প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য এক নারীকে ইতালিতে পাঠানোর অভিযোগে সংঘবদ্ধ মানবপাচার ও ভিসা জালিয়াতি চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা হয়েছে।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫৬টি পাসপোর্ট, ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিল, একটি এম্বোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ আড়াই লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, বেলায়েত হোসেন (৪০), মেহেদী হাসান (৩৭), সোলাইমান সুমন (৩২), ফজলে রাব্বী (২৭), তৌহিদুর রহমান (২৪) ও কাওসার হোসেন (৪২)।
সোমবার রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, গতকাল সিআইডির মানবপাচার শাখার (টিএইচবি) একটি চৌকস দল তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর গুলশান থানাধীন গুলশান-১ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ বিষয়ে গুলশান থানায় মামলা হয়েছে।
সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) পরিচালিত ওই অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের অফিস থেকে তিনটি সিপিইউ, একটি এইচপি ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, ১টি লোহার তৈরি এম্বোস সিল এবং নগদ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী বাদীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে ইতালিতে যাওয়ার আশায় বাদী দীর্ঘদিন ধরে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন।
একপর্যায়ে তিনি ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ইতালির দূতাবাস থেকে তাকে ফোন করে পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়ে অবহিত করা হয়।
পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য তিনি দূতাবাসে গেলে সেখানে অত্র মামলার এজাহারনামীয় দুই নম্বর অভিযুক্ত নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে পাসপোর্ট নবায়নসহ ইতালির ভিসা করে দেওয়ার কাজে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট নবায়ন করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়।
পরবর্তীতে নাজমুল ওই নারীকে রাজধানীর গুলশান-১ এলাকার একটি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায় এবং সেখানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে অত্র মামলার এজাহারনামীয় এক নম্বর অভিযুক্ত মো. বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়।
অভিযুক্তরা ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই নারীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করেন। পরে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। টাকা পরিশোধের পর তাকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।
এরপর ইতালিতে থাকা স্বামী স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বিমানের টিকিট কাটেন। নির্ধারিত দিনে ভুক্তভোগী সন্তানদের নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জানান, তার পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে অন্য এক নারী গত ২৪ এপ্রিল ইতোমধ্যে ইতালি চলে গেছেন।
এ ঘটনায় হতবাক হয়ে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি বিদেশে যেতে আগ্রহীদের ইতালির ভিসা ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত। পরে কৌশলে তাঁদের পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো হতো।
জব্দ করা ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।
সিআইডি আরও জানায়, চক্রের মূলহোতা হিসেবে গ্রেপ্তার বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য মিলেছে। একই ধরনের অপরাধে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং মামলাটি বিচারাধীন।
অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব জানান, জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল ও কম্পিউটারের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন, দেশি-বিদেশি সহযোগী এবং সম্ভাব্য আরও ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার এবং ভিসা জালিয়াতি বা মানবপাচারের সন্দেহ হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেছে।