১৫ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

প্রকাশ: মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬

ঢাকা সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে বাংলাদেশের সামনে একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এটি দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতাগুলো আবার চালু করতে সাহায্য করবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে। একই সঙ্গে তৈরি হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বাংলাদেশ এখন একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে বাংলাদেশ যখন নতুন পথ খুঁজছে, এমন সময়ে এই সুযোগটি এলো।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হওয়ার তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছিল সৌদি আরব। তবে ঢাকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বেশ কয়েকটি বড় প্রস্তাব আটকে যায়। নীতির ধারাবাহিকতার অভাব ও দুর্বল সমন্বয়ের কারণেও এগুলো এগোয়নি। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও সাবেক কর্মকর্তারা এমন তথ্যই জানিয়েছেন।

রিয়াদ এখন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুবরাজের সফরের আগে বাংলাদেশের দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। অতীতের মতো সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়, সে জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ তৈরি করা দরকার।

যুবরাজের ঢাকা সফর
গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের এইচ বিন আবিয়াহ ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। সেখানে এই অগ্রগতির বিষয়টি সামনে আসে। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর করেছেন রাষ্ট্রদূত। চিঠিতে যুবরাজ বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।

বৈঠককালে রাষ্ট্রদূত সৌদি সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের মৌখিক আমন্ত্রণও জানান। তারেক রহমান সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।

রাষ্ট্রদূত আরও জানান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ শিগগিরই ঢাকা সফর করতে চান। তাছাড়া বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখতে একটি সৌদি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলও দ্রুত বাংলাদেশ সফরে আসবে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এই সফরগুলোকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। রিয়াদ এখন প্রথাগত ‘নিয়োগকর্তা-শ্রমিক’ সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়তে চায়।

অমিমাংসিত সম্ভাবনার সম্পর্ক
সৌদি আরব দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিগত সাড়ে চার দশক ধরে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

মানুষে মানুষে এই শক্তিশালী বন্ধন থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।

গত এক দশকে রিয়াদ বারবার বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো, বিমান চলাচল ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বেশিরভাগ প্রস্তাব আলোচনা বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আর এগোয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ৯ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সৌদি আরবে পুনরায় কর্মী পাঠানো শুরু করে। এটি একটি বড় সাফল্য ছিল। তবে এই সম্পর্ককে বড় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।

তারা মনে করেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রস্তাবিত সফর এই ঘাটতি দূর করার বড় সুযোগ।

ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
বিগত সরকারের অধীনে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও রিয়াদের সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি ও স্থবিরতা ছিল। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর যোগাযোগসম্পন্ন একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি শুরু হয়। তার নেতৃত্বে দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ শুরু করে। বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন পথ তৈরি হয়। এটি একটি গতিশীল সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

সৌদি আরব বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ঢাকাও মুসলিম বিশ্বের এই প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে চায়।

তখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে সৌদি আরবের জন্য বাংলাদেশের অ-যুদ্ধকালীন (নন-কমব্যাট) সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে এই সহযোগিতার বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে যায়, বাস্তবে কোনো ফল আসেনি।

সাবেক কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশ সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব বুঝতেও ব্যর্থ হয়েছিল। এই কারণে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে।

হাতছাড়া হওয়া বিনিয়োগের সুযোগ
বিনিয়োগ হাতছাড়া হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সৌদি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ‘আরামকো’।

২০২৫ সালে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসেফ ঈসা আল দুহাইলান জানান, আরামকো বাংলাদেশে একটি বড় বিনিয়োগের চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি।

রাষ্ট্রদূতের মতে, মাতারবাড়িতে তেল শোধনাগার, এলএনজি টার্মিনাল ও পেট্রো-কেমিক্যাল কমপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এই বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরামকোর প্রতিনিধি দল তিনবার বাংলাদেশ সফর করে। তবে সফরকালে তারা প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায়নি।

রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, ‘তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়, সচিব ও আমলাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। বারবার তারা ব্যবস্থার (সিস্টেম) মধ্যে আটকে গেছে।’ এই ব্যর্থতার জন্য তিনি কিছু ব্যক্তিকে দায়ী করেন। রাষ্ট্রদূতের অভিযোগ, তারা জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সৌদি আরব বাংলাদেশে বিনিয়োগে এখনও আগ্রহী। অতীত ভুলে উভয় দেশকে ভবিষ্যতের সহযোগিতায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রদূত।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আরামকো ছাড়াও বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকটি বড় সৌদি ব্যবসায়িক গ্রুপ একই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। যেমন, জেমকো-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার সঙ্গে প্রথম যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেটি গত পাঁচ বছর ধরে অকার্যকর। বাংলাদেশি পক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাবেই এমনটা হয়েছে।

ডানা মেলেনি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে শুরুতে বেশ উৎসাহ দেখিয়েছিল দুই দেশ। ২০১৯ সালে প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার পর সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। তারা অ-যুদ্ধকালীন কাজের জন্য প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ নিতে চেয়েছিল।

তবে এই প্রস্তাবটি গতি পায়নি। বাংলাদেশ এই উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ করেনি।

আলোচনা থমকে পড়ায় সৌদি আরব ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। সেই অংশীদারিত্ব এখন অনেক বেড়েছে। পাকিস্তান রিয়াদ থেকে শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও বড় রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ একটি প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ হারিয়েছে।

আলোর মুখ দেখেনি বিমান চলাচল প্রকল্প
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতেও সৌদি বিনিয়োগের আরেকটি বড় প্রস্তাব ছিল। সৌদি আরব পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে একটি বড় বিমান মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব দেয়। এই প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।

এই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল বোয়িংয়ের একটি যৌথ উদ্যোগ, ‘আল সালাম অ্যারোস্পেস’। তাদের পরিকল্পনা ছিল এই ঐতিহাসিক বিমানক্ষেত্রটিকে আঞ্চলিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা। সেখানে বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাও হওয়ার কথা ছিল। এতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বড় সুযোগ তৈরি হতো। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিলম্ব ও আগ্রহের অভাবের কারণে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।

কূটনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই বিনিয়োগটি পরবর্তীতে অন্য দেশে চলে যায়। ভারত এর বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার এটি আরেকটি বড় উদাহরণ।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
কূটনীতিক ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা নয়। আসল সমস্যা হলো সেই আগ্রহকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা।

তারা জমি বরাদ্দে বিলম্ব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের ওভারল্যাপিং ও দুর্বল জবাবদিহিতাও বড় সমস্যা।

অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী নীতির ধারাবাহিকতাহীন বাস্তবায়ন ও দীর্ঘায়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিষয়েও অভিযোগ করেন।

ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে নতুন সুযোগ
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশ-সৌদি সহযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই কারণে সৌদি আরব তার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বহুমুখীকরণ করতে চায়।

একই সময়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চাইছে। বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রথাগত বন্ধুদের বাইরে গিয়ে নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে চায় দেশটি।

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচিও বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। অবকাঠামো, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে তারা শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।

বাংলাদেশ এই খাতের বেশ কয়েকটিতে অংশীদার হতে পারে। দক্ষ জনশক্তি, শিল্প সহযোগিতা, ওষুধ শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার মাধ্যমে এটি সম্ভব।

সৌদি আরব ২০৩০ সালে এক্সপো ও ২০৩৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করবে। এর জন্য ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমর্থনের প্রয়োজন।

বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও মুসলিম বিশ্বের সুদৃঢ় সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ এই আয়োজনে অবদান রাখতে পারে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী
মুসলিম বিশ্বে নিজস্ব প্রভাবের কারণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সৌদি-সমর্থিত একটি উদ্যোগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের অগ্রগতি হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ এই কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে সেই প্রচেষ্টা আর এগোয়নি।

সতর্ক প্রস্তুতির সময়
সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেন, বাংলাদেশ যেন সৌদি যুবরাজের সফরটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে সুপরিকল্পিতভাবে গ্রহণ করে।

তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি প্রশাসন অত্যন্ত পেশাদার এবং কাজের ফলাফলে বিশ্বাসী। যুবরাজ বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী হবেন যদি তিনি নিশ্চিত হন যে এর থেকে বড় কোনো ফল আসবে। সেই ফল যেন উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হয়।’

গোলাম মসীহ উল্লেখ করেন, এর আগে দুই জন সিনিয়র সৌদি মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ৩২ সদস্যের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছিল। তবে তারা প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি।

প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হলো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নিষ্ক্রিয়তা। গোলাম মসীহ মনে করেন, বিডাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধুমাত্র অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও পরিচালনগত সহায়তা পর্যন্ত সমগ্র বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটিকে সহজ করতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাকে দেশের বিনিয়োগ নীতির সঙ্গে মিল রেখে কাজ করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সত্যটি সবাইকে স্বীকার করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘উভয় দেশেরই এমন ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা প্রয়োজন যা পারস্পরিক সুবিধা দেবে।’

তার পরামর্শ হলো, সফরের আগে বিডা’র উচিত বিস্তারিত তথ্যসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা। বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারে এমন লাভজনক প্রস্তাব সেখানে থাকতে হবে।

সাধারণ বক্তব্য বা কেবল ইচ্ছা প্রকাশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিনিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত সুযোগগুলোই উপস্থাপন করতে হবে। এই তালিকায় শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি, লজিস্টিকস, বিমান চলাচল ও অবকাঠামোর প্রকল্পগুলো থাকা উচিত।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা একটি জরুরি সুপারিশ করেছেন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিডার মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় থাকা দরকার। এর ফলে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে।

তারা মনে করেন, বাংলাদেশের সৌদি যুবরাজের সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর পরিবর্তে বিনিয়োগ চুক্তি ও অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে। স্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াসহ দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করা দরকার। এটি একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তৈরি করবে।

সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে মোহাম্মদ বিন সালমানের এই সফর গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে। এটি এখনকার শ্রমবাজার-ভিত্তিক সম্পর্ককে বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক সহযোগিতার মতো বড় একটি সম্পর্কে রূপান্তর করবে।

সৌদি আরব নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে, বাংলাদেশও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ খুঁজছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এতদিন ধরে অবিকশিত থাকা এই সম্পর্ককে জাগিয়ে তোলার জন্য আগামী মাসগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি যুবকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বড় শ্রমবাজারের সুযোগ, নতুন ভিসা, বর্ধিত বিনিয়োগ ও ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ সুগম হবে।

বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

প্রকাশ: মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬

ঢাকা সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে বাংলাদেশের সামনে একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এটি দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতাগুলো আবার চালু করতে সাহায্য করবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে। একই সঙ্গে তৈরি হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বাংলাদেশ এখন একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে বাংলাদেশ যখন নতুন পথ খুঁজছে, এমন সময়ে এই সুযোগটি এলো।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হওয়ার তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছিল সৌদি আরব। তবে ঢাকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বেশ কয়েকটি বড় প্রস্তাব আটকে যায়। নীতির ধারাবাহিকতার অভাব ও দুর্বল সমন্বয়ের কারণেও এগুলো এগোয়নি। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও সাবেক কর্মকর্তারা এমন তথ্যই জানিয়েছেন।

রিয়াদ এখন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুবরাজের সফরের আগে বাংলাদেশের দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। অতীতের মতো সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়, সে জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের একটি প্যাকেজ তৈরি করা দরকার।

যুবরাজের ঢাকা সফর
গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের এইচ বিন আবিয়াহ ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। সেখানে এই অগ্রগতির বিষয়টি সামনে আসে। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর করেছেন রাষ্ট্রদূত। চিঠিতে যুবরাজ বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।

বৈঠককালে রাষ্ট্রদূত সৌদি সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের মৌখিক আমন্ত্রণও জানান। তারেক রহমান সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।

