১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ম্যারাডোনার পর যেমন বদলে ছিল আর্জেন্টিনা, মেসির পরও কি বদলাবে?

প্রকাশ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
ম্যারাডোনার পর যেমন বদলে ছিল আর্জেন্টিনা, মেসির পরও কি বদলাবে?
আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।

কিছু খেলোয়াড় শুধু জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা হয়ে ওঠেন পুরো একটি দলের পরিচয়। ব্রাজিল যেমন পেলের সঙ্গে একাকার, তেমনি আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।

এমন উচ্চতার কোনও খেলোয়াড় যখন বুটজোড়া তুলে রাখেন, তখন শুধু একটি ক্যারিয়ার শেষ হয় না; সামনে হাজির হয় আরও বড় এক প্রশ্ন- এরপর কী? যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কখনও কখনও লেগে যায় বহু বছর।

১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলের নেতৃত্বে শেষবার শিরোপা জয়ের পর ব্রাজিলকে আবার বিশ্বকাপ জিততে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৪ বছর। ম্যারাডোনার যুগ শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনারও লেগেছিল প্রায় একই রকম দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ ফিরেছিল সেই সোনালি ট্রফি। এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসরের ঘোষণায় সেই অনিশ্চয়তাই যেন আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টিও ছিল তার মতোই নাটকীয়। ‘ডি’ গ্রুপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ফিরে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। তাকে দলে ফিরে পেয়ে আলফিও বাসিলের দল গ্রিসকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর নাইজেরিয়াকেও হারায় ২-১ গোলে। হঠাৎ করেই আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট।

বিশ্বকাপের আগে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার আমাকে প্রয়োজন- এটাই আমার প্রয়োজন।’ তখন কোনও ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি ছিল না তার, পেশাদার ফুটবলের বাইরেও ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার বাছাই পর্বে কলম্বিয়ার কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বাসিলের ডাক এলে সাড়া দিতে দেরি করেননি।

ততদিনে আর্জেন্টিনার দলে সম্ভাবনাময় একদল তরুণের উত্থান ঘটেছে। লিও রদ্রিগেজ, ডিয়েগো সিমিওনে, ফার্নান্দো রেদোন্দো, ক্লদিও কানিজিয়া ও গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাদের ঘিরে দলটি এরই মধ্যে ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে জিতেছিল টানা দুটি কোপা আমেরিকা।

কিন্তু বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে সেই তরুণ দলটিই যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল। প্রয়োজন ছিল অনুপ্রেরণার, প্রয়োজন ছিল এমন একজনের, যিনি কঠিন মুহূর্তে দলকে টেনে তুলবেন। আবারও ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপালেন ম্যারাডোনা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্লে-অফে ২-১ গোলে জিতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন তিনি।

মূল টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ৪০ দিন আগে দীর্ঘদিনের ফিটনেস কোচ ফার্নান্দো সিগনোরিনির সঙ্গে অনুশীলন করতে লা পাম্পায় চলে গিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হতেই তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প থমকে গেলো। নিষিদ্ধ একটি বস্তুর পরীক্ষায় পজিটিভ হন তিনি। সেই খবরের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই শেষ ষোলোতে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। সেখানেই শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক অধ্যায়।

এরপর আর্জেন্টিনার ডাগআউটে ড্যানিয়েল পাসারেলার আগমন কার্যত ‘এল দিয়েস’-এর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামিয়ে দেয়। দুজনের সম্পর্ক ছিল কঠিন। কিন্তু ম্যারাডোনাকে পেছনে ফেলে সামনে এগোনোর পথটাও আর্জেন্টিনার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রস্তুতির সময় ম্যারাডোনার রুমমেট ছিলেন রিভার প্লেট তারকা আরিয়েল ওর্তেগা। ম্যারাডোনার পর সেই বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। গায়ে ওঠে ১০ নম্বর জার্সি। কিন্তু ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি মুহূর্তই হয়ে দাঁড়ায় ওর্তেগার পুরো বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি। ডাচ গোলকিপার এডউইন ফন ডার সারকে মাথা দিয়ে আঘাত করে লাল কার্ড দেখেন তিনি। এরপর আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়।

