ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তার প্রয়াত পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির চেয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়ে বহুগুণ বেশি আগ্রহী বলে মনে করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ বিষয়ে বাবার নীতি বদলে নিজের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছেন মোজতবা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, প্রকাশ্য মঞ্চে মোজতবা খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের পক্ষে সরাসরি কোনো অবস্থান না নিলেও, তিনি এবং তেহরানের বর্তমান কট্টরপন্থী নেতৃত্ব ইরানকে পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত করতে বেশ আগ্রহী।
মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলার মুখে তেহরানের এই সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ও আগ্রাসী পদক্ষেপের এক মারাত্মক বিপরীতমুখী পরিণতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ইরান শাসন করা তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আলি খামেনির শাসনামলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে প্রযুক্তিগতভাবে বেশ দূর এগিয়ে নেওয়া হলেও, তিনি ব্যক্তিগতভাবে পারমাণবিক বোমা বা মারণাস্ত্র নির্মাণের নীতিগত বিরোধী ছিলেন।
তবে তার মৃত্যুর পর দেশটির ক্ষমতার শীর্ষভাগে আসা তার পুত্র মোজতবা খামেনি এবং নতুন নেতৃত্ব সেই দীর্ঘদিনের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন বলে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। যদিও চলতি সংঘাতের সময় মোজতবা খামেনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং এরপর থেকে তার জনসমক্ষে আসা অনেকটাই কমে গেছে, তবু তিনিই বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের আসনে সমাসীন।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আয়াতুল্লাহ মোজতবার মানসিকতা ও চিন্তাভাবনা-সংক্রান্ত বেশির ভাগ তথ্যই বর্তমান সংঘাত শুরুর আগে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তার বাবা যে নিরঙ্কুশ ও একক কর্তৃত্ব ভোগ করতেন, মোজতবা এখনো সেই সমপর্যায়ের প্রভাব তৈরি করতে পারেননি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার মেরুকরণের পাশাপাশি মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত।
একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরোক্ষ দর-কষাকষিতেও ইরান এক অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন রূপ ধারণ করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন, ঠিক তখনই আমেরিকান গোয়েন্দাদের এই নতুন মূল্যায়ন প্রকাশিত হলো।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবার পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের এই নতুন সম্ভাবনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইরানে সামরিক অভিযান বাড়ানোর আরও একটি অতিরিক্ত যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছে।
মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ইরান এখন পর্যন্ত তাদের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় চালু করেনি। তবে আমেরিকান বিমান হামলার হাত থেকে নিজেদের অবশিষ্ট পারমাণবিক সম্পদ ও পরিকাঠামো রক্ষা করতে তেহরান অত্যন্ত সতর্ক ও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এর অংশ হিসেবে তারা ইতিমধ্যে বেশ কিছু স্পর্শকাতর সেনট্রিফিউজ স্থানান্তর করতে শুরু করেছে। মধ্য ইরানের একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সে এসব পারমাণবিক সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যা মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা মহলে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত।
সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন তেহরানকে পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে দেওয়ার বদলে বরং তাদের দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথেই চালিত করছে।