রাষ্ট্রদূত আরও জানান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ শিগগিরই ঢাকা সফর করতে চান। তাছাড়া বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখতে একটি সৌদি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলও দ্রুত বাংলাদেশ সফরে আসবে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এই সফরগুলোকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। রিয়াদ এখন প্রথাগত ‘নিয়োগকর্তা-শ্রমিক’ সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়তে চায়।

অমিমাংসিত সম্ভাবনার সম্পর্ক
সৌদি আরব দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিগত সাড়ে চার দশক ধরে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

মানুষে মানুষে এই শক্তিশালী বন্ধন থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।

গত এক দশকে রিয়াদ বারবার বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো, বিমান চলাচল ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বেশিরভাগ প্রস্তাব আলোচনা বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আর এগোয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ৯ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সৌদি আরবে পুনরায় কর্মী পাঠানো শুরু করে। এটি একটি বড় সাফল্য ছিল। তবে এই সম্পর্ককে বড় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।

তারা মনে করেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রস্তাবিত সফর এই ঘাটতি দূর করার বড় সুযোগ।

ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
বিগত সরকারের অধীনে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও রিয়াদের সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি ও স্থবিরতা ছিল। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর যোগাযোগসম্পন্ন একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি শুরু হয়। তার নেতৃত্বে দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ শুরু করে। বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন পথ তৈরি হয়। এটি একটি গতিশীল সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

সৌদি আরব বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ঢাকাও মুসলিম বিশ্বের এই প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে চায়।

তখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে সৌদি আরবের জন্য বাংলাদেশের অ-যুদ্ধকালীন (নন-কমব্যাট) সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে এই সহযোগিতার বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে যায়, বাস্তবে কোনো ফল আসেনি।

সাবেক কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশ সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব বুঝতেও ব্যর্থ হয়েছিল। এই কারণে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে।

হাতছাড়া হওয়া বিনিয়োগের সুযোগ
বিনিয়োগ হাতছাড়া হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সৌদি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ‘আরামকো’।

২০২৫ সালে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসেফ ঈসা আল দুহাইলান জানান, আরামকো বাংলাদেশে একটি বড় বিনিয়োগের চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি।

রাষ্ট্রদূতের মতে, মাতারবাড়িতে তেল শোধনাগার, এলএনজি টার্মিনাল ও পেট্রো-কেমিক্যাল কমপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এই বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরামকোর প্রতিনিধি দল তিনবার বাংলাদেশ সফর করে। তবে সফরকালে তারা প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায়নি।

রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, ‘তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়, সচিব ও আমলাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। বারবার তারা ব্যবস্থার (সিস্টেম) মধ্যে আটকে গেছে।’ এই ব্যর্থতার জন্য তিনি কিছু ব্যক্তিকে দায়ী করেন। রাষ্ট্রদূতের অভিযোগ, তারা জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সৌদি আরব বাংলাদেশে বিনিয়োগে এখনও আগ্রহী। অতীত ভুলে উভয় দেশকে ভবিষ্যতের সহযোগিতায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রদূত।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আরামকো ছাড়াও বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকটি বড় সৌদি ব্যবসায়িক গ্রুপ একই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। যেমন, জেমকো-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার সঙ্গে প্রথম যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেটি গত পাঁচ বছর ধরে অকার্যকর। বাংলাদেশি পক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাবেই এমনটা হয়েছে।

ডানা মেলেনি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে শুরুতে বেশ উৎসাহ দেখিয়েছিল দুই দেশ। ২০১৯ সালে প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার পর সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। তারা অ-যুদ্ধকালীন কাজের জন্য প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ নিতে চেয়েছিল।

তবে এই প্রস্তাবটি গতি পায়নি। বাংলাদেশ এই উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ করেনি।

আলোচনা থমকে পড়ায় সৌদি আরব ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। সেই অংশীদারিত্ব এখন অনেক বেড়েছে। পাকিস্তান রিয়াদ থেকে শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও বড় রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ একটি প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ হারিয়েছে।

