২৩ অক্টোবর ২০২৬

“আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হতে পারি!” ট্রাম্পের কৌতুক

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
“আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হতে পারি!” ট্রাম্পের কৌতুক

বিশ্ব মানচিত্রে এমন একটি দেশ রয়েছে, যেখানে ভোটযুদ্ধে দাঁড়ালে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব অনায়সেই যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে জিততে পারেন, এবং তিনি নিজেও বিষয়টি খুব ভালো করেই জানেন।

"আমি চাইলে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন করতে পারি," গত মে মাসে কৌতুকের ছলে এ কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, সেখানে তাঁর জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ! যদিও কোনো জনমত জরিপেই এ ধরনের ৯৯ শতাংশ সমর্থনের অঙ্ক মেলেনি। কিন্তু তাঁর এই কৌতুকটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে এক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, কারণ এটি নেহাৎ রসিকতা ছিল না—এর পেছনে লুকিয়ে ছিল গভীর এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন। তবে নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে এসে দেখা যাচ্ছে, এই পুরো নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হলেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প—যদিও ব্যালট পেপারে তাঁর কোনো নাম নেই! থাকার কথাও নয়, যেহেতু তিনিই বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

কিন্তু, যে ব্যক্তি বিগত এক দশক ধরে ট্রাম্পের সাথে গভীর সখ্য তৈরি করে নিজের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছেন—বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—তিনি আজ তিক্তভাবে আবিষ্কার করছেন যে, ট্রাম্পের সেই উষ্ণ আলিঙ্গন এখন অনেকটাই আলগা হয়ে এসেছে।

এক বছরের 'বীর বন্দনা' ও সখ্যতা

ট্রাম্প ও ইসরায়েলি রাজনীতির মধ্যকার এই মধুচন্দ্রিমার সম্পর্ক গত বছরের এই সময়ে এক চরম শিখরে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ট্রাম্পের টিমের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত এক গাজা চুক্তির আওতায়, হামাসের কাছে বন্দি জীবিত থাকা শেষ ২০ জন ইসরায়েলি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং একই দিনে ট্রাম্প ইসরায়েলি সংসদ 'নেসেট'-এ ভাষণ দেন।

ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ট্রাম্পের সেই ভাষণ এবং জিম্মিদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের দৃশ্য একইসঙ্গে সম্প্রচার করেছিল। ফলে সাধারণ ইসরায়েলিদের কাছে এই দুটি দৃশ্য যেন এক ও অভিন্ন হয়ে ফুটে উঠেছিল।

এর পরপরই শুরু হয় ট্রাম্পকে সম্মান জানানোর পালা। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের "ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু" হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে কেবল নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা 'ইসরায়েল পুরস্কার' একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান—ট্রাম্পকে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

এরপর আসে ২০২৬ সাল: ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি এবং জুলাই মাসে ট্রাম্প কর্তৃক ঘোষিত হামাসের অস্ত্রসংবরণ চুক্তি।

অর্থাৎ, ইসরায়েলের চাহিদামাফিক তেল আবিবের চিহ্নিত শত্রুদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছেন। আবার হামাসের হাত থেকে ইসরায়েলি বন্দি মুক্তিতেও ভূমিকা রেখেছেন। ইসরায়েল যেখানে সামরিক অভিযান চালিয়েও সফল হয়নি, হামাসের থেকে সেই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে ট্রাম্পের কূটনীতিক চাপ। তাই তাঁর প্রতি ইসরায়েলিদের সমর্থন কম তো হওয়ার নয়।

আর সেটা ৯৯ শতাংশ না হলেও, মোটেও কম নয়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ ইসরায়েলি ট্রাম্পের ওপর গভীর আস্থা রাখেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'জ্যুইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউট'-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, ৭৩ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সাধারণ প্রেসিডেন্টের চেয়ে বহুগুণ ভালো বলে মনে করেন।

তেল আবিব ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একে বর্ণনা করেছেন "ট্রাম্প ইফেক্ট" হিসেবে: ইসরায়েলের সাধারণ ইহুদিরা—বিশেষ করে কট্টর ডানপন্থীরা—ফিলিস্তিনিদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে অনেকটাই নমনীয় হয়ে ওঠেন, যখন তাদের বলা হয় যে এই শান্তি প্রস্তাবের নেপথ্যে ট্রাম্প রয়েছেন। এভাবে কোনো ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতা যা করতে পারেননি, ট্রাম্প তা অনায়াসেই করে দেখিয়েছেন।

যে সমর্থন আর কখনোই মিলছে না

২০১৯ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল 'লিকুদ পার্টি' আয়ালোন মহাসড়কে বিশাল আকারের বিলবোর্ড ঝুলিয়েছিল: সেখানে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হাত মেলাচ্ছেন এবং নিচে লেখা ছিল "অন্য উচ্চতার নেতৃত্ব" (ইন অ্যানাদার লিগ)। ট্রাম্প নিজেও সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিলেন।

সমীকরণটা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: বিবি (নেতানিয়াহু) ট্রাম্পের জৌলুস ধার করে নিজের রাজনীতি চালাতেন, আর ট্রাম্প সেই প্রশংসা ও শ্রদ্ধা উপভোগ করতেন।

কিন্তু এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন তাঁর হাত দুটি নিজের পকেটেই গুটিয়ে রেখেছেন!

গত জুনে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে প্রতিপক্ষের ওপর ভিত্তি করে তিনি "সম্ভবত" নেতানিয়াহুকেই সমর্থন করবেন। কিন্তু যখন গাদি আইজেনকোট নির্বাচনী ময়দানে নামলেন, ট্রাম্প মন্তব্য করে বসলেন যে আইজেনকোটের বিরুদ্ধে তিনি খারাপ কিছু শোনেননি। এমনকি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে সমর্থনের প্রশ্নটি তিনি অন্তত তিনবার কৌশলে এড়িয়ে গেছেন।

গত মঙ্গলবার 'মেরিন ওয়ান' হেলিকপ্টারে ওঠার আগে ট্রাম্প কেবল রহস্যময়ভাবে এটুকুই বলেন: "আমরা হয়তো কাউকে সমর্থন দিতে পারি।" কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম তিনি মুখে আনেননি।

সবচেয়ে কাছাকাছি তিনি যেটি করেছিলেন তা হলো—গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ নিউজম্যাক্স-এর একটি খবরের লিঙ্ক শেয়ার করা, যেখানে এক জরিপে নেতানিয়াহুর জোটকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে ট্রাম্প নিজে সেটি পোস্ট করেছিলেন কিনা তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে।

এর মধ্যেই ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিপক্ষ গাদি আইজেনকোট এবং নাফতালি বেনেটের শিবিরগুলো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের সাথে গোপনে কথা বলে তাঁকে এই নির্বাচনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। আর এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের সেই অনুরোধ পূরণ হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।

ইসরায়েলের এই জাতীয় নির্বাচন এতটাই হাড্ডাহাড্ডি হতে যাচ্ছে যে, ট্রাম্পের এই নীরবতা একটি বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে। গত মাসের পাঁচটি পৃথক জরিপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইজেনকোটের দল ইয়াশার গড়ে ২২.২টি আসন পেতে যাচ্ছে, যেখানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পাচ্ছে ২১.২টি আসন।

আর জোটের হিসাবে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পাচ্ছে গড়ে ৫৪.৪টি আসন এবং বিরোধী জায়নবাদী জোট পাচ্ছে ৫১টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কিন্তু কোনো পক্ষই এককভাবে ছুঁতে পারছে না।

বেদিতে দেখা দেওয়া ফাটল

এই দূরত্ব কিন্তু কেবল একতরফা নয়, দুই তরফ থেকেই তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যখন তেহরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি ও দরকষাকষি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন তিনি লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করতে এবং সিরিয়ার কিছু অঞ্চল থেকে সরে আসতে ইসরায়েলের ওপর মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

এক উত্তপ্ত ফোনালাপের সময় নেতানিয়াহুকে "পাগল" বলেও ডাকার কথা ট্রাম্প স্বীকার করেছেন। ইসরায়েলঘনিষ্ঠ মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে নাকি প্রায়ই বলেন— "বিবি (নেতানিয়াহু) নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু।"

ইসরায়েলি জনগণও বিষয়টি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট-এর গ্রীষ্মকালীন এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেন বলে বিশ্বাস করা মানুষের সংখ্যা মে মাসের ৪৪ শতাংশ থেকে কমে জুনে মাত্র ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

কেবল ইহুদি উত্তরদাতাদের মধ্যে, ট্রাম্পের ওপর ইসরায়েল সম্পূর্ণ নির্ভর করতে পারে—এই বিশ্বাসের হার মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ৩৮ পয়েন্টের বিশাল পতন ঘটেছে। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলি মনে করেন, ইরান যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান ভালো রয়েছে।

তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, নীতিগত বিষয়ে অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিন্তু ইসরায়েলে এক চুলও কমেনি! ইসরায়েলিরা তাঁর নীতিকে সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি ট্রাম্পকে তারা ঠিকই ভালোবাসে।

নেতানিয়াহুর নিজের প্রচারণাতেই এর প্রমাণ মেলে: সম্প্রতি লিকুদ পার্টির প্রার্থী তালিকায় নেতানিয়াহু এক ব্যবসায়ীকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যিনি অতীতে ট্রাম্পকে "নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত" বলে সমালোচনা করেছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান এবং ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু বলে আখ্যা দেন।

এভাবে ইসরায়েলে বসে ট্রাম্পের সামান্য সমালোচনা করাও এখন নির্বাচনী প্রচারণার জন্য এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

তাহলে এই দেশ আসলে কার?

ইসরায়েলের ওপর একচ্ছত্র ট্রাম্পের মালিকানা, "ট্রাম্পের দেশ" উক্তি আসলে সেটা বোঝায় না। এর অর্থ হলো—ট্রাম্প এখন এমন এক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন, যাকে ঘিরে সব ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের ঘুরতে হয়। নেতানিয়াহু নির্বাচন করছেন ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিচয়ে।

আবার আইজেনকোট নির্বাচন করছেন ট্রাম্পের শত্রু না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পুরো রাজনীতির ময়দান এখন কেবল একটি বিতর্ক নিয়েই ব্যস্ত—কে ট্রাম্পকে সবচেয়ে ভালোভাবে সামলাতে পারবেন?

আন্তর্জাতিক স্তরে ও জাতীয়ভাবে দম্ভ ও অহমিকার এক দেশ ইসরায়েল; যার রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক মতভেদে বিভক্ত, কিন্তু গণতান্ত্রিক একটি ইহুদিবাদী সমাজব্যবস্থা। তাদের জন্য এই ধরনের অন্ধ পরনির্ভরতা সত্যিই এক নজিরবিহীন ঘটনা। এবং এটি অদ্ভুত কিছু বার্তাও দিচ্ছে।

ট্রাম্প একসময় নেতানিয়াহুকে এমন এক ২০ দফার গাজা পরিকল্পনা মানতে বাধ্য করেছিলেন, যা কোনো ইসরায়েলি শাসক জোট কখনোই মেনে নিত না। আবার তিনিই প্রেসিডেন্ট হারজগকে চিঠি লিখে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলায় তাঁর খাস ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলেছিলেন—যে ধরনের হস্তক্ষেপ অন্য কোনো বিদেশি নেতার কাছ থেকে এলে তেল আবিবে চরম হট্টগোল পড়ে যেত।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলিরা তাদের নিজেদের প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার জন্য ভোট দেবেন। তবে ভোট দিতে যাওয়ার সময় অনেক ইসরায়েলির মনেই নীরবে একটি অভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খাবে: বিজয়ের শুভেচ্ছা জানিয়ে ওয়াশিংটন থেকে কার কাছে আগে ফোন আসবে?

অতএব, স্বাগতম ইসরায়েলে—যেখানে নির্বাচনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও দিকনির্ণায়ক মানুষটি (ট্রাম্প) নিজে কোনো ভোট দিতে পারবেন না, এবং আপাতত তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করছেন না!

লেখক: লিওন হাদার একজন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, ব্লগার, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গ্রন্থকার এবং পরামর্শক।

ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও ক্ষোভের স্বীকৃতি দিতে হবে! বারাক ওবামা

রেমিট্যান্সের সিংহভাগই চলে যায় দৈনন্দিন খরচে, উপেক্ষিত প্রবাসীরা

প্রকাশ: শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
রেমিট্যান্সের সিংহভাগই চলে যায় দৈনন্দিন খরচে, উপেক্ষিত প্রবাসীরা

কয়েক দশক ধরে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে ভূমিকা রেখে আসছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অন্যতম প্রধান শক্তি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত এই অর্থ।

প্রতি বছর কাজের সন্ধানে বিদেশ যাচ্ছেন যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক, তাদের সিংহভাগই গ্রামের মানুষ। গ্রামেই আসছে রেমিট্যান্সের বেশির ভাগ। প্রবাসী আয় হিসেবে যত টাকা দেশে আসে, এর মাত্র ২৫ শতাংশের কিছু বেশি বিনিয়োগ হয়।

সিংহভাগ খরচ হয় ভোগেই। খাবার, যাতায়াত, জামাকাপড়, মুঠোফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজ, আসবাবসহ বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটায় চার ভাগের তিন ভাগ টাকা খরচ করে ফেলেন বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা। দারিদ্র্যসীমার কিছু ওপরে থাকা বেশির ভাগ পরিবার সংসারের নানা চাহিদা মেটাতেই সব টাকা খরচ করে ফেলে।

আর পরিবারের প্রধান হিসেবে প্রবাসী আয়ের খরচ করার দায়িত্ব নারীর হাতেই ন্যস্ত রয়েছে। এসব পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষটি বিদেশে থাকেন। আর দেশে তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ নিকটাত্মীয়রা থাকেন। এমন পরিবারের যে অর্থ প্রবাস থেকে আসে, তার পুরোটাই খরচ করার দায়িত্ব পড়ে পরিবারের প্রধানতম সদস্য নারীর ওপর।

বিবিএস বলছে, প্রবাসী আয় পায় এমন পরিবারগুলোর প্রায় ৫২ শতাংশের প্রধান একজন নারী। তাঁরাই সংসার চালান, প্রবাসী আয় খরচ করেন। প্রবাসী আয়ের অর্থ খুব বেশি উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয় না।

বিবিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, যত পরিবার প্রবাসী আয় পায়, তাদের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ কোনো বিনিয়োগ করে না। আর প্রবাসী আয় পান এমন পরিবারগুলোর অর্ধেকের বেশি কোনো ধরনের সঞ্চয় করে না।

বিদেশ থেকে যে অর্থ আসে, তার পুরোটাই খরচ করেন এসব পরিবারের সদস্যরা। মাত্র ৪১ দশমিক ৭১ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় করে থাকে। আর বাকি অর্থ ভোগবিলাসের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় খরচ করেন।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা পরিবারগুলো বেশি রেমিট্যান্স পায়। তাই তাদের অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে রেমিট্যান্সের অর্থ খরচ ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।’

জাহিদ হোসেনের মতে, ‘প্রবাসী আয়ের পাঠানো অর্থ কিছুটা ভিন্নভাবে বিনিয়োগে আসে। বিদেশ থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট পরিবার সাধারণত সঞ্চয় হিসেবে ব্যাংকে রাখে। ব্যাংকে থাকা অর্থই বিনিয়োগ হয়। কিন্তু বিনিয়োগ পরিবেশ না দিলে তা কীভাবে বিনিয়োগে আসবে। তবে, প্রবাসী আয়ের ২৫ শতাংশের মতো বিনিয়োগযোগ্য অর্থ হিসেবে উদ্ব‍ৃত্ত থাকে; এটা জাতীয় অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের আনুপাতিক হারের সমান।’

