বিশ্বকে দেখার প্রচলিত মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলক চিত্র আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা তুলনামূলকভাবে বড় এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আগের চেয়ে ছোট দেখাবে।
শুক্রবারের (৪ সেপ্টম্বর) ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
জাতিসংঘের প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলোকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘মারকেটর প্রজেকশন’-এর পরিবর্তে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর সমুদ্রপথে নৌ চলাচল সহজ করার উদ্দেশ্যে যে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, সেটিই বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত বিশ্ব মানচিত্রের অন্যতম ভিত্তি।
নতুন উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসি বলেন, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্য উপস্থাপন করে না; মানুষের শিক্ষা, কল্পনা এবং পৃথিবী সম্পর্কে সামষ্টিক ধারণা তৈরিতেও এর প্রভাব রয়েছে।
তার ভাষ্য, মানচিত্র পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। পৃথিবীর কোনো বিকৃত চিত্র দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলে তা মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে এবং সেই ধারণা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে যেতে পারে।
তবে জাতিসংঘের এ উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভোটের আগে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ সমালোচনা করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে জাতিসংঘ ১৬ শতকের একটি মানচিত্র, ক্ষতিপূরণ এবং তথাকথিত ‘কগনিটিভ জাস্টিস’ নিয়ে আলোচনা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কেন বদলানো হচ্ছে মানচিত্র
মারকেটর প্রজেকশনের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এতে মহাদেশগুলোর আকৃতি ও কোণ মোটামুটি ঠিক থাকলেও প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় থাকে না। গোলাকার পৃথিবীকে সমতল পৃষ্ঠে উপস্থাপন করতে গিয়ে এ ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়।
এর প্রভাবে বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলোকে অনেক বড় দেখায় প্রচলিত মানচিত্র। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আয়তন বাস্তবের তুলনায় বেশি মনে হয়। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা তুলনামূলক ছোট দেখায়।
২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনকে বাস্তবের কাছাকাছি রেখে মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে।
মানচিত্রটির অন্যতম নির্মাতা বোয়ান সাভরিচ ২০২৫ সালে এএফপিকে বলেন, ইকুয়াল আর্থ মহাদেশগুলোর পারস্পরিক আয়তনের অনুপাত ধরে রাখে এবং পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠে তাদের প্রকৃত আকৃতি যতটা সম্ভব সঠিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
প্রচলিত মানচিত্র বাদ দিচ্ছে ফ্রান্সও
নতুন প্রজেকশনের পক্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। শুক্রবার দেশটি জানিয়েছে, তারা আর মারকেটর প্রজেকশন ব্যবহার করবে না।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, প্রচলিত মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বড় ও প্রভাবশালী দেখায়। একইভাবে গ্রিনল্যান্ডকেও প্রায় আফ্রিকার সমান বড় বলে মনে হয়।
তার মতে, মানচিত্র পরিবর্তন করলেই পৃথিবী বদলে যাবে না। তবে দীর্ঘদিনের বিকৃত উপস্থাপনাকে সংশোধন করা বাস্তবতাকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ফ্রান্স। ফলে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে দেশটির বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
দীর্ঘ ২৮৬ দিন সমুদ্রে থাকার পর থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। বন্দরে প্রবেশের সময় জাহাজটির গায়ে বড় বড় মরিচার দাগ ও রং উঠে যাওয়ার দৃশ্য নজর কেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যবেক্ষকদের। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান ও কঠিন সামরিক কার্যক্রমের পর জাহাজটির এমন চেহারা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন নিয়ে রণতরীটি থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছায়। এসময় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের অনেকেই বিশাল রণতরীটি দেখতে বন্দরের ভিড় জমান।
মার্কিন সংবাদমাধ্য সিএনএনের প্রকাশিত ছবিতে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের হালের বিভিন্ন অংশে মরিচার বড় দাগ এবং রং উঠে যাওয়ার চিহ্ন দেখা গেছে। বিশেষ করে পানির ঠিক ওপরের অংশ ও ফ্লাইট ডেকের কিনারায় মরিচার ছাপ স্পষ্ট।
শুধু জাহাজের বাইরের চেহারাই নয়, দীর্ঘ এই মোতায়েনের সময় রণতরীতে থাকা নাবিকদের জীবনযাপন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাবার ও স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রীর ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং অন্যান্য সমস্যার অভিযোগ সামনে এসেছে।
তবে মার্কিন নৌবাহিনী এসব অভিযোগের অনেকটাই অস্বীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞরাও জানিয়েছেন, গত বছরের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো নৌঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে আব্রাহাম লিংকন। এরপর দীর্ঘ ২৮৬ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে রণতরীটি। সমুদ্রে এত লম্বা সময় ধরে থাকায় এটির নিচের অংশে মরিচা ধরেছে। তবে ব্যাপক মরিচা ও ক্ষয় মেরামতের জন্য রণতরীটিকে বন্দরে নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল স্কুসজার, বলেছেন, ‘একটি জাহাজ যখন সমুদ্রে ৬০ দিন বা তার বেশি নিয়োজিত থাকে তখন এটির পানির অংশে মরিচা ধরা অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। সমুদ্রে, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন অভিযানের সময়, মরিচার সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব না’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যা দেখছি, তাতে সমস্ত মরিচা দূর করতে প্রায় ৩০ দিনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ লাগবে।’
