গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদনে ধস, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার অপচয় আর বাসাবাড়িতে নিভু নিভু চুলা—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদেরও উদ্বেগের কারণ।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ইতিহাস দীর্ঘ নয়। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসায় চাহিদা সামলাতে এটা শুরু করা হয়। অল্প সময়েই আমদানি করা এই গ্যাস নাগরিক জীবন ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন যে, এর সরবরাহ ব্যাহত হলেই দেশ স্থবির হয়ে পড়ছে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে নভেম্বর পর্যন্ত এশিয়া ও ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাতিল করেছে কাতার এনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশসহ আমদানিকারক দেশগুলোতে সংকট আরও বাড়বে।
ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে যে সরবরাহ বাতিলের এই প্রক্রিয়া অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বৈশ্বিক গবেষক অ্যান-সোফি কোরবাউ এই সংকটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ ও ভঙ্গুর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারতকে চিহ্নিত করেছেন।
কোরবাউয়ের মতে, বৈশ্বিক এই সংকটে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলো। বিশেষত যারা তাৎক্ষণিক বিকল্প কার্গো নিশ্চিত করতে পারেনি এবং আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে চড়া মূল্যে গ্যাস কেনার ওপর নির্ভর করে।
গত মার্চে কাতার এনার্জি প্রথমবারের মতো এই ফোর্স মেজার ঘোষণা করেছিল এবং অচলাবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ হওয়ায় প্রতি মাসেই এর মেয়াদ নবায়ন করেছে।
অ্যান-সোফি কোরবাউ বলেন, রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া অথবা সংঘাতের মূল পক্ষগুলোর পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ না দেখা পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না।
বিশ্ববাজারে সরবরাহের বিশাল ঘাটতি ও বিকল্পের সন্ধান
হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা বিশ্ববাজার থেকে কাতারের এলএনজি সরবরাহ একপ্রকার উধাও করে দিয়েছে। কমোডিটি ডেটা সংস্থা আইসিআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো বিদেশে রপ্তানি করতে পেরেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে তাদের রপ্তানিকৃত কার্গোর সংখ্যা ছিল ৫০৯।
এই ব্যাপক ধসের কারণে কাতারের গ্যাস বিক্রিতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো) আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষক কোরবাউ জানান, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা তাদের নতুন চালু হওয়া কারখানাগুলো থেকে অতিরিক্ত কিছু এলএনজি সরবরাহ পাঠিয়েছে। এর পাশাপাশি নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও গ্যাস উত্তোলন ও উৎপাদন কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। তবে বিকল্প এই সরবরাহগুলো দিয়ে পুরো বৈশ্বিক ঘাটতি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এশিয়ার অনেক দেশ বাধ্য হয়ে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে কিংবা বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তর করছে।
বাংলাদেশে এলএনজি: কী কেন কীভাবেপারস্য উপসাগরে এলএনজিবাহী জাহাজের প্রতীকী ছবি। রয়টার্সের সৌজন্যে
অন্যদিকে ইউরোপ চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে মরিয়া না হয়ে তাদের মজুতাগারে জমা থাকা গ্যাস বেশি পরিমাণে ব্যবহার করছে।
কোরবাউ উল্লেখ করেন, বাজারে যে সামান্য কার্গো পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছেই যাচ্ছে এবং কাতার ও আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ক্ষতির কারণে বিশ্বজুড়ে মোট এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ ২০২৬ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হতে পারে।
অসম আঞ্চলিক প্রভাব ও বৈশ্বিক ভারসাম্য ফেরার সময়সীমা
এই সংকটের প্রভাব আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর সমানভাবে পড়ছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে গত এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে সামগ্রিক এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল। চীনের এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পতন লক্ষ করা গেছে। চীন এখন পর্যন্ত তাদের ব্যবস্থাপনা দিয়ে কাতারি এলএনজি হারানোর ক্ষতি সামাল দিয়েছে। ইউরোপ তাদের গ্যাস মজুতাগার ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে, ফলে তাদের সামগ্রিক রিজার্ভ দ্রুত নিচে নামছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় বর্তমানে নির্মাণাধীন থাকা নতুন এলএনজি রপ্তানি প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে বাজারে বিকল্প সরবরাহ বাড়াতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার একটি স্বাভাবিক সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্যে ফিরে আসতে অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।