ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে অন্তত সাত হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার মানিক সরকার — শনিবারের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে সকাল থেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে পৌঁছনো মাত্রই আটক করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বকে। আটক হয়েছেন বামপন্থী ছাত্র নেত্রী নেহা বোরাও।
বিকেল চারটে নাগাদ জানা যায়, মমতা ব্যানার্জীসহ তার দলীয় সতীর্থদের হরিয়ানার কাছে উত্তর দ্বারকা থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। এর কিছুক্ষণ আগে, বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ পুলিশের হাতে আটক হন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
এদিকে গত রাত থেকে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শিখ গুরুদোয়ারা বাংলা সাহিবে আশ্রয় নিয়েছিলেন যে কয়েকশ বিক্ষোভকারী, তারা যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে গেলে সেখানে লাঠিচার্জ করা হয় বলে জানা যাচ্ছে।
এর আগে, সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসকে নাটকীয়ভাবে বিমান থেকেই আটক করেছে পুলিশ। পরিচিত ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে তার বাড়ি থেকেই আটক করে পুলিশ।
সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে; পরে আদালতের হস্তক্ষেপে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিক্ষোভের ঘোষিত এলাকা হিসাবে যন্তর মন্তরকে একরকম দুর্গ বানিয়ে ফেলা হলেও দুপুরে হঠাৎই বামপন্থী ছাত্র-নেত্রী নেহা বোরা রাজধানীর কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। সেখানে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদেরও আটক করা হয়েছে।

অবরুদ্ধ দিল্লিতে এবার বড় বিক্ষোভের ডাক ইন্ডিয়া জোটের
মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় এবার দিল্লিতে বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। শনিবার আলপ্পুঝায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল এ কথা জানান।
তিনি বলেন, সংবিধান ও জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষার চলমান লড়াইয়ের অংশ হিসেবে আগামী সোমবার রাজধানী দিল্লিতে এক বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। এই ইস্যুতে ইতোমধ্যে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানাতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। পাশাপাশি, আগামী সোমবার ভারতের প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও তাদের দেখা করার কথা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সুরক্ষা দেওয়ার অপচেষ্টার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর তীব্র সমালোচনা করেন বেণুগোপাল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন কমিশনারকে আড়াল করার এই প্রক্রিয়াই মোদি ও শাহের পতনের কারণ হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তিনি পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। বিরোধীদের আন্দোলনকে তিনি ভয় পাচ্ছেন। ককরোচ জনতা পার্টির ঘোষিত শনিবারের বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে রীতিমতো লকডাউন জারি করেছে সরকার। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মেট্রো স্টেশন ও সারা দেশের সঙ্গে দিল্লির রেল যোগাযোগ। মাঠে নামানো হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৪১ হাজার সশস্ত্র সদস্য।
একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়া জোট লড়াই চালিয়ে যাবে বলে জানান এই নেতা। কেরালার ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে দলের সতর্ক নজরদারির কথা উল্লেখ করেন কে সি বেণুগোপাল।

কাশ্মীরেও বিক্ষোভ শুরু
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের আঞ্চলিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। ভোটার তালিকায় জালিয়াতির অভিযোগ তুলে শনিবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ডাকে কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় এই বিক্ষোভ হয়।
এদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, ইন্টারনেট বন্ধ ও যাতায়াতে বিধিনিষেধের ঘটনাকে ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পরের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি।
শ্রীনগরে কংগ্রেসের কার্যালয়ে এনসি ও পিডিপির কয়েক ডজন নেতা-কর্মী সমবেত হন। তাদের মধ্যে নারীরাও ছিলেন। দলীয় পতাকা হাতে তারা লাল চকের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী তাতে বাধা দেয়।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ছবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল। তারা ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে সিইসির পদত্যাগ দাবি করেন।
কাশ্মীরের মধ্যাঞ্চলের গান্দেরবাল ও দক্ষিণাঞ্চলের অনন্তনাগেও ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলো যৌথ বিক্ষোভ করে।
গান্দেরবালে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গিয়াস আহমদ বলেন, ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি ও সিপিআই(এম)-এর কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে প্রতিবাদ করছেন। তাদের দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের কার্যক্রম তদন্ত করা হোক এবং তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।
দিল্লিতে ধরপাকড় হিটলারের আমলকেও ছাড়িয়ে গেছে: তৃণমূল নেতা
ভারতের দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড়ের ঘটনায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, দিল্লিতে পুলিশের দমন-পীড়ন হিটলারের শাসনামলকেও ছাড়িয়ে গেছে।
অভিষেক বলেন, দিল্লিতে বিজেপি সরকার ও পুলিশ প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দলীয় কর্মী-সমর্থক, কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সাধারণ মানুষ এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীরাও রয়েছেন।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ভোট চুরির প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও পাঁচ সংসদ সদস্য বাসস্ট্যান্ডে বসে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছিলেন। কিন্তু তাদের সেই প্রতিবাদও করতে দেওয়া হয়নি।
অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, সরকার যদি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদকে এত ভয় পাচ্ছে কেন?

