১৪ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরব হুথিদের হামলা ঠেকাতে পারছে না কেন?

প্রকাশ: সোমবার, অক্টোবর ১২, ২০২৬
সৌদি আরব হুথিদের হামলা ঠেকাতে পারছে না কেন?

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে।

ইরান-সমর্থিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সৌদি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও।

গত সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বিমানবন্দরটিতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে হুথিরা। শনিবারের হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। সব ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া সৌদি আরবে ভ্রমণের বিষয়ে নতুন সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য।

চলতি সপ্তাহের শুরুতেও বিমানবন্দরটিতে আরও দুটি হামলার দাবি করেছে হুথিরা। রোববার সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো এড়িয়ে চলতে মানুষকে সতর্ক করেছে গোষ্ঠীটি।

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর অধিকারী। দেশটির রয়েছে একাধিক স্তরের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এরপরও কীভাবে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দেশটির প্রতিরক্ষা ভেদ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

হুথিদের অস্ত্রভান্ডার কতটা শক্তিশালী?

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। তবে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করার পর থেকে সৌদি আরব লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে হুথিরা।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে গোষ্ঠীটির অস্ত্রভান্ডারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছেছে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতাও দেখিয়েছে তারা। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।

হুথিরা বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে। এতে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সব হামলা শনাক্ত করা ও প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল দেখা গেছে। সরকারি বাহিনীর অবস্থানে কয়েক সপ্তাহ ধরে হামলা চালানোর পর গত মাসে দ্রুত অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগর উপকূলের কিছু এলাকা দখল করে তারা।

গোষ্ঠীটির উন্নত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্যালেস্টাইন-২’। দুই ধাপের এই কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। এটি হাইপারসনিক গতিতে চলতে সক্ষম বলেও দাবি রয়েছে।

আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘তুফান’। এটি ইরানের ‘ঘদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তিত সংস্করণ বলে মনে করা হয়। এর পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার।

কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে গুচ্ছবোমা বহনের সক্ষমতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়েমেন থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়।

এ ছাড়া হুথিদের হাতে ‘বুরকান’ ও ‘বাদর’ সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলোও ইরানি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে ধারণা করা হয়। সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবায়েদের মতে, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের বড় অংশই ইরানের অস্ত্রপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এতে চীনা প্রযুক্তিরও কিছু প্রভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, নিজস্ব প্রযুক্তিতে বড় ধরনের উদ্ভাবনের উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হুথিদের ক্ষেত্রে খুব কম। তাদের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা মূলত অপেক্ষাকৃত কম উন্নত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ।

গত মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অভিযোগ করে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুথিদের নতুন ধরনের অস্ত্র—লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঘোরাফেরা করে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র—উন্নয়নে সহায়তা করছে।

কেন সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যর্থ হচ্ছে?

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত সপ্তাহে তাদের বাহিনী বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য উড়ন্ত বস্তু ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাজধানী লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তবে শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানা বস্তুটি প্রতিহত করতে পারেনি তারা।

নওয়াফ ওবায়েদ আল জাজিরাকে বলেন, সৌদি আরবের আয়তন এবং ইয়েমেনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তের কারণে মাঝেমধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে হামলা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তার ভাষায়, একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেও কোনো না কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে। তার মতে, হুথিদের বহু হামলা প্রতিহত করার পরও কিছু হামলা সফল হতে পারে।

নিরাপত্তানীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই বলেন, সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ইরান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করা। তবে হুথিদের হামলা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব ইয়েমেনের দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশের অবস্থান ও ব্যবহার পরিবর্তন করছে বলে তার ধারণা।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মিত্রের কাছে প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থার প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এসব প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল। ফলে মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

গত মাসে হুথিদের হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কয়েকটি বন্ধুদেশের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা চেয়েছিল রিয়াদ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হুথিদেরও রয়েছে সীমাবদ্ধতা

হুথিরা শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করলেও তাদের সামরিক সক্ষমতার ওপর নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাতিসংঘের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে একসঙ্গে লড়াই করার চাপ তাদের জন্য বড় বাধা।