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘রেমিট্যান্সের অর্থ ভোগ ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যয় হওয়া নেতিবাচক নয়। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানে ব্যয় পরিবারের জীবনমান উন্নত করে এবং দেশের ভেতরে চাহিদা বাড়ায়।

তবে, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কম হলে আয় বন্ধ হওয়ার পর পরিবার আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা হারায়। এ সমস্যা শুধু আর্থিক সচেতনতার অভাবের কারণে নয়।

নিরাপদ, সহজে বোঝা যায় এমন এবং যুক্তিসংগত মুনাফার বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকাও বড় কারণ। সরকারকে প্রবাসী আয়ের অর্থ বিনিয়োগের নামে অনির্ভরযোগ্য প্রকল্প ঠেকাতে তদারকি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণে স্বচ্ছ বিনিয়োগ পণ্য তৈরি করা দরকার। আর্থিক শিক্ষা ও পরামর্শও সহজলভ্য করতে হবে।’

ড. ফাহমিদা খাতুন আরো জানান, ‘রেমিট্যান্স পাওয়া পরিবারের প্রায় ৫২ শতাংশের প্রধান নারী হওয়ায় তাঁদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা, ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ, সহজ সঞ্চয় হিসাব এবং নারী উদ্যোক্তাদের উপযোগী ঋণ জরুরি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো রেমিট্যান্সকে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যুক্ত করা।

এজন্য বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ, স্থিতিশীল নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পরিবারই নেবে; সরকারের দায়িত্ব হবে ঝুঁকি কমানো ও কার্যকর সুযোগ তৈরি করা।’

সরকারি জরিপ সংস্থা বিবিএসের তথ্যানুসারে, দেশের প্রতিটি পরিবারের বছরে গড় প্রবাসী আয় ২ লাখ ১০ হাজার ৫৪ টাকা। সরকারি হিসাবে দেখা যায়, প্রবাসীদের ৮ শতাংশের বেশি মানুষ গড়ে ২৫ হাজার টাকা পাঠান প্রতি বছরে। ২৫ হাজার থেকে ৪৯ হাজার টাকা পাঠান ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, ৫০ হাজার থেকে ৯৯ হাজার টাকা পাঠান ১২ শতাংশ।

প্রতি বছর গড়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পাঠান ১৫ শতাংশ প্রবাসী, দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পাঠান ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পাঠান ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ৩ থেকে ৪ লাখ গড়ে পাঠান ১৩ শতাংশ এবং ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পাঠান ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ প্রবাসী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন মানুষ যখন বিমানবন্দরের গেট দিয়ে বিদেশের উদ্দেশে বেরিয়ে যান, তখন তিনি শুধু একজন যাত্রী নন। তার কাঁধে থাকে একটি পরিবারের দায়িত্ব, চোখে থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর বুকের ভেতর থাকে দেশ ছাড়ার অদৃশ্য কষ্ট। মায়ের চোখে পানি, বাবার নীরব দোয়া, স্ত্রীর উৎকণ্ঠা, সন্তানের প্রশ্ন- ‘বাবা কবে ফিরবে?’

সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি পাড়ি জমান অচেনা এক দেশে। কেউ যান শ্রমিক হয়ে। কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ রেস্তোরাঁকর্মী, কেউ চালক, কেউ কৃষিশ্রমিক। কেউ আবার ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ।

পেশা ভিন্ন, দেশ ভিন্ন, জীবনযাত্রা ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মিল আছে- তারা বাংলাদেশের সন্তান। বিদেশের মাটিতে তাদের শ্রমে বাংলাদেশের পরিবার চলে। তাদের পাঠানো অর্থে সন্তানের পড়াশোনা হয়, ঘর নির্মিত হয়, জমি কেনা হয়, চিকিৎসার খরচ চলে। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি।

প্রবাসী বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করেন, কিন্তু বাংলাদেশ তার ভেতরে বসবাস করে। তিনি ঈদ উপলক্ষে পরিবারকে টাকা পাঠান। বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ দেন। সন্তানের স্কুলের ফি দেন। দেশে ঘর বানান। জমি কেনেন। ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। আর নীরবে দেশের অর্থনীতিতে নিজের অংশটুকু দিয়ে যান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। একই তথ্য বলছে, দেশের চলতি হিসাবের অবস্থার উন্নতিতেও শ্রমিকদের রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই। প্রবাসী কি শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর একটি মাধ্যম? রেমিট্যান্সের সময় তিনি দেশের অর্থনীতির নায়ক, কিন্তু বিপদের সময় তিনি কেন অনেক ক্ষেত্রে একা? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিদেশ যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে একজন প্রবাসীকে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দেশে ফেরার সময়ও তার সঙ্গে থাকে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, লাগেজ, পরিবারের জন্য কেনাকাটার সামগ্রী এবং বহুদিন পর আপনজনকে দেখার আবেগ।

কিন্তু বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণ, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- যে মানুষটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, রাষ্ট্রের প্রবেশদ্বারে তার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? প্রবাসীর জন্য আলাদা লাউঞ্জ, বিভিন্ন সেবা ও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।

সরকারি ব্যবস্থায় প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন একটি প্রবাসীবান্ধব আচরণ সংস্কৃতি। একজন প্রবাসীকে যেন মনে না হয়, তিনি নিজের দেশে ফিরে কোনো অপরাধ করেছেন।

বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার মিশনগুলো একজন প্রবাসীর কাছে শুধু পাসপোর্ট বা কাগজপত্রের অফিস নয়। বিপদের মুহূর্তে সেটিই হওয়া উচিত তার রাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান আশ্রয়। পাসপোর্ট হারিয়েছে, চাকরিদাতা বেতন দিচ্ছে না, কারও বিরুদ্ধে অন্যায় মামলা হয়েছে, দুর্ঘটনা ঘটেছে, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে, কেউ হাসপাতালে, কেউ নিখোঁজ, আবার কারও মৃত্যু হয়েছে- এসব মুহূর্তে প্রবাসী বুঝতে চান, ‘আমার দেশ কি আমার পাশে আছে?’

