৮ নভেম্বর ২০২৬

নেতানিয়াহুর বিদায়, ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আইজেনকট

প্রকাশ: রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬
নেতানিয়াহুর বিদায়, ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আইজেনকট

ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো জোটই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব সাবেক সেনাপ্রধান ও য়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটকে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ। এর ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

রবিবার (৮ নভেম্বর) বিকেল ৫টায় জেরুজালেমের প্রেসিডেন্ট ভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ম্যানডেট হস্তান্তর করা হবে।

সিনেটের ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে আইজেনকোট এখন জোট সরকার গঠন এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর হারজোগ এই সিদ্ধান্ত জানান। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর দেশটি একটি বিভক্ত ফলাফলের মুখোমুখি হয়, যেখানে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। আইজেনকোট প্রথম জোট গঠনের সুযোগ পাচ্ছেন, যার মাধ্যমে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসন অবসানের একটি পথ উন্মোচিত হলো।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হারজোগ নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট উভয়ের সঙ্গেই কথা বলেন এবং তাদের জানান যে তিনি আইজেনকোটকেই বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

বিরোধী ও আরব জোট ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে নেবে: নেতানিয়াহু

পরামর্শ সভাটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না। ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেন, বিপরীতে ৪৬ জন সমর্থন করেন নেতানিয়াহুকে এবং ৭ জন কাউকে সুপারিশ করেননি।

আইজেনকোটকে সমর্থন দেওয়া ৬৭ জনের হিসাবটি এমন: চেঞ্জ ব্লক থেকে ৪৮ জন, আরব পার্টি রাআম থেকে ৭ জন এবং জয়েন্ট লিস্ট থেকে ১২ জন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার ডানপন্থি ও ধর্মীয় সহযোগীদের সমর্থন পান। তবে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ৭ জন সদস্য কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নেন।

এই পরিসংখ্যানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। নেতানিয়াহু এখনও একজন প্রভাবশালী নেতা, কিন্তু তার পেছনে দাঁড়ানোর চেয়ে আইজেনকোটের অধীনে একটি বিকল্প তৈরিতে বেশি সংখ্যক আইনপ্রণেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তবে কেবল সুপারিশ দিয়ে সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায় না।

আইজেনকোট হলেন ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক চিফ অব স্টাফ, যিনি ২০২২ সালে রাজনীতিতে আসেন। কেন্দ্র-বামপন্থি থেকে শুরু করে ডানপন্থি দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে প্রচারণা চালিয়ে তিনি এই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই দলগুলোর এক হয়ে থাকার মূল ভিত্তি ছিল নেতানিয়াহুর বিরোধিতা।

তার য়াশার পার্টি ২১টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং বিস্তৃত চেঞ্জ ব্লক মোট ৪৮টি আসনে জয় পায়। দুটি আরব-নেতৃত্বাধীন দল যারা যৌথভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে হারজোগের কাছে আইজেনকোটকে সুপারিশ করেছিল। মূলত তাদের ভোটই এই ব্যবধান তৈরি করে দেয়।

তবে আসল কঠিন পরীক্ষা এখন শুরু। আরব দলগুলো জানিয়েছে, তারা সরকারে যোগ দেওয়ার বদলে বাইর থেকে নেতানিয়াহু-বিরোধী অন্য যে কাউকেই সমর্থন দেবে। তাসত্ত্বেও তাদের ওপর নির্ভর করাটা বেশ সংবেদনশীল একটি বিষয়, এবং আইজেনকোটের নিজস্ব শিবিরের বেশ কয়েকটি দল আরব আইনপ্রণেতাদের ওপর নির্ভর করতে রাজি নয়।

আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহুকে ইউটিজে সমর্থন না দেওয়ায় একটি নতুন দরজাও খুলেছে, যদিও সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে ঝামেলা সেই সুযোগ আবারও বন্ধ করে দিতে পারে।

আইজেনকোটের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। তিনি বাইরে থেকে আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনে একটি সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনা করতে পারেন, আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন, অথবা একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে প্রতিটি পথের সামনেই রয়েছে নানা জটিলতা।

নেতানিয়াহু পরাজয় মেনে নেননি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী এখনও একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল যেকোনো সরকারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়ে তাদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনার সবচেয়ে তীব্র বিরোধপূর্ণ জায়গাগুলোর মধ্যে এটি একটি।

