১০ আগস্ট ২০২৬

দোহায় শেখ তামিম ও সুলতান হাইথামের ঐতিহাসিক বৈঠক

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২৬
দোহায় শেখ তামিম ও সুলতান হাইথামের ঐতিহাসিক বৈঠক

উপসাগরীয় দুই অনুজ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় মিলিত হয়েছেন কাতারের মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি এবং ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক। গত রবিবার দোহায় অবস্থিত আমিরি দিওয়ানে (Amiri Diwan) অনুষ্ঠিত এই সুসংহত বৈঠকে দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির সার্বিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়।

বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক পর্যালোচনা করার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করেন।

ঐতিহাসিক সম্পর্ক জোরদারে দৃঢ় অঙ্গীকার

আমিরি দিওয়ানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মহামান্য আমির কাতার ও ওমানের মধ্যকার গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দুই দেশের জনগণের যৌথ আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় কাতার সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উদার আতিথেয়তার জন্য কাতারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সংযোগকে আরও গতিশীল করতে এবং বিভিন্ন উদীয়মান খাতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনে ওমান সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা ও প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি

সুলতান হাইথাম বিন তারিকের এই সফরকে ঘিরে দোহায় ব্যাপক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়:

  • বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা: হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমিরি টার্মিনালে ওমানের সুলতান ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে সরাসরি স্বাগত জানান মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-খানি। সফর শেষে আমিরি হল থেকে সুলতানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ও জানান তিনি।

  • আমিরি মধ্যাহ্নভোজ: বৈঠক শেষে ওমানের সুলতান ও তাঁর সফরসঙ্গী উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সম্মানে আমিরি দিওয়ানে এক রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।

বৈঠক ও সংবর্ধনায় উপস্থিত শীর্ষ কর্মকর্তা:

  • কাতারের পক্ষে: উপ-প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শেখ সাউদ বিন আব্দুল রহমান আল-খানি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও লেখুইয়া প্রধান শেখ খলিফা বিন হামাদ আল-খানি, আমিরি দিওয়ানের প্রধান আব্দুল্লাহ বিন মোহাম্মদ আল-খুলাইফি, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাদ বিন শেরিদা আল-কাআবি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী শেখ ফয়সাল বিন থানি আল-খানি, পরিবহন মন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-খানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল-মুরাইখি এবং ওমানে নিযুক্ত কাতারি রাষ্ট্রদূত শেখ মুবারক বিন ফাহাদ আল-খানি।

  • ওমানের পক্ষে: মাস্কাটের গভর্নর সাইয়্যেদ বিলারাব বিন হাইথাম আল-সাইদ, রয়্যাল কোর্টের দেওয়ান মন্ত্রী সাইয়্যেদ খালিদ বিন হিলাল আল-বুসাইদি, রয়্যাল অফিসের মন্ত্রী জেনারেল সুলতান বিন মোহাম্মদ আল-নুমানি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ হামুদ বিন ফয়সাল আল-বুসাইদি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী সেলিম বিন নাসের আল-আউফি সহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত।

সুলতান হাইথাম বিন তারিকের এই গুরুত্বপূর্ণ কাতার সফর দুই জিসিসি (GCC) দেশের মধ্যকার বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সমন্বয়কে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিড়াল কেনা নয়, দত্তক নিন! সংকট নিরসনে কাতার উদ্ধারকারীদের বিশেষ বার্তা

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২৬
বিড়াল কেনা নয়, দত্তক নিন! সংকট নিরসনে কাতার উদ্ধারকারীদের বিশেষ বার্তা