আলোর মুখ দেখেনি বিমান চলাচল প্রকল্প
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতেও সৌদি বিনিয়োগের আরেকটি বড় প্রস্তাব ছিল। সৌদি আরব পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে একটি বড় বিমান মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব দেয়। এই প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।

এই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল বোয়িংয়ের একটি যৌথ উদ্যোগ, ‘আল সালাম অ্যারোস্পেস’। তাদের পরিকল্পনা ছিল এই ঐতিহাসিক বিমানক্ষেত্রটিকে আঞ্চলিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা। সেখানে বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাও হওয়ার কথা ছিল। এতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বড় সুযোগ তৈরি হতো। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিলম্ব ও আগ্রহের অভাবের কারণে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।

কূটনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই বিনিয়োগটি পরবর্তীতে অন্য দেশে চলে যায়। ভারত এর বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার এটি আরেকটি বড় উদাহরণ।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
কূটনীতিক ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা নয়। আসল সমস্যা হলো সেই আগ্রহকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা।

তারা জমি বরাদ্দে বিলম্ব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের ওভারল্যাপিং ও দুর্বল জবাবদিহিতাও বড় সমস্যা।

অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী নীতির ধারাবাহিকতাহীন বাস্তবায়ন ও দীর্ঘায়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিষয়েও অভিযোগ করেন।

ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে নতুন সুযোগ
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশ-সৌদি সহযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই কারণে সৌদি আরব তার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বহুমুখীকরণ করতে চায়।

একই সময়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চাইছে। বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রথাগত বন্ধুদের বাইরে গিয়ে নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে চায় দেশটি।

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচিও বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। অবকাঠামো, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে তারা শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।

বাংলাদেশ এই খাতের বেশ কয়েকটিতে অংশীদার হতে পারে। দক্ষ জনশক্তি, শিল্প সহযোগিতা, ওষুধ শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তার মাধ্যমে এটি সম্ভব।

সৌদি আরব ২০৩০ সালে এক্সপো ও ২০৩৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করবে। এর জন্য ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমর্থনের প্রয়োজন।

বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও মুসলিম বিশ্বের সুদৃঢ় সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ এই আয়োজনে অবদান রাখতে পারে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী
মুসলিম বিশ্বে নিজস্ব প্রভাবের কারণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সৌদি-সমর্থিত একটি উদ্যোগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের অগ্রগতি হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ এই কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে সেই প্রচেষ্টা আর এগোয়নি।

সতর্ক প্রস্তুতির সময়
সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেন, বাংলাদেশ যেন সৌদি যুবরাজের সফরটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে সুপরিকল্পিতভাবে গ্রহণ করে।

তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি প্রশাসন অত্যন্ত পেশাদার এবং কাজের ফলাফলে বিশ্বাসী। যুবরাজ বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী হবেন যদি তিনি নিশ্চিত হন যে এর থেকে বড় কোনো ফল আসবে। সেই ফল যেন উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হয়।’

গোলাম মসীহ উল্লেখ করেন, এর আগে দুই জন সিনিয়র সৌদি মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ৩২ সদস্যের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছিল। তবে তারা প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি।

প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হলো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নিষ্ক্রিয়তা। গোলাম মসীহ মনে করেন, বিডাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধুমাত্র অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও পরিচালনগত সহায়তা পর্যন্ত সমগ্র বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটিকে সহজ করতে হবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাকে দেশের বিনিয়োগ নীতির সঙ্গে মিল রেখে কাজ করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সত্যটি সবাইকে স্বীকার করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘উভয় দেশেরই এমন ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা প্রয়োজন যা পারস্পরিক সুবিধা দেবে।’

তার পরামর্শ হলো, সফরের আগে বিডা’র উচিত বিস্তারিত তথ্যসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা। বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারে এমন লাভজনক প্রস্তাব সেখানে থাকতে হবে।

সাধারণ বক্তব্য বা কেবল ইচ্ছা প্রকাশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিনিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত সুযোগগুলোই উপস্থাপন করতে হবে। এই তালিকায় শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি, লজিস্টিকস, বিমান চলাচল ও অবকাঠামোর প্রকল্পগুলো থাকা উচিত।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা একটি জরুরি সুপারিশ করেছেন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিডার মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় থাকা দরকার। এর ফলে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে।