তবে ওর্তেগাকে ঘিরে গল্পটির বাইরেও আর্জেন্টিনার ফুটবলে তখন বড় পরিবর্তন এসেছিল। দলটি ধীরে ধীরে কোনও একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও বেশি সমষ্টিনির্ভর হয়ে উঠছিল। দেশটির ফুটবলীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই প্রতিভার কোনও ঘাটতি ছিল না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে একাই উদ্ধার করতে পারবেন এমন একজন, একজন সত্যিকারের আইকন, তখনও খুঁজে পায়নি আর্জেন্টিনা।

আর বিষয়টি শুধু ১০ নম্বর জার্সির ছিল না। ছিল সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দুর অভাবও। ম্যারাডোনার পর, মেসির আগে দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনা এমন একজন স্থায়ী নেতারও অভাব অনুভব করেছে, যিনি মাঠে যেমন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন, তেমনি ড্রেসিংরুমেও থাকবেন নেতৃত্বের কেন্দ্রে।

বরং এক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আরেক খেলোয়াড়ের হাতে ঘুরেছে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। ১৯৯৮ সালে পাসারেলা দায়িত্ব দিয়েছিলেন সিমিওনেকে। ২০০২ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেন হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন; জাপানে দলের শেষ ম্যাচে নেতৃত্ব দেন বাতিস্তুতা। এরপর ২০০৬ সালে হোসে পেকারম্যান দায়িত্ব দেন হুয়ান পাবলো সোরিনকে। ২০১০ সালে সেই দায়িত্ব নেন হাভিয়ের মাসচেরানো।

চার বছর পর আবার বিশ্বকাপে ফেরেন ওর্তেগা। এবার কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে। বিয়েলসার দর্শনে গড়া সেই আর্জেন্টিনা দ্রুত বল এগিয়ে নেওয়া, সরাসরি আক্রমণ, দুই প্রান্ত ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া এবং বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং করে তা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিতো।

ওর্তেগার গায়ে ১০ নম্বর জার্সি থাকলেও তিনি আর আগের সেই চিরাচরিত আর্জেন্টাইন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছিলেন না। বরং তাকে খেলানো হতো অনেকটা ওয়াইড ফরোয়ার্ড হিসেবে। প্রতিপক্ষের ফুলব্যাককে অনুসরণ করে রক্ষণেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো। কিন্তু ওর্তেগা কখনোই নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি। আর্জেন্টিনাও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি।

ম্যারাডোনা-পরবর্তী যুগে এক বিশ্বকাপ চক্র থেকে আরেক চক্রে আর্জেন্টিনার কোচ বদলেছে। পাসারেলার পর দায়িত্ব আসে বিয়েলসার হাতে, এরপর পেকারম্যানের কাছে।

২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে বিশ্বকাপ অভিযানে আর্জেন্টিনার দায়িত্বে ছিলেন পেকারম্যান। যিনি বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দেশটির সোনালি প্রজন্ম তৈরির অন্যতম স্থপতি। তার পছন্দের ১০ নম্বর ছিলেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। ১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তারকা তখন দলের সৃজনশীলতার মূল কেন্দ্র। আর সেই দলেই ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে এক তরুণ মেসি ধীরে ধীরে বিশ্বকে দেখাচ্ছিলেন তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই অসাধারণ প্রতিভার ঝলক, যা অচিরেই বিশ্ব ফুটবলে ঝড় তুলবে।

আর্জেন্টিনা তখন খেলতো আরও ঐতিহ্যবাহী এক ছকে। বল দখলে রেখে, আর ১০ নম্বরকে ক্লাসিক প্লেমেকার হিসেবে ব্যবহার করে। খেলার গতি ও ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন রিকেলমে। কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিলেও ২০০৬-এর সেই আর্জেন্টিনা আজও স্মরণীয় টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ও দক্ষ দল হিসেবে।

২০১০ সালে আর্জেন্টিনার কাঠামোয় আসে বড় পরিবর্তন। ডাগআউটে তখন ম্যারাডোনা, আর তারই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামছেন মেসি।

বার্সেলোনায় নিজের অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসেছিলেন ছোটখাটো গড়নের সেই জাদুকর। সঙ্গে ছিল ক্রমেই পরিচিত হয়ে ওঠা বিশাল প্রত্যাশা। ক্লাব ফুটবলে তিনি যা করছেন, আর্জেন্টিনার হয়েও ঠিক সেটিই করতে হবে।

কিন্তু সেই বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল হতাশায়। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তবে আজ পেছন ফিরে তাকালে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-কে অন্যভাবেও দেখা যায়। কারণ সেখানেই প্রকৃত অর্থে মেসি-যুগের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল।