সরকার ইতোমধ্যে প্রবাসীদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরসন সেল গঠনের কথা জানিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে একজন বিপদগ্রস্ত প্রবাসীর অভিজ্ঞতায়। কত ঘণ্টায় উত্তর মিলল? কত দিনে সমস্যার সমাধান হলো? কতটা স্বচ্ছ ছিল প্রক্রিয়া? কর্তৃপক্ষ কি নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখল? রাষ্ট্রীয় সেবার আসল পরীক্ষা অফিসের টেবিলে নয়, মানুষের সংকটের মুহূর্তে।

প্রবাসী জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় মৃত্যু। একজন মানুষ জীবিত অবস্থায় পরিবারের জন্য টাকা পাঠান। নিজের কষ্টের কথা অনেক সময় পরিবারকে জানান না। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই মানুষটির শেষ ঠিকানাটুকুও নিশ্চিত করতে পরিবারকে সংগ্রাম করতে হয়।

ইউরোপের কোনো দেশে একজন বাংলাদেশি মারা গেলে তার মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। প্রবাসী সমাজের অভিজ্ঞতায় অনেক ক্ষেত্রে কয়েক হাজার ইউরো পর্যন্ত খরচের কথা সামনে আসে। পরিবার যদি সেই অর্থ বহন করতে না পারে, তখন শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। মানুষের দরজায় দরজায় যেতে হয়। কেউ দেন ১০ ইউরো। কেউ দেন ২০ ইউরো। কেউ দেন ১০০ ইউরো।

এভাবে চাঁদা তুলে একজন মানুষের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়। ভাবুন দৃশ্যটি। একজন মানুষ জীবিত অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে অর্থ পাঠিয়েছেন। মৃত্যুর পর তার লাশ দেশে পাঠানোর জন্য তারই স্বজনদের বিদেশের রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। এর চেয়ে নির্মম বৈপরীত্য আর কী হতে পারে?

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অবশ্য প্রবাসে মৃত কর্মীর মরদেহ দেশে আনতে সহায়তার বিধান রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা হয়।

দেশে মরদেহ পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে পরিবহন ও দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি মৃত কর্মীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদানের বিধান রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই সহায়তা কি বাস্তব খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

যদি একজনের মরদেহ দেশে পাঠাতে কয়েক হাজার ইউরো প্রয়োজন হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় সহায়তার কাঠামো কি সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন নয়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কোনো প্রবাসীর লাশ দেশে পাঠানোর জন্য তার পরিবারকে কি মানুষের কাছে গিয়ে চাঁদা তুলতে হবে? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এ বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি কমে হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এই কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ থেকে ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। মূলত এটি বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। অন্যদিকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে কর্মী পাঠানোর গড় সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ২০২৩ সালে- ওই বছর বিদেশে যান ১৩ লাখের বেশি কর্মী। সংখ্যাটি যত বড়ই হোক না কেন, বিদেশ যেতে আগ্রহী তরুণের তালিকা কখনোই ছোট হয়নি।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে মোট ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময় মোট কর্মী গেছেন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। এর প্রায় ৭৯ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। সব মিলিয়ে ৯৪ শতাংশ কর্মী গেছেন ১০টি দেশে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের তালিকার শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন ও মালদ্বীপ। সবই এশিয়ার দেশ, যার মধ্যে সাতটি মধ্যপ্রাচ্যের। ৯৮টি দেশে দেড় দশকে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো যায়নি। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশকেন্দ্রিক বাজারনির্ভরতা এখন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিএমইটির তথ্য বলছে, গত বছর সব মিলিয়ে বিদেশে গেছেন ১১ লাখ ৩২ হাজারের বেশি কর্মী। এবার যুদ্ধের পর থেকে সৌদিতে কর্মসংস্থান কমছে। গত বছর অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনে বিভিন্ন দেশে যেতে বিএমইটি থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৪ হাজার ১৭৪ জন। এবার একই সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১১ হাজার ১২২ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে যেতে গত বছর ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ৯৭১ জন, আর এবার নিয়েছেন ১ হাজার ৮৫০ জন।

দীর্ঘ আট বছর সৌদি আরবে প্রবাস জীবন শেষে সম্প্রতি দেশে এসেছেন বগুড়ার হাফেজ মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম। যিনি ২০১৭ সালে দালালের মাধ্যমে প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যান। তিনি জানিয়েছেন, তার দীর্ঘ প্রবাস জীবনে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাওয়ার গল্প। মালির কাজ নিয়ে সৌদি আরব গেলেও সেখানে গিয়ে মোমিনুল সেই কাজ পাননি। বরং তার কফিল (যে মালিক তাকে ভিসা দিয়েছিলেন) তাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের মতো কাজ খুঁজে নিতে বলেন। উপরন্তু, কফিল প্রতিমাসে তার কাছ থেকে ৩০০ রিয়াল চেয়ে বসে।

