লিওনেল মেসির জীবনে ২০১৬ সালের সেই রাতটা ছিল সবচেয়ে যন্ত্রণার। আর্জেন্তিনার হয়ে আরও একটি ফাইনালে হার, তার উপর টাইব্রেকারে নিজের পেনাল্টি মিস। সেই ধাক্কা এতটাই গভীর ছিল যে, ম্যাচ শেষেই জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা করেছিলেন মেসি।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরই বদলে যায় সিদ্ধান্ত। দেশের প্রতি ভালোবাসায় ফের আর্জেন্তিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামেন তিনি। তার পরের গল্পে এসেছে বিশ্বকাপ-সহ একের পর এক সাফল্য। আজ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় নেওয়ার পর তাই ফিরে দেখা যাক, কেন ২০১৬ সালে এতটা ভেঙে পড়েছিলেন মেসি?
ফাইনালে হার, নিজের পেনাল্টি মিস
২০১৬ সালের জুনে কোপা আমেরিকা শতবর্ষের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্তিনা ও চিলি। নির্ধারিত সময় এবং অতিরিক্ত সময়েও ম্যাচ গোলশূন্য থাকায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই চিলির কাছে হেরে যায় আর্জেন্তিনা। আর সেই টাইব্রেকারে নিজের পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। এই হার মেসির কাছে ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণার। কারণ তার আগেও বড় মঞ্চের ফাইনালে বারবার হতাশ হতে হয়েছিল তাঁকে।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। তার পর ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৬ সালেও একই দলের কাছে একই ভাবে হার। অর্থাৎ ন’ বছরের মধ্যে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চারটি ফাইনালে হারের সাক্ষী হয়েছিলেন মেসি।
তখন আর সেই হতাশা সামলাতে পারেননি তিনি। ম্যাচের পরই জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করেছিলেন লিও। সেই সময় মেসি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ। আমি যা যা করতে পারতাম, সব করেছি। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা খুব কষ্টের। চারটি ফাইনাল খেলেছি, চেষ্টা করেছি। এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু সেটা পূরণ করতে পারিনি। তাই মনে হয়, এ বার শেষ।’
আরও পড়ুন
এক নজরে লিওনেল মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
আর্জেন্টিনার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা লিওনেল মেসির
মেসির অবসর ঘোষণার পর যা বলছে আর্জেন্টিনা ফুটবল
সমর্থকদের এক সুতোয় বাঁধার জন্য মেসিকে ধন্যবাদ দিলেন ফিফা সভাপতি
কয়েক সপ্তাহেই বদলে গেল সিদ্ধান্ত
তবে সেই অবসর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন মেসি। ২০১৬ সালের অগস্টে জানিয়ে দেন, আবার আর্জেন্তিনার হয়ে খেলতে চান। আসলে জাতীয় দলের প্রতি মেসির টান এতটাই গভীর ছিল যে, ফাইনালের সেই তীব্র হতাশা ধীরে ধীরে তাঁর সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। নিজের দেশ এবং জাতীয় দলের জার্সির প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে ফের মাঠে টেনে আনে। অবসর ভেঙে ফিরে এসে মেসি বলেছিলেন, ‘আমি এই দেশ এবং এই জার্সিটাকে খুব বেশি ভালোবাসি।’
শুধু ফিরে আসাই নয়, আর্জেন্তিনার ফুটবলের সমস্যাগুলির সমাধানও ভিতর থেকে করতে চেয়েছিলেন তিনি। বাইরে থেকে সমালোচনা না করে দলের সঙ্গেই থেকে পরিবর্তনের অংশ হতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমি বাইরে থেকে সমালোচনা করার চেয়ে ভিতর থেকে এই কাজটা করতেই বেশি পছন্দ করি।’
সেই প্রত্যাবর্তনই বদলে দিল মেসির গল্প
২০১৬ সালে যে মেসি একটি ফাইনালে হারের পর ভেঙে পড়ে জাতীয় দল ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই মেসিই কয়েক বছর পর আর্জেন্তিনার ফুটবলের সবচেয়ে বড় সাফল্যের নায়ক হয়ে ওঠেন। অবসর থেকে ফেরার পাঁচ বছর পর ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্তিনা। সেটিই ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সাফল্য পাওয়ার পর যেন বদলে যায় তাঁর গল্প।
তার পর হয় মেসির সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বকাপ জেতেন তিনি। সাতটি গোল করে জেতেন গোল্ডেন বলও। এর পর ২০২২ সালের ফাইনালিসিমায় ইতালিকে হারায় আর্জেন্তিনা। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জেতে তারা। অর্থাৎ ২০১৬ সালে যে মেসি মনে করেছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে আর কিছু দেওয়ার নেই, তিনিই পরের কয়েক বছরে আর্জেন্তিনাকে একের পর এক বড় ট্রফি এনে দেন।
এর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও আর্জেন্তিনার নেতৃত্বে ছিলেন মেসি। দলকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ফাইনালে। কিন্তু সেখানে স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্নভঙ্গ হয়। তবু এ বারের বিদায় ২০১৬ সালের মতো কোনও হতাশার মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। বরং আর্জেন্তিনার হয়ে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ-সহ প্রায় সব বড় সাফল্য ছুঁয়ে, নিজের স্বপ্ন পূরণ করেই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেন মেসি।