ম্যারাডোনার পরও আর্জেন্টিনা একের পর এক বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করেছে। গড়ে তুলেছে স্মরণীয় সব দল। কিন্তু বছরের পর বছর তাদের খুঁজতে হয়েছে এমন একজনকে, যিনি ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া প্রতীকী শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন। এবার শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়।

অসাধারণ ফুটবলার তৈরি করার আর্জেন্টিনার ঐতিহ্য এখনও অটুট। কিন্তু লা আলবিসেলেস্তেকে আবারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরিচিত এক চ্যালেঞ্জের- এমন একজন ১০ নম্বরকে ছাড়া পথ চলা, যাকে একসময় মনে করা হয়েছিল অপূরণীয়।

ম্যারাডোনা-পরবর্তী সময় আর্জেন্টিনার জন্য একটি কার্যকর শিক্ষা রেখে গেছে। আর ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা হয়তো আরেকজন মেসি খুঁজে পাবে না। কিন্তু প্রধান তারকাকে ছাড়া কীভাবে নিজেদের বদলে নিতে হয়, কীভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, সেই পথ তারা আগেও খুঁজে নিয়েছে। হয়তো মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার গল্পটাও শেষ পর্যন্ত হবে নতুন করে নিজেদের আবিষ্কারের গল্প হিসেবে।

ম্যারাডোনার পর যেমন বদলে ছিল আর্জেন্টিনা, মেসির পরও কি বদলাবে?

প্রকাশ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
ম্যারাডোনার পর যেমন বদলে ছিল আর্জেন্টিনা, মেসির পরও কি বদলাবে?
আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।

কিছু খেলোয়াড় শুধু জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা হয়ে ওঠেন পুরো একটি দলের পরিচয়। ব্রাজিল যেমন পেলের সঙ্গে একাকার, তেমনি আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।

এমন উচ্চতার কোনও খেলোয়াড় যখন বুটজোড়া তুলে রাখেন, তখন শুধু একটি ক্যারিয়ার শেষ হয় না; সামনে হাজির হয় আরও বড় এক প্রশ্ন- এরপর কী? যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কখনও কখনও লেগে যায় বহু বছর।

১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলের নেতৃত্বে শেষবার শিরোপা জয়ের পর ব্রাজিলকে আবার বিশ্বকাপ জিততে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৪ বছর। ম্যারাডোনার যুগ শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনারও লেগেছিল প্রায় একই রকম দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ ফিরেছিল সেই সোনালি ট্রফি। এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসরের ঘোষণায় সেই অনিশ্চয়তাই যেন আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টিও ছিল তার মতোই নাটকীয়। ‘ডি’ গ্রুপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ফিরে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। তাকে দলে ফিরে পেয়ে আলফিও বাসিলের দল গ্রিসকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর নাইজেরিয়াকেও হারায় ২-১ গোলে। হঠাৎ করেই আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট।

বিশ্বকাপের আগে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার আমাকে প্রয়োজন- এটাই আমার প্রয়োজন।’ তখন কোনও ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি ছিল না তার, পেশাদার ফুটবলের বাইরেও ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার বাছাই পর্বে কলম্বিয়ার কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বাসিলের ডাক এলে সাড়া দিতে দেরি করেননি।

ততদিনে আর্জেন্টিনার দলে সম্ভাবনাময় একদল তরুণের উত্থান ঘটেছে। লিও রদ্রিগেজ, ডিয়েগো সিমিওনে, ফার্নান্দো রেদোন্দো, ক্লদিও কানিজিয়া ও গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাদের ঘিরে দলটি এরই মধ্যে ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে জিতেছিল টানা দুটি কোপা আমেরিকা।

কিন্তু বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে সেই তরুণ দলটিই যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল। প্রয়োজন ছিল অনুপ্রেরণার, প্রয়োজন ছিল এমন একজনের, যিনি কঠিন মুহূর্তে দলকে টেনে তুলবেন। আবারও ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপালেন ম্যারাডোনা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্লে-অফে ২-১ গোলে জিতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন তিনি।

মূল টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ৪০ দিন আগে দীর্ঘদিনের ফিটনেস কোচ ফার্নান্দো সিগনোরিনির সঙ্গে অনুশীলন করতে লা পাম্পায় চলে গিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হতেই তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প থমকে গেলো। নিষিদ্ধ একটি বস্তুর পরীক্ষায় পজিটিভ হন তিনি। সেই খবরের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই শেষ ষোলোতে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। সেখানেই শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক অধ্যায়।

