মাসের শেষ। হাতে টাকা কম। অথচ সামনে বিয়ের অনুষ্ঠান। বন্ধুরা সবাই নতুন ফোন কিনেছে, আপনিও ভাবছেন একটা নতুন ফোন হলে মন্দ হয় না। আবার হঠাৎ কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। কিংবা ব্যবসায় ভালো একটা সুযোগ এসেছে, কিন্তু হাতে প্রয়োজনীয় টাকা নেই।
মুহূর্তেই মাথায় আসে ‘ধার করে নিলেই তো হয়!’ ঋণ নেওয়া সহজ। কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধের সময়টিই আসল পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ঋণ জীবনের অংশ হতে পারে। কিন্তু এমন অনেক খরচ আছে, যেগুলোর জন্য ধার করলে আজকের আনন্দ বা প্রয়োজন মেটালেও ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ। তাই ঋণ নেওয়ার আগে প্রশ্ন করা দরকার আমি কি সত্যিই এটি ধার করে কিনব, নাকি একটু অপেক্ষা করতে পারি?
চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন কারণে ঋণ নেওয়া থেকে যতটা সম্ভব বিরত থাকা ভালো।
এক দিনের জাঁকজমকের জন্য বছরের পর বছর ঋণ নয়
বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু সেই অনুষ্ঠান কতটা জাঁকজমকপূর্ণ হলো, তা দিয়ে সংসারের ভবিষ্যৎ ঠিক হয় না। শুধু আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের বাহবা পাওয়ার জন্য নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করে ঋণ নেওয়া ভবিষ্যতে চাপ তৈরি করতে পারে। অনুষ্ঠান হোক আনন্দের, কিন্তু তার খরচ যেন নতুন সংসারের ওপর দীর্ঘদিনের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। সামর্থ্যের মধ্যে সুন্দর আয়োজন ঋণ করে বড় আয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তির।
ভ্রমণের আনন্দের মাঝেই কিস্তির চিন্তা
ভ্রমণ মানুষকে আনন্দ দেয়, নতুন অভিজ্ঞতা দেয়। কিন্তু সেই ভ্রমণের খরচ যদি পুরোপুরি ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে ফিরে এসে কিস্তির চাপ সেই আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে।ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলে আগে পরিকল্পনা করুন, সঞ্চয় করুন, তারপর বেড়াতে যান। বিশেষ করে বিলাসবহুল ভ্রমণের জন্য ঋণ নেওয়ার আগে নিজের ভবিষ্যৎ আয় ও অন্যান্য আর্থিক দায় বিবেচনা করা জরুরি।
নতুন ফোনের জন্য ধার করা বোকামি ছাড়া কিছুই না
বর্তমান ফোনটি ভালোভাবেই চলছে। তারপরও নতুন মডেল বাজারে এসেছে। বিজ্ঞাপন বলছে আরও ভালো ক্যামেরা, আরও বড় ডিসপ্লে, আরও আধুনিক ফিচার। কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনার সত্যিই কি নতুন ফোনটি প্রয়োজন? শুধু সামাজিক মর্যাদা বা অন্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ধার বা দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে দামি গ্যাজেট, পোশাক কিংবা অন্য ভোগ্যপণ্য কেনা ভবিষ্যতের বাজেটে চাপ ফেলতে পারে। প্রয়োজন আর ইচ্ছার পার্থক্য বোঝা ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
টাকা ধার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে চরম মাশুল গুনতে হতে পারে
‘এখন টাকা ধার করে বিনিয়োগ করি, লাভ হলে ঋণ শোধ করে দেব’ ভাবনাটা শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু বিনিয়োগে লাভ নিশ্চিত নয়। শেয়ারবাজার, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় ক্ষতি হলে বিনিয়োগের টাকা হারানোর পাশাপাশি ঋণ ও সুদ পরিশোধের দায়ও থেকে যায়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ধার করা টাকা ব্যবহার করার আগে ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
এক ঋণ শোধ করতেই আরেক ঋণ?
