১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভিসা আবেদনে ভুয়া নথির ছড়াছড়ি:

আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশী পাসপোর্ট

প্রকাশ: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬
আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশী পাসপোর্ট

বছর দুই আগে অস্ট্রেলিয়ার একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান বাংলাদেশী তরুণ আকিব হোসেন (প্রকৃত নাম নয়)। ভিসার জন্য তাকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেটের মতো প্রয়োজনীয় নথিপত্রের জোগান দেয় গুলশানের একটি শিক্ষা ও ক্যারিয়ার কনসালট্যান্সি ফার্ম। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের এ তরুণের পক্ষে ব্যাংকে ৬০ লাখ টাকার আমানত স্থিতি দেখানো সম্ভব ছিল না।

সেজন্য ওই ফার্মটির মধ্যস্থতায় দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের শরিয়াহভিত্তিক একটি ব্যাংকে ৩ লাখ টাকা জমা দেয়া হয়। বিনিময়ে ওই ব্যাংক থেকে দেয়া হয় ৬০ লাখ টাকার সলভেন্সি সার্টিফিকেট। এজন্য জমাকৃত টাকা থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা সার্ভিস ফি কেটে নেয় ব্যাংকটি।

আকিব হোসেনের মতো উচ্চ শিক্ষার জন্য গত বছর যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান রাফসান আহমেদ। স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হতে খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় তাকে ব্যাংক স্টেটমেন্টও কম দেখাতে হয়। তার প্রয়োজন ছিল ১২ লাখ টাকার সলভেন্সি সার্টিফিকেট। তবে সেই সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য রাফসান আহমেদকে কোনো ব্যাংকেই যেতে হয়নি। উত্তরার একটি স্টুডেন্ট ভিসা প্রসেসিং সেন্টার তাকে ওই স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে দিয়েছিল। এজন্য তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার তরুণ প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যান। এ শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে ভুয়া কিংবা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেখাচ্ছেন। ব্যাংকে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা আমানত আছে, এমন স্টেটমেন্ট দেখানোর জন্য দেশের অনেক ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২-৫ লাখ টাকা নিচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে, এটি ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা ও কনসালট্যান্সি ফার্মের বড় ব্যবসা হয়ে উঠেছে। ভুয়া স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন অনেক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রতারণামূলক এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস উদ্বেগ জানিয়েছে। নিজেরা বিবৃতি দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছে অনেক দেশের দূতাবাস। আর এসব দেশে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীসহ ভ্রমণ ইচ্ছুক আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

চলতি বছরের ৭ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সাক্ষাৎ করেন। ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়ার বিষয়টি সেই সাক্ষাতে তুলে ধরেন সারাহ কুক।

উদ্বেগজনক এমন প্রেক্ষাপটে গত ১২ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর পরও ভুয়া কিংবা প্রতারণামূলক স্টেটমেন্ট দেয়ার কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি।

বরং অভিনব কৌশলে বিদেশগামী শিক্ষার্থী কিংবা তাদের অভিভাবকদের নামে ঋণ সৃষ্টি করে, পরবর্তী সময়ে সে অর্থই আমানত দেখিয়ে ব্যাংকগুলো সলভেন্সি সার্টিফিকেট দিচ্ছে। বেশকিছু ব্যাংক নানা মাধ্যমে এ ধরনের ঋণ দেয়ার বিষয়ে প্রচার-প্রচারণাও চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। উচ্চ শিক্ষাবিষয়ক কনসালট্যান্সি ফার্মসহ ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ বিদেশ গমনেচ্ছুদের সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থী, কনসালট্যান্সি ফার্ম, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা নিরুপায় হয়ে অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছেন। আর কনসালট্যান্সি ফার্ম ও ব্যাংকগুলোর বক্তব্য হলো, গত এক দশকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের স্টেটমেন্ট কিংবা সার্টিফিকেট ইস্যু করা অনেকটা ব্যবসা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

এক্ষেত্রে ভালো ব্যাংকগুলো কিছু নীতি মেনে চললেও করপোরেট সুশাসন উপেক্ষা করে চলা ব্যাংকগুলো এটিকে অনেকটা সার্টিফিকেট ব্যবসায় রূপান্তর করেছে। এ কারণে বেশকিছু দূতাবাস এখন নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের স্টেটমেন্ট প্রত্যাখ্যান করছে। বণিক বার্তার অনুসন্ধানে এ ধরনের বেশকিছু ব্যাংকের নামও উঠে এসেছে।