আইজেনকোটের পার্টি পাল্টা জবাব দিয়ে আরব আইনপ্রণেতাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করায় নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা লিকুদ পার্টির সদস্যদের সুদূর-ডানপন্থি সহযোগীদের সাথে নিজেদের জোট পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।

গাজা যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ এবং স্বয়ং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র বিভাজনের মাঝেই এই পুরো ঘটনা প্রবাহ উন্মোচিত হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর আইজেনকোট সাময়িকভাবে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেটে যোগ দিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে তিনি আবারও বিরোধী দলে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনার উপায় নিয়ে নেতানিয়াহুর অন্যতম কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন যেকোনো সরকারে কাজ করার সম্ভাবনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তার সামরিক ক্যারিয়ার ও নিরাপত্তার রেকর্ডই রাজনীতির মূল ভিত্তি। তিনি যদি সরকার গঠনে সফল হন, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী শিকড় থাকা সমাজ থেকে উঠে আসা ইসরায়েলের প্রথম মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি।

হারজোগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যানডেট পাওয়ার পর আইজেনকোট জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন মনে করলে প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত আরও ১৪ দিন সময় বাড়িয়ে দিতে পারেন।

তিনি যদি জোট গঠনে ব্যর্থ হন, তবে পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন অন্য কারও কাছে এই ম্যানডেট চলে যেতে পারে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে নেতানিয়াহুও আরেকবার সুযোগ পেতে পারেন। আর যদি একের পর এক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকে, তবে ইসরায়েল হয়তো আবারও একটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে যা সম্ভবত ২০২৭ সালের শুরুর দিকে হতে পারে।

আপাতত, হারজোগের এই সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নিজের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন সত্যিই ক্ষমতা হারানোর বাস্তব ঝুঁকির মুখে।

আইজেনকোটের কাজটাও সমান কঠিন। ৬৭ জনের সমর্থন পাওয়া ছিল সবচেয়ে সহজ অংশ। প্রথম কোনো নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার পরও টিকে থাকতে পারবে এমন একটি শক্ত জোট গঠন করাই হবে তার আসল পরীক্ষা।

প্রশ্নটা এখন আর কেবল নেতানিয়াহু টিকে থাকতে পারবেন কি না তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আসল বিষয় হলো, তার বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়া শক্তিগুলো পরবর্তীতে কী করা হবে সে বিষয়ে একমত হতে পারবে কি না। সূত্র: এনডিটিভি

বিরোধী ও আরব জোট ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে নেবে: নেতানিয়াহু

প্রকাশ: রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬
বিরোধী ও আরব জোট ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে নেবে: নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন যে, বিরোধী দল এবং আরব জোটগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি বা ঐক্য দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।

শনিবার (৭ নভেম্বর) ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ কাকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন সেই সংক্রান্ত চূড়ান্ত ঘোষণার আগের রাতে নেতানিয়াহু এই বক্তব্য দেন।

অন্যদিকে, দেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীরা দিন দিন আরও আশাবাদী হয়ে উঠছেন।

সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিতে নবাগত গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে থাকা বিরোধী শিবির ধর্মীয় নিরপেক্ষ ও উদারপন্থি ইসরায়েলিদের সমর্থন টানার চেষ্টা করছে। তারা আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের সঙ্গে একসময়ের অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব বলে মনে হওয়া একটি জোটের সুযোগ উন্মুক্ত করেছে।

এর ফলে আইজেনকোট জোট গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন পেতে পারেন, যার মধ্যে চরমপন্থি নয় এমন ইসলামপন্থী দল রাআম যাদের নেতা ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তারা যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ জয়েন্ট লিস্ট-এর বাহ্যিক সমর্থনও তিনি পেতে পারেন।

একটি পূর্ব-রেকর্ড করা ভাষণে চরম ডানপন্থী ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের সুর মিলিয়ে যারা দাবি করেন যে ইউরোপের কিছু অংশ ইসলামিক আইনের অধীনে চলে গেছে নেতানিয়াহু বলেন, ইসলামপন্থিদের ওপর নির্ভরশীল এই ধরনের সরকার ভেতর থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেবে; যা ইউরোপীয় দেশগুলোতে ঘটছে, তার থেকেও এটি অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ নেবে।

