ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো জোটই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব সাবেক সেনাপ্রধান ও য়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটকে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ। এর ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
রবিবার (৮ নভেম্বর) বিকেল ৫টায় জেরুজালেমের প্রেসিডেন্ট ভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ম্যানডেট হস্তান্তর করা হবে।
সিনেটের ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে আইজেনকোট এখন জোট সরকার গঠন এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর হারজোগ এই সিদ্ধান্ত জানান। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর দেশটি একটি বিভক্ত ফলাফলের মুখোমুখি হয়, যেখানে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। আইজেনকোট প্রথম জোট গঠনের সুযোগ পাচ্ছেন, যার মাধ্যমে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসন অবসানের একটি পথ উন্মোচিত হলো।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হারজোগ নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট উভয়ের সঙ্গেই কথা বলেন এবং তাদের জানান যে তিনি আইজেনকোটকেই বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
বিরোধী ও আরব জোট ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে নেবে: নেতানিয়াহু
পরামর্শ সভাটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না। ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেন, বিপরীতে ৪৬ জন সমর্থন করেন নেতানিয়াহুকে এবং ৭ জন কাউকে সুপারিশ করেননি।
আইজেনকোটকে সমর্থন দেওয়া ৬৭ জনের হিসাবটি এমন: চেঞ্জ ব্লক থেকে ৪৮ জন, আরব পার্টি রাআম থেকে ৭ জন এবং জয়েন্ট লিস্ট থেকে ১২ জন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার ডানপন্থি ও ধর্মীয় সহযোগীদের সমর্থন পান। তবে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ৭ জন সদস্য কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নেন।
এই পরিসংখ্যানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। নেতানিয়াহু এখনও একজন প্রভাবশালী নেতা, কিন্তু তার পেছনে দাঁড়ানোর চেয়ে আইজেনকোটের অধীনে একটি বিকল্প তৈরিতে বেশি সংখ্যক আইনপ্রণেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তবে কেবল সুপারিশ দিয়ে সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায় না।
আইজেনকোট হলেন ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক চিফ অব স্টাফ, যিনি ২০২২ সালে রাজনীতিতে আসেন। কেন্দ্র-বামপন্থি থেকে শুরু করে ডানপন্থি দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে প্রচারণা চালিয়ে তিনি এই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই দলগুলোর এক হয়ে থাকার মূল ভিত্তি ছিল নেতানিয়াহুর বিরোধিতা।
তার য়াশার পার্টি ২১টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং বিস্তৃত চেঞ্জ ব্লক মোট ৪৮টি আসনে জয় পায়। দুটি আরব-নেতৃত্বাধীন দল যারা যৌথভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে হারজোগের কাছে আইজেনকোটকে সুপারিশ করেছিল। মূলত তাদের ভোটই এই ব্যবধান তৈরি করে দেয়।
তবে আসল কঠিন পরীক্ষা এখন শুরু। আরব দলগুলো জানিয়েছে, তারা সরকারে যোগ দেওয়ার বদলে বাইর থেকে নেতানিয়াহু-বিরোধী অন্য যে কাউকেই সমর্থন দেবে। তাসত্ত্বেও তাদের ওপর নির্ভর করাটা বেশ সংবেদনশীল একটি বিষয়, এবং আইজেনকোটের নিজস্ব শিবিরের বেশ কয়েকটি দল আরব আইনপ্রণেতাদের ওপর নির্ভর করতে রাজি নয়।
আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহুকে ইউটিজে সমর্থন না দেওয়ায় একটি নতুন দরজাও খুলেছে, যদিও সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে ঝামেলা সেই সুযোগ আবারও বন্ধ করে দিতে পারে।
আইজেনকোটের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। তিনি বাইরে থেকে আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনে একটি সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনা করতে পারেন, আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন, অথবা একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে প্রতিটি পথের সামনেই রয়েছে নানা জটিলতা।
নেতানিয়াহু পরাজয় মেনে নেননি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী এখনও একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল যেকোনো সরকারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়ে তাদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনার সবচেয়ে তীব্র বিরোধপূর্ণ জায়গাগুলোর মধ্যে এটি একটি।
আইজেনকোটের পার্টি পাল্টা জবাব দিয়ে আরব আইনপ্রণেতাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করায় নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা লিকুদ পার্টির সদস্যদের সুদূর-ডানপন্থি সহযোগীদের সাথে নিজেদের জোট পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
গাজা যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ এবং স্বয়ং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র বিভাজনের মাঝেই এই পুরো ঘটনা প্রবাহ উন্মোচিত হচ্ছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর আইজেনকোট সাময়িকভাবে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেটে যোগ দিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে তিনি আবারও বিরোধী দলে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনার উপায় নিয়ে নেতানিয়াহুর অন্যতম কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন যেকোনো সরকারে কাজ করার সম্ভাবনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার সামরিক ক্যারিয়ার ও নিরাপত্তার রেকর্ডই রাজনীতির মূল ভিত্তি। তিনি যদি সরকার গঠনে সফল হন, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী শিকড় থাকা সমাজ থেকে উঠে আসা ইসরায়েলের প্রথম মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি।
হারজোগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যানডেট পাওয়ার পর আইজেনকোট জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন মনে করলে প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত আরও ১৪ দিন সময় বাড়িয়ে দিতে পারেন।
তিনি যদি জোট গঠনে ব্যর্থ হন, তবে পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন অন্য কারও কাছে এই ম্যানডেট চলে যেতে পারে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে নেতানিয়াহুও আরেকবার সুযোগ পেতে পারেন। আর যদি একের পর এক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকে, তবে ইসরায়েল হয়তো আবারও একটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে যা সম্ভবত ২০২৭ সালের শুরুর দিকে হতে পারে।
আপাতত, হারজোগের এই সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নিজের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন সত্যিই ক্ষমতা হারানোর বাস্তব ঝুঁকির মুখে।
আইজেনকোটের কাজটাও সমান কঠিন। ৬৭ জনের সমর্থন পাওয়া ছিল সবচেয়ে সহজ অংশ। প্রথম কোনো নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার পরও টিকে থাকতে পারবে এমন একটি শক্ত জোট গঠন করাই হবে তার আসল পরীক্ষা।
প্রশ্নটা এখন আর কেবল নেতানিয়াহু টিকে থাকতে পারবেন কি না তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আসল বিষয় হলো, তার বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়া শক্তিগুলো পরবর্তীতে কী করা হবে সে বিষয়ে একমত হতে পারবে কি না। সূত্র: এনডিটিভি