তদন্তের অংশ হিসেবে শেখ আব্দুল হান্নানের কাতার, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে থাকা সম্পদের তথ্য চেয়ে ২০২৬ সালের ২৩ মে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এবং ২১ জুন বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি শাখার সহকারী মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি পাঠায় দুদক।
দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আব্দুল হান্নানকে কাতারে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। গত ১৫ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ইন্টারপোল ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) জানায়।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান কমিশনের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, 'শেখ আব্দুল হান্নানের গ্রেপ্তারের খবর দুদক গতকাল অনানুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে। পরে বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত হয় কমিশন।'
এদিকে, সাবেক বিমান বাহিনী প্রধানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কমিশন।
দুদক সচিব বলেন, 'আমাদের কাছে ইতোমধ্যে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলো সরবরাহে আমরা প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিয়েছি। এসব তথ্যের মাধ্যমে আমরা বিশ্বাস করি, আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারব এবং আইনের আওতায় আনতে পারব।'
দুদকের মামলার তথ্য অনুযায়ী, শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৪ কোটি ৮ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৫ টাকার অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতিসাধন, ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক তিন সদস্যের একটি দল গঠন করে।
অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই কমিশনের ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসানকে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
তদন্তের অংশ হিসেবে শেখ আব্দুল হান্নানের কাতার, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে থাকা সম্পদের তথ্য চেয়ে ২০২৬ সালের ২৩ মে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এবং ২১ জুন বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি শাখার সহকারী মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি পাঠায় দুদক।
কমিশনের অনুসন্ধানে কানাডা ও দুবাইয়ে তার সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তার সন্তানদের নামেও তিনটি দেশে সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে মামলার তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, দুদকের আবেদনের পর আদালতের আদেশে শেখ আব্দুল হান্নান ও তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এসব সম্পদের দেখভালের জন্য রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে। তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারির উদ্যোগও নিয়েছে কমিশন।
তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর সহায়তায় তিনি ১.৯১ কোটি টাকার বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তার নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে ১.১৮ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে কমিশন।
চলতি বছরের মার্চে দুদকের পৃথক দুটি আবেদনের পর আদালত শেখ আব্দুল হান্নান ও তাহমিদা বেগমের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ দেন। আয়কর ফাইল খোলার সময় থেকে ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দের আবেদন করেছিল কমিশন।
উল্লেখ্য, শেখ আব্দুল হান্নান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০২১ সালের ১২ জুন তিনি বাহিনীর ১৬তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের ১১ জুন তিনি অবসরে যান।