সিজেপির বিক্ষোভে সংহতি জানাতে গিয়ে আটক অভিনেতা ইমরান খান
ভারতের মুম্বাইয়ে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে আটক হয়েছেন অভিনেতা ইমরান খান। শনিবার মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দান থেকে তাকে আটক করে পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সিজেপির বিক্ষোভের সমর্থনে আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে জড়ো হওয়ার কথা ছিল। তবে সেখানে বিক্ষোভের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে মুম্বাই পুলিশ।
আটক হওয়ার পর নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পুলিশের ভ্যানের ভেতর থেকে একটি সেলফি প্রকাশ করেন ইমরান। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, আমাকে গাড়িতে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভের জন্য তাদের কাছে কোনো অনুমতি চাওয়া হয়নি। বোম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, আজাদ ময়দান ছাড়া অন্য কোথাও বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানায় তারা। তবে সিজেপির কর্মীদের দাবি, অনুমতি চেয়ে তারা ইমেইল করলেও পুলিশের কাছ থেকে কোনো জবাব পাননি।

৩ হাজার আটক বিক্ষোভকারীর সবাই মুক্তি পেলেও দীপকে ও ধ্রুব রাঠিসহ ৪ জন কারাবন্দি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের রাজনৈতিক দল ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ডাকা মহাসমাবেশ ঠেকাতে রাজধানী দিল্লি জুড়ে ব্যাপক দমনপীড়ন ও গণগ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। শনিবারের এই অভিযানে আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেরালার পিনারাই বিজয়নসহ অন্তত ৩ হাজার বিক্ষোভকারী ও বিরোধী নেতাকে আটক করে পুলিশ। দিন শেষে নারী ও প্রবীণদের প্রথমে মুক্তি দেওয়া হলেও সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ চার জন এখনও আটক রয়েছেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের অন্য দুই নেতা আশুতোশ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে দিল্লিতে অবতরণ করার সাথে সাথেই বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। এর মধ্যেই মহারাষ্ট্রে অভিজিতের ঠাকুমা মারা গেলেও তাকে শেষকৃত্যে যোগদানের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। এছাড়া জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও গুরুগ্রাম থেকে আটক করা হয়েছিল।

রোববার ফের যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ঘোষণা ককরোচ পার্টির
ভারতের মোদি সরকারের চাপ ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নেতা অজিঙ্ক শিন্ডে জানিয়েছেন, দাবি আদায়ের লক্ষে আগামীকাল রোববার আবারো দিল্লির যন্তরমন্তরের উদ্দেশে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাবেন তারা।
সিজেপির ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক পোস্টে অজিঙ্ক শিন্ডে দাবি করেন, বর্তমান সরকার বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে আতঙ্কিত। বিরোধীরা একজোট হয়ে আবারো প্রতিরোধ গড়ে তুললে সরকারের ক্ষমতার ভিত কেঁপে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মোদি-শাহদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে: রাহুল গান্ধী
ভারতের তরুণদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বলেছেন, আমরা নিশ্চিত করব যেন এই সরকার এবং যারা সংবিধানের ওপর আঘাত হেনেছে, তারা যেন পরাজিত হয়।
শনিবার চেন্নাইয়ে ‘ছাত্রন কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ আহ্বান জানান রাহুল। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মূল বৈশিষ্ট্য ‘কাপুরুষতা’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাহুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, আরএসএসপ্রধান মোহন ভাগবত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল বলেন, ‘এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি নরেন্দ্র মোদি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। প্রতিপক্ষকে যেভাবে গভীরভাবে চেনা যায়, তাদেরও আমি সেভাবেই চিনি—ভেতর-বাহির সবকিছু, নিজের হাতের তালুর মতো।’
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আন্দোলন চালিয়ে যান।’ সংবিধানের ওপর আঘাত হেনেছে এমন শক্তিকে পরাজিত করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন কংগ্রেস নেতা।