১১ জুলাই ২০২৬

২০৩০ বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলো ছয় দেশ

প্রকাশ: বুধবার, জুলাই ০৮, ২০২৬
২০৩০ বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলো ছয় দেশ

২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের উত্তেজনা চললেও ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি ইতোমধ্যে ঘুরতে শুরু করেছে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের দিকে। কারণ, ওই আসরটি হবে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের আসর।

ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারই প্রথম তিন মহাদেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসর।

ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক উরুগুয়েকে সম্মান জানিয়ে উদ্বোধনী পর্বের তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। ফলে ছয়টি দেশই স্বাগতিকের মর্যাদা পাবে এবং নিয়ম অনুযায়ী তারা সরাসরি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। উদ্বোধনী ম্যাচগুলো শেষে অংশগ্রহণকারী দলগুলো ইউরোপ ও আফ্রিকায় গিয়ে টুর্নামেন্টের বাকি সূচিতে অংশ নেবে।

২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ফিফা কংগ্রেসে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোকে যৌথ আয়োজক হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২০ সালে শুরু হওয়া বিডিং প্রক্রিয়া ২০২৩ সালে শেষ হয়। শুরুতে মরক্কো এককভাবে আয়োজক হওয়ার আগ্রহ দেখালেও পরে স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথ প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত সেটিই অনুমোদন পায়।

বিশ্বকাপের শতবর্ষ উপলক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হবে উরুগুয়ের ঐতিহাসিক মন্টেভিডিওর এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে, যেখানে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

অন্য দুটি উদ্বোধনী ম্যাচ হবে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল এবং প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনের এস্তাদিও ওসভালদো ডোমিঙ্গেজ দিব স্টেডিয়ামে।

ফিফার ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপ শুরু হবে ৮ জুন এবং ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ২১ জুলাই। মোট ৪৪ দিনব্যাপী চলবে এই আসর, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ টুর্নামেন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। তিন মহাদেশে ম্যাচ আয়োজন এবং দলগুলোর দীর্ঘ ভ্রমণ বিবেচনায় রেখে সূচি দীর্ঘ করা হয়েছে।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছয় দেশের ১৮টি শহরের ২১টি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করা হবে।

সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে স্পেনে। সম্ভাব্য ভেন্যুর মধ্যে রয়েছে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ও সিভিতাস মেত্রোপোলিতানো, বার্সেলোনার স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু, সেভিয়ার এস্তাদিও দে লা কার্তুহা, বিলবাওয়ের সান মামেস, সান সেবাস্তিয়ানের রিয়াল অ্যারিনা, সারাগোসার লা রোমারেদা, ভ্যালেন্সিয়ার নু মেস্তায়া, লাস পালমাসের এস্তাদিও গ্রান ক্যানারিয়া এবং ভিগোর আবাঙ্কা-বালাইদোস।

পর্তুগালে ম্যাচ হবে লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ, এস্তাদিও জোসে আলভালাদে এবং পোর্তোর এস্তাদিও দো দ্রাগাওয়ে। অন্যদিকে মরক্কোর সম্ভাব্য ভেন্যুর মধ্যে রয়েছে কাসাব্লাঙ্কার নির্মাণাধীন হাসান-২ স্টেডিয়াম, রাবাত, মারাকেশ, আগাদির, ফেজ ও তাঞ্জিয়ারের স্টেডিয়াম।

বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি ফিফা। সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে আলোচনায় রয়েছে মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, বার্সেলোনার স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু এবং মরক্কোর নির্মাণাধীন হাসান-২ স্টেডিয়াম। ফিফা জানিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর চূড়ান্ত ভেন্যু তালিকার সঙ্গে ফাইনালের স্টেডিয়ামের নামও ঘোষণা করা হবে।

বিশ্বকাপের শতবর্ষ উপলক্ষে ঐতিহ্য, ইতিহাস ও আধুনিক আয়োজনের সমন্বয়ে ২০৩০ সালের আসর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে।

মরক্কোকে ২-০ গোলে উড়িয়ে প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে ফ্রান্স

প্রকাশ: শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২৬
মরক্কোকে ২-০ গোলে উড়িয়ে প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালে ফ্রান্স

কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলের গোলে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। অন্যদিকে, কোয়ার্টার ফাইনালেই শেষ হলো মরক্কোর স্বপ্নের বিশ্বকাপ যাত্রা।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল ফ্রান্স। তবে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি তারা।

প্রথমার্ধে ম্যাচের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে ফ্রান্সের সামনে। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় তারা। স্পট কিক নিতে আসেন ফরাসি অধিনায়ক নিজেই। কিন্তু তার শট ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু।

দ্বিতীয়ার্ধেও একই ধারায় এগোয় ম্যাচ। বলের দখল ধরে রেখে মরক্কোর রক্ষণে চাপ বাড়াতে থাকে ফ্রান্স। ৫৬ মিনিটে দেজিরে দুয়ের নেওয়া নিচু শটও সামলে নেন বুনু।

তবে ম্যাচের ৬০ মিনিটে শেষ পর্যন্ত ভাঙে গোলের অপেক্ষা। বাম প্রান্তের আক্রমণ থেকে বল পান দুয়ে। বক্সের বাইরে থাকা এমবাপ্পের দিকে বল বাড়িয়ে দেন তিনি। খুব কম জায়গার মধ্যেও নিজের অসাধারণ দক্ষতায় শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন এমবাপ্পে। তার বাঁকানো শট দূরের কোণে জড়িয়ে যায় জালে। বুনু ঝাঁপিয়েও রুখতে পারেননি সেই দুর্দান্ত ফিনিশ।

এদিক গোলের পর মরক্কোর খেলোয়াড়রা আক্রমণের শুরুতে হ্যান্ডবলের দাবি জানিয়ে প্রতিবাদ করেন। তবে ভিএআর পর্যালোচনার পর গোলটি বৈধ ঘোষণা করেন রেফারি।

এর মাত্র ছয় মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। এমবাপ্পের গতির কারণে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে দ্রুত আক্রমণে উঠেন তিনি। বক্সে ঢুকে নিচের কোণ লক্ষ্য করে নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান পিএসজির এই ফরোয়ার্ড। এবারও বুনুর প্রতিরোধ কাজে আসেনি।

২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও লড়াই ছাড়েনি মরক্কো। তবে ফ্রান্সের শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভেদ করে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি তারা।

ম্যাচের ৭৬ মিনিটে মাঠে বসে পড়েন ফ্রান্স অধিনায়ক। এর আগেও কয়েকবার অস্বস্তিতে ভুগতে দেখা গিয়েছিল তাকে। এরপর কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়েন এমবাপ্পে।। তার জায়গায় নামেন জিন-ফিলিপ মাতেতা।

ম্যাচের ৮৩ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে সুযোগ তৈরি হয় মরক্কোর। বক্সের বাইরে ফ্রি-কিক থেকে আশরাফ হাকিমির বাড়িয়ে দেওয়া বল পেয়ে জোরালো শট নেন আজ্জেদিন উনাহি। তবে ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁ সেটি পাঞ্চ করে বিপদমুক্ত করেন। এটিই ছিল মরক্কোর ম্যাচে প্রথম লক্ষ্যে থাকা শট।

শেষ মুহূর্তে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল ফ্রান্সও। ইনজুরি সময়ের চতুর্থ মিনিটে মাতেতা ওয়ান-অন-ওয়ান অবস্থায় মরক্কোর ডিফেন্ডার ইসা দিয়োপকে পেছনে ফেলে গোলরক্ষক বুনুর মুখোমুখি হন। কিন্তু আবারও দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন বুনু।

তবে শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ২-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে সেমিফাইনালে উঠে যায় ফ্রান্স। আর গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোর এবারের বিশ্বকাপ অভিযান থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালেই।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান হারাল আর্জেন্টিনা, এক নম্বরে ফিরল ফ্রান্স!