নওয়াফ ওবায়েদের মতে, সামরিক শক্তির দিক থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও হুথিরা মাঝেমধ্যে সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে পারছে।

বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি এবং জি-২০-এর সদস্য হওয়ায় সৌদি আরবের ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব রয়েছে। ফলে দেশটির বিমানবন্দর বা তেল স্থাপনায় হামলার প্রভাব শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

তবে হুথিদের হাতে ঠিক কতটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা জানা যায়নি। একই সময়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা এবং ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ওবায়েদ বলেন, ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান হামলার বড় লক্ষ্য হচ্ছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও ড্রোন তৈরির কারখানা ধ্বংস করা। তাঁর মতে, এসব হামলায় হুথিদের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

পুস্তাইয়ের ধারণা, হুথিদের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্ভবত সীমিত হয়ে এসেছে। এ কারণে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলার মতো বড় আকারের হামলা চালানো তাদের পক্ষে কঠিন হতে পারে।

এর পরিবর্তে তারা কম সুরক্ষিত বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একটি বা অল্প কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত করে বড় ধরনের কৌশলগত প্রভাব তৈরির চেষ্টা করতে পারে তারা।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা দেশটির নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তবে মাঝেমধ্যে কিছু হামলা সফল হওয়া মানেই সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘ সীমান্ত, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার এবং প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

প্রবাসী বাবার দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন ফয়সাল, সড়কেই ঝরলো প্রাণ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
প্রবাসী বাবার দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন ফয়সাল, সড়কেই ঝরলো প্রাণ

প্রবাসে কাজ না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বাড়িতে টাকা পারছেন না প্রবাসী বাবা। তাই চারজনের ছোট্ট সংসারটির দায়িত্ব এসে পড়ে ১৮ বছরের তরুণ মো. ফয়সালের কাঁধে। কিন্তু হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় সড়কের ঝরে গেল সেই ফয়সালের প্রাণ।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। প্রবাসী বাবার সংসারের হাল ধরা ফয়সালের মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ছগুড়া-হাতিমারা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত ফয়সাল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা গ্রামের জমশের বাড়ির প্রবাসী খোরশেদ আলমের বড় ছেলে। তিনি দেবিদ্বার জেলা পরিষদ মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন।

নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন ১৮ বছরের তরুণ। কিন্তু আর ফেরা হলো না ১৮ বছর বয়সী তরুণ মো. ফয়সালের। কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দেবিদ্বারগামী একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে কুমিল্লাগামী মর্ডান পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলচালক ফয়সাল ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন ফয়সাল। তার বাবা খোরশেদ আলম প্রবাসে থাকলেও কাজ না থাকায় নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারতেন না। ফলে অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল ফয়সালকে। কাপড়ের দোকানে কাজ করে পরিবারের খরচ চালাতে সহযোগিতা করতেন তিনি।

ফয়সালের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যে তরুণের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল পরিবার, তার চলে যাওয়া শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ঘটনার পর ফয়সালের বাড়িতে চলছে মাতম। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।

ফয়সালের ছোট ভাই সিয়াম (১৪) জানায়, সকালে খাওয়া-দাওয়া করে বাড়ি থেকে বের হয় তার ভাই। পরে তারা খবর পান, ফয়সাল সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

মিরপুর হাইওয়ে থানার ওসি মো. আনিছুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে আমাদের টিম গিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। ঘাতক বাসটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীর চুল কাটার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীর চুল কাটার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল

পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক গৃহবধূকে আটকে রেখে মারধর, মাথার চুল কেটে দেওয়া এবং গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

ঘটনাটি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বেপারীডাঙ্গী গ্রামের। নির্যাতনের শিকার নারী রিক্তা বেগম (২৮)। তিনি ওই গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী রাজিব বেপারীর স্ত্রী।

রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে পুলিশ।

ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক গৃহবধূকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক তার হাত ধরে রেখেছেন। এ সময় চেক টি-শার্ট পরা আরেক যুবক ধারালো কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল কাটছেন। ওই নারী চিৎকার করে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করলেও চুল কাটা বন্ধ করেননি তারা। ভিডিওর শেষ দিকে ওই নারীর মুখে থাপ্পড় মারতেও দেখা যায়।

অন্যদিকে, ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে রাতে ওই নারী ও এক যুবককে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় ওই নারীকে মারধর করতেও দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন রিক্তা বেগম। ওই রাতেই তার কক্ষে এক যুবককে দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। তারা দুজনকে আটক করেন। এ সময় ওই যুবক পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাকে ধরে রাখেন।

স্থানীয়দের দাবি, এরপর ওই নারী ও যুবককে আটকে রাখা হয়। পরদিন রোববার বিকেলে গৃহবধূর চুল কেটে তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আটক যুবককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও জানান তারা।

স্থানীয় সূত্রে নির্যাতনে জড়িত হিসেবে সুমন হোসেন (২৬) ও জয় হোসেন (২৮) নামে দুই যুবকের নাম এসেছে। সুমন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ বেপারীর নাতি বলে জানা গেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নির্যাতনের শিকার রিক্তা বেগমের বাবার বাড়ি সদরপুর উপজেলার পাশের ভাষাণচর ইউনিয়নের কারীরহাট গ্রামে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আ. জলিল মোল্যা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে নির্যাতনের শিকার নারী ও তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভিডিও দুটি কে বা কারা ধারণ করেছেন এবং কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নির্যাতনের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং এর পেছনে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহ বলেন, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচারের জন্য আইন রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযানে রয়েছেন।

মালদ্বীপে বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু, পলাতক ৩ রুমমেট

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
মালদ্বীপে বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু, পলাতক ৩ রুমমেট

মালদ্বীপে মো. সজীব (২৭) নামের এক বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তার মরদেহ কক্ষ থেকে উদ্ধারের সময় সেখানে থাকা তিন প্রবাসীকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পরিবার।

তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশের কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার এবং অন্যজন নেপালের নাগরিক। তাদের অনুপস্থিতি ঘিরে সজীবের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে স্বজনদের মধ্যে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহত সজীব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া উত্তরপাড়া এলাকার পুরাতন মকিমের বাড়ির আবদুল খালেকের ছেলে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছায়। পরে পরিবারের সদস্যরা মালদ্বীপ থেকে ফোনে তার মৃত্যুর খবর পান বলে জানা গেছে।

সজীবের চাচাতো ভাই মো. সোহেল তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সজীবকে তার কক্ষে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে মালদ্বীপের পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।

পরিবারের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের সময় সজীবের সঙ্গে একই কক্ষে থাকা তিন প্রবাসী সেখানে ছিলেন না। তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় সজীবের মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন স্বজনেরা। তাদের আশঙ্কা, তাকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মালদ্বীপের পুলিশের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ফলে সজীবের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সজীব অবিবাহিত ছিলেন। তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না বলে দাবি স্বজনদের। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় তিন বছর আগে তিনি মালদ্বীপে পাড়ি জমান। সেখানে উপার্জন করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।

সজীবের আকস্মিক মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মহালক্ষ্মীপাড়া উত্তরপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজন ও এলাকাবাসী তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে সজীবের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।

মালয়েশিয়ায় ভিসা কোটা জালিয়াতি চক্র উন্মোচিত: ২৬৫ বাংলাদেশির পাসপোর্টসহ আটক ২০

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
মালয়েশিয়ায় ভিসা কোটা জালিয়াতি চক্র উন্মোচিত: ২৬৫ বাংলাদেশির পাসপোর্টসহ আটক ২০