পুরোনো ঋণের কিস্তি দেওয়ার সময় নতুন করে ঋণ নেওয়া এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।তবে সব ধরনের ঋণ একত্রীকরণ খারাপ নয়। কম সুদের ঋণে একাধিক ঋণ একত্র করার মতো কিছু ব্যবস্থা পরিস্থিতিভেদে উপকারী হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন আয়-ব্যয়ের মূল সমস্যা সমাধান না করে শুধু পুরোনো ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ নেওয়া হয়। ঋণ নেওয়ার আগে তাই পরিশোধের বাস্তব পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে গিয়ে ঋণ করা বোকামি
পাশের কলিগ নতুন গাড়ি কিনেছেন। কিংবা বন্ধু দামি ফোন ব্যবহার করছেন। অথবা পরিচিত কেউ বিদেশে ঘুরে এসেছেন। তাহলে আপনাকেও একই কাজগুলো করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব পোস্ট করে অন্যকে দেখাতে খুব আনন্দ পান। সামাজিক তুলনা অনেক সময় মানুষকে নিজের সামর্থ্যের বাইরে খরচ করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু অন্যের আয়, সঞ্চয় বা আর্থিক পরিস্থিতি আপনি জানেন না। নিজের আয় অনুযায়ী জীবনযাপন করাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি নিরাপদ।
মাসের বাজার-খরচ চালাতেই যদি নিয়মিত ধার করতে হয়
এক মাসে সমস্যা হওয়া আর প্রতি মাসে সমস্যা হওয়া এক জিনিস নয়। হঠাৎ কোনো জরুরি কারণে ধার করতে হতে পারে। কিন্তু বাজার, বিল, যাতায়াত কিংবা দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই যদি নিয়মিত ধার করতে হয়, তাহলে কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা খুঁজে দেখা দরকার। হয়তো খরচ কমাতে হবে, হয়তো বাজেট নতুন করে করতে হবে। কারণ নিয়মিত ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণ নেওয়া সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাটিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
কাউকে খুশি করতে নিজের সামর্থ্যের বাইরে যাওয়া
কখনো আত্মীয়ের অনুষ্ঠান, কখনো বন্ধুর প্রয়োজন, কখনো সামাজিক প্রত্যাশা অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে অনেকেই নিজের সামর্থ্যের সীমা ভুলে যান। অন্যকে সাহায্য করা ভালো। কিন্তু সেই সাহায্যের জন্য এমন ঋণ নেওয়া ঠিক কি না, যা পরে নিজের পরিবারকে সমস্যায় ফেলবে সেটিও ভাবতে হবে। সাহায্য করার সামর্থ্য না থাকলে বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ বলতে শেখাও আর্থিক দায়িত্বশীলতার অংশ।
জরুরি সময়ের জন্য কিছুই না রেখে সব খরচ করে ফেলা
জীবনে সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। হঠাৎ চিকিৎসার খরচ হতে পারে, বাড়ির কোনো জরুরি মেরামত লাগতে পারে, কাজের পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হাতে কোনো সঞ্চয় না থাকলে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ধীরে ধীরে জরুরি সঞ্চয় গড়ে তোলা ভবিষ্যতের আর্থিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
ঋণ নেওয়ার আগে একটু থামুন
ঋণ মানেই খারাপ বিষয়টি এমন নয়। বাড়ি, শিক্ষা, প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ঋণ যুক্তিসংগত হতে পারে। আসল বিষয় হলো কেন ঋণ নিচ্ছেন, কতটা নিচ্ছেন এবং কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা আগে থেকেই ভাবা।
তাই ঋণ নেওয়ার আগে নিজেকে অন্তত তিনটি প্রশ্ন করুন
এটি কি সত্যিই প্রয়োজন?
ঋণ না নিয়ে কি কিছুদিন সঞ্চয় করে এটি করা সম্ভব?
আমার বর্তমান আয় দিয়ে কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হবে কি?
আজকের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে যদি আগামী দিনের আয়কে আগেই খরচ করে ফেলেন, তাহলে সেই আনন্দের মূল্য অনেক বেশি হতে পারে। জীবনে ঋণ কখনো কখনো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ঋণ থেকে দূরে থাকা অনেক সময় নিজেকেই ভবিষ্যতের আর্থিক চাপ থেকে দূরে রাখা।