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুলাই ০৯, ২০২৬

২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে মাঠের বাইরে কিছুটা হতাশাজনক খবর পেল আর্জেন্টিনা জাতীয় দল। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর স্থানটি হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। লিওনেল মেসির দলকে পেছনে ফেলে আবারও শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছে ফ্রান্স।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয় পেলেও পয়েন্টের মারপ্যাঁচে পিছিয়ে পড়েছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে শীর্ষস্থান নিজেদের করে নিয়েছে ফরাসিরা। নতুন হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের বর্তমান পয়েন্ট ১ হাজার ৯২৫.৮৬ এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা আর্জেন্টিনার পয়েন্ট ১ হাজার ৯২৫.১৫। দুই দলের পয়েন্টের ব্যবধান এতটাই কম যে, বিশ্বকাপের পরবর্তী ম্যাচগুলোর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এই অবস্থান আবারও ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগের আন্তর্জাতিক বিরতি ও প্রস্তুতি ম্যাচগুলোর সমীকরণ কাজে লাগিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। সে সময় ফ্রান্স আইভরি কোস্টের কাছে ২-১ গোলে হেরে এবং স্পেন ইরাকের সাথে ১-১ গোলে ড্র করে মূল্যবান পয়েন্ট হারিয়েছিল। বিপরীতে আর্জেন্টিনা হন্ডুরাস ও আইসল্যান্ডকে হারিয়ে এক নম্বর দল হিসেবেই বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছিল। তবে টুর্নামেন্ট চলাকালীন প্রতিটি ম্যাচের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিকভাবে র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাব হালনাগাদ হওয়ায় এখন আবার চূড়ায় ফিরল ফ্রান্স।

শীর্ষস্থান হারানোর এই খবরটি পরিসংখ্যানের দিক থেকে নেতিবাচক হলেও, ফুটবল দুনিয়ার একটি প্রচলিত ‘কুসংস্কার’ বা ইতিহাস অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফুটবল ইতিহাসে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে যে দল ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে থাকে, তারা কখনোই সেই আসরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারে না।

যেহেতু আর্জেন্টিনা এক নম্বর দল হিসেবে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল, তাই এই কুসংস্কার বা অপয়া পরিসংখ্যানের গেরো নিয়ে অনেক সমর্থকের মনেই এক ধরনের শঙ্কা ছিল। এখন শীর্ষস্থান হাতছাড়া হওয়ায় আর্জেন্টিনার অতিপ্রাকৃতিক বা কুসংস্কারে বিশ্বাসী সমর্থকেরা হয়তো কিছুটা স্বস্তিই পাবেন। তারা মনে করছেন, এক নম্বর স্থান হারানোর মাধ্যমে ট্রফি ধরে রাখার মিশনের ওপর থেকে অন্তত এই অপয়া পরিসংখ্যানের চাপটি দূর হলো।

সুখবর পেলেন মিশরের কোচ হোসাম হাসান

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুলাই ০৯, ২০২৬
সুখবর পেলেন মিশরের কোচ হোসাম হাসান

২০২৬ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হোসাম হাসানের সঙ্গে চুক্তি নবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও তার নেতৃত্বে দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট হয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, জাতীয় দলের প্রধান কোচ হোসাম হাসান এবং দলের পরিচালক ইব্রাহিম হাসানের চুক্তি নবায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও নতুন চুক্তির মেয়াদ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে এটি ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এবারের বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় খেলে নিজেদের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ অভিযান সম্পন্ন করেছে মিশর। এর আগে ১৯৩৪, ১৯৯০ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিলেও দলটি কখনো গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারেনি। বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) কায়রোতে ফিরছে মিশর দল।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মিশর ফুটবল ফেডারেশন। এ ঘটনায় ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে। ফেডারেশনের দাবি, ম্যাচ পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করা ফরাসি রেফারি ও তার সহকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভুল করেছেন।

মিশরের অভিযোগ, ২-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর তাদের একটি বৈধ গোল বাতিল করা হয়। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সম্ভাব্য একটি পেনাল্টির আবেদনও উপেক্ষা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় আফ্রিকার দলটিকে।

মিশর ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি হানি আবু রিদা জানিয়েছেন, জাতীয় দলের সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই কোচ হোসাম হাসান ও পরিচালক ইব্রাহিম হাসানের চুক্তি নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় দল দেশে ফেরার পর পরিচালনা পর্ষদের পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

যে নিয়মে মিসরের গোল বাতিল ও আর্জেন্টিনারটি বহাল

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুলাই ০৯, ২০২৬
যে নিয়মে মিসরের গোল বাতিল ও আর্জেন্টিনারটি বহাল

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে রেফারিং ও ভিএআরের দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি ছিল মিসরের। আফ্রিকান দলটির দাবি, মোস্তফা জিকোর করা গোলটি অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে ফাউলের অজুহাতে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউল হলেও সেটি ধরা হয়নি। এখন ফুটবল দুনিয়ায় প্রশ্ন একটাই-মিসরের গোল কেন বাতিল হলো; আর আর্জেন্টিনার গোল কেন বহাল রয়ে গেছে? ভিএআর চেকের নিয়ম জানলেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ভিএআর ম্যাচের প্রতিটি ফ্রেম চেক করে। এ বিশ্বকাপে রেকর্ডিং ফ্রেম রেট হলো ৫০ এফপিএস (ফ্রেমস পার সেকেন্ড)। তার মানে যেটা দাঁড়ায় এবারের বিশ্বকাপে ব্যবহৃত প্রতিটি ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে ৫০টি ছবি তোলে। একটি ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমের পার্থক্য প্রায় ২০ মিলি সেকেন্ড। আর বল ট্র‍্যাকিং টেকনোলজি দিয়ে এবারের ট্রায়োন্ডা বল মাঠ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার ডেটা পাঠায়।

তাই মাঠের কোনো ঘটনাই মিস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রেফারি না দেখলেও ভিএআর নিজেই চার ধরনের ঘটনা রি-চেক করে-যেমন গোল, পেনাল্টি, সরাসরি লাল কার্ড ও ভুল প্লেয়ারকে কার্ড দেওয়ার মতো বিষয়গুলো।

ফাউল চেকের ক্ষেত্রে কিছু সিস্টেম আছে। ভিএআর কেবল তখনই ফাউল রিভিউ করে, যখন সেটা চারটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।

এক. গোলের আগে আক্রমণ চালানো দলের কেউ কোনো ফাউল করেছে কি না-সেটা চেক করে ভিএআর। ম্যাচে মিসরের গোল বাতিল হওয়ার আগে লিসান্দ্রোকে ফাউলের বিষয়টি চেক করে সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল ভিএআর! সেটা ফাউল হওয়ায় গোলটি বাতিল হয়ে যায়।

দুই. পেনাল্টি হওয়া উচিত ছিল কি না বা দেওয়া পেনাল্টি ভুল ছিল কি না-সেটাও চেক করে ভিএআর। আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে ডি-বক্সের মধ্যে সালাহকে ফাউলের বিষয়টিও চেক করে ভিএআর। কিন্তু সেটি ফাউল হয়নি। সে কারণে আর্জেন্টিনার গোল বহাল থেকে যায়।

তিন. সরাসরি লাল কার্ডের মতো ফাউল হয়েছে কি না-এটাও পরীক্ষা করে দেখে ভিএআর।

চার. ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেওয়া হয়েছে কি না- সেটিও দেখে সিদ্ধান্ত নেয় ভিএআর।

সবাই হয়তো এ বিষয়গুলো বোঝেন না। যেগুলোতে রেফারির সন্দেহ থাকে বা মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিএআরের সিদ্ধান্ত মেলে না, সেগুলো রিভিউ করা হয়। দর্শক টিভির পর্দায় সেটাই দেখতে পান। বাকিগুলো সব রেফারির সঙ্গে হেডফোনে আলোচনা হয়ে যায়। টিভিতে না দেখানোর মানে এ নয় যে, সেগুলো চেক হয়নি।

লড়াইয়ের ৬২ মিনিটে মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো আর্জেন্টিনার জালে বল জড়িয়েছিলেন। কিন্তু ভিএআরের রিভিউ শেষে গোলটি বাতিল করা হয়। কারণ, গোল হওয়ার আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন। আত্তিয়া একই সময় মার্তিনেজের জার্সি ধরে টানেন এবং তার পায়ের ওপর পা রাখেন-যা ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ভিডিও দেখার পর ফরাসি রেফারি লেতেক্সিয়ে ভিএআরের সঙ্গে একমত হন এবং গোল বাতিল করেন।

ম্যাচের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করার আগে ফাউলের আবেদন করেছিল মিসর। ঘটনাটি আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকার ভেতরে ঘটে। মোহাম্মদ সালাহ দাবি করেন, আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেস তাকে ফাউল করেছেন। কিন্তু রেফারির মতে, এটি ফাউল দেওয়ার মতো ঘটনা ছিল না।

ভিএআর ঘটনাটি পরীক্ষা করে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখে; এ কারণে কোনো পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। আলভারেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল সেসময় এবং দুজনের গতির কারণেই সেই সংস্পর্শ তৈরি হয়েছিল। সালাহ অহেতুক মাটিতে পড়ে যান। এ ঘটনায় দুজনের বুটের মধ্যে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যা দুই খেলোয়াড়ের গতির ফল। যে কারণে এটি ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়নি। আর তাই আর্জেন্টিনার গোলও বাতিল হয়নি।

২ গোল বাতিল ও পেনাল্টি বিতর্ক: ফুটবল আইনের সঠিক প্রয়োগে বাঁচল আর্জেন্টিনা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, জুলাই ০৯, ২০২৬
২ গোল বাতিল ও পেনাল্টি বিতর্ক: ফুটবল আইনের সঠিক প্রয়োগে বাঁচল আর্জেন্টিনা

‘ফুটবল আপনাকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শেখায়’—চিরন্তন এ সত্যই যেন আবার জীবন্ত হয়ে ফিরল মিয়ামির বিশ্বকাপের রাতে!
৬৭ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচের স্কোরলাইন আর্জেন্টিনা ০, মিসর ২। জি, আপনি ভুল পড়ছেন না!

বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তখন প্রায় অচেনা, বিধ্বস্ত, মুখ শুকনো, দুশ্চিন্তায় কাহিল। আর মিসর? তারা যেন ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছিল। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে সত্যিকার নিষ্ঠুরতার ধারালো ছুরি! শেষ ১৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা বাকি ম্যাচটি দুই ধার চাকু দিয়ে এমনভাবে চিরল যে, এই রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা সম্ভবত আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে মিসরকে!

লড়াই জেতার জেদে পুরো আর্জেন্টিনা এমন এক মহাকাব্য লিখল, যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে ছিল লিওনেল মেসির ছায়া, সরব উপস্থিতি, লিডারশিপ-যাকে বলে লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট। সে সাহসেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং মিসরের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। অথচ এ দলটিই ম্যাচের বেশিরভাগ সময় পর্যন্ত আনন্দের রেশে আপ্লুত ছিল।

ওই যে শুরুতে বলা সে কথাটা মনে পড়ছে-শেষ বাঁশি পর্যন্ত বিশ্বাস ও সাহস ধরে রাখা। মাত্র ১৩ মিনিটের তিন গোলে এই ম্যাচের সবকিছুই এক লহমায় বদলে গেল। বদলে গেল জয়ী দলের নামও!
ম্যাচ আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে জিতেছে। কিন্তু এক ঝটিকায় এ তিন গোলের গল্পে লুকিয়ে আছে আরো বড় গল্প—একটি প্রায় নিখুঁত কৌশলের, একটি মিস পেনাল্টি শটের, একটি বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তের সঠিক ব্যাখ্যার এবং একজন কিংবদন্তির সময়কে নিজ ইচ্ছেমতো আবার নিজের দিকে বাঁকিয়ে দেওয়ার গল্প। এক ম্যাচে এক সঙ্গে এত গল্পের সমাহার কে কবে দেখেছিল?

বিশ্বকাপ ইতিহাসে অনেক ক্ল্যাসিক আছে। অনেক প্রত্যাবর্তন আছে। অনেক ট্র্যাজেডিও আছে; কিন্তু এক ম্যাচে এত নাটক, এত সৌন্দর্য, এত নিষ্ঠুরতা, এত বীরত্ব, এত নায়ক, এত পার্শ্বনায়ক-সব একসঙ্গে খুব কমই দেখা গেছে। এ রাত তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি ফুটবলের নিজস্ব নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হওয়া এক মহাকাব্য।