নেতানিয়াহুর উগ্র-ডানপন্থি শাসনব্যবস্থায় গভীরভাবে বিভক্ত এবং দীর্ঘ যুদ্ধের চাপে ক্লান্ত এই দেশে গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

সব দলের সাথে পরামর্শ শেষে বৃহস্পতিবার বক্তব্য দেওয়ার সময় নতুন সরকার গঠনের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্ট হারজোগ স্বীকার করেন যে, আইজেনকোটকে ম্যানডেট দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত হবে। কারণ ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো তাকে সুপারিশ করেছে, যেখানে নেতানিয়াহুর ব্লকের পক্ষে ছিল ৪৬ জনের সমর্থন।

প্রেসিডেন্ট এ সংক্রান্ত ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে তিনি দুই শিবিরের ইহুদি ইসরায়েলিদের একত্র করে একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের পথও উন্মোচন করতে চান।

শনিবার নেতানিয়াহু সেই ধারণার প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেন, আমি একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি, যেখানে জাতীয় শিবিরের সমস্ত দল এবং সমস্ত জায়নবাদী দল অন্তর্ভুক্ত থাকবে যারা আমাদের রাষ্ট্রকে, অর্থাৎ ইহুদি জনগণের একমাত্র রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে চায়। তবে তার সাম্প্রতিক আরেকটি ভাষণের মতো এবার তিনি নিজে সেই জোটের নেতৃত্ব দেবেন কি না, তা স্পষ্ট করেননি।

এর জবাবে আইজেনকোটের য়াশার পার্টি নেতানিয়াহুর মিত্র ও তার লিকুদ পার্টির সদস্যদের প্রতি আইজেনকোটের নেতৃত্বে ঐক্য সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।

এক্স-এ য়াশার পার্টি লিখেছে, লিকুদ এবং তার মিত্ররা যদি হঠাৎ করেই 'ঐক্য' এবং একটি বিস্তৃত সরকার গঠনে আগ্রহী হয়, তবে উগ্রপন্থীদের সাথে তাদের জোট বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে এবং প্রধানমন্ত্রী আইজেনকোটের অধীনে সরকারে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে তাদের স্বাগত জানানো হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি

নেতানিয়াহুর বিদায়, ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আইজেনকট

প্রকাশ: রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬
নেতানিয়াহুর বিদায়, ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আইজেনকট

ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো জোটই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব সাবেক সেনাপ্রধান ও য়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটকে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ। এর ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

রবিবার (৮ নভেম্বর) বিকেল ৫টায় জেরুজালেমের প্রেসিডেন্ট ভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ম্যানডেট হস্তান্তর করা হবে।

সিনেটের ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে আইজেনকোট এখন জোট সরকার গঠন এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর হারজোগ এই সিদ্ধান্ত জানান। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর দেশটি একটি বিভক্ত ফলাফলের মুখোমুখি হয়, যেখানে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। আইজেনকোট প্রথম জোট গঠনের সুযোগ পাচ্ছেন, যার মাধ্যমে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসন অবসানের একটি পথ উন্মোচিত হলো।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হারজোগ নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট উভয়ের সঙ্গেই কথা বলেন এবং তাদের জানান যে তিনি আইজেনকোটকেই বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

বিরোধী ও আরব জোট ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে নেবে: নেতানিয়াহু

পরামর্শ সভাটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না। ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকোটের নাম সুপারিশ করেন, বিপরীতে ৪৬ জন সমর্থন করেন নেতানিয়াহুকে এবং ৭ জন কাউকে সুপারিশ করেননি।

আইজেনকোটকে সমর্থন দেওয়া ৬৭ জনের হিসাবটি এমন: চেঞ্জ ব্লক থেকে ৪৮ জন, আরব পার্টি রাআম থেকে ৭ জন এবং জয়েন্ট লিস্ট থেকে ১২ জন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার ডানপন্থি ও ধর্মীয় সহযোগীদের সমর্থন পান। তবে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ৭ জন সদস্য কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নেন।

এই পরিসংখ্যানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। নেতানিয়াহু এখনও একজন প্রভাবশালী নেতা, কিন্তু তার পেছনে দাঁড়ানোর চেয়ে আইজেনকোটের অধীনে একটি বিকল্প তৈরিতে বেশি সংখ্যক আইনপ্রণেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তবে কেবল সুপারিশ দিয়ে সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায় না।