এরপর আর্জেন্টিনার ডাগআউটে ড্যানিয়েল পাসারেলার আগমন কার্যত ‘এল দিয়েস’-এর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামিয়ে দেয়। দুজনের সম্পর্ক ছিল কঠিন। কিন্তু ম্যারাডোনাকে পেছনে ফেলে সামনে এগোনোর পথটাও আর্জেন্টিনার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রস্তুতির সময় ম্যারাডোনার রুমমেট ছিলেন রিভার প্লেট তারকা আরিয়েল ওর্তেগা। ম্যারাডোনার পর সেই বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। গায়ে ওঠে ১০ নম্বর জার্সি। কিন্তু ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি মুহূর্তই হয়ে দাঁড়ায় ওর্তেগার পুরো বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি। ডাচ গোলকিপার এডউইন ফন ডার সারকে মাথা দিয়ে আঘাত করে লাল কার্ড দেখেন তিনি। এরপর আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়।

তবে ওর্তেগাকে ঘিরে গল্পটির বাইরেও আর্জেন্টিনার ফুটবলে তখন বড় পরিবর্তন এসেছিল। দলটি ধীরে ধীরে কোনও একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও বেশি সমষ্টিনির্ভর হয়ে উঠছিল। দেশটির ফুটবলীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই প্রতিভার কোনও ঘাটতি ছিল না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে একাই উদ্ধার করতে পারবেন এমন একজন, একজন সত্যিকারের আইকন, তখনও খুঁজে পায়নি আর্জেন্টিনা।

আর বিষয়টি শুধু ১০ নম্বর জার্সির ছিল না। ছিল সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দুর অভাবও। ম্যারাডোনার পর, মেসির আগে দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনা এমন একজন স্থায়ী নেতারও অভাব অনুভব করেছে, যিনি মাঠে যেমন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন, তেমনি ড্রেসিংরুমেও থাকবেন নেতৃত্বের কেন্দ্রে।

বরং এক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আরেক খেলোয়াড়ের হাতে ঘুরেছে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। ১৯৯৮ সালে পাসারেলা দায়িত্ব দিয়েছিলেন সিমিওনেকে। ২০০২ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেন হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন; জাপানে দলের শেষ ম্যাচে নেতৃত্ব দেন বাতিস্তুতা। এরপর ২০০৬ সালে হোসে পেকারম্যান দায়িত্ব দেন হুয়ান পাবলো সোরিনকে। ২০১০ সালে সেই দায়িত্ব নেন হাভিয়ের মাসচেরানো।

চার বছর পর আবার বিশ্বকাপে ফেরেন ওর্তেগা। এবার কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে। বিয়েলসার দর্শনে গড়া সেই আর্জেন্টিনা দ্রুত বল এগিয়ে নেওয়া, সরাসরি আক্রমণ, দুই প্রান্ত ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া এবং বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং করে তা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিতো।

ওর্তেগার গায়ে ১০ নম্বর জার্সি থাকলেও তিনি আর আগের সেই চিরাচরিত আর্জেন্টাইন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছিলেন না। বরং তাকে খেলানো হতো অনেকটা ওয়াইড ফরোয়ার্ড হিসেবে। প্রতিপক্ষের ফুলব্যাককে অনুসরণ করে রক্ষণেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো। কিন্তু ওর্তেগা কখনোই নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি। আর্জেন্টিনাও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি।

ম্যারাডোনা-পরবর্তী যুগে এক বিশ্বকাপ চক্র থেকে আরেক চক্রে আর্জেন্টিনার কোচ বদলেছে। পাসারেলার পর দায়িত্ব আসে বিয়েলসার হাতে, এরপর পেকারম্যানের কাছে।

২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে বিশ্বকাপ অভিযানে আর্জেন্টিনার দায়িত্বে ছিলেন পেকারম্যান। যিনি বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দেশটির সোনালি প্রজন্ম তৈরির অন্যতম স্থপতি। তার পছন্দের ১০ নম্বর ছিলেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। ১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তারকা তখন দলের সৃজনশীলতার মূল কেন্দ্র। আর সেই দলেই ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে এক তরুণ মেসি ধীরে ধীরে বিশ্বকে দেখাচ্ছিলেন তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই অসাধারণ প্রতিভার ঝলক, যা অচিরেই বিশ্ব ফুটবলে ঝড় তুলবে।

