ইরানের তিন পাইলটকে ছয় মাস ধরে আটক রাখার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে কাতার।
তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সূচনালগ্নে সামরিক অভিযানের সময় কাতারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হামলায় দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ওই পাইলটদের আটক করা হয়। তবে দোহা জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং পাইলটদের আটকের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় সামরিক অভিযানে ওই তিন পাইলটকে কাতার আটক করেছিল বলে দাবি করেছে ইরান। এরপর ছয় মাস ধরে তারা কাতারে বন্দি রয়েছেন বলেও জানিয়েছে তেহরান। ইরান ওই তিন পাইলটকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের দাবি, যুদ্ধের শুরুর দিকে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে ইরানি দুটি যুদ্ধবিমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আঘাতে ভূপাতিত হওয়ার পর পাইলটরা বিমান থেকে বেরিয়ে আসেন এবং কাতারের একটি সামরিক ঘাঁটিতে তাদের আটক করা হয়।আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রধানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরজাদেহ বলেন, পাইলট জাভাদ সালেহি, আবদুল মাজিদ দাশতিয়ান ও ইমরান বেহরোশিয়ান ছয় মাস ধরে বন্দি রয়েছেন।
তিনি জানান, একই অভিযানে নিহত চতুর্থ পাইলট মাজিদ কাজেমির মরদেহ ইরানের কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২ মার্চ যুদ্ধের তৃতীয় দিনে ওই অভিযানে তিনি নিহত হন।
তবে ইরানের এই দাবি ‘সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার’ করেছে কাতার। দোহা বলেছে, ইরানের এ ধরনের ‘বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে’ তারা বিস্মিত।ইরানের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বাঘেরজাদেহ দাবি করেন, যুদ্ধ অভিযানের সময় নিজেদের যুদ্ধবিমান থেকে বেরিয়ে আসার পর কাতারের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ওই তিন পাইলটকে আটক করা হয়।
ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিতে কাতারের বিরুদ্ধে ওই তিন পাইলটের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়। চিঠিটি আইসিআরসি প্রধান মিরজানা স্পোলিয়ারিচের কাছে পাঠানো হয়েছিল। এতে বলা হয়, পাইলটদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা আন্তর্জাতিক আইন ও বিধির পরিপন্থি।
চিঠিতে আরও দাবি করা হয়, ওই তিন পাইলটকে তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বা যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। তবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ মোহাম্মদ আল-আনসারি বলেন, ‘কাতারের আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর’ পাইলটদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তাদের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কাতারের ভূখণ্ড রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। আল-আনসারি আরও বলেন, কাতারের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাইলটদের মরদেহের সন্ধানে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে।
তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া এক পাইলটের মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে সমন্বয় করতে কাতার ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য কাতারের দেয়া আমন্ত্রণে তেহরান এখনও সাড়া দেয়নি।
কাতারের আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর কিছু ইরানি পাইলটকে আটক বা বন্দি করে রাখার দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করেছে কাতার।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ড. মাজেদ বিন মোহাম্মদ আল আনসারি এক বিবৃতিতে জানান, অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য ছড়ানোয় কাতার সরকার বিস্ময় প্রকাশ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মুখপাত্র আল আনসারি কাতার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের প্রকৃত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন:
কাতারি আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর এবং আকাশযানগুলোর বিপজ্জনক গতিপথ নিশ্চিত হয়ে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পাইলটদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে কোনো সাড়া না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক আইন ও সামরিক প্রোটোকল অনুসরণ করে ভূখণ্ড রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ড. আল আনসারি জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কাতারি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পেশাদারিত্বের সাথে পাইলটদের দেহাবশেষ উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে একজন পাইলটের দেহাবশেষ হস্তান্তরের বিষয়ে ইতোমধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও বিস্তারিত সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য কাতার সরকার গত এপ্রিল মাসে একটি ইরানি প্রতিনিধিদলকে দোহা সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানালেও ইরান এখনো সেই আমন্ত্রণে কোনো সাড়া দেয়নি।