চতুর্থ প্রজন্মের একটি ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ একেবারেই স্থবির। এজন্য স্টুডেন্ট ফাইল খোলা বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেয়া “‍কাঁচা টাকা আয়ের” বড় উৎস হয়ে উঠেছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনেই এটি হচ্ছে। এক্ষেত্রে দূতাবাসগুলো থেকে নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হলে প্রধান কার্যালয় থেকে সত্যায়ন সার্টিফিকেট দেয়া হয়।’

ভুয়া কিংবা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইস্যুকে নৈতিকতা বিরুদ্ধ ও অপরাধ বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘বেশকিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে।

আমরা এরই মধ্যে ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। তার পরও কেউ বিদেশী দূতাবাসগুলোকে বিভ্রান্ত করতে প্রতারণামূলক সার্টিফিকেট ইস্যু করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘ব্যাংক একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোনো ব্যবসাই যেন অনৈতিক না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। আইন দিয়ে অনেক সময় সব অপরাধ দমন করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে নৈতিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি ব্যাংক নির্বাহীদের পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে।’

বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এ খাতে ব্যয়ও গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশগামী উচ্চ শিক্ষার্থীরা ব্যয় করেছেন ৮৯ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরলে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বরাদ্দের সমান।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য ৫৫টি দেশে গিয়েছেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভুয়া বা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়া এবং বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা না করা শিক্ষার্থীদের হার বেড়ে যাওয়ার প্রভাব ভিসা ইস্যুর ওপর পড়েছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার নামে দেশে শতাধিক কনসালট্যান্সি ফার্ম গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত শিক্ষা ও ক্যারিয়ার কনসালট্যান্সি ফার্মগুলোর জাতীয় সংগঠন হলো ফরেন অ্যাডমিশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এফএসিডি-সিএবি)।

সংগঠনটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, ‘ভারত ও শ্রীলংকার শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈধ উপায়ে ঋণ নেয়া কিংবা ব্যাংক সলভেন্সি দেখানোর সরকারি ব্যবস্থা আছে। এমনকি নেপালের শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারি তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। এ কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষায় বিদেশযাত্রার জন্য অনৈতিক নানা উপায় অবলম্বনে বাধ্য হচ্ছেন।’

শিক্ষার্থীদের জন্য ভুয়া বা প্রতারণামূলক ব্যাংক স্টেটমেন্টের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে এফএসিডি-সিএবির সদস্যভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান যুক্ত কিনা জানতে চাইলে জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, ‘কনসালট্যান্সি ফার্মের পক্ষে তো ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করে দেয়া সম্ভব নয়। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তারাই যুক্ত।

অনেক ব্যাংক ও ব্যাংকার ফেসবুকে এ ধরনের স্টেটমেন্ট জোগাড় করে দেয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। নিজেদের মোবাইল নাম্বার বা ভিজিটিং কার্ড ফেসবুকে দিয়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেয়ার প্রচারণা চালাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে।’

বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় গমনেচ্ছুদের ‘ফান্ড সাপোর্ট’ বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট জোগাড় করে দেয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা চলছে। এ ধরনেরই একটি পেজের নাম ‘হলিডে হ্যাভেন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’। পেজটিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য ফান্ড সাপোর্ট নিয়ে চিন্তিত? ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন করবেন, কিন্তু ২০-৪০ লাখ টাকার ফান্ড নেই? তাহলে পরামর্শ পেতে এ নম্বরে যোগাযোগ করুন।’ ওই বিজ্ঞাপনে তহবিল জোগানো বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে দেশের ছয়টি ব্যাংকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

একই ধরনের সহযোগিতার কথা বলে বিজ্ঞাপন দেয়া বেশকিছু পেজ ও আইডি খুঁজে পাওয়া যায় ফেসবুকে। এর মধ্যে রয়েছে টিম এডুকেশন, ব্যাংক সাপোর্ট ফর বাংলাদেশী স্টুডেন্ট, বিডি ব্যাংক স্পন্সর সাপোর্ট, ফাইন্যান্স এইড বিডি, ব্যাংক সাপোর্ট, স্টাডি সাপোর্ট বিডি, ইনস্ট্যান্ট ব্যাংক সাপোর্ট বিডি, ব্যাংক সাপোর্ট অ্যান্ড স্পন্সর বিডি প্রভৃতি।

বিডি ব্যাংক স্পন্সর সাপোর্ট নামে ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে গতকাল ফোন করা হয়। এ সময় সুমন নামের এক ব্যক্তি ফোন ধরেন। ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট দরকার—এমন সহযোগিতা চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, তারা যেকোনো অংকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দিতে পারবেন।

এক্ষেত্রে তিনি ১২টি ব্যাংকের নাম উল্লেখ করে কোন ব্যাংকের সার্টিফিকেট পেতে কত টাকা লাগবে, সে তথ্যও জানান। একই সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তার ভিজিটিং কার্ডও এ প্রতিবেদককে পাঠিয়েছেন। একইভাবে অন্য কয়েকটি ফেসবুক পেজে উল্লেখ করা নম্বরে যোগাযোগ করলে তারাও বিভিন্ন অংকের অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয়ার আশ্বাস দেন।

কিছু ব্যাংক প্রতারণামূলক স্টেটমেন্ট ইস্যু করলেও এক্ষেত্রে কেউ কেউ অভিনব কৌশল বের করেছেন। এ বিষয়ে কথা হয় দেশের অন্তত ছয়টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তারা জানান, প্রক্রিয়াটি এমন—কোনো শিক্ষার্থী ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত হিসাবে জমা রাখেন। ব্যাংক ওই টাকা জামানত দেখিয়ে, তার বিপরীতে আরো ৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়। এতে আমানতের অর্থের পরিমাণ বেড়ে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। আর এ টাকা আবারো জামানত দেখিয়ে নতুন করে ১০ লাখ টাকার ঋণ দেয়। এতে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ লাখে।

এভাবে একই অর্থ কয়েক দফায় জামানত দেখিয়ে টাকার স্থিতি ৫০-৬০ লাখে উন্নীত করা হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ওই ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ পান না। বরং পুরো হিসাবটি পরিচালনা করেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এভাবে অনেকটা বৈধ উপায়ে ব্যাংকের সিভিএস থেকে শিক্ষার্থীর নামে সলভেন্সি ও স্টেটমেন্ট ইস্যু করা হয়। পরে শিক্ষার্থী বিদেশে যাওয়ার পর প্রথমে জমাকৃত ৫ লাখ টাকা থেকে সুদ ও সার্ভিস চার্জ কেটে রেখে পুরো ঋণটি সমন্বয় বা আদায় দেখানো হয়।

এ বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর এ ধরনের অনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়াকে অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম হিসেবে দেখি। যদি কোনো ব্যাংক প্রকৃত আমানত না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীর নামে ৫০-৬০ লাখ টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইত্যাদি তৈরি করে দেয় এবং এর বিনিময়ে অর্থ নেয়, তাহলে সেটা শুধু অনৈতিক ব্যবসা নয়, সেটা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার অপব্যবহার। তবে কোনো শিক্ষার্থীর পরিবার বৈধভাবে অর্থ ব্যাংকে জমা দিলে তার ভিত্তিতে স্টেটমেন্ট বা সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করলে তাতে সমস্য নেই।’

সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘কেবল কিউআর কোড ব্যবহার করে এ ধরনের সমস্যার সমধান হবে না। এর সঙ্গে কার্যকর ভেরিফিকেশন আর্কিটেকচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেটের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাইযোগ্য ডিজিটাল স্ট্যান্ডার্ড প্রয়োজন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে কমন ভেরিফিকেশন গেটওয়ে চালু করা যেতে পারে।’

কয়েক বছর ধরেই ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ জাল নথি ব্যবহার করে ভিসা আবেদনের অভিযোগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় অবস্থানরত ১৩টি পশ্চিমা দেশের মিশন গত বছর যৌথভাবে বাংলাদেশী আবেদনকারীদের ভুয়া নথি ব্যবহার না করার আহ্বান জানায়। ওই সময় বলা হয়, জাল নথি ব্যবহার করলে শুধু ভিসা বাতিল নয়, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা, আইনি জটিলতা ও সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও তৈরি হবে।

চলতি বছরের ৭ মে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় সারাহ কুকের পক্ষ থেকে ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়াসহ জাল নথিপত্রের বেশকিছু ঘটনা তুলে ধরা হয়। এসব প্রতারণা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন ব্রিটিশ দূত। এক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ নথিপত্র যাচাইয়ে কিউআর কোডভিত্তিক পদ্ধতি চালুর বিষয়ে প্রস্তাব আসে। ওইদিনের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে জারীকৃত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট, ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটসহ সংশ্লিষ্ট নথিতে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড থাকতে হবে। ওই কোড স্ক্যান করে ন্যূনতম পাঁচটি তথ্য যাচাই করা যাবে।

এগুলো হলো অ্যাকাউন্ট নাম্বার, হিসাবধারীর নাম, স্টেটমেন্ট শুরুর স্থিতি (ওপেনিং ব্যালান্স), স্টেটমেন্টের শেষ স্থিতি (ক্লোজিং ব্যালান্স) ও স্টেটমেন্ট তৈরির তারিখ। এসব তথ্য কমপক্ষে ছয় মাস সংরক্ষণ ও যাচাইযোগ্য রাখার নির্দেশও দেয়া হয়। প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা কার্যকরে ব্যাংকগুলোকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। যদিও এখনো নির্দেশনা অনুযায়ী কিউআর কোড চালু করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য দুই ধরনের ঋণ চালু করেছি। শিক্ষার্থীরা রীতিনীতি মেনেই এসব ঋণসেবা নিয়ে বিদেশে যেতে পারছেন। সারা বিশ্বেই শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ নেয়ার সুযোগ আছে। সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে যাওয়ার পর লেখাপড়া চালিয়ে যান না। আর ব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন না। এ কারণে বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, জাল নথিপত্রের ব্যবহার ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশী পাসপোর্টের মানেও অবনমন হচ্ছে। গ্রহণযোগ্যতার বিচারে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৭তম। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে আছে উত্তর কোরিয়া।

ইরান যুদ্ধের ধাক্কা:

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনছে কাতার

প্রকাশ: শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনছে কাতার

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশের যোগান দিত কাতার। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কাতারের গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা চরমভাবে ব্যাহত হওয়ায় দেশটি নিজস্ব গ্রাহকদের চাহিদাও যথাযথভাবে পূরণ করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক কাতার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বরাতে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম এমন তথ্য জানিয়েছে।

আলোচনাটি খুবই গোপনীয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করা শর্তে ওই ব্যক্তিরা জানান, চালু থাকা ও নির্মাণাধীন রপ্তানি প্রকল্পগুলো থেকে গ্যাস পেতে আগ্রহী কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে নিজস্ব সরবরাহ বাড়াতে বিকল্প খুঁজছে কাতার।

সম্ভাব্য এই চুক্তিগুলো থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কীভাবে কাতারকে তার গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে গ্যাসের বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করছে।

একসময় বিশ্বের মোট এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ একাই সরবরাহ করত কাতার। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে গ্যাস ট্যাংকার চলাচলের ঝুঁকির কারণে তাদের সরবরাহ এখন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কাতারএনার্জি সাড়া দেয়নি।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কাতার তাদের রাস লাফান এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল। তবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই স্থাপনা সংঘাতের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছরের মতো সময় লাগতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। সংঘাত আরও বাড়াতে প্রস্তুত ইরান। শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এ যুদ্ধ ২০২৯ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের আশঙ্কাই হয়তো কাতারকে বাণিজ্যের ওপর আরও বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করছে।

কাতারের হাতে ইতিমধ্যেই মার্কিন সরবরাহের কিছু সুযোগ রয়েছে। তারা টেক্সাসে অবস্থিত গোল্ডেন পাস এলএনজি কারখানার অন্যতম মালিক। কারখানাটি গত এপ্রিলে রপ্তানি শুরু করেছে, ক্রমাগত উৎপাদনও বাড়াচ্ছে।

পারস্য উপসাগরীয় দেশটি তাদের কাতারএনার্জি ট্রেডিং ইউনিটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি পরিবহনের সক্ষমতাও ধারাবাহিকভাবে বাড়াচ্ছে। এই ইউনিটটি মূলত স্বল্পমেয়াদি ব্যবসার ওপর কাজ করে।

বাতাস থেকে সুপেয় পানি উৎপাদনে লখুইয়ার অভিনব প্রযুক্তি ‘বদর’ সিস্টেম উদ্ভাবন

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
বাতাস থেকে সুপেয় পানি উৎপাদনে লখুইয়ার অভিনব প্রযুক্তি ‘বদর’ সিস্টেম উদ্ভাবন

বায়ুুমণ্ডলে থাকা আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পকে টেনে তা থেকে বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানীয় জল উৎপাদনের জন্য একটি অত্যন্ত আধুনিক ও যুগান্তকারী সিস্টেম তৈরি করেছে কাতারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ‘লখুইয়া’ (Lekhwiya)। বাহিনীর সিকিউরিটি টেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট এই উদ্ভাবনটি করেছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে পানীয় জলের বিকল্প উৎস হিসেবে এক বিরাট সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে।

লখুইয়ার উদ্ভাবিত এই অত্যাধুনিক সিস্টেমটি দুটি ভিন্ন মডেলের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন অপারেশনাল প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম:

  • প্রথম মডেল (ইনডোর বা অভ্যন্তরীণ ব্যবহার): এই মডেলটি মূলত বিভিন্ন স্থাপনা বা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ব্যবহারের উপযোগী। এর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ২০০ লিটার, যা প্রায় ৬০০টি ৩৩০ মিলিলিটারের পানির বোতলের সমান।

  • দ্বিতীয় মডেল (উচ্চ ধারণক্ষমতা): বৃহত্তর পরিসর বা যেসব এলাকায় পানির চাহিদা বেশি, সেসব জায়গার জন্য তৈরি করা হয়েছে এই মডেলটি। এর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ ৫,০০০ লিটার, যা প্রায় ১২,০০০টি ৩৩০ মিলিলিটারের বোতলের সমান।

নিরাপত্তা, তেজস্ক্রিয়তা রোধ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার

এই সিস্টেমটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি যেকোনো ধরনের রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় দূষণ (chemical and radioactive contaminants) মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং এটি সর্বোচ্চ মানের সুরক্ষা ও বিশুদ্ধতা বজায় রেখে পানি উৎপাদন করে। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিস্টেমটি সম্পূর্ণ সৌরশক্তি (solar energy) বা সোলার পাওয়ারের সাহায্যে পরিচালনা করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যা এর অপারেশনাল কার্যকারিতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

শহীদ বদর আল-দোসারির স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ: ‘বদর’ সিস্টেম

গত বছর দোহায় সংঘটিত ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় কর্তব্যরত অবস্থায় শাহাদাতবরণকারী লখুইয়ার বীর সদস্য বদর সাদ মোহাম্মদ আল-হামিদি আল-দোসারির পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তির নামকরণ করা হয়েছে ‘বদর’ (Badr) সিস্টেম।

জরুরি পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প

বিশেষ করে যুদ্ধকালীন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রচলিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে বা সুপেয় পানির সংকট দেখা দিতে পারে—সেখানে এই এয়ার-টু-ওয়াটার (air-to-water) প্রযুক্তিটি জীবন রক্ষাকারী এক নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। লখুইয়ার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ এবং টেকসই সমাধানের মাধ্যমে যেকোনো সংকট মোকাবিলায় তারা কতটা প্রস্তুত ও উদ্ভাবনমুখী।

আরও পড়ুন

কাতারে নির্মিত হচ্ছে প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা

হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্রিতে শাটল সার্ভিস চালু

কাতারে খোলা জায়গায় গাড়ি ধোয়া নিষিদ্ধ: অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা

সহানুভূতি নয়, দক্ষতা! প্রতিবন্ধীদের সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত করছে কাতার

আলোচনার টেবিল যখন লক্ষ্যবস্তু:

দোহায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের এক বছর ও কূটনৈতিক মূল্যবোধের সংকট

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
দোহায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের এক বছর ও কূটনৈতিক মূল্যবোধের সংকট

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টা বেজে ৪৬ মিনিট। ওই মুহূর্তটি কেবল কাতারের ইতিহাসে নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে একটি বিপজ্জনক মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেদিন যুদ্ধক্ষেত্রের নির্মম বাস্তবতা এসে আছড়ে পড়েছিল শান্তির দূত হিসেবে পরিচিত দোহা শহরের বুকে। যুদ্ধবিরতির আলোচনা যখন চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে হামাসের একটি আলোচনা প্রতিনিধিদলের ব্যবহৃত আবাসিক ভবনে আকস্মিক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।

এই নৃশংস হামলায় ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারান ২২ বছর বয়সি কাতার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর (লখুইয়া) সদস্য বদর সাদ মোহাম্মদ আল-হুমাইদি আল-দোসারিসহ বেশ কয়েকজন। আহত হন অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী ও সাধারণ নাগরিক। এই হামলার এক বছর পূর্তি কেবল কোনো স্মরণের দিন নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কাঠামোর একটি বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষার মুহূর্ত।

মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর আঘাত

ইসরায়েলের এই হামলা এমন তিনটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যা এতদিন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—সার্বভৌমত্ব বলবৎ থাকে শক্তির সীমার মধ্যে, মধ্যরাষ্ট্র বা মধ্যস্থতাকারীরা রাজনৈতিক সুরক্ষায় থাকে, এবং আলোচনার টেবিল সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয়।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে তাদের লক্ষ্য ছিল হামাস, কাতার নয়। কিন্তু এই কৌশলগত যুক্তিটি পুরো ঘটনাটির ভয়াবহতাকে আড়াল করে। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে কেবল শত্রুর উপস্থিতি রয়েছে—এই অজুহাতে অন্য কোনো দেশের ওপর শক্তি প্রয়োগ করার লাইসেন্স কোনো রাষ্ট্র পেতে পারে না। তাছাড়া, কাতার যাদের আশ্রয় দিয়েছিল তারা কোনো সাধারণ স্থানে লুকিয়ে থাকা কেউ ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন একটি পরিচিত রাজনৈতিক আলোচনার চ্যানেল বা প্রক্রিয়ার অংশ। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, হামাস এবং অন্যান্য পক্ষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগের স্বার্থেই দোহা সেই রাজনৈতিক পরিসরটি তৈরি করে দিয়েছিল। কারণ সরাসরি কথা বলতে না পারা পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন ছিল।

মধ্যস্থতার মূল শর্তই হলো—প্রতিপক্ষরা আলোচনা টেবিলে একে অপরকে যতই অপছন্দ করুক বা শর্তে রাজি না হোক না কেন, মধ্যস্থতাকারীর সেই নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও পরিসরটি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকতে হবে। আলোচনার আয়োজক দেশেই যদি মধ্যস্থতাকারীদের বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে যেকোনো ধরনের মধ্যস্থতা কেবল শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে বোকামিতে পরিণত হয়।

দ্বিমুখী নীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ব্যর্থতা

এই হামলা ইসরায়েলি নীতির একটি মৌলিক স্ববিরোধিতাকেও উন্মোচন করেছিল। একদিকে কাতারকে হামাসের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন মহলে সমালোচনার মুখে পড়তে হতো, অন্যদিকে ঠিক সেই যোগাযোগের মাধ্যমটিকেই জিম্মি মুক্তি, মানবিক সহায়তা এবং যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরের কাজে ব্যবহার করা হতো। কোনো পক্ষ যখন ছাড় পাওয়ার জন্য মধ্যস্থতাকে অপরিহার্য মনে করে, আবার কূটনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেই সেই একই মাধ্যমকে অবৈধ ঘোষণা করে—তখন সেই নীতিতে কোনো নৈতিকতা থাকে না।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও মানবাধিকার কমিশন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কাতারের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বড় শক্তিগুলো কেবল কূটনৈতিক স্তরে নিন্দা জানিয়েই দায় সেরেছে, যা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মধ্যস্থতাকারীদের আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যদি বড় শক্তির সামরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো কার্যকারিতা অবশিষ্ট থাকে না।

মধ্যস্থতার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি

হামলার পরও কাতার ভেঙে পড়েনি বা মধ্যস্থতার ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। কারণ কাতার বুঝেছিল যে হামলা চালিয়ে কোনো দেশকে দমিয়ে রাখা গেলেও আঞ্চলিক আস্থার সংকটে মধ্যস্থতার বিকল্প তৈরি হয় না। দোহা তার মার্কিন, মিশরীয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে কাজ চালিয়ে গেছে এবং ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির কূটনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতেও কাতারকেই ফিরে আসতে হয়েছিল।

দোহায় ইসরায়েলি হামলার এক বছর পর আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা ভবিষ্যতে কেমন মধ্যপ্রাচ্য দেখতে চাই? এমন এক অঞ্চল যেখানে গায়ের জোর ও সামরিক সক্ষমতাই ঠিক করে কার সার্বভৌমত্ব টিকবে, নাকি আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনীতিই ক্ষমতার ওপর সঠিক বাধানিষেধ আরোপ করবে?

কাতারের পক্ষ থেকে এই হামলার জবাবে কোনো দুর্বলতা প্রকাশ করা হয়নি। বরং হামলার পরও মধ্যস্থতা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছে যে সহিংসতা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক নিয়ম নির্ধারণ করা যায় না। যারা সত্যি শান্তি ও আলোচনা চান, তাদের মনে রাখা উচিত—আলোচনার টেবিল নিজেই কখনো আরেকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।

মতামতভিত্তিক নিবন্ধের মূল লেখক: কাতারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-আইতাইবি। এটি দোহা নিউজে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রবন্ধের ভাবানুবাদ ও সম্পাদিত রূপ।

দোহায় ইসরায়েলি হামলার এক বছর:

উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা সমীকরণ ও কাতারের নতুন কৌশল

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা সমীকরণ ও কাতারের নতুন কৌশল

আজ থেকে ঠিক এক বছর আগের কথা। গাজা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চলমান মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে হামাস নেতাদের এক বৈঠকের সময় দোহায় অবস্থিত একটি কম্পাউন্ডে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (GCC) কোনো সদস্য দেশের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি এই সামরিক আগ্রাসন চালায় তেল আবিব। নজিরবিহীন এই হামলায় পাঁচজন হামাস সদস্যের পাশাপাশি এক কাতারি নিরাপত্তাকর্মীও প্রাণ হারান।

হামলার পর এক বছর পেরিয়ে গেছে। এই একটি বছর কাতার এবং এর আশপাশের উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক বড় উপলক্ষ এনে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও কাতারের আত্মতুষ্টিতে ধাক্কা

দোহায় এই হামলার ঘটনা বিশেষভাবে হতবাক করেছিল কারণ কাতারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ২০২২ সাল থেকে কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালি’ বা প্রধান মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। তাছাড়া, আল-উদেদ বিমান ঘাঁটিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন সেনট্রকমের (CENTCOM) ফরোয়ার্ড হেডকোয়ার্টার অবস্থিত। কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবেও কাতার নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অন্যতম ভরসার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আসছিল।

ফলে, ইসরায়েলের এই হামলা কাতারের সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়, যেখানে দেশটি বিশ্বাস করত যে মার্কিন মিত্রতার সুবাদে তাদের ভূখণ্ড পুরোপুরি সুরক্ষিত। হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করেন এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করলেও—দোহা ও অন্যান্য উপসাগরীয় রাজধানীতে এই প্রশ্ন জোরালোভাবে দেখা দেয় যে, আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিত্র দেশ হয়েও যদি কাতার এমন হামলার শিকার হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব গ্যারান্টি আসলে কতটুকু কার্যকর?

উপসাগরীয় দেশগুলোর অভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও সংহতি

দোহায় হামলার পরপরই জিসিসিভুক্ত অন্য দেশগুলো অভাবনীয় ঐক্য প্রদর্শন করে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) প্রতিক্রিয়া ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ২০২০-এর দশকে দোহার সাথে আবুধাবির কিছু রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও, ইব্রাহিম অ্যাকর্ড চুক্তির সুবাদে ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের ঘনিষ্ঠতা এবং হামাসের প্রতি আমিরাতি নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও—আবুধাবি পরিষ্কার ভাষায় এই হামলাকে কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে।

হামলার পরদিনই আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের দোহা সফর উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার এই অখণ্ড ঐক্যেরই বার্তা দেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য রাজধানীগুলোতে তখন থেকেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘুরেফিরে বেড়াতে শুরু করে: ইসরায়েল যদি এমন একটি দেশ আক্রমণ করতে পারে যারা বছরের পর বছর ধরে মার্কিন প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, তবে অন্য কোনো জিসিসি দেশকে রক্ষা করার মতো আর কে বা কী আছে?

কাতারের কূটনৈমিতিক কৌশলে পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক মিত্রতা অন্বেষণ

এই ঘটনার পর কাতার তার নিজস্ব বৈদেশিক ও কূটনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা চিন্তা করতে বাধ্য হয়। হামাসসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনার সেতু নির্মাণ করে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা যে সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, সে পাঠ কাতার খুব ভালোভাবেই পেয়েছে। ওয়াশিংটনের ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাতার এখন আঞ্চলিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

তারই ধারাবাহিকতায়, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যকার কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’—যেগুলোকে কাতার ইতিবাচক হিসেবেই স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় তুরস্কের সাথে দোহার অংশীদারিত্ব এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনের সাথে ঐতিহাসিক মিত্রতা বজায় রেখেই বিকল্প আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে কাতার।

ইরানি আগ্রাসন এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি উপসাগরীয় অঞ্চলের এই নিরাপত্তাহীনতাকে আরও তীব্র করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত বেপরোয়া যুদ্ধের জেরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কাতারের ওপরও দফায় দফায় ইরানি হামলার ঘটনা ঘটে। এর মাধ্যমে কাতার এক দ্বিমুখী হুমকির মুখে পড়ে— একদিকে ইসরায়েল, অন্যদিকে ইরান।

পরিশেষে বলা যায়, বিগত এক বছরে কাতারের ওপর ইসরায়েলি হামলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আমেরিকার ওপর একশ ভাগ নির্ভর না করে নিজস্ব প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা। ভবিষ্যতের উপসাগরীয় বৈদেশিক নীতি হয়তো এই দুই নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে: একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহ্যগত কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে বাইরের যেকোনো আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আঞ্চলিক ও মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই চীন-কাতার সম্পর্ক কেন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে?

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই চীন-কাতার সম্পর্ক কেন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে?

কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ও মঙ্গলবার চীন সফর করেন। চীনা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের পর্যায়ে রয়েছে।

আল থানির দুই দিনের এই সফরকে বেইজিং ও দোহা এমন এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখছে, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অস্থিরতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে চাপে ফেলেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে চীন। সফর শেষে দুই দেশ জ্বালানি, বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতায় কাতারের প্রচেষ্টাও এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দোহায় সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, এই অবস্থা অঞ্চল, আঞ্চলিক দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। কাতার তার অংশীদারদের, যার মধ্যে চীনও রয়েছে, সঙ্গে নিয়ে সংকট সমাধানে কাজ করছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ও নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

চীনও দোহাকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। একই সময়ে কাতার চীনকে জানিয়েছে, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেবে।

হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কেন ঝুঁকি বাড়ছে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় চীন ও কাতার- উভয়ের জন্যই পরিস্থিতির গুরুত্ব বেড়েছে। কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক। অন্যদিকে, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক। বিশ্বে স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দুই দেশের অর্থনীতিতেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি খাতই চীন-কাতার সম্পর্কের মূল ভিত্তি। চীন কাতারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৮ বিলিয়ন বা ২৩৮০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে কাতার চীনকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করেছে, যা কাতারকে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে।

এ সম্পর্ক শুধু জ্বালানি কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি চীনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে ২৭ বছরের এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে। চীনা এই দুই প্রতিষ্ঠান কাতারের বিশাল নর্থ ফিল্ড গ্যাস সম্প্রসারণ প্রকল্পেও অংশীদার হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ইরান প্রশ্নে একই স্বার্থ, ভিন্ন কৌশল

চীন ও কাতারের স্বার্থের বড় একটি জায়গায় মিল থাকলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের কৌশলে পার্থক্য রয়েছে। চীন বারবার কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা কিংবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ঘটনায় বেইজিং সরাসরি তেহরানের সমালোচনা থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে। বরং চীনের কর্মকর্তারা সংঘাতের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছেন।

চীনা কূটনীতিকদের ভাষায়, এই সংঘাত ‘কখনোই হওয়া উচিত ছিল না’। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। সেই সঙ্গে তেহরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতাও করে আসছে বেইজিং।

কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে চাপ সৃষ্টি কোনো সমাধান নয়; সংলাপ ও আলোচনাই একমাত্র কার্যকর পথ।

তবে কাতারের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। ইরানের হামলায় নিজেদের ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো আক্রান্ত হওয়ায় দোহা প্রকাশ্যে তেহরানের নিন্দা করেছে। সংকট সমাধানের বিভিন্ন উদ্যোগ ব্যর্থ বা থমকে যাওয়ায় কাতার হতাশ হলেও তারা এখনো সংলাপের পথ খোলা রাখতে মধ্যস্থতা করে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় কাতারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেহরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ শক্তিশালী। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট কমাতে কাতারের প্রচেষ্টায় চীনকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা গেলে দোহা এমন একটি প্রভাবশালী পক্ষকে পাশে পেতে পারে, যার তেহরানের ওপর নিজস্ব প্রভাব রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও অটুট রাখতে চায় চীন

তবে কাতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সময় চীনকে আরেকটি বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। কাতারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদও কাতারে অবস্থিত।

৩ মার্চ ইরান কাতারের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হলেও অন্যটি আল উদেইদে আঘাত হানে। এতে কেউ হতাহত না হলেও ওই হামলার পর দোহা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল।

চীন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা নিয়ে কাতারের নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তাদাতা হতে চাইছে না। বেইজিংয়ের সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের গবেষক জোন আহমেদ খানের মতে, বর্তমানে চীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে অতিরিক্ত বিকল্প খুঁজছে।

তবে প্রশ্ন হলো, ইরানের ক্ষেত্রে চীন তার প্রভাব কতটা ব্যবহার করতে প্রস্তুত। এখন পর্যন্ত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির ওপর বড় ধরনের চাপ প্রয়োগে চীনের খুব বেশি আগ্রহ দেখা যায়নি।


ইরানের বাইরেও সম্পর্কের বিস্তৃতি

কাতারের প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের চীন সফরের আলোচনার বিষয় শুধু ইরান ছিল না। বরং চলমান যুদ্ধ দুই দেশকে তাদের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছে। কাতার যে সম্পর্ককে ‘আরও বিস্তৃত দিগন্তে’ নিয়ে যেতে চায়, সফরে সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ঐতিহ্যবাহী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল থানিও উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

কাতারে চীনা বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে। ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৫২০টি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত এক দশকে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এসব প্রকল্পে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা চীন-কাতার সম্পর্কের জন্য শুধু ঝুঁকি তৈরি করেনি, বরং দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রণোদনাও বাড়িয়েছে। জ্বালানি ও বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কূটনীতিতে সম্পর্ক বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান সংকট পরীক্ষা করছে—চীন ও কাতার তাদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।