তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত 'মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট' (Makkah Joint Deterrence Agreement) কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও পুরো মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোয় এক নতুন মাইলফলক রচিত হয়েছে। ঐতিহাসিক এই সমঝোতাকে কেবল তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জোটে আরও বেশি সংখ্যক মুসলিম দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে এর পরিধি বহুগুণ বাড়াতে চায় আঙ্কারা।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এই জোটকে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ছাতার রূপ দেওয়া হবে।
কী রয়েছে 'মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স' চুক্তিতে?
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পূর্ববর্তী প্রতিরক্ষা সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই চুক্তির প্রধান প্রধান দিকগুলো হলো:
-
যৌথ প্রতিরক্ষার নীতি: জোটের যেকোনো একটি দেশের ওপর বাইরের যেকোনো সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
-
পরামর্শ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত: সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে ঠিক কোন পদ্ধতিতে, কতখানি এবং কী ধরনের সামরিক বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে—তা তাৎক্ষণিক ট্রিপক্ষীয় পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
-
কাউকে লক্ষ্য না করা: তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, কোনো দেশ আক্রান্ত না হলে অন্য কোনো রাষ্ট্রকে এই জোটের হুমকি হিসেবে ধরা হবে না। এছাড়া ন্যাটোর (NATO) সক্রিয় সদস্য তুরস্ক এবং সৌদি আরব স্পষ্ট করেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ (যেমন: ইরান)-কে লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং এটি বিদ্যমান কৌশলগত জোটের বিকল্প নয়।
পরবর্তী সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে কাদের নাম আলোচনায়?
তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির পরবর্তী ধাপে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দেশের অন্তর্ভুক্তির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে:
| সম্ভাব্য সদস্য দেশ | যোগদানের সম্ভাবনা ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট |
| মিসর | পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মতে, মিসর এই জোটের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’। কায়রোকে নিয়ে 'আর-৪' (R-4) ফ্রেমওয়ার্কে কাজ চলছে। কারিগরি কিছু বিষয় সমাধান হলেই মিসর এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে পারে, যা জোটের সামরিক কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। |
| কাতার | সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা ও সেপ্টেম্বরে দোহায় ইসরায়েলের হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারে কাতারকে সবচেয়ে স্বাভাবিক সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি জিসিসির সকল দেশকে এতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। |
| কুয়েত | কাতার ও কুয়েত উভয় দেশেরই তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয় দেশই নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত যৌথ গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা নিশ্চিতে আগ্রহী। |
| অন্যান্য দেশ | কৌশলগত কারণে আজারবাইজান, জর্ডান এবং নতুন গতিপথের সিরিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সীমিত বা পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে যুক্ত হতে পারে। |
মিসরের যোগদানে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
বিশ্লেষকদের মতে, মিসরের সামনে কিছু আইনি ও কূটনৈতিক বাধা রয়েছে:
১. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংক্রান্ত নীতি: কায়রো এমন কোনো কঠোর সামরিক বাধ্যবাধকতায় যাবে না যা ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সম্পর্ক, বিদ্যমান সামরিক সহায়তা এবং পূর্বের শান্তিকৌশলকে সংকটে ফেলে।
২. নিজেদের শর্ত ও অবস্থান: লিবিয়া বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের অবস্থান কিংবা অন্য দেশের যুদ্ধে সরাসরি সেনা পাঠানোর মতো বাধ্যবাধকতা এড়াতে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে কায়রো।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ন্যাটোর মতো কঠোর কোনো একীভূত সামরিক কমান্ড অর্গানাইজেশন হবে, নাকি 'ইচ্ছুক দেশগুলোর' (Coalition of the Willing) একটি নমনীয় কিন্তু কার্যকর আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠবে—তা নির্ভর করবে আগামী দিনে মিসর, কাতার ও কুয়েতের আনুষ্ঠানিক যোগদানের ওপর। তবে এটি যে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কৌশলগত শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।
(তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সি)