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। এ ঘটনায় দুই ব্যবসায়ী, ছয় স্থানীয় নারী কর্মী ও ১২ বিদেশি গ্রাহকসহ মোট ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে বাংলাদেশি নাগরিকদের ২৬৫টিসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৩৫২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় সেলাঙ্গর রাজ্যের আমপাংয়ের তামান দাতো আহমাদ রাজালি এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জেআইএম জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ডের সহযোগিতায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। জনসাধারণের দেওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানের ভিত্তিতে অভিযানটি চালানো হয়।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন পুরুষকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছয়জন স্থানীয় নারী কর্মী এবং নয়জন পুরুষ ও তিনজন নারীসহ ১২ বিদেশি গ্রাহককে আটক করা হয়েছে। আটক বিদেশি গ্রাহকদের জাতীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

অভিবাসন বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি ‘মালিক এ থেকে মালিক বি’ পদ্ধতিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার করছিল। এ পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অনুমোদন করিয়ে অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাসের মাধ্যমে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসত। পরে ওই কর্মীদের কোটা অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য সরবরাহ করা হতো।

তদন্তকারীদের ধারণা, এভাবে প্রতিজন বিদেশি কর্মীর কাছ থেকে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত আয় করত চক্রটি। কোটা অনুমোদন পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে অসংগতিপূর্ণ তথ্য জমা দিয়েছিল বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

অভিযানকালে বাংলাদেশি নাগরিকদের ২৬৫টি, ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের ৬৩টি, পাকিস্তানি নাগরিকদের ১২টি এবং ভারতীয় নাগরিকদের ১২টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে জব্দ করা পাসপোর্টের সংখ্যা ৩৫২টি।

এ ছাড়া সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত হিসাবের তুলনায় কম মুনাফা দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসাথে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত আয় ঘোষণা না করার অভিযোগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বোর্ড

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির আইন লঙ্ঘন করে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা অপব্যবহার, অবৈধভাবে কর্মী সরবরাহ এবং এসব কর্মকাণ্ড থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। শুধু আইন লঙ্ঘনকারী বিদেশি কর্মী নয়, বরং এসব কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী, পরিচালনাকারী ও সুবিধাভোগীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রবাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘরে ফিরেও জীবন নিয়ে স্বস্তিতে নেই বিদেশফেরত নারী শ্রমিকরা। শূন্য হাতে দেশে ফেরার পরও তাদের নতুন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর সন্দেহ, কটূক্তি আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের।

ভুক্তভোগী নারী কর্মীরা জানান, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার পর নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আরেকটি বিপর্যয় নেমে আসছে জীবনে। সবাই দূরে থাকে, মিশতে চায় না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরূপ সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন তারা।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু ঠিক কতজন নারী কর্মী বিদেশফেরত হয়েছেনÑএর কোনো তালিকা নেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে।

এদিকে বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ শীর্ষক নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তা নিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, এসব নীতিমালা কেবল কাগজে-কলমে। সরকার থেকে কোনো খোঁজখবর রাখা হয় না।

বিদেশে গিয়ে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন নরসিংদীর রনি বেগম। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে—এমন আশায় কাজের ভিসায় গত জুলাইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ না পাওয়া, নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হন। প্রায় দেড় মাস বন্দি থাকার পর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে।

রনি বেগম বলেন, আমার স্বামী রিকশা চালায়। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ ও স্বামীর কষ্ট দেখে বিদেশ যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসে। ভালো কাজের আশায় ঋণ করে সৌদি আরবে গেলেও তা সুখকর হয়নি। কিন্তু দেশে আসার পর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরা বিদেশযাত্রা ও ফিরে আসার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলে প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা ও মানসিক সমর্থনের বদলে মুখোমুখি অপমান, অবিশ্বাস কিংবা সামাজিক দূরত্বের মুখে পড়তে হচ্ছে।

জানা যায়, ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ নীতিমালায় উল্লেখ আছে, প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের যৌক্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং সুরক্ষিতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিবাসী নারী কর্মীকে বৈষম্যহীন ও সমান সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে আরো বলা হয়, প্রত্যাগত নারী অভিবাসীকর্মীরা অভিবাসনজনিত যেসব সামাজিক সমস্যা, নেতিবাচক ধারণা ও মনোভাবের সম্মুখীন হন তা দূর করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের (বিএমইটি) তথ্যনুযায়ী, ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের ১০ তারিখ পর্যন্ত এক লাখ ৭২ হাজার ২০৮ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে বিদেশ গেছেন ৬১ হাজার ২৫৬ জন নারী শ্রমিক। ২০২৫ সালে গেছেন ৬২ হাজার ৩৫৫ জন ও ২০২৬ সালের অক্টোবর ১০ তারিখ পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৬৯৭ জন বিদেশে পাড়ি জমান।