অবশ্যই দিতে হবে, নতুবা কাজ ছেড়ে পালিয়ে গেছে অভিযোগে মিথ্যা মামলার হুমকি দেন। মোমিনুল বলেন, প্রথম তিন মাস তেমন কোনো কাজ পাইনি। খেয়ে-না খেয়ে ছিলাম, কখনো রাস্তায় রাস্তায় থাকতে হয়েছে, কেউ খোঁজ নেয়নি। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে অল্প কিছু কাজ করতাম। সাগরে মাছ ধরার জাল বোনার কাজ পেয়েছিলাম।

কিন্তু দীর্ঘ সময় বসে থেকে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি বিধায় কাজ ছেড়ে দেই। কিন্তু কফিলকে প্রতিমাসে তিনশ রিয়াল দিতেই হতো। তিনমাস অনেক কষ্ট করার পর পরিচিত এক চাচার মাধ্যমে একটি বেকারিতে কাজ পাই। তখন মাসে ১৫০০ রিয়াল বেতন পেতাম।

এদিকে ছয় মাস পর কফিল মোমিনুলের কাছে চারশ রিয়াল দাবি করেন। বাধ্য হয়ে তা দিতে রাজি হন এই যুবক। কিন্তু দুই মাস যেতে না যেতেই কফিল মোমিনুলের কাছে পাঁচশ রিয়াল দাবি করে বসেন। আমি তখন তাকে অনুরোধ করি, মাত্র ১৫০০ রিয়াল বেতন পাই। ৫০০ তাকে দিলে আমার তো কিছু থাকে না। বাড়িতে ঋণ শোধের চাপও বাড়ছিল। কিন্তু কফিল টাকা কম নিতে রাজি না। পরে আমি রেখে গিয়ে তাকে বলি আমি আর কোনো টাকাই দিব না। তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। ফোনে তার নম্বর ব্লক করি। তখন কফিল আমার নামে মামলা করে দেয়।

মামলার কারণে পুলিশের ভয়ে থাকতেন মোমিনুল। লুকিয়ে কাজ করতেন। নিজের কাগজপত্র বৈধ করতে বহুবার চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করেনি। তিনি জানান, আট বছরের প্রবাস জীবনে তিনবার গ্রেপ্তারও হয়েছে। দুই-একদিন কারাগারে থাকার পর মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে মুক্তি মিলেছে।

অর্থ উপার্জনের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করেছি। ৪০ ডিগ্রির উপরের তাপমাত্রায় রাতে ১২ ঘণ্টা বেকারিতে কাজ করার পর দিনে আবার পার্টটাইম কাজ করতাম। আল্লাহর রহমতে এক সময় আয় বাড়ে। ঋণ শোধ করে ভবিষ্যতের জন্য বাড়িতে টাকা পাঠাতে শুরু করি।

এই আট বছরে একবারও দেশে আসেননি মোমিনুল। কারণ, তার বৈধ কাগজপত্র ছিল না। মোমিনুল যখন প্রবাস জীবনে খানিকটা গুছিয়ে নিয়েছেন তখন হানা দেয় করোনা মহামারি। যদিও করোনা মহামারি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ওই সময়ে সম্পূর্ণ লকডাউন ছিল ১৫ দিন। তাছাড়া, কাজ চলেছে। আর বেকারির কাজ তো বন্ধ করার উপায়ও নেই। তাই তার উপার্জনে তেমন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যের দাম দুই-তিনগুণ বেড়ে যায়। আয় না বাড়ায় তাকে তাই খানিকটা চাপে পড়তে হয়। কেউ কেউ তখন কুলিয়ে উঠতে না পেরে দেশে চলে আসে বলে জানান তিনি। বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের আগে সৌদি আরবে আটার দাম ছিল হাফ রিয়াল। যুদ্ধ শুরুর পর তা দুই রিয়াল পর্যন্ত উঠে যায়। এরকম সব পণ্যের দামই কম-বেশি বেড়ে যায়। যে দাম আর খুব একটা কমেনি।

আট বছরের প্রবাস জীবন শেষে মোমিনুল একেবারেই দেশে চলে এসেছেন। যেহেতু তার কাগজপত্র বৈধ নয়, তাই ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, দেশে এখন কী করবেন? তিনি জানান, আরেকটু সময় নিয়ে, একটু ভেবেচিন্তে কোনো একটা ব্যবসা শুরু করবেন। এজন্য পুঁজি দরকার। কতটা পুঁজি নিয়ে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি খানিকটা আক্ষেপের সুরে বলেন, কিছু পুঁজি নিয়ে এসেছি। তবে পরিবার যদি সহযোগিতা করত তবে আরো বেশি সঞ্চয় হতো।

মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আমার পরিবার। সবাই শুধু টাকা চায়। আমাদের কথা কেউ ভাবে না। সবাই মনে করে প্রবাসীরা টাকার গাছ। আমরা যে কত কষ্ট করে টাকা কামাই পরিবার সেটা দেখে না। চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে পারলে আমরা হিরো, না পারলে আমরা ভিলেন। আমাদের ভালো-মন্দের খোঁজ কেউ রাখে না।