আর্জেন্টিনা তখন খেলতো আরও ঐতিহ্যবাহী এক ছকে। বল দখলে রেখে, আর ১০ নম্বরকে ক্লাসিক প্লেমেকার হিসেবে ব্যবহার করে। খেলার গতি ও ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন রিকেলমে। কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিলেও ২০০৬-এর সেই আর্জেন্টিনা আজও স্মরণীয় টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ও দক্ষ দল হিসেবে।

২০১০ সালে আর্জেন্টিনার কাঠামোয় আসে বড় পরিবর্তন। ডাগআউটে তখন ম্যারাডোনা, আর তারই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামছেন মেসি।

বার্সেলোনায় নিজের অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসেছিলেন ছোটখাটো গড়নের সেই জাদুকর। সঙ্গে ছিল ক্রমেই পরিচিত হয়ে ওঠা বিশাল প্রত্যাশা। ক্লাব ফুটবলে তিনি যা করছেন, আর্জেন্টিনার হয়েও ঠিক সেটিই করতে হবে।

কিন্তু সেই বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল হতাশায়। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তবে আজ পেছন ফিরে তাকালে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-কে অন্যভাবেও দেখা যায়। কারণ সেখানেই প্রকৃত অর্থে মেসি-যুগের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল।

ম্যারাডোনার পরও আর্জেন্টিনা একের পর এক বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করেছে। গড়ে তুলেছে স্মরণীয় সব দল। কিন্তু বছরের পর বছর তাদের খুঁজতে হয়েছে এমন একজনকে, যিনি ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া প্রতীকী শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন। এবার শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়।

অসাধারণ ফুটবলার তৈরি করার আর্জেন্টিনার ঐতিহ্য এখনও অটুট। কিন্তু লা আলবিসেলেস্তেকে আবারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরিচিত এক চ্যালেঞ্জের- এমন একজন ১০ নম্বরকে ছাড়া পথ চলা, যাকে একসময় মনে করা হয়েছিল অপূরণীয়।

ম্যারাডোনা-পরবর্তী সময় আর্জেন্টিনার জন্য একটি কার্যকর শিক্ষা রেখে গেছে। আর ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা হয়তো আরেকজন মেসি খুঁজে পাবে না। কিন্তু প্রধান তারকাকে ছাড়া কীভাবে নিজেদের বদলে নিতে হয়, কীভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, সেই পথ তারা আগেও খুঁজে নিয়েছে। হয়তো মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার গল্পটাও শেষ পর্যন্ত হবে নতুন করে নিজেদের আবিষ্কারের গল্প হিসেবে।

ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশ দলে জিদানসহ তিন প্রবাসী

প্রকাশ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশ দলে জিদানসহ তিন প্রবাসী

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ফিফা আসিয়ান কাপের জন্য বাংলাদেশের চূড়ান্ত দল হয়েছে। ২৩ সদস্যের দলে একাধিক নতুন মুখ।

প্রবাসী জিদান ইউসুফ, শুকি ইতফোসা ও ফারহান আলী ওয়াহিদ নতুন মুখ। এছাড়া মিনহাজুল করিম স্বাধীন রয়েছেন। বাদ পরেছেন সাইফ, ফাহিম ও জিকো।

বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে ‘এ’ গ্রুপে। এই গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষরা হলো স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর।

জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে হবে খেলাগুলো।

ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়া জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা ফারহান, জিদান ও শুকির সামনে এবারই প্রথম বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ। জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকার পর কোচ টমাস ডুলির আস্থায় তারা জায়গা করে নিয়েছেন আসিয়ান কাপের চূড়ান্ত দলে।

তিনজনের মধ্যে ফারহান আলী ওয়াহিদ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলে একজন স্বীকৃত সেন্টার ফরোয়ার্ডের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা ছিল। সেই জায়গায় ফারহানকে নতুন একটি বিকল্প হিসেবে দেখছেন কোচ ডুলি। যদিও চলমান ক্যাম্পে এখনও পাওয়া যায়নি তাঁকে। সরাসরি যোগ দেবেন ইন্দোনেশিয়ায়।

জিদান ইউসুফ রক্ষণভাগের খেলোয়াড়। অনুর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে নজর কেড়েছেন তিনি। আর জাপান প্রবাসী শুকি ইতফুসার অন্তর্ভুক্তি আক্রমণভাগে আরও একটি বিকল্প যোগ করেছে বাংলাদেশ দলে।

তিন প্রবাসীর সঙ্গে এবারের দলে আছেন আগে থেকেই জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন প্রবাসী ফুটবলারও। হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, তারিক কাজী, জায়ান আহমেদ ও ফাহামিদুল ইসলামের সঙ্গে এবার যোগ হলো নতুন তিন নাম।

​বাংলাদেশ দল

মিতুল মারমা, মো. সুজন হোসেন, মো. মেহেদী হাসান শ্রাবণ, তপু বর্মন, মো. শাকিল আহাদ তপু, মো. সাদ উদ্দিন, মো. রহমত মিয়া, তারিক রায়হান কাজী, জাইয়ান আহমেদ, জিদান আলেকজান্ডার ইউসুফ, এস এম মনজুরুর রহমান, জামাল ভূঁইয়া, মো. সোহেল রানা, সোহেল রানা, মো. হৃদয়, শেখ মোরসালিন, রাকিব হোসেন, মো. মিনহাজুল করিম স্বাধীন, ফাহামেদুল ইসলাম, হামজা দেওয়ান চৌধুরী, শামিত শোম, ফারহান আলী ওয়াহিদ, শুকি ইতফুসা।

৬৮ বছর পর লা লিগায় বিরল কীর্তি বার্সোলোনার

প্রকাশ: সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬
৬৮ বছর পর লা লিগায় বিরল কীর্তি বার্সোলোনার

মৌসুমের শুরুতেই গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছে বার্সেলোনার আক্রমণভাগ। লা লিগার প্রথম পাঁচ ম্যাচে রাফিনিয়া, লামিন ইয়ামাল ও ফেরমিন লোপেজ মিলে করেছেন ১৬ গোল। এর মাধ্যমে ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবারের মতো স্পেনের শীর্ষ লিগে কোনো আক্রমণত্রয়ী প্রথম পাঁচ ম্যাচে এত গোল করার কীর্তি গড়েছে।

রবিবার রাতে লেভান্তের মাঠে ৪-২ গোলের জয়ের ম্যাচেই রেকর্ডটি স্পর্শ করে বার্সেলোনা। ম্যাচের ৪৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ইয়ামালের দ্বিতীয় গোলের পর আক্রমণভাগের তিন সদস্যের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ তে। নতুন মৌসুমে টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে লা লিগার শীর্ষস্থানও আরও শক্ত করেছে হানসি ফ্লিকের দল।

এই ১৬ গোলের মধ্যে রাফিনিয়া ও ইয়ামালের নামের পাশে রয়েছে ছয়টি করে গোল। বাকি চারটি করেছেন ফেরমিন লোপেজ। লেভান্তের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইয়ামালও দলের দুর্দান্ত শুরুর অন্যতম নায়ক হয়েছেন।

ম্যাচে বার্সেলোনার হয়ে প্রথম গোলটি করেন শাভি এসপার্ত। রাফিনিয়ার পাস থেকে গোলটি আসে। এরপর ইয়ামালের প্রথম গোলেও অবদান রাখেন রাফিনিয়া। পরে পেনাল্টি থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ইয়ামাল। তবে রক্ষণে দুটি ভুলের কারণে লেভান্তে দুই গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরার আভাস দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কারিম আদেয়েমির গোলে জয় নিশ্চিত করে বার্সেলোনা।

ইয়ামালের দ্বিতীয় গোলের সাথে সাথেই ৬৮ বছর আগের একটি রেকর্ডের পাশে বসে বার্সার বর্তমান আক্রমণত্রয়ী। ১৯৫৮-৫৯ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি ত্রয়ী আলফ্রেডো দি স্তেফানো, ফেরেঙ্ক পুসকাস ও হেক্তর রিয়াল প্রথম পাঁচ ম্যাচে করেছিলেন ১৬ গোল।

তবে লা লিগার ইতিহাসে প্রথম পাঁচ ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড এখনো সেভিয়ার। ১৯৪০-৪১ মৌসুমে গিয়ের্মো কাম্পানাল, মিগেল তোরোনতেগুই ও হোসে লোপেজ মিলে করেছিলেন ২৪ গোল।

এর পরের অবস্থানে রয়েছে ১৭ গোল করা দুটি আক্রমণত্রয়ী। একই মৌসুমে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের প্রুদেন সানচেজ, পাকো কাম্পোস ও কোসমে ভাসকেজ এবং সেলতা ভিগোর আগুস্তিন হারাবো, হুয়ান দেল পিনো ও রাইমুন্দো দিয়াজ এই কীর্তি গড়েছিলেন।

এ ছাড়া ১৯৪১-৪২ মৌসুমে সেভিয়ার রাইমুন্দো ব্লাঙ্কো, পেপিয়ো ও কাম্পানাল এবং ১৯৫০-৫১ মৌসুমে বার্সেলোনার সেসার রদ্রিগেজ, মার্কোস আউরেলিও ও এস্তানিসলাও বাসোরাও প্রথম পাঁচ ম্যাচে ১৬ গোল করেছিলেন। ফলে এবার নিজেদের ক্লাবের পুরোনো রেকর্ডও ছুঁয়ে ফেলেছে ইয়ামাল-রাফিনিয়ারা।

মাঠে রেফারিদের হাতে এবার ‘কালো কার্ড’

প্রকাশ: রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
মাঠে রেফারিদের হাতে এবার ‘কালো কার্ড’

শিশুদের ফুটবল ম্যাচে গ্যালারিতে অভিভাবকদের অতিরিক্ত মানসিক চাপ, গালাগালি কিংবা হাতাহাতির মতো বিশৃঙ্খলা রুখতে এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে রোমানিয়া ফুটবল ফেডারেশন।

খুদে ফুটবলারদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে বিশেষ ‘কালো কার্ড’। প্রথাসিদ্ধ লাল কিংবা হলুদ কার্ডের মতো খেলোয়াড়দের ওপর নয়, বরং গ্যালারির বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি অভিভাবকদের সতর্ক করতেই এটি ব্যবহার করবেন রেফারি।

সম্প্রতি আর্জেন্টিনাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস-এর এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশটির অনূর্ধ্ব-৭ থেকে অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যন্ত সব যুব প্রতিযোগিতায় নিয়মটি কার্যকর করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারিতে দর্শকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রথম দফায় খেলা সাময়িকভাবে থামিয়ে দেবেন রেফারি।

এ সময় দুই দলের কোচ গ্যালারিতে গিয়ে নিজেদের সমর্থকদের শান্ত করার চেষ্টা করবেন। তাতেও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে দ্বিতীয় ধাপে খেলা ১০ মিনিটের জন্য স্থগিত করা হবে এবং ফুটবলারদের ড্রেসিংরুমে পাঠানো হবে।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর খেলা পুনরায় শুরু হলেও যদি অভিভাবকদের আপত্তিকর আচরণ অব্যাহত থাকে, তবে রেফারি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ‘কালো কার্ড’ প্রদর্শন করবেন।

আর রেফারি এই কার্ড বের করা মাত্রই ম্যাচটি স্থায়ীভাবে পণ্ড হয়ে যাবে এবং কোনোভাবেই সেদিনের মতো আর মাঠে খেলা গড়াবে না।

এর আগে ২০২৪ সালে গ্যালারির অসদাচরণ বন্ধে জরিমানা কিংবা লাইসেন্স বাতিলের কঠোর বিধান রাখা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছিল না। ম্যাচ শেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে এবার সরাসরি খেলার চলাকালীন পরিস্থিতি সামলানোর মূল ক্ষমতা রেফারির হাতে তুলে দিলো রোমানিয়ার ফুটবল কর্তৃপক্ষ।

সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করায় বয়কটের মুখে অ্যাডিডাস

প্রকাশ: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬
সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করায় বয়কটের মুখে অ্যাডিডাস
অ্যাডিডাস বয়কটের আহ্বানে সমর্থন জানিয়েছেন হাভিয়ের বারদেম ও ফাতিমা ভুট্টো/ ছবি: ইনস্টাগ্রাম

সাবেক এক ইসরায়েলি সেনাকে বিজ্ঞাপনে দেখানোয় বয়কটের মুখে পড়েছে জার্মান ক্রীড়াপণ্য নির্মাতা অ্যাডিডাস। সম্প্রতি অ্যাম্পিউটি বা অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তিদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির এক পায়ের জুতা সরবরাহ–সেবার প্রচারে সাবেক ইসরায়েলি সেনা শালেভ বিটনকে দেখানো হয়েছে।

ইসরায়েলের একটি দোকানে তাকে জুতা পরতে দেখা যায়। পরে বাইরে দৌড়াতেও দেখা যায় সাবেক এ সেনাকে।

বিজ্ঞাপনটি প্রকাশের পর ফিলিস্তিনপন্থি অধিকারকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অ্যাডিডাসকে বয়কটের আহ্বানও জানানো হচ্ছে।

‘ফিলিস্তিনিদের জন্য অপমানজনক’
ফিলিস্তিনপন্থি বয়কট আন্দোলনের সংগঠকেরা এই বিজ্ঞাপনকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ‘চরম অবমাননাকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্যালেস্টিনিয়ান ক্যাম্পেইন ফর দ্য একাডেমিক অ্যান্ড কালচারাল বয়কট অব ইসরায়েলের (পিএসিবিআই) স্পোর্টস বয়কট ক্যাম্পেইন সমন্বয়কারী স্টেফানি ওয়েস্টব্রুক অ্যাডিডাসের সমালোচনা করেছেন।

তার কথায়, এটি শুধু অ্যাডিডাসের অসংবেদনশীলতা বা পরিস্থিতি না বোঝার ঘটনা নয়। বরং গাজায় ইসরায়েলি হামলায় স্বজন ও অঙ্গ হারানো ফিলিস্তিনিদের জন্য অপমানজনক।

ওয়েস্টব্রুকের মতে, এ ধরনের প্রচারণা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনে থাকা শালেভ বিটন সাবেক ইসরায়েলি সেনা। ২০২১ সালে ইসরায়েল ও গাজার মধ্যে সংঘাতের সময় আহত হয়ে তিনি একটি পা হারান।

ওই সময়ে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর টানা ১১ দিনের হামলা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে তাড়ানোর কাজ চলছে, স্বীকার করল ইসরায়েল

ওয়েস্টব্রুক বলেন, বিজ্ঞাপনে এমন একজনকে তুলে ধরা হয়েছে যার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তার সেনাজীবন।

এ নিয়ে তিনি ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড ও ফিলিস্তিনিদের ওপর এর প্রভাবের প্রসঙ্গও তুলেছেন।

গাজায় অঙ্গহানির চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত গাজায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ অঙ্গচ্ছেদের শিকার হয়েছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা দুই বছরের সংঘাতে প্রায় ৪২ হাজার ফিলিস্তিনি জীবন বদলে দেওয়া ধরনের আঘাত পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিস্থিতিও চরম সংকটপূর্ণ বলে জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

ইসরায়েলের অবরোধের কারণে ওষুধ ও কৃত্রিম অঙ্গসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী গাজায় প্রবেশে বাধার অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন

গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলই প্রধান বাধা: সৌদি, কাতারসহ ৮ দেশের যৌথ বিবৃতি

নিহত ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদও
অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনে সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে দৌড়াতে দেখা গেলেও গাজায় যুদ্ধের কারণে ক্রীড়াঙ্গনেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ফিলিস্তিনের ১১ ফুটবলার ও ফিফা রেফারিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের সময় এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন। অনেক ফুটবল খেলোয়াড়ও অঙ্গ হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন

গণহত্যার অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি তুরস্কের

তাদের কেউ কেউ অ্যাম্পিউটি ফুটবল দল গঠন করেছেন। ধ্বংস, মৃত্যু ও অঙ্গহানির মধ্যেও খেলাধুলার মাধ্যমে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন।

বয়কটের আহ্বানে তারকারাও
অ্যাডিডাস বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম। ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়কটের প্রচারণাসংক্রান্ত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন।

মার্কিন-ফিলিস্তিনি লেখক সুসান আবুলহাওয়া, পাকিস্তানি লেখক ফাতিমা ভুট্টোসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ফিলিস্তিনিও অ্যাডিডাসের পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গাজায় গত দুই বছরে অঙ্গচ্ছেদের শিকার মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শিশু।

আরও পড়ুন

গাজায় প্রতিদিন ৩০-৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান বেন-গভিরের

সংস্থাটির মতে, প্রতি ব্যক্তির হিসাবে গাজায় বিশ্বের অন্য যে কোনো স্থানের তুলনায় শিশু অ্যাম্পিউটির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় প্রায় ৪২ হাজার ফিলিস্তিনি জীবন বদলে দেওয়া ধরনের আঘাত পেয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১১ হাজারই শিশু।

সূত্র: আল-জাজিরা