ওই সময়ে যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে বেশি নারী শ্রমিক গেছেন তার মধ্যে সৌদি আরবের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ আড়াই বছরে সৌদি গেছেন এক লাখ ১৮ হাজার ২৮ জন নারী শ্রমিক, জর্ডান গেছেন ৩৭ হাজার ২৮৭ জন, কাতারে ৫,৮৯৯ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২,৪৮১ জন, লেবানন ১,১৩০ জন ও কুয়েতে গেছেন ১,১৩০ জন নারী শ্রমিক।

কতজন নারী শ্রমিক প্রত্যাগত হয়েছেন তা জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সিস্টেম অ্যানালিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবু রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রত্যাগত নারী কর্মীদের তালিকা এন্ট্রি নেই তাদের কাছে।

সাতক্ষীরার সুমি বেগম। ২০২৩ সালে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ভালো বেতনের প্রস্তাবে কাজের ভিসায় তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে একটি বাসায় কাজের জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর সুখের বদলে জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ নির্যাতন। তিনি বলেন, একটা বাসায় কাজ করতাম। তারা আমাকে ঠিকমতো বেতন দেয়নি। শেষে যখন আট মাসের বেতন পুরোটাই আটকে ফেলেছে, তখন অনেক কান্নাকাটি করার পর আমি মুক্তি পাই।

সুমি বলেন, দেশে আসার পর আমাকে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রতিবেশীরা ভিন্নদৃষ্টিতে দেখে। অথচ আমার অপরাধ কী সেটাই তো আমি জানি না। সংসারের হাল ধরতেই তো আমি বিদেশে গেছি। এটাই কি আমার অপরাধ? সরকার যদি আমাদের সম্মান দিতে না পারে, তাহলে বিদেশে কেন নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছে?

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাহিরুন্নেসা বলেন, আমার স্বামীর দুর্ঘটনার পর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য গৃহপরিচারিকার কাজে আমি সৌদি আরবে যাই। সেখানে আমাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে দেশে ফিরতে হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে ফেরার পর আত্মীয়স্বজনরা আমার থেকে দূরে থাকে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেও সেভাবে তারা আমাকে দাওয়াত দেয় না। মনোভাব এমন, আমি তাদের সঙ্গে মিশলে সম্মানহানি হবে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত মানসিক যুদ্ধ করে বেঁচে আছি।

তাহিরুন্নেসা বলেন, ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলাম, নিঃস্ব হয়ে ফিরেছি। কিন্তু সরকারের কোনো চিন্তা নেই আমাদের জন্য। কোনো সহায়তাও মিলছে না। আমি অসুস্থ স্বামী ও চারজন সন্তান নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবÑসে চিন্তায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি।

সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসন জরুরি

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর আমার দেশকে বলেন, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের পুনর্বাসন বলতে শুধু আর্থিক সহায়তা বা প্রশিক্ষণ বোঝালে চলবে না। তাদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেউ বিদেশ গেলেই যে তাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে হবে, সে মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করতে হবে, যাতে তারা ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ না করে পুনর্বাসনে সহযোগিতা করেন।

সরকারি উদ্যোগ নিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের নিয়ে সরকারি উদ্যোগগুলো যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে প্রচার ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এছাড়া ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ নীতিমালা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। কতজন প্রত্যাগত হয়েছেন, এর তালিকা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন, তাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। বিশেষ করে যারা বিধবা ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, তাদের কীভাবে স্বাবলম্বী করা যায় এবং এজন্য ডিসেম্বরের মধ্যেই ভালো কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

সূত্র: আমার দেশ