একই রকম কথা শোনান জনি মন্ডল। ঢাকায় মোটর মেকানিকের কাজ করা এই তরুণ গাড়ির গ্যারেজের কাজ নিয়ে ২০২১ সালের শেষ দিকে করোনা মহামারি যখন বিদায় নিতে শুরু করেছে তখন সৌদি আরব যান। জনি বলেন, শুরুতে ভালোই ছিলাম। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চাল, তেল, আটাসহ সব নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাদের আয় বাড়েনি। এই টাকায় তারা চলতে পারছেন না। বাড়িতে ঠিকমত টাকা পাঠাতে পারেন না। পরিবার থেকেও তখন চাপ আসে। বেশিরভাগ মানুষ তো ঋণ করে বিদেশে আসে। প্রত্যেক বছর আকামা করতেই ১০ হাজার রিয়াল লেগে যায়। অনেকে পোষাতে না পেরে তাই দেশে চলে গেছেন।

কাতার প্রবাসী রংপুরের সুমন আহমেদ অবশ্য খানিকটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। প্রায় নয় বছর ধরে তিনি কাতারে আছেন, সেখানে সেলসে কাজ করেন। নিজের আয়, কাজের পরিবেশ নিয়ে তিনি বেশ সন্তুষ্ট। দুই সন্তানের জনক সুমন আহমেদ দুইবার দেশে থেকে ঘুরে এসেছেন। তার আয়ে পরিবার বেশ স্বচ্ছন্দে চলছে। ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও করতে পারছেন।

তিনি বলেন, করোনা মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ বা গাজা যুদ্ধের কারণে আমাদের কাজের পরিবেশে পরিবর্তন হয়নি। আয়ও একই আছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছিল। তবে এখন তা অনেকটাই কমে এসেছে। আগের মত না হলেও নাগালের বাইরে নয়। নিজের প্রবাস জীবন নিয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি দেখা গেছে সুমন আহমেদের কথায়।

তবে সবাই তার মতো ভাগ্যবান নন। বরং বেশিরভাগ প্রবাসীকেই প্রবাসে কষ্টকর এক জীবন পাড়ি দিতে হয়। দেশের জন্য, পরিবারের জন্য শত কষ্ট সহ্য করেও তারা কাজ করে যান। দেশের জন্য শুধু রেমিটেন্স যোদ্ধা আর পরিবারের জন্য ‘টাকা ছাপানোর মেশিন হয়ে নয়' বরং সবার কাছে সম্মান আশা করেন তারা।

বিদেশে থাকা পরিবারের একজন সদস্য বছরে গড়ে ৪ লাখ টাকা দেশে পাঠান। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। এই অর্থই যদি পরিবারের প্রধান বৈদেশিক আয়ের উৎস হয়, তাহলে বছরজুড়ে সেই টাকার বড় একটি অংশ চলে যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে।

মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খাবার ও বাজার খরচ, ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও মোবাইল-ইন্টারনেট বিল, ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা সন্তানের পড়াশোনা, ২ থেকে ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ও ওষুধ, ২ থেকে ৩ হাজার টাকা যাতায়াত ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচে চলে যেতে পারে। এর বাইরে পোশাক, ঈদ বা উৎসবের কেনাকাটা, বাড়িঘর মেরামত, আত্মীয়স্বজনকে সহায়তা কিংবা হঠাৎ কোনো জরুরি ব্যয় এলে মাসিক বাজেট আরো চাপে পড়ে।

ফলে, মাসে ৩৩ হাজার টাকার কিছু বেশি রেমিট্যান্স এলেও নিয়মিত ব্যয়ের পর হাতে থাকে তুলনামূলকভাবে সামান্য অর্থ। কোনো কোনো মাসে সঞ্চয় সম্ভব হলেও অন্য মাসে সেই সঞ্চয়ও ভেঙে চিকিৎসা, শিক্ষা, বিয়ে, ঘর মেরামত কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে খরচ হয়ে যায়।

অর্থাৎ বছরে ৪ লাখ টাকা রেমিট্যান্স পাওয়া একটি পরিবারের ক্ষেত্রে সব অর্থকে নিছক ভোগবিলাসের টাকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর বড় অংশই পরিবারের মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে চলে যায়। তবে যদি বছরে অন্তত ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পরিকল্পিতভাবে সঞ্চয় করা যায় এবং তার একটি অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে নেওয়া যায়, তাহলে একই রেমিট্যান্স ভবিষ্যতে পরিবারের স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিপরীতে পুরো ৪ লাখ টাকা যদি বছর শেষে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক, গৃহস্থালি পণ্য ও অন্যান্য ভোগব্যয়ে শেষ হয়ে যায়, তাহলে প্রবাসী সদস্যের দীর্ঘ বছরের শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া অর্থ পরিবারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটালেও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে না।

তাই প্রশ্নটি শুধু একটি পরিবার বছরে কত টাকা রেমিট্যান্স পেল সেখানে নয় বরং সেই অর্থের কতটা প্রয়োজনীয় ব্যয়ে গেল, কতটা সঞ্চয় হলো এবং কতটা ভবিষ্যৎ আয় তৈরির কাজে লাগল সেই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