কাতারে গৃহহীন ও বিপথগামী বিড়ালদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য প্রতিটি উদ্ধার অভিযান যেন দীর্ঘ সংগ্রামের এক একটি কষ্টকর অধ্যায়। আহত, ক্ষুধার্ত কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার বিড়ালদের রক্ষা করতে রাতদিন কাজ করে গেলেও স্থানীয় প্রাণী উদ্ধারকারী ও স্বেচ্ছাসেবীরা একটি বিষয়ে একমত—কেবল বিড়াল উদ্ধার করে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়; বরং শুরুতেই বিড়ালদের রাস্তায় আসা ও বংশবৃদ্ধি করা বন্ধ করতে হবে।

এই লক্ষ্যে কাতার জুড়ে গড়ে উঠেছে একটি নতুন আন্দোলন, যেখানে বিড়ালের বন্ধ্যাকরণ (Sterilization/Neutering) এবং কেনাকাটার পরিবর্তে দত্তক গ্রহণকে (Adoption) মূল সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বেচ্ছাসেবকদের মানবিক অভিজ্ঞতা ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ

দোহার বাসিন্দা এবং সাত বছর ধরে স্বাধীনভাবে প্রাণী উদ্ধারে যুক্ত ইরিনা তিমোশেঙ্কো বর্তমানে নিজের বাড়িতেই প্রায় ৭২টি বিড়ালের যত্ন নিচ্ছেন। অসুস্থ ও আহত বিড়ালদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলা, বন্ধ্যাকরণ ও টিকা দেওয়ার পর তাদের দত্তক নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই তাঁর প্রধান কাজ।

  • বিপুল আর্থিক ও মানসিক চাপ: তিমোশেঙ্কো জানান, বিড়ালদের খাবারের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১,৫০০ রিয়াল খরচ হলেও সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কা আসে চিকিৎসা খরচে। গত দুই মাসেই গুরুতর আহত ও সংক্রমণে ভোগা ১৩টি বিড়ালের চিকিৎসার জন্য তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ২৪,০০০ কাতারি রিয়াল।

  • সাহায্যের তাগিদ: আর্থিক ও মানসিক চাপ থাকা সত্ত্বেও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

একইভাবে দোহার বাসিন্দা সাবিনা হুসেইনোভা বিপথগামী বিড়াল ও কুকুরদের খাবার দেওয়া এবং বন্ধ্যাকরণের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১,০০০ রিয়াল ব্যয় করছেন। তিনি মনে করেন, প্রাণীদের মূল এলাকা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর না করে বন্ধ্যাকরণ করাই তাদের বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই উপায়।

প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলোর বার্তা ও 'TNR' কৌশল

কাতারের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রাণী কল্যাণ সংস্থা এই সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছে:

  • 'টিএনআর কাতার' (TNR Qatar): সংস্থাটির কর্মকর্তা শার্লটের মতে, "আশ্রয় দিয়ে বা দত্তক দিয়ে হাজার হাজার বিড়ালের সংকট মেটানো যাবে না, সমাধান লুকিয়ে আছে টিএনআর (Trap-Neuter-Return) কর্মসূচিতে।" তাঁরা অধিবাসীদের বন্ধ্যাকরণে পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং বিড়াল ও কুকুরের বাধ্যতামূলক সরকারি নিবন্ধনের দাবি জানান।

  • 'দ্য পার্ল অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার' (The Pearl Animal Welfare): সংস্থাটি জানিয়েছে, স্থানান্তরের সময় পোষা প্রাণীদের পরিত্যক্ত না করা এবং দোকান থেকে কেনার বদলে উদ্ধারকৃত বিড়ালদের দত্তক নেওয়াই দায়িত্বশীল পোষ্য পালনের প্রধান শর্ত।

  • 'স্ট্রিটস অব স্ট্রে' (Streets of Stray): সাধারণ বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে সংস্থাটি আহ্বান জানিয়েছে—অঞ্চল পরিষ্কার রেখে স্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া, তীব্র গ্রীষ্মে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা এবং পশুচিকিৎসার খরচে সহায়তা করার মাধ্যমে যে কেউ এই মানবিক কাজে শরিক হতে পারেন।

মূল প্রস্তাবনা ও আইনি নজরদারির দাবি

উদ্ধারকারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাতার সরকারের নজরদারি এবং অধিবাসীদের থেকে কয়েকটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন: ১. ‘ট্র্যাপ-নিউটার-রিটার্ন’ (TNR) কর্মসূচির ব্যাপক প্রসার: বিপথগামী বিড়ালদের ধরে বন্ধ্যাকরণ শেষে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া।

২. কঠোর আইনি পদক্ষেপ: পোষা প্রাণীর দোকান ও ব্রিডারদের ওপর নজরদারি এবং মালিকদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন।

৩. পরিত্যাগের প্রবণতা বন্ধ করা: দেশ ত্যাগ বা বাসা বদলের সময় পোষা প্রাণী রেখে যাওয়ার মানসিকতা দূর করা।

পশুদের যত্ন এবং পরিচ্ছন্ন সম্প্রদায়ের সুরক্ষা—দুটি বিষয়ই একে অপরের পরিপূরক। সচেতনতা বৃদ্ধি, বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি জোরদার এবং পোষা প্রাণী দত্তক নেওয়ার মানসিকতা তৈরির মাধ্যমেই কেবল কাতারে গৃহহীন প্রাণীদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

কাতার-ওমান কূটনৈতিক সম্পর্ক:

অর্ধশতকের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২৬
অর্ধশতকের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়

কাতার এবং ওমান সালতানাতের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক কেবল স্বাভাবিক কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কের নিদর্শন নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের গভীর সহযোগিতা, বিশ্বাস, যৌথ ধর্ম, ভাষা এবং অভিন্ন ভবিষ্যতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক মজবুত বন্ধন। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং জনগণের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার এই সম্পর্ককে দিন দিন আরও গতিশীল করে তুলছে।

সম্পর্কের সূত্রপাত ও ঐতিহাসিক ভিত্তি

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে কাতার ও ওমানের আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

  • ১৯৭৩ সাল: ওমান সালতানাতে কাতারের প্রথম রাষ্ট্রদূত নিয়োগের জন্য একটি আমিরি ডিক্রি জারি করা হয়।

  • ১৯৭৪ সাল: দোহায় কাতারের কাছে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করেন ওমানের প্রথম রাষ্ট্রদূত।

তবে এই কূটনৈতিক মাইলফলকটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার ফল ছিল না; এটি ছিল ভৌগোলিক নৈকট্য এবং যৌথ আরব ও ইসলামিক পরিচয়ে গড়ে ওঠা দুই দেশের শতবর্ষের সামাজিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা।

শীর্ষ পর্যায়ের সফর ও কৌশলগত অগ্রগতি

দুই দেশের নেতৃত্বের পারস্পরিক সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সুদূরপ্রসারী এবং শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে:

  • অক্টোবর ২০১৩: মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির মাস্কাট সফর।

  • নভেম্বর ২০২১: ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের ঐতিহাসিক দোহা সফর।

  • জানুয়ারি ২০২৫: মহামান্য আমিরের পুনরায় ওমান সফর।

এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সফরগুলোর মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, পর্যটন ও পরিবহন খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) ও নির্বাহী কর্মসূচি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন দিগন্তে নিয়ে গেছে।

রাজনৈতিক সমন্বয় ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিরতা

১৯৮১ সালে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কাতার ও ওমান এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এক হয়ে কাজ করছে। আঞ্চলিক যেকোনো সংকট নিরসনে দোহা ও মাস্কাট সর্বদা মধ্যস্থতা, সংলাপ এবং বিচক্ষণ কূটনৈতিক নীতিতে বিশ্বাসী।

  • আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা: হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং ইরান সংক্রান্ত আলোচনা সহ অঞ্চলের উত্তেজনা কমাতে দুই দেশ প্রতিনিয়ত পরামর্শ বিনিময় করে।

  • অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: ফিলিস্তিন ইস্যু সহ অন্যান্য প্রধান আরব ও ইসলামিক সংকটে কাতার ও ওমানের অবস্থান সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন।

  • জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ: বিশ্বশান্তি ও টেকসই উন্নয়নের পক্ষে দুই দেশই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যপন্থী ও দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

'কাতার-ওমান যৌথ কমিটি' ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৯৫ সালে 'কাতার-ওমান যৌথ কমিটি' গঠিত হয়, যার ১ম অধিবেশন ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে দোহায় অনুষ্ঠিত হয় এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এর ২৩তম অধিবেশন। এই কমিটি কৃষি, জ্বালানি, যোগাযোগ, পরিবহন, পর্যটন, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগের চিত্র:

  • দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য: ২০২৩ সাল শেষে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১১৩ বিলিয়ন ওমানি রিয়াল (প্রায় ২.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ২০২৪ সালের নভেম্বর শেষে তা দাঁড়ায় প্রায় ৯৫১ মিলিয়ন ওমানি রিয়ালে।

  • বিনিয়োগ বৃদ্ধি: ওমানে কাতারি বিনিয়োগ ২০২৩ সালের শেষের দিকে ১২% বৃদ্ধি পেয়ে ৭৩০ মিলিয়ন ওমানি রিয়ালে পৌঁছেছে (যেটি ২০২২ সালে ছিল ৬৫২ মিলিয়ন রিয়াল)। উৎপাদনী শিল্প, সেবা, পর্যটন ও আবাসন খাতে প্রায় ১৫টি বৃহৎ কাতারি প্রতিষ্ঠান ওমানে কাজ করছে। অন্যদিকে, কাতারের বাজারে শত শত ওমানি প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এই উদীয়মান অর্থনৈতিক সহযোগিতা 'কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০' এবং 'ওমান ভিশন ২০৪০'-এর লক্ষ্যমাত্রা (বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস ও পর্যটন) অর্জনে সরাসরি সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মেলবন্ধন

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি কাতার ও ওমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সুসংগঠিত। দুই দেশই 'জিসিসি সাংস্কৃতিক কৌশল ২০২০-২০৩০'-এর আওতায় শিল্প, সঙ্গীত, থিয়েটার, প্রকাশনা এবং অমূর্ত ঐতিহ্য সংরক্ষণে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

  • দোহা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৪: ২০২৪ সালের দোহা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ওমান সালতানাতকে ‘গেস্ট অফ অনার’ (Guest of Honour) বা সম্মানিত অতিথি হিসেবে নির্বাচন করা হয়, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক নৈকট্যের গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।

সংক্ষেপে, কাতার-ওমান সম্পর্ক হলো প্রজ্ঞা, মধ্যপন্থা এবং যৌথ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এক অনন্য উপসাগরীয় সফলতার গল্প। শীর্ষ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা ও জনগণের আকুণ্ঠ সমর্থনে আগামী দিনে বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ এবং টেকসই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই সম্পর্ক সমগ্র জিসিসি অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির নতুন বার্তা নিয়ে আসবে।

দোহায় শেখ তামিম ও সুলতান হাইথামের ঐতিহাসিক বৈঠক

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২৬
দোহায় শেখ তামিম ও সুলতান হাইথামের ঐতিহাসিক বৈঠক

উপসাগরীয় দুই অনুজ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় মিলিত হয়েছেন কাতারের মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি এবং ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক। গত রবিবার দোহায় অবস্থিত আমিরি দিওয়ানে (Amiri Diwan) অনুষ্ঠিত এই সুসংহত বৈঠকে দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির সার্বিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়।

বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক পর্যালোচনা করার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করেন।

ঐতিহাসিক সম্পর্ক জোরদারে দৃঢ় অঙ্গীকার

আমিরি দিওয়ানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মহামান্য আমির কাতার ও ওমানের মধ্যকার গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি দুই দেশের জনগণের যৌথ আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় কাতার সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উদার আতিথেয়তার জন্য কাতারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সংযোগকে আরও গতিশীল করতে এবং বিভিন্ন উদীয়মান খাতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনে ওমান সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা ও প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি

সুলতান হাইথাম বিন তারিকের এই সফরকে ঘিরে দোহায় ব্যাপক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়:

  • বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা: হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমিরি টার্মিনালে ওমানের সুলতান ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে সরাসরি স্বাগত জানান মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-খানি। সফর শেষে আমিরি হল থেকে সুলতানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ও জানান তিনি।

  • আমিরি মধ্যাহ্নভোজ: বৈঠক শেষে ওমানের সুলতান ও তাঁর সফরসঙ্গী উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সম্মানে আমিরি দিওয়ানে এক রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।

বৈঠক ও সংবর্ধনায় উপস্থিত শীর্ষ কর্মকর্তা:

  • কাতারের পক্ষে: উপ-প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শেখ সাউদ বিন আব্দুল রহমান আল-খানি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও লেখুইয়া প্রধান শেখ খলিফা বিন হামাদ আল-খানি, আমিরি দিওয়ানের প্রধান আব্দুল্লাহ বিন মোহাম্মদ আল-খুলাইফি, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাদ বিন শেরিদা আল-কাআবি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী শেখ ফয়সাল বিন থানি আল-খানি, পরিবহন মন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-খানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল-মুরাইখি এবং ওমানে নিযুক্ত কাতারি রাষ্ট্রদূত শেখ মুবারক বিন ফাহাদ আল-খানি।

  • ওমানের পক্ষে: মাস্কাটের গভর্নর সাইয়্যেদ বিলারাব বিন হাইথাম আল-সাইদ, রয়্যাল কোর্টের দেওয়ান মন্ত্রী সাইয়্যেদ খালিদ বিন হিলাল আল-বুসাইদি, রয়্যাল অফিসের মন্ত্রী জেনারেল সুলতান বিন মোহাম্মদ আল-নুমানি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ হামুদ বিন ফয়সাল আল-বুসাইদি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী সেলিম বিন নাসের আল-আউফি সহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত।

সুলতান হাইথাম বিন তারিকের এই গুরুত্বপূর্ণ কাতার সফর দুই জিসিসি (GCC) দেশের মধ্যকার বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সমন্বয়কে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্বের ১১টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করে ইতিহাস গড়লেন কাতারি পর্বতারোহী শেইখা আসমা

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২৬

বিশ্বের ১১টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করে ইতিহাস গড়লেন কাতারি পর্বতারোহী শেইখা আসমা

কাতারি ও সামগ্রিকভাবে আরব নারীদের জন্য অ্যাডভেঞ্চার ও পর্বত আরোহণে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন কাতারের বিখ্যাত পর্বতারোহী শেইখা আসমা বিনতে থানি আল-থানি। বিশ্বের ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার চরম সংকটপূর্ণ ১৪টি পর্বতের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১১টি সফলভাবে জয় করেছেন তিনি।

গতকাল (৯ আগস্ট ২০২৬) 'টিম কাতার' (Team Qatar) আনুষ্ঠানিকভাবে শেখা আসমার এই অনন্য ও ঐতিহাসিক অর্জনের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।

সর্বশেষ সাফল্য: কারাকোরামের ‘গাশেরব্রাম-২’ জয়
টিম কাতারের তথ্য অনুযায়ী, শেইখা আসমা আল-থানির সর্বশেষ বিশ্বজয়ী অভিযানটি ছিল পাকিস্তান ও চীন সীমান্তে বিস্তৃত কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত অন্যতম দুর্গম পর্বত ‘গাশেরব্রাম-২’ (Gasherbrum II)। প্রতিকূল আবহাওয়া কাটিয়ে তিনি সফলভাবে এই পর্বতের চূড়ায় পৌঁছান।