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ২৮৬ দিনের এই মোতায়েন শুধু ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি অবস্থান করা একটি বিমানবাহী রণতরী ও তার ক্রুদের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, সেই বিষয়টিও সামনে এনেছে।
এদিকে থাইল্যান্ডে পৌঁছে প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্যেররাকয়েক দিনের বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছেন। রণতরীটি লায়েম চাবাং বন্দরে অবস্থান করবে, আর নাবিকদের বড় একটি অংশ কাছের পর্যটন শহর পাতায়ায় সময় কাটাবেন।
এক সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা ও নাবিকের আগমনে স্থানীয় ব্যবসা ও পর্যটন খাতেও অর্থনৈতিক সুবিধা হবে বলে আশা করছে থাই কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট বা হিমালয়ের হিমবাহ গলার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও ভূমিকা রাখছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পর্বতারোহী ও গাইডদের পোড়ানো জ্বালানির তাপ এবং সরাসরি হিমবাহে ত্যাগ করা মূত্র বরফ গলনের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি ‘রিজিওনাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’ নামক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি নেপালের এভারেস্টের অংশে অবস্থিত খুম্বু হিমবাহকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। এভারেস্টের নেপাল অংশে অবস্থিত বেজ ক্যাম্পটি এই হিমবাহের ওপরে অবস্থিত।
আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল তিনটি প্রধান কারণ খতিয়ে দেখেছেন, এর মধ্যে রয়েছে- বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং মানুষের মূত্র নিঃসরণ থেকে উৎপন্ন তাপ।
গবেষকদের হিসাবে, বসন্তের পর্বতারোহণ মৌসুমে বেস ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার লিটার মূত্র উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ সরাসরি হিমবাহের ওপর ফেলা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া মূত্রের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিপুল পরিমাণ উষ্ণ মূত্র সরাসরি বরফের ওপর পড়ায় স্থানীয়ভাবে বরফ গলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, শুধু মানুষের মূত্রের কারণে প্রায় ১৫৪ টন বরফ ও তুষার গলে যাওয়ার অনুমান করেছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, হিমবাহ গলার প্রধান কারণ মূত্র নয়। বেস ক্যাম্পে রান্না, তাঁবু গরম রাখা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির তাপও বড় ভূমিকা রাখছে।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে
গবেষকরা ২০২৩ সালের বসন্তকালীন পর্বতারোহণ মৌসুমে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করেন। তারা ক্যাম্পে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে নির্গত শক্তি ও তাপ পরীক্ষা করে দেখেন। এর মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, কেরোসিন এবং পেট্রোলের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই জ্বালানিগুলো রান্না, তাপ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো অপরিহার্য কাজে ব্যবহৃত হয়। গবেষকরা মূত্রত্যাগের ফলে উৎপন্ন তাপ নিয়েও গবেষণা করেছেন। বেস ক্যাম্পে মানুষের কার্যকলাপ কীভাবে খুম্বু হিমবাহকে প্রভাবিত করতে পারে, তা বোঝার জন্য এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে।
গবেষণা অনুসারে, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে এই কার্যকলাপগুলো থেকে নির্গত মোট তাপশক্তির পরিমাণ আনুমানিক ৮৪৯,১৭৪ ± ১৭৯,৭৭৪ মেগাজুল ছিল। এটি একটি বিশাল পরিমাণ শক্তি। গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন যে, এই পরিমাণ তাপ প্রায় ২,৪৯২ ± ৫২৮ টন হিমবাহের বরফ ও তুষার গলানোর জন্য যথেষ্ট হবে।
গবেষকেরা আরও বলছেন, এভারেস্ট বেস ক্যাম্প এখন শুধু পর্বতারোহীদের অস্থায়ী অবস্থানস্থল নয়; এটি মৌসুমি একটি বড় বসতিতে পরিণত হয়েছে। ক্যাফে, গরম পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধার কারণে মানুষের পরিবেশগত প্রভাবও বেড়েছে। গবেষণার প্রধান লেখক খিম লাল গৌতমের মতে, হিমবাহের ওপর মানুষের এই চাপ ভবিষ্যতে টেকসই থাকবে না।
এই পরিস্থিতিতে গবেষকেরা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পকে হিমবাহের ওপর থেকে সরিয়ে বরফমুক্ত স্থানে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং হিমবাহের ওপর সরাসরি মূত্রত্যাগ বন্ধ করাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা ঠিক হবে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়নই হিমালয়ের হিমবাহ সংকুচিত হওয়ার মূল চালিকাশক্তি। মানুষের কর্মকাণ্ড সেই প্রক্রিয়াকে আরও প্রভাবিত করছে।
ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিতর্কিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এবার সরাসরি সংঘাতের হুঁশিয়ারি দিলেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। বৃহস্পতিবার সম্প্রচারিত ভাষণে মিলেই জানিয়েছেন, ফকল্যান্ডের কাছাকাছি এলাকায় ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলোর খনিজ সম্পদ উত্তোলনের পরিকল্পনা থামাতে তার সরকার কঠোর আইনি ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দ্বীপে আমেরিকার ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ অবস্থান পুনর্বিবেচনার আভাস দেওয়ার পরপরই আর্জেন্টিনার তরফ থেকে এই নতুন উত্তাপ তৈরি হলো।
গভীর সমুদ্রে 'সি লায়ন' তেল প্রকল্পের কাজ বন্ধ করতে এর সঙ্গে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট। তিনি পরিষ্কার করে জানান, স্বাবলম্বী সামরিক শক্তি ছাড়া সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব নয়।
তাই নিজস্ব ব্যয়সংকোচন নীতির মাঝেই দেশটির সর্বদক্ষিণের তিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশে নতুন একটি আধুনিক নৌঘাঁটি নির্মাণে বাড়তি তহবিল বরাদ্দের ঘোষণা দেন মিলেই। তিনি এই তেল প্রকল্পকে জাতীয় নিরাপত্তার সরাসরি লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন।
