সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামের এই নতুন জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশও বিবেচনা করতে পারে বলে একজন মন্ত্রী জানিয়েছেন। তবে এমন পদক্ষেপে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হয়, তবে সেখানে আমাদের অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, তারা বাংলাদেশকে বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেখানে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, মূলত সৌদি আরবই ঢাকাকে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি। প্রতিমন্ত্রীর এই মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশে অবস্থিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এই তিন দেশ চুক্তিটিতে সই করে। এটি মূলত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর-- এক সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে; যৌথ-প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে যখন চরম আঞ্চলিক উত্তেজনা চলছে, তখন তারা এমন চুক্তি করেছে।
পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান এবং শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিতে আরও দেশের যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ তুরস্ক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি এক নতুন পরীক্ষার মুখে পড়বে। কারণ, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলোকে এড়িয়ে চলাই ছিল ঢাকার নীতি। মূলত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ সব পক্ষের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এর বড় বাজার হলো ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশে কর্মরত লাখো শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি উৎস।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া জানান, আনুষ্ঠানিক কোনো জোটে গেলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়; বরং চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল হতে পারে। তিনি বলেন, সম্পর্কগুলো হয়তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশ একবার কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে, তারা আসলে কোন পক্ষে আছে—সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছয় মাস বয়সী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের এক স্পর্শকাতর সময়ে এই আমন্ত্রণ এলো। যদিও উভয় দেশই আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে জোরপূর্বক মানুষ পুশ-ইনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হাসিনাকে ফেরত চেয়েও অনুরোধ করেছে ঢাকা। এসব কারণে দুদেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর একজন মুখপাত্র চলতি মাসে জানিয়েছেন, সরকারপ্রধান ভারত সফর করবেন কি না—সেই সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। মূলত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধের বিষয়ে নয়াদিল্লির উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর ঢাকা এ ঘটনার সমালোচনা করে। বাংলাদেশ আগেই জানিয়েছে যে, ভারত সফরের জন্য একটি ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ প্রয়োজন।
এদিকে মক্কা চুক্তির বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, কোনো এক পক্ষে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এই অর্থনীতি বহুমুখী অংশীদারদের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ খুশি হবে না। তবে সেটি বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।