কাতারে প্রাণী সম্পদের সুরক্ষা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে কঠোর বিধান যুক্ত করে নতুন আইন জারি করা হয়েছে। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের অফিশিয়াল গেজেটের ১৭তম সংখ্যা প্রকাশ করেছে, যার মাধ্যমে জারি করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১২ নম্বর ‘পশু স্বাস্থ্য আইন’ (Law No. 12 of 2026)। এই আইনে পশুপালনের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, খামারি বা পশুর মালিক এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
নতুন এই আইনে মোট ৪৯টি সংক্রামক, মহামারী ও জুনোটিক (প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে এমন) রোগের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আইন অমান্যকারীদের জন্য জেল ও লাখ লাখ রিয়াল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব: আইনের ২ ধারা অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পশুর রোগ নির্ণয়ে রোগতাত্ত্বিক নজরদারি (epidemiological surveillance) পরিচালনা করবে। এছাড়া পশুর রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদানের তালিকা প্রণয়ন, পশুর গায়ে ট্যাগ লাগানোর জন্য ডেটাবেজ তৈরি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুকে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
২. পশুর মালিকদের দায়িত্ব ও সতর্কতা:
-
২৪ ঘণ্টার মধ্যে নোটিশ: কোনো পশুর শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে মালিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানাতে হবে এবং পশুকে পরীক্ষার জন্য ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
-
সংক্রমিত পশু আলাদা রাখা: সংক্রামক বা মহামারী রোগে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন পশুকে মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্থানে আলাদা করে (কোয়ারেন্টাইন) রাখতে হবে। মালিক নিজ দায়িত্বে পশুর খাদ্যের খরচ বহন করবেন এবং মন্ত্রণালয়ের যৌথ অনুমোদন ছাড়া পশু বা এর উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না।
-
নির্ধারিত সময়ে পশু ফিরিয়ে নেওয়া: সুস্থ প্রমাণিত হওয়ার পর মালিককে দুই সপ্তাহের মধ্যে নিজ দায়িত্বে পশু ফিরিয়ে নিতে হবে, অন্যথায় সেগুলো বিক্রি করে প্রয়োজনীয় খরচ কেটে রাখা হতে পারে।
৩. ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের দায়িত্ব: আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসক সংক্রামক রোগের উপস্থিতি পেলে রোগাক্রান্ত পশু, এর বর্জ্য ও পরিচর্যার সরঞ্জাম জব্দ করা, পশুর পণ্য বিক্রি বা পরিবহন নিষিদ্ধ করা এবং খামারে স্বাস্থ্যগত ও জীবাণুমুক্তকরণের কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
৪. রোগনিয়ন্ত্রণ ও নিষিদ্ধ কার্যক্রম:
-
মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ছাড়া বিদেশ থেকে রোগের নমুনা আনা-নেওয়া বা পশুর ওপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
-
আক্রান্ত পশু, এর মৃতদেহ বা বর্জ্য পদার্থ বেচাকেনা বা অনুমোদন ছাড়া পরিবহন করা যাবে না।
-
সংক্রামক রোগে মারা যাওয়া পশুর মৃতদেহ নিরাপদে ধ্বংস করার বিষয়ে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের নির্দেশনা মানতে হবে এবং নির্দিষ্ট স্থানেই কেবল পশু জবাই বা মৃতদেহ প্রক্রিয়াজাত করা যাবে।
-
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া মিডিয়া বা অন্য কোনো মাধ্যমে পশুর রোগ বা স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।
৫. ক্ষতিপূরণ কমিটি: মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘অ্যানিমেল হেলথ কম্পেনসেশন কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যা সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্দেশে মৃত বা ধ্বংস করা পশুর মালিকদের ক্ষতিপূরণের আবেদন যাচাই করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করবে।
৬. কঠোর শাস্তি ও জরিমানা:
-
কারাদণ্ড ও জরিমানা: কোনো খামারি নির্দিষ্ট রোগগুলোর বিরুদ্ধে পশুকে টিকা না দিলে অথবা আইনের ৮ ও ৯ ধারা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড এবং দুই লাখ (২০০,০০০) কাতারি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা অথবা যেকোনো একটি দণ্ড হতে পারে।
-
সাধারণ জরিমানা: ৩, ১২ বা ১৩ ধারা লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ (১০০,০০০) কাতারি রিয়াল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
-
এছাড়া আইনি অপরাধ পুনরাবৃত্তি (recidivism) হলে শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে।
আইনের আওতায় উল্লেখযোগ্য রোগসমূহ: নতুন এই আইনে আফ্রিকান হর্স সিকনেস, র্যাবিস (জলাতঙ্ক), অ্যানথ্রাক্স, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (খুরা রোগ), লাম্পি স্কিন ডিজিজ, ব্রুসেলোসিস, বার্ড ফ্লু (এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা), ক্যামেল পক্স, ক্রিমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক ফিভারসহ মোট ৪৯টি সংক্রামক রোগকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাতারে খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রাণিসম্পদ রক্ষায় এই যুগান্তকারী আইন বড় ধরনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।