ইরানের সঙ্গে চলমান তীব্র যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ 'হরমুজ প্রণালী'-কে খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন নজিরবিহীন বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্কের 'পুলিশ একাডেমি সেন্টার ফর ট্রেনিং অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স'-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় ট্রাম্প বলেন, "খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছি।"
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি ট্রাম্পের দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখান করে বলেন:
"হরমুজ প্রণালী ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবেই ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে।"
ঘারিবাবাদি আরও জোর দিয়ে দাবি করেন, ইরানের ‘কৌশলগত পরাজয়’ প্রতিপক্ষ মেনে না নেওয়া পর্যন্ত এই প্রণালীর ওপর তেহরানের অবরোধ অব্যাহত থাকবে। একই সাথে কখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হবে কিংবা পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে—সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও ইরানই নেবে।
দুই দেশের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কারণে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। জ্বালানি ও পরিবহন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী:
-
জাহাজ চলাচলের ধস: শুক্রবার মাত্র দুটি সাধারণ জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করতে পেরেছে এবং কোনো ধরনের অপরিশোধিত তেলবাহী (ক্রুড অয়েল) ট্যাঙ্কার প্রণালীতে প্রবেশ করেনি। এর আগে বৃহস্পতিবার নয়টি এবং বুধবার মাত্র পাঁচটি জাহাজ এই পথ পার হয়েছিল।
-
স্বাভাবিক সময়ের বৈপরীত্য: বর্তমান সংকট শুরুর আগে অর্থাৎ যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টির পূর্বে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টিরও বেশি বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল করত। এমনকি চলতি আগস্ট মাসের শুরুতেও গড়ে দিনে ১২টি করে জাহাজ চলাচল করছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ কঠোরভাবে কার্যকর করতে তারা টানা অভিযান চালাচ্ছে। সেন্টকমের তথ্য মতে, গত ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তাদের নৌবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে মোট ৬২টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, ৩টি জাহাজকে অচল করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন ২টি জাহাজে সরাসরি উঠে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
বর্তমানে এই প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চাপ অব্যাহত রেখেছে, বিপরীতে ইরান ওই জলসীমায় নিজেদের সার্বভৌম আধিপত্য বজায় রাখতে অনড়। চরম সামরিক উত্তেজনার পরও দুই দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের কূল-কিনারা বা আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না।