তুরস্ক সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গোপনে বিমান পরিবর্তনের খবর চাউর হতেই বিশ্ব রাজনীতি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সামরিক শক্তির ভয়েই ট্রাম্প এমন অভূতপূর্ব ও নাটকীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন দাবি করে ঘটনাটিকে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ভরিয়ে দিচ্ছে ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই তড়িঘড়ি ও গোপনীয়তাকে ট্রাম্পের জন্য চরম ‘অপমান ও লাঞ্ছনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে তেহরান।
ঘটনার সূত্রে জানা গেছে, নেটো সম্মেলনে যোগ দিতে আঙ্কারায় অবস্থান করছিলেন ট্রাম্প। সফরের শেষ দিনে মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পারেন যে, প্রেসিডেন্টকে বহনে ব্যবহৃত বিশেষ বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় পরিণত হতে পারে। এই হামলাকে তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ট্রাম্পকে অত্যন্ত গোপনে একটি ছোট সি-৩২এ বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তুরস্ক সফরকালে ট্রাম্প যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন, তা তো বটেই—এমনকি তিনি কত তলার কক্ষে ছিলেন তা-ও ইরানের কাছে নির্ভুলভাবে জানা ছিল। এই তথ্য ফাঁসের পর মার্কিন প্রশাসন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গত ৮ জুলাই তুরস্ক ত্যাগের সময় ট্রাম্প এবং তার হাতে গোনা কয়েকজন সফরসঙ্গীকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সরিয়ে একটি খাদ্য সরবরাহকারী ট্রাকে করে ছোট বিমানে তোলা হয়। অন্যদিকে, মূল এয়ার ফোর্স ওয়ানে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, হোয়াইট হাউসের কর্মীবৃন্দ এবং সফররত সাংবাদিকদের নিয়ে সাধারণ নিয়মেই আলাদাভাবে উড্ডয়ন করানো হয়।
মার্কিন প্রশাসনের এই চরম আতঙ্ককে ঘিরে ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাস তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে লিখেছে, ‘খুব শিগগিরই ট্রাম্প ডাস্টবিনে গিয়ে লুকোবেন।’ সঙ্গে খাবারভর্তি বাক্সের মধ্যে ট্রাম্পের একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করা হয়, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। তা ছাড়া, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে টাঙানো বিলবোর্ড ও ম্যুরালে ট্রাম্পের কফিনে শোয়া কিংবা সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার ছবি এঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলকে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলমান যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইতিমধ্যেই প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক উপপরিচালক আলী ওয়ায়েজ এ বিষয়ে বলেন, ইরানি কট্টরপন্থীরা যারা দেশের সর্বোচ্চ নেতা এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে রয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই ভয় এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখে বেশ আনন্দ পাচ্ছে।
তবে বিমান পরিবর্তন বা মার্কিন নথির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি তেহরান এবং এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালেও ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে এক ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ অভিযোগ গঠন করেছিল, যা তেহরান সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গভীর অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
২০১৮ সালে ইরাকের আল-আসাদ ঘাঁটিতে নিজের গোপন সফরের কথা স্মরণ করে ট্রাম্প নিজেই একবার বলেছিলেন, অন্ধকারের মধ্যে বাতি নিভিয়ে, জানালা বন্ধ করে বিমানে ভ্রমণ করার ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি। সব মিলিয়ে ইরানের ভয়ে ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন ক্যাটারিং ট্রাকে করে বিমান বদলের ঘটনা মার্কিন সামরিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে নতুন করে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল।