চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক পুলিশ কনস্টেবলের সহযোগিতায় অভিযানের নামে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪০ ভরি স্বর্ণ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ওই পুলিশ কনস্টেবলের নাম জাকির হোসেন। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার্স মেসে কর্মরত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর কালীনগর ব্রিজের পাশে গত ৮ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে স্বর্ণ লুটের ওই ঘটনাটি ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে। গলিত অবস্থায় ৪০ ভরি স্বর্ণ রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঠিয়েছিলেন নিঝুম নামে আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী।
রাজশাহী থেকে স্বর্ণগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে যান ব্যবসায়ী নিঝুমেরই দুলাভাই মোহাম্মদ আলী। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর আলমপুরে। মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. নয়নের বন্ধু হচ্ছেন পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণের চালানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওই ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়ার দুই মিনিটের মধ্যে সেখানে হাজির হন কনস্টেবল জাকির।
পরে পুলিশ পরিচয়ে তিনি তার কাছ থেকে ওই স্বর্ণ নিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ। ঘটনার পর ওই ব্যবসায়ী বিষয়টি নিঝুমকে জানান। নিঝুমের অভিযোগ, তার দুলাভাই মোহাম্মদ আলী ও ভাগনে মো. নয়ন স্বর্ণ লুটের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্য জাকিরকে ব্যবহার করেছে। জাকির অভিযানের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৪০ ভরি স্বর্ণ হাতিয়ে তিনজনে ভাগবাঁটোয়ারা করেছেন।
ব্যবসায়ী নিঝুমের দাবি, ঘটনাটি যেদিন ঘটে সেদিন ছিল শনিবার। তিনি তার দুলাভাইয়ের হাত দিয়েই ওই ৪০ ভরি স্বর্ণ চাঁপাইনবাবগঞ্জে দিতে পাঠান। তার দুলাভাই মোহাম্মদ আলী ও ভাগনে নয়ন এই স্বর্ণ মেরে দিতে পুলিশ কনস্টেবল জাকিরকে ঠিক করেছিলেন। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণের চালানটি হস্তান্তরের পরপরই সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য জাকির আরেকজনকে নিয়ে গিয়ে ওই স্বর্ণ হাতিয়ে নেন।
এ ঘটনার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে কালীনগর ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন তিনি। এতে দেখা যায়, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে জাকির তার নিজের ব্যবহৃত অ্যাপাচি মোটরসাইকেলে তিনিসহ দুজন ব্রিজের দিকে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেলে জাকিরের সঙ্গে অপরজন কে ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন সেদিন মোটরসাইকেলে কালীনগর ব্রিজের দিকে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন। জাকির বলেন, ‘নিঝুম কারণ ছাড়াই এ ঘটনায় আমাকে জড়াচ্ছেন। কিন্তু আমি জড়িত না। বিষয়টা তাদের নিজেদের। ওদের মীমাংসার জন্য বসারও কথা ছিল। পরে তারা বসেনি।’
তবে কনস্টেবল জাকির হোসেন, নয়ন ও তার বাবা মোহাম্মদ আলীর মোবাইলের ফোনকল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘটনার দিন, আগের দিন ও পরদিন মূল পরিকল্পনাকারী নয়ন ও তার বাবার সঙ্গে অসংখ্যবার মোবাইলে কথা হয়েছে জাকিরের। এর মধ্যে ঘটনার দুই দিন আগে ৬ আগস্ট জাকির তার ব্যবহৃত ০১৭০১৭৪**৭৪ নম্বর থেকে নয়নের ০১৩১৭৯৮**১৫ নম্বরে মোট ১০ বার কথা বলেছেন।
ঘটনার দিন ৮ আগস্ট জাকির ও নয়নের মোবাইলে কথা হয়েছে ১০ বার। ফোনকলের লোকেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বর্ণ নিয়ে মোহাম্মদ আলী যখন কালীনগর ব্রিজের আশপাশে ছিলেন, তখন ওই এলাকাতেই ছিলেন পুলিশ সদস্য জাকির। তখনো তাদের মধ্যে কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে।
কথোপকথনের ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন শুধু নয়নের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, অনেক দিন ধরেই নয়ন তার পরিচিত। তার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়, দেখা হয়। তবে নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মোবাইলে এতবার কী কথা হয়েছে সে প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
স্বর্ণের চালানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলী। আর তার ছেলে নয়ন বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটা লাইব্রেরি চালাই, রাজশাহীতে পড়াশোনা করি। বেশির ভাগ সময় রাজশাহীতেই থাকি। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। মামা কেন আমার কথা বলছে জানি না।’
এদিকে ঘটনার বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইন বলেন, এ ব্যাপারে থানায় কেউ অভিযোগ করেননি। তিনি কিছু জানেন না।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজও এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত করে জাকিরের সম্পৃক্ততা পেলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।