তারা মনে করেন, বাংলাদেশের সৌদি যুবরাজের সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর পরিবর্তে বিনিয়োগ চুক্তি ও অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে। স্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াসহ দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করা দরকার। এটি একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তৈরি করবে।

সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে মোহাম্মদ বিন সালমানের এই সফর গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে। এটি এখনকার শ্রমবাজার-ভিত্তিক সম্পর্ককে বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক সহযোগিতার মতো বড় একটি সম্পর্কে রূপান্তর করবে।

সৌদি আরব নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে, বাংলাদেশও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ খুঁজছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এতদিন ধরে অবিকশিত থাকা এই সম্পর্ককে জাগিয়ে তোলার জন্য আগামী মাসগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি যুবকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বড় শ্রমবাজারের সুযোগ, নতুন ভিসা, বর্ধিত বিনিয়োগ ও ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ সুগম হবে।

কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি

প্রকাশ: সোমবার, জুলাই ১৩, ২০২৬
কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি

কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তা‌রেক রহমান।

রবিবার (১২ জুলাই) কাতা‌রের বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে লেখা এক চি‌ঠি‌তে শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

চি‌ঠি‌তে তা‌রেক রহমান লি‌খে‌ছেন, বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে আপনার (বর্তমান আমির) রাজপরিবার, সরকার এবং কাতারের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।

সরকারপ্রধান চি‌ঠি‌তে উ‌ল্লেখ ক‌রেন, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, যার নেতৃত্ব কাতারকে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধশালী এবং বিশ্বব্যাপী সম্মানিত জাতিতে রূপান্তরিত করেছে। আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তার অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

তা‌রেক রহমান চি‌ঠি‌তে আরো লি‌খে‌ছেন, বাংলাদেশ কাতা‌রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অত্যন্ত মূল্যায়ন করে, যেটি পারস্পরিক বিশ্বাস, ভাগ করা মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্কের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে লালিত হ‌য়ে আস‌ছে।

গভীর শোকের এই মুহূর্তে আমার চিন্তাভাবনা এবং প্রার্থনা আপনার, রাজপরিবার এবং কাতারের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের সঙ্গে রয়েছে। আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহ কাছে মরহুমের আত্মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করার জন্য এবং আপনা এবং রাজপরিবারের শোকাহত সদস্যদের ধৈর্য, ​​শক্তি এবং সান্ত্বনা দান করার জন্য প্রার্থনা করছি।

বর্তমান রিজার্ভ প্রায় ৩৬.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশ: সোমবার, জুলাই ১৩, ২০২৬
বর্তমান রিজার্ভ প্রায় ৩৬.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার : অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ২৫ জুন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার বর্তমান রিজার্ভ প্রায় ৩৬.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রবিবার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলামের এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী এসব কথা জানান।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম) অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন।
সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম জানতে চান, চলমান ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় সময়ে এলসি বা ঋণপত্র খুলিতে পারছে না।

তার ফলে শিল্প-কারখানা কাঁচামাল ও অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সমস্যা উত্তরণে সরকারের পরিকল্পনা কী?

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২৫ জুন, ২০২৬) বৈদেশিক মুদ্রার বর্তমান রিজার্ভ প্রায় ৩৬.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মূলত সরকারের বৈদেশিক দায়-দেনা নিষ্পত্তি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টে, ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে এবং নগদ বৈদেশিক মুদ্রার সামষ্টিক মজুত প্রায় ২.১৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রয়েছে।

ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি শুরু করেছে রিয়াদ এয়ার

প্রকাশ: শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২৬
ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি শুরু করেছে রিয়াদ এয়ার

আগামী ৭ আগস্ট ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি দৈনিক ফ্লাইট চালুর আগে আজ থেকে এ রুটের টিকিট বিক্রি শুরু করেছে রিয়াদ এয়ার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

এয়ারলাইন্সের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন এ রুটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এইচএসআইএ) এবং রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজে দৈনিক ফ্লাইট পরিচালিত হবে।

এ দৈনিক ফ্লাইট বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ভ্রমণ, বাণিজ্য ও পর্যটন-সংযোগ আরও জোরদার করবে। একই সঙ্গে রিয়াদ এয়ারের সম্প্রসারিত নেটওয়ার্ক ও কোডশেয়ার অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীদের জন্য সুবিধাজনক সংযোগ নিশ্চিত করবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন এ রুট দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান বিমান পরিবহন বাজারগুলোর একটির প্রতি রিয়াদ এয়ারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন এবং বাংলাদেশ-সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

ফ্লাইট সূচি অনুযায়ী, আরএক্স০৭৬৩ ফ্লাইট রিয়াদ থেকে স্থানীয় সময় রাত ৯টা ২০ মিনিটে ছেড়ে পরদিন সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। ফিরতি আরএক্স০৭৬৪ ফ্লাইট স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে রিয়াদে অবতরণ করবে।

রিয়াদ এয়ার জানিয়েছে, নতুন এ সেবা ব্যবসা, অবকাশ যাপন ও শিক্ষাসংক্রান্ত ভ্রমণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য রিয়াদকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

এয়ারলাইন্সটি আরও জানায়, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাজার এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় এ রুট তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

যাত্রীরা রিয়াদ এয়ারের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টদের মাধ্যমে টিকিট কিনতে পারবেন।

ফ্লাইটগুলো রিয়াদ এয়ারের বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারে পরিচালিত হবে। উড়োজাহাজে বিজনেস এলিট, বিজনেস, প্রিমিয়াম ইকোনমি ও ইকোনমি- এই চারটি কেবিন শ্রেণি থাকবে। এতে সর্বাধুনিক ইন-ফ্লাইট বিনোদন ব্যবস্থা, ওয়্যারলেস সংযোগ এবং উন্নত যাত্রীসেবা সুবিধা থাকবে।

সৌদি আরবের নতুন জাতীয় এয়ারলাইন্স রিয়াদ এয়ার দেশটির বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধি, পর্যটন খাতের বিকাশ এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে গৃহীত বৃহত্তর বিমান পরিবহন কৌশলের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে।

বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়েছে কাতারএনার্জি

প্রকাশ: মঙ্গলবার, জুলাই ০৭, ২০২৬
বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়েছে কাতারএনার্জি

চলতি বছর বাংলাদেশে নির্ধারিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে কাতারের সমন্বিত জাতীয় তেল ও গ্যাস করপোরেশন ‘কাতারএনার্জি’। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।

সোমবার (০৬ জুলাই) বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান।

তিনি বলেন, ‘এসব সমস্যার মূল কারণ যুদ্ধ। ঘাটতি মোকাবিলায় আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি। স্পট মার্কেট থেকে বেশি এলএনজি কেনা যেতে পারে। অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সবচেয়ে সুবিধাজনক বাণিজ্যিক বিকল্পই বেছে নেওয়া হবে।’

বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদনকারী দেশ কাতার। বাংলাদেশে আমদানি হওয়া এলএনজির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীও দেশটি। গত বছর বাংলাদেশ প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টনই এসেছে কাতার থেকে।

বর্তমানে কাতারএনার্জির সঙ্গে পেট্রোবাংলার দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এর একটি বছরে ২৫ লাখ টন এবং অন্যটি ১৮ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের জন্য।

আবদুল মান্নান জানান, নির্ধারিত সরবরাহ কমানো হলেও কাতার কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। এ বিষয়ে কাতারএনার্জির তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় চলতি বছর কাতার থেকে ১৯টি এলএনজি কার্গো পেয়েছিল বাংলাদেশ।

তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতারের রাস লাফান রপ্তানি টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশে আর কোনো এলএনজি কার্গো আসেনি। ফলে দেশের চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে বিকল্প চালান কিনতে হচ্ছে। মার্চের পর থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।