আর এই ক্ল্যাসিক ম্যাচে মিসরের শুরুর পরিকল্পনা ছিল সাহসী, উদ্যমী ও দুরন্ত! তারা শুধু রক্ষণে দেয়াল তুলে বসে থাকেনি; বরং মাঝমাঠকে এমনভাবে সংকুচিত করেছিল যে, এনজো ফার্নান্দেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এমনকি মেসিকেও বারবার নিচে নেমে বল সংগ্রহ করতে হয়েছে। আর্জেন্টিনা বলের দখল রেখেছিল; কিন্তু সেই দখল বেশিরভাগ সময়ই ছিল নিষ্ফলা। কারণ, সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল হাফস্পেস প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল মিসর।

আক্রমণে তাদের পরিকল্পনাও ছিল অসাধারণ। মোহাম্মদ সালাহ বারবার টাচলাইন ছেড়ে ভেতরে ঢুকছিলেন। এতে আর্জেন্টিনার ফুল-ব্যাকরা দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছিলেন—সালাহকে অনুসরণ করবেন, নাকি বাইরের দৌড় সামলাবেন? সেই এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তহীনতার ফাঁকেই উঠে আসছিলেন মোস্তফা জিকো। প্রথম গোল, পরে বৈধ দ্বিতীয় গোল—দুটোই একই নকশায় আঁকা।

এর সঙ্গে যোগ হয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের অবিশ্বাস্য রাত। মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি শুধু একটি গোলই বাঁচাননি, পুরো দলকে বিশ্বাস উপহার দিয়েছিলেন। তিনি যেন প্রাচীর। মিসরের পিরামিডের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ফিরিয়ে দিলেন। আলভারেজের নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিলেন হাতের পাঞ্জায়। আরেকটি শট ঠেলে দিলেন পোস্টের বাইরে।

আর্জেন্টিনা যতবার আক্রমণ করেছে, ততবারই মনে হয়েছে মিসরের গোলপোস্টে গোলকিপার নয়, দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য দুর্গ। সে দুর্গের করিডোরে আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ-বাধা পিছু হটছে।

ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত অবশ্য ভিএআরের সিদ্ধান্ত। যেটা সম্ভবত শুধু ম্যাচে নয়, ম্যাচ শেষেও ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তফা জিকোর প্রথম গোলটি বাতিল হওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন; কিন্তু ফুটবলের আইন জানাচ্ছে এই গোল বাতিলের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল নেই।

রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ শুরু হওয়ার ঠিক আগে মারওয়ান আতিয়া বল দখলে থাকা লিসান্দ্রো মার্তিনেসের জার্সি টেনে তাকে বাধা দেন। এটি একই অ্যাটাকিং পজিশন ফেইজের (এপিপি) অংশ ছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী, গোল হওয়ার আগে একই আক্রমণের আগের বিল্ডআপে যদি ফাউল ঘটে এবং সেটি গোলের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে ভিএআর সে ঘটনায় ফিরে গিয়ে গোল বাতিল করতে পারে। অর্থাৎ, সিদ্ধান্তটি বিতর্কিত মনে হলেও আইনের দৃষ্টিতে সেটি সঠিক ছিল।

একইভাবে ম্যাচের শেষদিকে সালাহর পেনাল্টির দাবিও গ্রহণযোগ্য হয়নি। রিপ্লে স্পষ্ট বলছে, হুলিয়ান আলভারেজ প্রথমে বৈধভাবে বলে স্পর্শ করেন; এরপর দুজনের স্বাভাবিক সংঘর্ষ হয়। ফুটবলের নিয়মে এটিকে ফাউল ধরা হয় না। ফলে দুই বিতর্কেই রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—দুই গোলে এগিয়ে থেকেও মিসর কেন হারল?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে ৭০ মিনিটের পরের ক্লান্তিতে। প্রথম এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে যে কমপ্যাক্ট ডিফেন্স কাঠামো মিসর ধরে রেখেছিল, সেটি বজায় রাখতে বিপুল শারীরিক শক্তি ব্যয় হয়েছে। ঠিক তখনই লিওনেল স্কালোনি মেসিকে নির্দিষ্ট অবস্থানের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেন। তিনি কখনো ডানদিকে, কখনো মাঝখানে, কখনো আবার নিচে নেমে খেলতে শুরু করেন। একজন নির্দিষ্ট মার্কারের পক্ষে তাকে অনুসরণ করা তখন আর সম্ভব ছিল না।

ফলাফল?
মেসির অ্যাসিস্টে রোমেরোর হেডে গোল করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় আর্জেন্টিনা। এরপর মেসির চোখ জুড়ানো দুর্বার গতির ভলি। দুই গোলের মাঝখানে মিসরের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল মনোযোগ হারানো। বিশেষ করে সেট-পিস মার্কিংয়ে তাদের রক্ষণের শক্তি ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেসের হেডে আসে জয়সূচক গোল—যেন মানসিক জোয়ারে ভেসে যাওয়া এক ক্লান্ত প্রতিরক্ষার শেষ আত্মসমর্পণ। ইনজুরি টাইমের খেলা চলছে, সে সময় কেন ডিফেন্সে মাত্র একজন খেলোয়াড় ডি-বক্সে থাকবেন? বাকিরা কোথায়? উত্তর একটাই- ক্লান্তি। ফুটবল নিষ্ঠুরতা দেখায় যদি আপনি শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াইয়ের যথেচ্ছ শক্তি ধরে রাখতে না পারেন!

শেষ শক্তি ঢেলে দিয়ে আর্জেন্টিনা এ ম্যাচ জিতলেও তারা কিন্তু মোটেও নিখুঁত ছিল না। দলের দুই সেন্টার-ব্যাকের মধ্যকার দূরত্ব বারবার উদ্বেগের কারণ হয়েছিল। সালাহ যখন ভেতরে ঢুকছিলেন, মোস্তফা জিকো তখন সেই ফাঁকা করিডোর ব্যবহার করছিলেন। দ্বিতীয় গোলে এই দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়।

শক্তিশালী ও সংগঠিত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রাখতে গিয়ে মাঝেমধ্যে রক্ষণে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি করেছে। মেসির প্রতিভা সেই ক্ষত হয়তো ঢেকে দিচ্ছে; কিন্তু প্রতিবার এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইংল্যান্ড বা স্পেন-ফ্রান্স সম্ভবত আর্জেন্টিনাকে সে সুযোগ দেবে না।

আর মেসি? পেনাল্টি মিস করার পর তার চেহারাই বলে দিচ্ছিল ভুলটা কেমন ছিল। মিসর স্কোরলাইন ২-০ করার পর তার মুখ আরো শুকনো হয়ে গেল। জানতেন, এভাবে বিদায় নিলে এ বিশ্বকাপ তার বাকি সবকিছুকে ভুলে যাবে। তাই লড়াইয়ে ফিরতে চোয়াল-শক্ত পণ করলেন। খেলার কৌশল বদলালেন। আক্রমণের পথও বদল করলেন। নিজের পরিচিত সেই ছকে রইলেন না।

জেতার জেদের সেই অবিশ্বাস্য শক্তিতে মেসি শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ছন্দ, গতি, বিশ্বাস—সবকিছুর পরিচালক হয়ে উঠলেন। কর্নার থেকে একটি নিখুঁত অ্যাসিস্ট, একটি অসাধারণ ভলি, অসংখ্য সঠিক সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত পুরো দলকে বিশ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া—এটাই কিংবদন্তিদের আলাদা করে। তারা ভুল করেন; কিন্তু সেই ভুলকেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম বাক্যেও পরিণত করেন।

মিসর ম্যাচ হেরেছে; কিন্তু তাদের পরিকল্পনা, সাহস আর লড়াই বিশ্বফুটবলের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে। আর আর্জেন্টিনা জিতেছে শুধু তিনটি গোলের জন্য নয়; জিতেছে কারণ তাদের দলে এখনো এমন একজন আছেন, যিনি অসম্ভবকে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কখনো ‘অসম্ভব’ মনে করেন না।

ফুটবলের অভিধানে তাই নতুন করে আরেকটি লাইন লেখা হলো—স্বপ্ন ভাঙে, কৌশল ভাঙে, শরীরও হয়তো ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে; কিন্তু বিশ্বাসের নাম যদি লিওনেল মেসি হয়, তবে শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত ‘মেসির গল্পের’ সমাপ্তি হয় না।
এ বিশ্বকাপে মেসির সেই সুন্দর গল্প এখনো ক্রমশ…!