বিদেশ সফরে গিয়ে একের পর এক নতুন পদক ও সম্মাননা সংগ্রহ করে ঝুলি ভারী করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত ২৭ থেকে ২৯ জুন সেশেলস সফরে গিয়ে তিনি লাভ করেছেন গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন নামক এক ট্রফি ও সম্মাননা। তবে এই নতুন পদকপ্রাপ্তি বিশ্বমঞ্চে প্রশংসার চেয়ে বেশি কুড়িয়েছে কৌতুক আর সমালোচনা। কারণ মোদির সফরের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে এই পুরস্কার তৈরি করা হয় এবং এর সার্টিফিকেটটি ছিল বানান ভুলে ভরা।
পুরস্কার প্রদানকারী দেশটি নিজের নামই লিখেছে ভুল করে, রিপাবলিক অব সেশেলসের বদলে লেখা হয়েছে রিপাবলিক অব সেশেলিস। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে মোদির এই পদক কূটনীতির পেছনের আসল রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।
সেশেলসের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনি মোদিকে পরিবেশবান্ধব অবদানের জন্য পদকটি দিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ছবি আসতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। শুধু বানান ভুলই নয়, বিভিন্ন সফটওয়্যার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেছে সার্টিফিকেটটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।
এ নিয়ে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে বলেছেন, বিশ্ব এখন মোদিকে চিনে গেছে, যেকোনো একটা পুরস্কারের লোভ দেখান, তিনি দৌড়ে চলে আসবেন, এতটাই তাড়াহুড়ো ছিল যে সেশেলস নিজের দেশের নামটাই ভুল লিখে ফেলল। তীব্র বিতর্কের মুখে সেশেলস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফাই গেয়েছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেটি ছড়িয়েছে সেটি একটি ওয়ার্কিং ড্রাফট বা খসড়া ছিল, আসল সনদটি নির্ভুল।
শুধু মোদির জন্যই তৈরি হয় বিশেষ পদক
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক নিতাশা কাউল আলজাজিরাকে বলেন, এই পুরস্কারগুলোর সঙ্গে ভারতের বৈদেশিক কূটনীতির কোনো সম্পর্ক নেই, এগুলো স্রেফ মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ তৈরির প্রচারণা। ১২ বছরের শাসনামলে মোদি ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যার অনেকগুলোই তাঁর সফরের ঠিক আগে তৈরি করা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মোদির ইসরায়েল সফরের ঠিক আগে সে দেশের পার্লামেন্ট স্পিকার অব দ্য নেসেট মেডেল নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন পুরস্কার তৈরি করে, যা মোদি ছাড়া আজ পর্যন্ত আর কোনো বিশ্বনেতা পাননি। গত জুন মাসে স্লোভাকিয়া সফরকালে মোদিকে সে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা অর্ডার অব দ্য হোয়াইট ডাবল ক্রস ফার্স্ট ক্লাস দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া সফরেও তিনি পেয়েছেন বিনতাং আদিপূর্ণা পদক।
ফিলিপ কোটলার পুরস্কারের অদ্ভুত ইতিহাস
২০১৯ সালে মোদি ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিটের প্রথম ফিলিপ কোটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড পান, যা প্রতি বছর বিশ্বনেতাদের দেওয়ার কথা থাকলেও মোদির পর গত সাত বছরে আর কোনো বিশ্বনেতাকে এই পদক দেওয়া হয়নি।
ব্যক্তিগত প্রচার নাকি দেশের স্বার্থ
মোদি ও তাঁর দল বিজেপি সবসময় দাবি করে এই আন্তর্জাতিক পদকগুলো ১৪০ কোটি ভারতবাসীর সম্মান। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এতে কোনো কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা দেখছেন না। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ান হল বলেন, নয়াদিল্লি যুক্তি দিতে পারে যে এগুলো বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রমাণ, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থে এর কোনো বাস্তবিক অবদান নেই, উল্টো এটি প্রমাণ করে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসল কাজের চেয়ে নিজের প্রচারণায় বেশি মনোযোগী।
মোদির জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, এই পুরস্কার শিকারের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের ভক্ত ও ভোটারদের কাছে নিজেকে বিশ্বনেতা হিসেবে জাহির করা। তবে সেশেলসের মতো দেশগুলোতে তড়িঘড়ি করে বানান ভুল ও এআই দিয়ে তৈরি সার্টিফিকেট গ্রহণের এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতকে সম্মানিত করার চেয়ে বেশি হাস্যরসের খোরাক জোগাচ্ছে।
বিডি প্রতিদিন/এবি