কাতারের মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট (এমআইএ) তাদের সংগ্রহে থাকা দুর্লভ ও ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের অংশ হিসেবে পবিত্র কাবা শরিফের ভেতরের দরজার বিশেষ কিসওয়া (গিলাফ) প্রদর্শন ও সংরক্ষণের তথ্য প্রকাশ করেছে।
কাবা শরিফকে সজ্জিত করার শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে এই মূল্যবান কিসওয়াটি বর্তমানে দোহার এমআইএ-তে পরম যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রতি বছর কাবার পোশাক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় এর ভেতরের দরজা, যা 'বাব আল-তাওবা' (অনুশোচনার দরজা) নামে পরিচিত এবং কাবার ছাদের দিকে যাওয়ার পথ নির্দেশ করে—তা ঢেকে দেওয়ার জন্য এই বিশেষ কারুকাজ করা রেশমি গিলাফটি ব্যবহার করা হতো। কাবার বাইরের বিখ্যাত কালো কিসওয়ার পাশাপাশি এর ভেতরের অংশও এমন চোখধাঁধানো ও কারুকার্যময় রেশমি পর্দা দিয়ে সজ্জিত করার ঐতিহ্য ছিল।
কায়রো থেকে মক্কার পথে 'মাহমাল' শোভাযাত্রা
ইতিহাস অনুযায়ী, প্রতি বছর কাবার জন্য এসব অলঙ্কৃত গিলাফ মিসরের কায়রোতে তৈরি করে বিশেষ পালকিতে (যাকে ‘মাহমাল’ বলা হতো) রাখা হতো। মক্কাগামী হজযাত্রী ও কাফেলার একেবারে সামনের সারিতে করে পূর্ণ মর্যাদায় এসব উপহার মক্কায় নিয়ে আসা হতো।
১২ ৩৩ হিজরিতে (১৮১৭ খ্রিস্টাব্দ) উসমানীয় গভর্নর মুহাম্মদ আলী পাশা কায়রোতে কাবার পর্দা তৈরির জন্য বিশেষ কারখানা ‘দার আল-কিসওয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে কেবল এই পবিত্র বস্ত্রগুলোই বুনন করা হতো।
কিসওয়ার বুনন ও টেক্সট বিশদ
কালো, লাল ও সবুজ রেশমের ওপর উজ্জ্বল সোনালী সুতোর নিখুঁত এমব্রয়ডারি দিয়ে সাজানো হয়েছে এই ঐতিহাসিক কিসওয়াটি। এতে খোদাই করা রয়েছে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ:
-
কুরআনের বাণী: লাল পটভূমির ওপর লেখা রয়েছে সূরা আল-শূরার ২৫ নম্বর আয়াতের আল্লাহর অশেষ করুণা সংক্রান্ত অংশ।
-
আয়াতুল কুরসি: নিচের আয়তক্ষেত্রাকার অংশে খোদাই করা আছে সম্পূর্ণ আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারা: ২৫৫)।
-
শাহাদাত ও দোয়া: এর মাঝে গোলাকার বৃত্তে খোদাই করা আছে কালেমা শাহাদাত এবং মহানবী (সা.)-এর প্রতি দুরুদ ও দোয়া।
সুলতান আব্দুল হামিদের আমলের নিদর্শন
গিলাফটির একেবারে নিচের দিকে বৃত্তাকার সবুজ প্যানেলে খোদাই করা রয়েছে অটোমান বা উসমানীয় সুলতান আব্দুল হামিদের রাজকীয় মোহর 'তুগরা'।
তুগরার ভেতরের লেখা অনুযায়ী, এই বস্ত্রটি অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের (শাসনকাল: ১২৯৩-১৩২৭ হিজরি / ১৮৭৬-১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ) নির্দেশে তৈরি করা হয়েছিল এবং এর সময়কাল ছিল ১৩২১ হিজরি (১৯০৩-১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ)। ইসলামী শিল্পকলা ও পবিত্র কাবার ইতিহাসের অনন্য এক স্মারক হিসেবে কাতার মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্টে সংরক্ষিত এই ঐতিহাসিক কিসওয়াটি বিশ্বজুড়ে দর্শনার্থী ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।