লোহিত সাগর ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালী ঘিরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা নতুন করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের জেরে এই জলপথে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর নেতিবাচক প্রভাব কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন আমদানিনির্ভর ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিকেও এর চড়া মূল্য দিতে হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্ব বাণিজ্যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন বা প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত লোহিত সাগর। এর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মানদেব প্রণালী আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মূলত এই পথ পাড়ি দিয়েই পণ্যবাহী জাহাজগুলো সুয়েজ খালের মাধ্যমে খুব সহজেই ইউরোপের বাজারে পৌঁছাতে পারে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে সংক্ষিপ্ততম দূরত্বে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম এই সমুদ্রপথ।
কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের কারণে জাহাজগুলো যদি এই রুট এড়িয়ে চলতে বাধ্য হয়, তবে তাদের আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ (Cape of Good Hope) হয়ে বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হয়। এর ফলে জাহাজের স্বাভাবিক যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়।
বিকল্প রুটের বাড়তি চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
লোহিত সাগর এড়িয়ে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগছে:
-
সময় বৃদ্ধি: যে পণ্যগুলো সাধারণত স্বাভাবিক রুটে প্রায় ২৮ দিনে গন্তব্যে পৌঁছাত, বিকল্প রুটে সেখানে প্রায় ৪৫ দিন বা তার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
-
লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি: দীর্ঘ দূরত্বের কারণে জ্বালানি খরচ, জাহাজের ভাড়া, ক্রু বা নাবিকদের বেতন এবং সামুদ্রিক বিমা বা ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও রপ্তানি খাতে বড় আঘাত
বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো তৈরি পোশাক (RMG) খাত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে আমাদের পোশাকের বড় একটি অংশ সমুদ্রপথেই রপ্তানি করা হয়। লোহিত সাগরের এই সংকট প্রলম্বিত হলে পোশাক রপ্তানিকারকদের নানামুখী সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে:
-
নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে না পারার ঝুঁকি।
-
কন্টেইনার ও জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
-
সময়মতো চালান না পৌঁছালে অনেক সময় ক্রেতাদের জরিমানা গুনতে হয় বা কার্যাদেশ (অর্ডার) বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়।
-
সার্বিক উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয় দীর্ঘসূত্রতা।
আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা
বাংলাদেশ কেবল রপ্তানির জন্যই নয়, বরং বিভিন্ন নিত্যপণ্য ও শিল্প কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। সমুদ্রপথের দূরত্ব ও সময় বাড়ার কারণে শুধু জাহাজভাড়া নয়, আমদানিকৃত পণ্যের সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে যায়। এর প্রভাবে আমদানিকারকরা বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর ফেলেন, যা দেশের বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা তৈরি করে।
পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত গ্যাস (LNG) ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। যদিও জ্বালানির স্থানীয় দাম কেবল পরিবহন খরচের ওপর নির্ভর করে না—এর সাথে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার, সরকারি নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও জড়িত; তবুও এই নৌপথের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
সংকট উত্তরণে ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
মূলত গাজা যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে হুথিদের এই লোহিত সাগরমুখী আগ্রাসন। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও হুমকি বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর তাই বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সুরক্ষায় বিকল্প বাণিজ্যিক রুট সন্ধান এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে জোরালো ভূমিকা রাখার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।