“আমার মাইয়াডা ওমানের হাসপাতালে মৃত্যুর লগে লড়ছে। আমি অন্ধ মানুষ বাবা… শেষবারের মতো আমার মাইয়াডারে ধইরা দেখবার চাই। আমার মাইয়াডারে দেশে আইনা দেন!”
চোখে আলো নেই, কিন্তু ওমানের হাসপাতালের হিমশীতল বিছানায় কাতরাতে থাকা সন্তান সুমি আক্তারের কষ্ট যেন হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে অনুভব করছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মা জয়নব খাতুন। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বাইটকামারী এলাকার এই বৃদ্ধা।
পাঁচ মাস ধরে ওমানের সোহার এলাকার একটি সরকারি হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন সুমি। পরিবারের অভিযোগ, স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনে পঙ্গুপ্রায় হয়ে হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকা সুমি এখন আর ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না, কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। আর এই মুমূর্ষু অবস্থাতেই তাঁকে বিদেশের মাটিতে একাকী ফেলে সুচতুরভাবে দেশে পালিয়ে এসেছে পাষণ্ড স্বামী।
প্রায় পাঁচ বছর আগে পাশের দক্ষিণ টাপুর চর এলাকার ওমানপ্রবাসী মো. বাবু রায়হানের সঙ্গে সুমির বিয়ে দেন দিনমজুর বাবা সাইদুর রহমান। বিয়ের পর সুমিকে ওমানে নিয়ে যান বাবু। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরপরই শুরু হয় চরম নিগ্রহ।
পরিবারের কাছে পাঠানো দুটি ভয়েস বার্তায় সুমি নিজের আকুতি জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে প্রতিদিন তাঁকে মারধর করতেন। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সুমিকে মেঝেতে ফেলে পেটে ও কোমরে নির্মমভাবে লাথি মারা হতো। স্বামীর এমন নির্যাতনে গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার পর থেকেই সুমির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অচল হতে শুরু করে।
গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে ওমানের সোহারের একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েই দেশে সটকে পড়েন স্বামী বাবু রায়হান। শুধু তা-ই নয়, প্রবাসীরা সুমির চিকিৎসার জন্য যে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছিলেন, সেই অর্থও আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে বাবুর বিরুদ্ধে। চিকিৎসাধীন স্ত্রীকে ফেলে আসার কারণ জানতে চাইলে কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই বাবু দাবি করেন, “ওটা তো বাংলাদেশ না যে চাইলেই থাকতে পারব, তাই চলে আসছি।” একই সাথে মারধরের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
বর্তমানে ওমানের ওই হাসপাতালে কর্মরত এক বাংলাদেশি নারী সুযোগ পেলে ভিডিও কলে সুমিকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখান। বাবা সাইদুর রহমান অশ্রুসজল চোখে বলেন, “আমার মেয়ে কথা বলতে পারে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। আমরা কথা বললে নিঃশব্দে শোনে।”
নিঃস্ব দিনমজুর বাবা ও অন্ধ মায়ের পক্ষে সুমিকে নিজস্ব খরচে দেশে ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাহায্য তো দূরের কথা, স্থানীয় থানায় গিয়েও কোনো আইনি সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ পরিবারটির।
তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুমির পরিবার ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে’ লিখিত আবেদন করলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাঁকে অতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এক অন্ধ মায়ের বুকের হাহাকার আর দিনমজুর বাবার অসহায় অশ্রু—এখন কেবলই একটি অলৌকিক অপেক্ষায়। তাঁদের একটাই আকুল আকুতি, সরকারি ও মানবিক হস্তক্ষেপে যেন সুমিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জীবনের আলো হারিয়ে যাওয়া সেই অন্ধ মা যেন শেষবারের মতো অন্তত সুস্থভাবে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন তাঁর কলিজার টুকরো সন্তানকে।