দাম্মাম ও রিয়াদগামী বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

প্রকাশ: শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
দাম্মাম ও রিয়াদগামী বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পর যাত্রীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। তবে জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইটগুলো পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চালু থাকবে।

বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানায়, গত ২১ অক্টোবর বুধবার রাতে দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে দাম্মামগামী আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ অক্টোবরের সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

এছাড়া সৌদি আরবে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় যাত্রীদের সুরক্ষার স্বার্থে ঢাকা থেকে রিয়াদগামী রুটের সব ফ্লাইট আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থগিত করা ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সংশোধিত যাত্রাসূচি যথাসময়ে যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।

তবে এ সময়ে ঢাকা থেকে জেদ্দা ও মদিনাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটগুলো নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

জরুরি প্রয়োজনে দাম্মাম ও রিয়াদগামী যাত্রীরা আসনে ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত করতে পারবেন।

টিকিট ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য যাত্রীদের নিকটস্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।

সৌদি প্রবাসীদের জন্য সুখবর! দাম্মামের পর এবার চালু হচ্ছে রিয়াদ রুট

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
সৌদি প্রবাসীদের জন্য সুখবর! দাম্মামের পর এবার চালু হচ্ছে রিয়াদ রুট

সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ঢাকা-রিয়াদ রুটে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ফ্লাইট শুরু করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বুধবার (২১ অক্টোবর) থেকে ঢাকা-দাম্মাম রুটের ফ্লাইট চালু হয়েছে। এছাড়া মদিনা রুটে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিস্থিতির ক্রমাগত উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৫ অক্টোবর রিয়াদগামী একটি ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সময় ২৫ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টা ২৫ মিনিটে ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে রিয়াদের উদ্দেশে যাত্রা করবে।

প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি: আবেদন শুরু হচ্ছে

তবে রিয়াদগামী অন্যান্য ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

এদিকে, ঢাকা-দাম্মাম রুটে বুধবার (২১ অক্টোবর) থেকে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। আগামী ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে দাম্মামের উদ্দেশে ফ্লাইট ছেড়ে যাবে। এসব ফ্লাইট বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ দিয়ে পরিচালনা করা হবে।

জেদ্দা রুটে আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকা থেকে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান। এরপর ২৩, ২৪ ও ২৫ অক্টোবর প্রতিদিন বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে ঢাকা থেকে জেদ্দার উদ্দেশে একটি করে ফ্লাইট ছেড়ে যাবে।

অন্যদিকে, ঢাকা-মদিনা রুটে ১৮ অক্টোবর থেকে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল করছে। এ রুটে বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মদিনাগামী ফ্লাইটের কার্যক্রম ও সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে।

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমাতে ১৫০টি নতুন ট্রলি উপহার!

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমাতে ১৫০টি নতুন ট্রলি উপহার!

প্রকাশ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমাতে ১৫০টি নতুন ট্রলি উপহার!

প্রবাসী কর্মীদের লাগেজ পরিবহন সহজ করতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৫০টি ট্রলি হস্তান্তর করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সুবিধার্থে মোট ২০০টি ট্রলি সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ট্রলি হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী জানান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উদ্যোগে চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগে ২৫টি করে ট্রলি সরবরাহ করা হয়েছে।

জাপানে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত ‘টেকনিক্যাল ইন্টার্নশিপ’ পদ্ধতির পরিবর্তে নতুন ‘এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি কর্মীরা জাপানের স্থানীয় শ্রমিকদের সমতুল্য আইনি সুরক্ষা পাবেন। পাশাপাশি নারী-পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মদানের কারণে নারী কর্মীদের প্রতি বৈষম্য রোধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরবে বোমা হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে মন্ত্রী জানান, তাঁদের একজন অভিবাসী শ্রমিক এবং অন্যজন ওমরাহ যাত্রী। একজনের বাড়ি বগুড়ায়, অন্যজনের কুমিল্লায়।

আকাশপথের যোগাযোগ ও সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁদের মরদেহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

সৌদি আরবে সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সঠিক তথ্য জানতে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি: আবেদন শুরু হচ্ছে

প্রকাশ: সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি: আবেদন শুরু হচ্ছে

প্রবাসী কর্মীদের মেধাবী সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে শিক্ষাবৃত্তির জন্য আবেদন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এই আবেদন করা যাবে। গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রবাসী কর্মীদের সন্তানদের শিক্ষাজীবনে সহায়তা এবং মেধার বিকাশে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরাসরি মন্ত্রীর ই-মেইলে অভিযোগ জানানোর আহ্বান

জানা যায়, শিক্ষাবৃত্তির জন্য আগ্রহী ও যোগ্য শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে আবেদন করতে হবে।

আবেদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে এ ধরনের উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে।

বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা কমাতে শিক্ষাবৃত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিদেশে গিয়ে নরকযন্ত্রণা, দেশে ফিরে সামাজিক কটূক্তি! বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের যোগ্যতা, আবেদনপদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদনের শেষ তারিখ এবং শিক্ষাবৃত্তি পাওয়ার শর্তাবলি উল্লেখ রয়েছে।

আবেদন করার আগে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞপ্তিটি ভালোভাবে পড়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, শিক্ষাবৃত্তির জন্য আবেদন করতে আগ্রহীদের নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে।

আবেদনে কোনো ভুল বা প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি থাকলে তা বিবেচনায় সমস্যা হতে পারে।