নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে কাতারের সাবেক আমির প্রয়াত মহামান্য শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির স্মরণে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন আয়োজন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘে কাতারের স্থায়ী প্রতিনিধি শায়খা আলিয়া আহমেদ বিন সাইফ আল-থানি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সভায় জিসিসি (GCC), আরব গ্রুফ, ওআইসি (OIC) এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এর (NAM) প্রতিনিধিরাসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
আধুনিক কাতারের রূপকার ও দূরদর্শী নেতা
সভায় বক্তারা শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির বর্ণাঢ্য জীবন ও তার অসামান্য অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। সাধারণ পরিষদের সভাপতি তার বক্তব্যে কাতারের নেতৃত্ব, সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, শায়খ হামাদের ১৮ বছরের শাসনামলে কাতার শিক্ষা, বিজ্ঞান, জ্ঞানচর্চা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং ভোটাধিকার প্রদানে তার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মূল্যায়ন
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার বক্তব্যে প্রয়াত আমিরকে একজন ‘দূরদর্শী নেতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তার নেতৃত্বই কাতারকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি ও বিশ্বমঞ্চে একটি শক্ত অবস্থান এনে দিয়েছে। কূটনীতি, মধ্যস্থতা, শিক্ষা, জ্বালানি এবং গণমাধ্যমের বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে কাতারের আত্মপ্রকাশের পেছনে তার অবদান অনন্য।
মহাসচিব আরও বলেন, “শেখ হামাদ বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি দেশের প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক অর্জন দিয়ে মাপা যায় না, বরং শান্তি ও সংলাপের প্রতি তার অবদানই আসল পরিমাপক।” কাতারের জাতীয় ভিশন ২০৩০ এবং কাতার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় তার যুগান্তকারী বিনিয়োগের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও আঞ্চলিক জোটগুলোর শ্রদ্ধা
-
জিসিসি (GCC): বাহরাইনের স্থায়ী প্রতিনিধি জামাল ফারেস আলরোয়াইই জিসিসির পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, শেখ হামাদ তার জীবন ও মেধা কাতারের সেবা এবং আধুনিক রেনেসাঁ গঠনে উৎসর্গ করেছিলেন।
-
আরব গ্রুপ: ওমানের স্থায়ী প্রতিনিধি এটিকে কাতার ছাড়াও সমগ্র আরব ও ইসলামিক বিশ্বের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
-
ওআইসি (OIC): তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, শেখ হামাদ ইসলামী উম্মাহর অধিকার রক্ষা এবং বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
-
ন্যাম (NAM): উগান্ডার প্রতিনিধি সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও মধ্যস্থতার প্রবক্তা হিসেবে তার আন্তর্জাতিক অবদানের কথা তুলে ধরেন।
কাতারের স্থায়ী প্রতিনিধির বক্তব্য
জাতিসংঘে কাতারের স্থায়ী প্রতিনিধি শায়খা আলিয়া আহমেদ বিন সাইফ আল-থানি বলেন, এই বিশেষ অধিবেশন বিশ্বমঞ্চে মরহুম নেতার উচ্চ মর্যাদারই বহিঃপ্রকাশ। ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সালের শাসনামলে তিনি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে আধুনিক কাতার গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, শায়খ হামাদ কেবল দেশীয় উন্নয়নের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তিনি লেবাননের দোহা চুক্তি, দারফুর শান্তি চুক্তি এবং জিবুতি-ইরিত্রিয়া মধ্যস্থতাসহ আন্তর্জাতিক বহু বিরোধ নিষ্পত্তিতে কাতারকে বিশ্বস্ত আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছিলেন।
শায়খ হামাদের প্রদর্শিত শান্তি ও মানবকল্যাণের এই পথ ধরেই বর্তমান আমির মহামান্য শায়খ তামিম বিন হামাদ আল থানির নেতৃত্বে কাতার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।