‘দিনে প্রচণ্ড গরম। রাতে কাজে যাচ্ছি। ফিরে কল দিয়ে কথা বলব।’ শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে স্ত্রী সুলতানা বেগমকে ফোনে কথাগুলো বলেছিলেন কাতার প্রবাসী আজম মিয়া। কিন্তু সেই কথার আর কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি তার। স্ত্রীর সাথে শেষ কথার কয়েক ঘণ্টা পরই নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে রশি ছিঁড়ে নিচে পড়ে ৩৫ বছর বয়সী আজমের মৃত্যু হয়।
এরপর থেকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বামীকে হারিয়ে নির্বাক স্ত্রী, আর বাবার ফেরার অপেক্ষায় তিন সন্তান। বাড়িজুড়ে এখন শুধু কান্না আর অপেক্ষা।
জানা গেছে, কাতারের দোহায় একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন আজম। শনিবার রাতে শিফটে কাজ করার সময় হঠাৎ রশি ছিঁড়ে নিচে পড়ে যান তিনি। এ সময় সাথে থাকা আরও দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হন। তবে ঘটনাস্থলেই মারা যান আজম।
পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে কাতার প্রবাসী স্বজনদের মাধ্যমে আজমের মৃত্যুর খবর জানতে পারে তার পরিবার।
আজমের বড় ভাই মাতাব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা চার ভাই। সবার আলাদা সংসার। কিন্তু আজমের আয়েই তার স্ত্রী-সন্তানদের সংসার চলত। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছোট মেয়েটার বয়স মাত্র চার বছর। এখন ওরা কীভাবে চলবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে জীবিকার তাগিদে কাতার পাড়ি জমান আজম। প্রায় দুই বছর আগে তিন মাসের ছুটিতে সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন তিনি। এরপর আর দেশে ফেরা হয়নি তার।
স্বামীকে হারানোর খবর এখনো মেনে নিতে পারছেন না স্ত্রী সুলতানা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাত ৮টায় কল দিছিলাম। কইলো, গরমের লাগি রাতে কাম। ফিরা আইয়া কল দিমুনে। এরপর আর ফোন ধরে নাই। সকালে শুনি, আমার মানুষটাই নাই।
বাবার মৃত্যুর খবর বুঝে ওঠার আগেই তিন সন্তান মাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে- ‘আব্বা কবে আইবো?’ কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই সুলতানার কাছে।
রোববার সকালে আজমের বাড়িতে যান কুলাউড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. রুশন মিয়া। তিনি বলেন, খবর শুনে পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে গেছে। আজম খুব ভালো মানুষ আছিল। তার মৃত্যুতে পরিবারটি একেবারে চাপে পড়ে গেছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, তার লাশ যেন দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তান এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখেছিলেন আজম। কিন্তু কর্মস্থলের একটি দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নকে মুহূর্তেই থামিয়ে দিয়েছে।
প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ আবারও সামনে এনে দিয়েছে আজমের মৃত্যু। পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের আশায় হাজারো মানুষ বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু কর্মস্থলে দুর্ঘটনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু মুহূর্তেই একটি পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
আজমের লাশ দেশে আনা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিবারের দাবি, প্রিয় স্বজনের লাশ যেন শেষবারের মতো নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
যে মানুষটি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘রাতের কাজ শেষে ফিরে কল দেব’, তিনি আর ফেরেননি। রেখে গেছেন স্ত্রী ও তিন সন্তানকে, আর লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাড়িতে রেখে গেছেন এক অসমাপ্ত অপেক্ষা।
পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাইলে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারি সহায়তারও দাবি জানিয়েছে পরিবার।