মিলেইয়ের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে ওয়াশিংটনের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ওপর ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে ফকল্যান্ড ইস্যুতে ওয়াশিংটনের নিরপেক্ষ অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের মন্তব্যকে নিজের সরকারের বড় পররাষ্ট্রনৈতিক সাফল্য বলে দাবি করেন মিলেই।
এদিকে, বিতর্কিত দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণ যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের দপ্তর থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ব্রিটেনের হাতেই থাকবে এবং দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সিদ্ধান্তই এতে চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৮ আগস্ট এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি দাবি করেন, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত দ্বিগুণের বেশি করবে। একই সঙ্গে, মার্কিণ নাগরিকদের জন্য জ্বালানির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাস্তবে এই চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অল্প সময়ে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই।
৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের নিয়ন্ত্রণ
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে, দেশটির মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন (৩০ হাজার ৩০০ কোটি) ব্যারেল। এটি বিশ্বের মোট প্রমাণিত তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।
নতুন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়নের বেশি ব্যারেল প্রমাণিত তেলের নিয়ন্ত্রণ পাবে। এটি দেশটির মোট পরিচিত তেল মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
তবে ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। এই তেল উত্তোলন ও পরিশোধন তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল।
কার হাতে যাচ্ছে তেলের নিয়ন্ত্রণ
হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সঙ্গে একটি বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ তৈরি করছে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক ভেনেজুয়েলার ধনকুবের আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ট। তিনি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সাবেক মিত্র ছিলেন।
ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদনে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অপারেটর নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স। চুক্তিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটালের ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে।
যৌথ উদ্যোগটির দৈনিক প্রায় দুই লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদন খরচের দামে কেনার অধিকার পাবে।
এখনই কমছে না তেলের দাম
চুক্তি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম বরং বেড়েছে।
কোপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল বলেন, চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল ৮৩ থেকে ৮৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৫ থেকে ৮৮ ডলারের মধ্যে। এরপর ডব্লিউটিআই ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ব্রেন্টের দামও ৯৫ ডলারের ওপরে ওঠে।
এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভেনেজুয়েলার তেল তুলতে লাগবে বহু বছর
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুত থাকলেও তা দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব নয়।
দেশটির তেল অবকাঠামোর বড় অংশ পুরোনো। পাইপলাইন ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও পর্যাপ্ত নয়।
এ ছাড়া ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
রাউবালের মতে, চুক্তির কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলোও এরই মধ্যে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে।
তাই ভেনেজুয়েলার অতিরিক্ত তেল এলেও তাৎক্ষণিকভাবে পাম্পের দাম কমানোর মতো প্রভাব তৈরি হবে না।
হরমুজ প্রণালির ঘাটতি পূরণ করতে পারবে ভেনেজুয়েলা?
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর ব্রেন্ট তেলের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
তাই ভেনেজুয়েলার অতিরিক্ত তেল উৎপাদন এই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, হরমুজ দিয়ে বাজারে আসা তেলের ঘাটতি ভেনেজুয়েলা পূরণ করতে পারবে না।
এর একটি কারণ হলো, ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা অনেক তেল তুলনামূলকভাবে হালকা। ফলে দুই ধরনের তেল একইভাবে বাজারে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
আসল লাভ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো।
চুক্তি ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে সক্রিয় বড় মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনের শেয়ারের দাম ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটও জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে শেভরন, ইতালির এনিই, ভারতের ওএনজিসি, কলম্বিয়ার জিওপার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের জিই ভারনোভা থাকার কথা রয়েছে।
আছে তেলের ভাণ্ডার, সঙ্গে ঝুঁকিও
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি ছিল। এরপর বিনিয়োগের ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।
ভেনেজুয়েলায় নতুন করে বিনিয়োগ করতে কোম্পানিগুলোকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হবে। দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। তাই দীর্ঘমেয়াদে তেল উৎপাদন বাড়লেও কতটা বাড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার তেল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানির কম দাম পাবেন— এমন সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বরং চুক্তির তাৎক্ষণিক ও সবচেয়ে স্পষ্ট সুবিধা পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো।