মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) যুগের অবসান ঘটিয়ে শতভাগ ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশে। বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোয় পাসপোর্ট সেবাগ্রহীতাদের প্রায় ৯৯ শতাংশই এখন ই-পাসপোর্ট নিচ্ছেন।
এ অবস্থায় যেসব মিশনে ই-পাসপোর্ট সেবা পুরোপুরি চালু হয়েছে, সেখানে এমআরপি বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব মিশনে পর্যায়ক্রমে এমআরপি সেবা গুটিয়ে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা কার্যকরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
গত ২৩ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোয় এমআরপি, ই-পাসপোর্ট ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী দেশের ৭১টি পাসপোর্ট অফিস ও বিদেশের ৭১টি মিশনে ই-পাসপোর্ট সেবা চালুর অগ্রগতি এবং বিতরণ করা ই-পাসপোর্টের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমআরপি সুবিধা পুরোপুরি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। একই সঙ্গে প্রবাসীদের ই-পাসপোর্টের তথ্য সংশোধনে এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহারের সুযোগ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়।
এর আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এমআরপি সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে শতভাগ ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালু করা হবে।
দেশে ২০২০ সালে ই-পাসপোর্ট চালু হলেও বিদেশে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মীর একটি বড় অংশ তখনো এমআরপির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। জন্মনিবন্ধনের তথ্য দিয়ে তৈরি অনেক এমআরপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এনআইডির তথ্যের অমিল ছিল। আবার অনেক প্রবাসীর এনআইডিই ছিল না। ফলে হঠাৎ এমআরপি সেবা বন্ধ করা হলে বিশেষ করে সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের ভিসা ও আকামার বৈধতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এতে অনেকের দেশে ফিরে আসার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারত। এ কারণে ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পরও প্রবাসীদের সুবিধার্থে সাময়িকভাবে এমআরপি সেবা চালু রাখা হয়েছিল।
পর্যালোচনা সভায় বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার জানান, বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোয় ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট ৯৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৮ সালে এমআরপি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এর পুরনো যন্ত্রপাতি সচল রাখা ও মেরামত করা ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে পড়েছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান, বর্তমানে আর এমআরপি সিস্টেম অব্যাহত রাখার প্রয়োজন নেই।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে অর্থাৎ ৩০ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭ হাজার ১টি ই-পাসপোর্টের বিপরীতে মাত্র একটি এমআরপি ইস্যু হয়েছে। ওই এমআরপিটিও বিদেশের একটি কনস্যুলেট থেকে ইস্যু করা হয়েছে। তাদের মতে, চাহিদা প্রায় না থাকায় এমআরপি ব্যবস্থা চালু রাখার কার্যকারিতাও এখন অনেকটাই কমে গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, এমআরপি সেবা পুরোপুরি বন্ধে ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর প্রথম ধাপে বিদেশের যেসব বাংলাদেশ মিশনে ই-পাসপোর্ট সেবা পুরোপুরি চালু হয়েছে, সেসব মিশনে এমআরপি সুবিধা অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ পরিবর্তনের সুযোগে প্রবাসীরা যাতে হয়রানি বা মধ্যস্বত্বভোগীদের খপ্পরে না পড়েন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মিশনগুলোকে সতর্ক নজর রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া সৌদি আরবে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশীকে দ্রুত পাসপোর্ট সেবা দিতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত আটটি মোবাইল এনরোলমেন্ট কিট (এমইকে) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাশাপাশি রাশিয়ার মস্কো মিশনের ধারাবাহিকতায় ভারতের দিল্লি ও কলকাতা মিশনে দ্রুত ই-পাসপোর্ট সেবা চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত সব সার্ভার এবং এমইকের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিশ্চিত করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে যাদের হাতে এমআরপি রয়েছে কিন্তু ই-পাসপোর্ট নেয়া হয়নি, তাদের জন্য সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। নতুন করে আর এমআরপি করা যাবে না। তবে যাদের বৈধ এমআরপি রয়েছে, তারা পরবর্তী সময়ে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রবাসীদের সুবিধার্থে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এমআরপি সেবা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সঙ্গে ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনের তথ্যে বয়সের অমিল থাকলে সর্বোচ্চ আট বছর পর্যন্ত বিশেষ ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এ আট বছরের ছাড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয়পত্র কর্তৃপক্ষের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, এটি এনআইডি অনুবিভাগের নিজস্ব নীতি নয়; বরং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অংশ। তিনি বলেন, ‘আট বছরের সংশোধনের এ সুযোগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সার্কুলার অনুযায়ী দিয়েছে। এটি এনআইডি অনুবিভাগের সার্কুলার নয়।
আমাদের ক্ষেত্রে বয়স সংশোধন বা তথ্য যাচাই সবসময় এসওপি অনুযায়ী করা হয়। জন্মসনদ, শিক্ষাগত সনদ, পারিবারিক সনদ এবং ভাই-বোন বা পিতা-মাতার এনআইডিসহ প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।’ এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্ট রূপান্তর প্রসঙ্গে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে এমআরপি করা যাবে না। তবে যাদের হাতে এমআরপি আছে তারা যেকোনো সময় ই-পাসপোর্ট করতে পারবেন। শর্ত হলো, এনআইডির তথ্যের সঙ্গে হুবহু মিল থাকতে হবে।’
এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এমআরপি বন্ধের বিষয়ে অধিদপ্তরের অবস্থান আগের মতোই রয়েছে। দুই বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরে এমআরপি ইস্যু বন্ধ রয়েছে। বিদেশে পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এর ব্যবহার ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে বিদেশের মিশনগুলোকে এমআরপি বন্ধের বিষয়ে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
তবে অনেক প্রবাসীর এনআইডি ও অন্যান্য নথির তথ্যে গরমিল থাকায় এবং সরাসরি মিশনে গিয়ে ই-পাসপোর্টের আবেদন করাকে ঝামেলাপূর্ণ মনে হওয়ায় তারা এখনো এমআরপি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’ ওই কর্মকর্তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মিশনে কনস্যুলার সার্ভিস সেন্টার ও প্রয়োজনীয় জনবল বাড়িয়ে ই-পাসপোর্ট সেবার গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। তাহলেই এমআরপি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে।