেজুয়েলায় যেতে হলে নতুন করে ভিসার আবেদন করতে হবে।

অনলাইনে করা যাবে আবেদন

প্রো-ভি-৯০ ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে করা যায়। আবেদনকারীরা ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন।

ফ্র্যাগোমেনের তথ্য অনুযায়ী, আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাধারণত দুই থেকে ১০ কর্মদিবস সময় লাগতে পারে। ভিসার আবেদন অনুমোদিত হলে আবেদনকারীর ই-মেইলে অনুমোদনপত্র পাঠানো হবে। এজন্য ভেনেজুয়েলার কোনও কনস্যুলেটে গিয়ে পাসপোর্টে শারীরিক ভিসা স্ট্যাম্প সংগ্রহের প্রয়োজন নেই। ই-মেইলে পাওয়া অনুমোদনপত্র আবেদনকারী প্রিন্ট করে ব্যবহার করতে পারবেন।

যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে

প্রো-ভি-৯০ ভিসার জন্য আবেদনকারীদের বেশ কিছু নথি জমা দিতে হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে ছয় মাস মেয়াদি পাসপোর্ট, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণপত্র।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আবেদন বা অনুরোধপত্র এবং কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটও জমা দিতে হতে পারে।

তবে আবেদনকারীর পেশা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বাংলাদেশ থেকে আবেদন করার আগে ভেনেজুয়েলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি। প্রো-ভি-৯০ ভিসার নির্দিষ্ট নথির তালিকা ও আবেদন প্রক্রিয়া সরকারি নির্দেশিকায় দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য তাই ভিসার আবেদন করার আগে ভ্রমণের উদ্দেশ্য, ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য কাজ, আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা—সবকিছু নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভুল ভিসা শ্রেণিতে আবেদন করার ঝুঁকি কমবে এবং ভ্রমণের প্রস্তুতিও সহজ হবে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন