আধুনিক কাতারের প্রধান রূপকার, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং বাংলাদেশের কোটি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল রোববার সকালে ৭৪ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে কাতারজুড়ে ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান পৃথক পৃথক শোকবার্তায় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং আধুনিক কাতার বিনির্মাণ ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন।
গতকাল রোববার আমীরের কার্যালয় থেকে তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। তাঁর এই বিদায়ের পর বিশ্বমঞ্চের পাশাপাশি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি খাত এবং মানবিক উন্নয়নে তাঁর রাখা অসামান্য ও ঐতিহাসিক অবদানের কথা। ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে দোহায় জন্মগ্রহণ করা এই অনন্য সাধারণ দূরদর্শী নেতার জীবন, কর্ম এবং বাংলাদেশ-কাতার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে করা হলো:
জন্ম, শিক্ষা ও ক্ষমতার স্বর্ণযুগ (১৯৯৫-২০১৩)
শিক্ষা ও দায়িত্ব গ্রহণ: শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত রয়্যাল একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে তাঁর স্নাতক সম্পন্ন করেন. পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের জুনে তিনি কাতারের আমিরের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
অর্থনৈতিক বিপ্লব ও এলএনজি: তিনি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন কাতার ছিল পারস্য উপসাগরের একটি সাধারণ ও ছোট রাষ্ট্র. ১৮ বছরের (১৯৯৫ থেকে ২০১৩) শাসনকালে তাঁর প্রজ্ঞা এবং অনন্য অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে কাতারকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেন. তাঁর সময়েই কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) শিল্পের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটে এবং ২০০৬ সালের মধ্যে কাতার বিশ্বে শীর্ষস্থান অর্জন করে. তাঁর শাসনামলে দেশটির জিডিপি (GDP) প্রায় ২৪ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল.
গণমাধ্যমের রূপান্তর: কেবল অর্থনীতিই নয়, বিশ্ব গণমাধ্যমের চিত্র বদলে দেওয়া আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’ ১৯৯৬ সালে তাঁর একটি বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমেই যাত্রা শুরু করেছিল।
বিরল দৃষ্টান্ত: ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর ছেলে ও বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং এরপর থেকে ‘ফাদার-আমির’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রেমিট্যান্সে অসামান্য অবদান
ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি কেবল কাতারের নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মানুষের এক পরম সুহৃদ. তাঁর দূরদর্শী অভিবাসন নীতির কারণে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে এবং ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য কাতারের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়।
শ্রমবাজারের আইনি সহজীকরণ: তাঁর শাসনামলেই কাতারে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা কয়েক লক্ষে উন্নীত হয়. বর্তমানে কাতারে যে প্রায় ৪ লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তার মূল ভিত্তি ও আইনি সহজীকরণ সম্পন্ন হয়েছিল শেখ হামাদের হাত ধরেই।
শ্রমিকদের মূল্যায়ন ও আইন সংস্কার: কাতারের উন্নয়নযজ্ঞে (যেমন ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণসহ মেগা প্রজেক্টসমূহ) বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিক, প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের অংশগ্রহণকে তিনি সর্বদা উচ্চ মূল্যায়ন করতেন. প্রবাসীদের কাজের পরিবেশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য তিনি বিশেষ শ্রম আইন সংস্কার করেছিলেন।
জ্বালানি নিরাপত্তা (এলএনজি কূটনীতি): বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পোৎপাদন এবং বিদ্যুৎ খাতের স্থায়িত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে কাতার অন্যতম প্রধান অংশীদার. বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাতার বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহকারী দেশ. এই জ্বালানি কূটনীতির রূপরেখাও শেখ হামাদের আমলেই তৈরি হয়েছিল।
সংকট ও দুর্যোগে বাংলাদেশের পাশে কাতার: শত মিলিয়ন ডলারের অনুদান
ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রত্যক্ষ নির্দেশনা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ও দাতব্য সংস্থাসমূহের (যেমন: কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট-কিউএফএফডি, কাতার চ্যারিটি, এবং থানি বিন আব্দুল্লাহ ফাউন্ডেশন-আরএএফ) মাধ্যমে বাংলাদেশ গত তিন দশকে শত শত মিলিয়ন ডলারের অনুদান ও মানবিক সহায়তা পেয়েছে।
২০০৭ সালের সিডর পুনর্বাসন: ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ যখন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তখন ফাদার আমির শেখ হামাদের বিশেষ নির্দেশে কাতার রেড ক্রিসেন্ট ও কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিশেষ অনুদান পাঠানো হয়. ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের আশ্রয়কেন্দ্র ও হাসপাতাল নির্মাণে কাতার সরাসরি অর্থায়ন করে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট: ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলে কাতার সরকার ও কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট ব্যাপক আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও বাসস্থান নিশ্চিত করতে কাতার এ পর্যন্ত ১৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি (প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা) বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে নিবেদিত করেছে। এছাড়া ২০১৮ সালে উখিয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিল্ড হাসপাতাল সচল রাখতে সরাসরি ৪ মিলিয়ন কাতারি রিয়াল অনুদান দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য কূটনীতি: লাখো শিশুর অন্ধত্ব দূরীকরণ
ফাদার আমিরের দূরদর্শী স্বাস্থ্য কূটনীতির অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে শিশু অন্ধত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৯৫ কোটি টাকা) অনুদানের মাধ্যমে একটি মেগা প্রকল্প চালু করা হয়। এই মানবিক প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৬ দশমিক ৭ মিলিয়নেরও বেশি শিশুর চোখ পরীক্ষা ও বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে, যা দুই দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কাতার জুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজা সম্পন্ন
মরহুম ফাদার আমিরের জানাজার নামাজ ১২ জুলাই রবিবার মাগরিবের নামাজের পর রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে. জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ ঐতিহ্যবাহী ও ইসলামী রীতিনীতি অনুসরণ করে লুসাইল কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৪ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক: ফাদার আমিরের প্রয়াণে কাতারে ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
সরকারি দপ্তরে ছুটি: শোক প্রকাশ ও প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৩ জুলাই সোমবার থেকে দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় দাপ্তরিক কাজ স্থগিত করা হয়েছে. টানা এই ছুটি শেষে আগামী ১৯ জুলাই রবিবার থেকে সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পুনরায় কাজে যোগ দেবেন।
তিন দিন শোকবার্তা গ্রহণ: কাতারের মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি আগামী সোমবার, মঙ্গলবার এবং বুধবার (১৩, ১৪ ও ১৫ জুলাই) লুসাইল প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, শাসক পরিবার, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে শোকবার্তা গ্রহণ করবেন. (সময়সূচি: সকাল ৮:০০ টা থেকে বেলা ১১:৩০ টা পর্যন্ত এবং আসরের নামাজের পর থেকে ইশার নামাজ পর্যন্ত)।
ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রয়াণে দোহায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং কাতারের বিশাল বাংলাদেশ কমিউনিটি গভীর শোক প্রকাশ করেছে. দূতাবাস এক শোকবার্তায় জানায়, কাতারের অভূতপূর্ব রূপান্তরের এই রূপকার আজীবন বাংলাদেশ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন. তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত অবদান এবং প্রবাসীদের প্রতি সদয় দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
