“তারা রোহিঙ্গা জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। আমরা যদি এসব হত্যাকাণ্ড এবং সুনির্দিষ্ট স্থানগুলোর প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারি, তবে বিশ্বকে দেখাতে পারব আসলে সেখানে কী ঘটছে”—মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্য থেকে গোপনে ভিডিও ধারণ করা এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাগরিক সাংবাদিকের এই আর্তনাদই বলে দেয় সেখানে চলমান সংকটের ভয়াবহতা।
গোপন নথি, এক্সক্লুসিভ ভিডিও এবং ফেকোলজিক্যাল বা ফরেনসিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে আল জাজিরার অনুসন্ধানী দল তৈরি করেছে নতুন একটি তথ্যচিত্র—‘ব্লাডশেড অন দ্য বর্ডার’ (Bloodshed on the Border)। এই ডকুমেন্টারিতে উন্মোচিত হয়েছে কীভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হচ্ছে, তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে মানবপাচার করা হচ্ছে এবং একটি জাতিগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক জুন্টা এবং স্থানীয় ক্ষমতাশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র মধ্যকার চলমান গৃহযুদ্ধের ক্রসফায়ারে আটকা পড়েছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। রাখাইনের এই সংঘাতে এই মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী উভয় পক্ষ দ্বারাই টার্গেট হয়েছে। তাদের ব্যবহার, শোষণ, নির্যাতন ও লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ঘরছাড়া করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে গৃহযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করার পর থেকে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারহীন এই বন্ধ রাজ্যে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ডকুমেন্টারিতে তুলে ধরা হয়েছে যে, ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনীর জাতিগত নিধনের সময়কার বর্বরতার মতোই বর্তমান গৃহযুদ্ধেও উভয় পক্ষ থেকে রোহিঙ্গারা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশর একটি শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা সেতেরা বেগম জানান, বিদ্রোহীরা গ্রামে ঢুকে পরিখা খনন ও চেকপোস্ট তৈরি করেছিল, যার ফলে সেখানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে প্রাণ হারান।
‘মিয়ানমার উইটনেস’-এর ফরেনসিক গবেষকদের বিশ্লেষণ এবং রোহিঙ্গা নাগরিক সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আল জাজিরা দেখিয়েছে, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য দখল করার পর এই মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কী ধরনের নির্যাতন নেমে এসেছে। পাশাপাশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে মানবপাচারের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অর্থ কামাচ্ছে, তাতিও উঠে এসেছে এতে।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও নারীদের জোরপূর্বক নৌকায় তুলে অন্য দেশে পাচার এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার মর্মান্তিক তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে। ১৪ বছরের এক রোহিঙ্গা শরণার্থী আয়শা জানিয়েছে, তাদের ওপর কতটা অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
আল জাজিরার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও আরাকান আর্মি লিখিত উত্তর বা ইন্টারভিউ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে এর আগে তাদের নেতারা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার কথা অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর এক লিখিত বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে তারা ‘নৃশংসতা’ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তারা কোনো সদুত্তর দেয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিশাল শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থায় সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ও অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিনিয়র কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের কোনো আলোর দিশা না পেয়ে তরুণ প্রজন্ম যদি হতাশ হয়ে পড়ে, তবে তাদের চুপ করে বসে থাকার আশা করা যায় না।
আল জাজিরা ইনভেস্টিগেটের ‘মিয়ানমার এক্সপোজড’ (Myanmar Exposed) প্রতিবেদনের একটি অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছে এই ডকুমেন্টারিটি, যা ২০২১ সালের অভ্যুত্থান পরবর্তী মিয়ানমারের অজানা ও লুকিয়ে থাকা সত্যগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।