মরুময় আবহাওয়া ও তীব্র গরমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের শহরাঞ্চলকে আরও বসবাস উপযোগী, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তুলতে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে কাতার। দেশজুড়ে পার্ক, উদ্যান এবং গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পৌর মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কাতারের মোট সবুজ এলাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ বর্গমিটারে, যেখানে মাথাপিছু সবুজ জায়গার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৬.৮ বর্গমিটার।
পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার পার্ক নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণে এই বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ন্যাশনাল প্ল্যানিং কাউন্সিলের উন্মুক্ত উপাত্তেও চাষযোগ্য সবুজ ভূমি, গাছপালা, গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, খেজুর বাগান এবং রাস্তার ডিভাইডারে থাকা উদ্ভিদের বার্ষিক অগ্রগতির চিত্র নিয়মিত তুলে ধরা হয়।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় জমা দেওয়া কাতারের ‘ন্যাশনাল্লি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন ৩.০’ (NDC 3.0)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশের সবুজ এলাকা ছিল ৩.৫ বর্গকিলোমিটার, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৭ বর্গকিলোমিটারে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এবং ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়া ‘এক মিলিয়ন গাছ রোপণ কর্মসূচি’-র পাশাপাশি সড়ক, শিল্পাঞ্চল, স্কুল ও আবাসিক এলাকায় বনায়নের মাধ্যমে এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। প্রথম প্রকল্পের সফলতার পর কাতার ২০২২ সালে ‘দশ মিলিয়ন গাছ রোপণ উদ্যোগ’ শুরু করে, যা বর্তমানেও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
জাতিসংঘে জমাকৃত কাতারের ২০২৫ সালের স্বেচ্ছামূলক জাতীয় পর্যালোচনা প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ১৫৯টি পার্ক এবং প্রায় ৩০ লাখ বর্গমিটারের উন্নত সবুজ এলাকা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ‘দশ মিলিয়ন গাছ রোপণ উদ্যোগ’-এর আওতায় ইতোমধ্যেই ৩ লাখ ২০ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। দেশের মোট আয়তনের ২৭ শতাংশ বা ১২টি সুরক্ষিত এলাকার প্রায় ৩ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার অংশকে প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট স্থল ও সামুদ্রিক এলাকার ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কাতার।
কাতারের জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় এই সবুজায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রীষ্মকালে এখানকার চরম তাপমাত্রা এবং প্রখর রোদ প্রায়ই মানুষের বহিরাঙ্গন চলাচল ও বিনোদনকে কঠিন করে তোলে। তবে গাছপালা ও সবুজ বেষ্টনী ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় তাপমাত্রাকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
দোহা ও আল দাইয়েন এলাকার ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, পাকা রাস্তা বা কংক্রিটের কাঠামোর তুলনায় সবুজ এলাকায় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। কাতারের উপযোগিতা বাড়াতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় গাছপালা ও বড় আকারের সবুজ পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কাতার ইউনিভার্সিটির ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, খোলা বালি বা শিল্পাঞ্চলের তুলনায় গাছপালা সমৃদ্ধ নিম্নমানের এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা বেশ সহনীয় থাকে।
সবুজায়নের এই প্রচেষ্টার পেছনে ঐতিহাসিক কিছু পটভূমিও রয়েছে। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন প্রস্তুতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাতারের মোট সবুজ এলাকা বৃদ্ধিতে ৭৩ শতাংশেরও বেশি ভূমিকা রেখেছিল। এই আয়োজন সাধারণ মানুষের জন্য সবুজ পরিবেশের ন্যূনতম সুযোগ প্রায় ৯ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পরিবেশ সুরক্ষায় গাছের ভূমিকা শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গাছপালা ও সংযুক্ত সবুজ করিডোর পাখি, পোকামাকড় এবং অন্যান্য প্রাণীর জন্য নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের জোগান দেয়। কাতার তার জাতীয় কৌশলের আওতায় বড় পরিসরে বনায়ন, ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরবন পুনরুদ্ধার এবং নগর উন্নয়নে প্রকৃতির সঠিক মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি টেকসই ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।