বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করে কাতারের শীর্ষ ব্যবসায়ী বনে গেছেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আবদুল হান্নান।
একই সঙ্গে সেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিও পেয়েছেন। কানাডা, দুবাই ও কাতারে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মিলেছে।
কাতারে রয়েছে ট্রাভেল চ্যানেল ও ট্যুরস নামে একটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা অভিযোগে সম্প্রতি কাতারে গ্রেপ্তার হয়েছেন বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আবদুল হান্নান। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মার্কিন-ইরান সংঘাত এড়াতে তেহরানে কাতারি প্রতিনিধি দল
গোয়েন্দা সূত্রে সংস্থাটি জানতে পারে, বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করে নিয়ে গিয়ে সেই দেশে বিনিয়োগ করে শীর্ষ ব্যবসায়ীর তালিকায় উঠেছেন শেখ আবদুল হান্নান। গত বছরের ২৭ জুলাই শেখ আবদুল হান্নান ও তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, শেখ আবদুল হান্নান ৩ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৫০৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। তার ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও রয়েছে। তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ব্যাংক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানে আবদুল হান্নানের কাতারের কিছু নথি ও ছবি এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। রেসিডেন্সি পারমিটে ‘ঝযধরশয অনফঁষ ঐধহহধহ’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে তার জন্ম তারিখ ১ জুন ১৯৬৩। সেখানে তার পেশা আরবি ভাষায় ‘মুহান্দিস মাশরু’ লেখা, এর অর্থ প্রকল্প প্রকৌশলী। নিয়োগকর্তা হিসেবে একটি ব্যবসা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কথা রয়েছে। পারমিটটির মেয়াদ ছিল ১৪ জুন ২০২৫ পর্যন্ত। তার পাসপোর্টের মেয়াদ ২০৩৪ সাল পর্যন্ত রয়েছে। আরেকটি ন্যাশনাল অ্যাড্রেস সার্টিফিকেটে একই নাম ও একই আইডি নম্বর দেখা যায়। এটি ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ইস্যু করা হয়েছিল এবং এর মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত। ঠিকানা হিসেবে দোহার আল ফুরুসিয়া এলাকার নাম রয়েছে।
এ ছাড়া দোহায় তার ‘ট্রাভেল চ্যানেল অ্যান্ড টুরস’ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সির ছবিও পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির সামনে ঢাকা-দোহা রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আবদুল হান্নানই বলে জানিয়েছেন দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে অর্জিত সম্পদ থেকে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগটি আইন ও বিধি মোতাবেক তদন্ত করা হচ্ছে। কাতারের সম্পদ বা ব্যবসার উৎসও খোঁজা হচ্ছে।
দুদকের অনুসন্ধানে শেখ আবদুল হান্নানের স্ত্রী তাহমিদার নামে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩৪ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া গেছে ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ৭১৭ টাকার। তার নামে থাকা ৩২টি ব্যাংক হিসাবে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ১৯ হাজার ৯২৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও পাওয়া যায়।
এ ছাড়া আদালতের আদেশে শেখ আবদুল হান্নান, তার স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা মোট ৩৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। এসব হিসাবের মধ্যে আবদুল হান্নানের পাঁচটি, ছেলে শেখ লাবিব হান্নানের নামে একটি এবং স্ত্রী তাহমিদা বেগমের নামে ৩২টি হিসাব রয়েছে। ওই সময় এসব হিসাবে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৩২২ টাকা ছিল। দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা জানান, তাহমিদার কানাডার ভিজিটর (ই-১) ভিসার তথ্য পাওয়া গেছে।
ভিসাটি ২০২২ সালে সিঙ্গাপুরে ইস্যু করা হয়েছিল এবং এর মেয়াদ ছিল ২০২৫ সাল পর্যন্ত। শেখ আবদুল হান্নান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কানাডা, দুবাই ও কাতারে সম্পদ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশে থাকা অন্যান্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহে চলতি বছরের ২৩ মে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এবং ২১ জুন পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিদেশে সম্পদ অর্জন এবং দেশে অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে গত বছরের ৫ মে শেখ আবদুল হান্নান ও তার পরিবারের তিন সদস্যের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।
পরদিন ৬ মে তার জমি, ফ্ল্যাট, ভবন ও ব্যাংক হিসাব জব্দ বা অবরুদ্ধ করার বিষয়ে আদেশ দেওয়া হয়। আদালতের আদেশে খিলক্ষেতের একটি ছয় তলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা ৬৯৯ ও ৮২৩ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুর ডিওএইচএসের ২ হাজার ২৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, মিরপুরে একটি আবাসন প্রকল্পে নির্মাণাধীন সাত তলা একটি ভবন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ জমি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়।
দুদক জানায়, গত ১৫ অক্টোবর কাতারে শেখ আবদুল হান্নানের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান জানান, গ্রেপ্তার আবদুল হান্নানকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। জানা যায়, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে কমিশন পাওয়া শেখ আবদুল হান্নান ২০২১ সালের ১২ জুন বিমানবাহিনীর ১৬তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের ১১ জুন তিনি অবসরে যান।