বিশ্বের সর্বোচ্চ ১৪টি শৃঙ্গ জয়ের যে চূড়ান্ত স্বপ্ন তিনি দেখছেন, এই জয়ের মাধ্যমে তিনি তার লক্ষ্যমাত্রার আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন।

কেন এই অর্জন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ?
৮,০০০ মিটারের চেয়ে বেশি উচ্চতার এই পর্বতগুলোকে এভিয়েশনের ভাষায় এবং পর্বতারোহীদের কাছে "ডেথ জোন" (Death Zone) বলা হয়।

মৃত্যুকূপ বা ডেথ জোন: এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

প্রতিকূল পরিবেশ: চরম তুষারঝড়, ভয়াবহ মাইনাস তাপমাত্রা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে পর্বতারোহীদের পথ চলতে হয়।

এমন বিপজ্জনক ডেথ জোন অতিক্রম করে একের পর এক শৃঙ্গ জয় করা শেখা আসমার অদম্য সাহস, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক শক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শেইখা আসমা বিনতে থানি আল-থানির এই ধারাবাহিক সাফল্য কেবল কাতারের ক্রীড়া ইতিহাসকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং সমগ্র আরব বিশ্বের নারীদের জন্য নতুন উচ্চতা ছোঁয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।

কাতারের সরকারি সেবার মান যাচাইয়ে গ্রাহক সন্তুষ্টি জরিপ চালু!

প্রকাশ: রবিবার, আগস্ট ০৯, ২০২৬
কাতারের সরকারি সেবার মান যাচাইয়ে গ্রাহক সন্তুষ্টি জরিপ চালু!

কাতারের সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিষেবা গ্রহীতাদের অভিজ্ঞতার মান যাচাই এবং সন্তুষ্টির মাত্রা পরিমাপের লক্ষ্যে একটি বৃহৎ সমীক্ষার (Customer Satisfaction Survey) আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়েছে। গত ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দেশটির 'জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদ' (National Planning Council), 'বেসামরিক পরিষেবা ও সরকারি উন্নয়ন ব্যুরো'র (Civil Service and Government Development Bureau) সাথে যৌথ সমন্বয়ে এই সমীক্ষা চালুর ঘোষণা দেয়।

প্রদত্ত সরকারি পরিষেবার সার্বিক মূল্যায়ন এবং নাগরিকদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সেবা খাতকে আরও আধুনিকায়ন করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

সমীক্ষার লক্ষ্য ও ‘তৃতীয় জাতীয় উন্নয়ন কৌশল’

জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদ সূত্রে জানানো হয়, সরকারি পরিষেবার গুণগত মান সম্পর্কে সরাসরি সেবাগ্রহীতাদের গঠনমূলক মতামত ও অভিজ্ঞতা শনাক্ত করাই এই জরিপের প্রধান লক্ষ্য। এই উদ্যোগটির সাফল্য কাতারের রূপকল্প বাস্তবায়নে ঘোষিত 'তৃতীয় জাতীয় উন্নয়ন কৌশল' (Third National Development Strategy)-এর লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি বিশেষ অবদান রাখবে।

জনগণের অংশগ্রহণের সুফল ও গুরুত্ব:

  • পরিষেবার মানোন্নয়ন: রাষ্ট্রীয় পরিষেবাগুলোর মানধারায় ধারাবাহিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

  • গ্রাহক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধকরণ: সাধারণ নাগরিক ও বাসিন্দাদের দৈনন্দিন সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ ও গতিশীল করা।

  • উদ্ভাবন ও দক্ষতা: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিত্যনতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

জনসাধারণের প্রতি আহ্বান:

সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ নাগরিক, বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের এই সমীক্ষায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে তাঁদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও মতামত শেয়ার করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। জনগণের এই সুনির্দিষ্ট মতামত কাতার সরকারের প্রতিটি ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবাকে আরও বিশ্বমানের করে তুলতে সরাসরি সাহায্য করবে।