আইজেনকোট হলেন ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাবেক চিফ অব স্টাফ, যিনি ২০২২ সালে রাজনীতিতে আসেন। কেন্দ্র-বামপন্থি থেকে শুরু করে ডানপন্থি দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে প্রচারণা চালিয়ে তিনি এই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই দলগুলোর এক হয়ে থাকার মূল ভিত্তি ছিল নেতানিয়াহুর বিরোধিতা।

তার য়াশার পার্টি ২১টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং বিস্তৃত চেঞ্জ ব্লক মোট ৪৮টি আসনে জয় পায়। দুটি আরব-নেতৃত্বাধীন দল যারা যৌথভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে হারজোগের কাছে আইজেনকোটকে সুপারিশ করেছিল। মূলত তাদের ভোটই এই ব্যবধান তৈরি করে দেয়।

তবে আসল কঠিন পরীক্ষা এখন শুরু। আরব দলগুলো জানিয়েছে, তারা সরকারে যোগ দেওয়ার বদলে বাইর থেকে নেতানিয়াহু-বিরোধী অন্য যে কাউকেই সমর্থন দেবে। তাসত্ত্বেও তাদের ওপর নির্ভর করাটা বেশ সংবেদনশীল একটি বিষয়, এবং আইজেনকোটের নিজস্ব শিবিরের বেশ কয়েকটি দল আরব আইনপ্রণেতাদের ওপর নির্ভর করতে রাজি নয়।

আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহুকে ইউটিজে সমর্থন না দেওয়ায় একটি নতুন দরজাও খুলেছে, যদিও সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে ঝামেলা সেই সুযোগ আবারও বন্ধ করে দিতে পারে।

আইজেনকোটের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। তিনি বাইরে থেকে আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনে একটি সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনা করতে পারেন, আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন, অথবা একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে প্রতিটি পথের সামনেই রয়েছে নানা জটিলতা।

নেতানিয়াহু পরাজয় মেনে নেননি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী এখনও একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল যেকোনো সরকারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়ে তাদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনার সবচেয়ে তীব্র বিরোধপূর্ণ জায়গাগুলোর মধ্যে এটি একটি।

আইজেনকোটের পার্টি পাল্টা জবাব দিয়ে আরব আইনপ্রণেতাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করায় নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা লিকুদ পার্টির সদস্যদের সুদূর-ডানপন্থি সহযোগীদের সাথে নিজেদের জোট পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।

গাজা যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ এবং স্বয়ং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র বিভাজনের মাঝেই এই পুরো ঘটনা প্রবাহ উন্মোচিত হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর আইজেনকোট সাময়িকভাবে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেটে যোগ দিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে তিনি আবারও বিরোধী দলে ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনার উপায় নিয়ে নেতানিয়াহুর অন্যতম কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন যেকোনো সরকারে কাজ করার সম্ভাবনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তার সামরিক ক্যারিয়ার ও নিরাপত্তার রেকর্ডই রাজনীতির মূল ভিত্তি। তিনি যদি সরকার গঠনে সফল হন, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী শিকড় থাকা সমাজ থেকে উঠে আসা ইসরায়েলের প্রথম মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি।

হারজোগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যানডেট পাওয়ার পর আইজেনকোট জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন মনে করলে প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত আরও ১৪ দিন সময় বাড়িয়ে দিতে পারেন।

তিনি যদি জোট গঠনে ব্যর্থ হন, তবে পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন অন্য কারও কাছে এই ম্যানডেট চলে যেতে পারে। পরিস্থিতি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে নেতানিয়াহুও আরেকবার সুযোগ পেতে পারেন। আর যদি একের পর এক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকে, তবে ইসরায়েল হয়তো আবারও একটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে যা সম্ভবত ২০২৭ সালের শুরুর দিকে হতে পারে।

আপাতত, হারজোগের এই সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নিজের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন সত্যিই ক্ষমতা হারানোর বাস্তব ঝুঁকির মুখে।

আইজেনকোটের কাজটাও সমান কঠিন। ৬৭ জনের সমর্থন পাওয়া ছিল সবচেয়ে সহজ অংশ। প্রথম কোনো নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার পরও টিকে থাকতে পারবে এমন একটি শক্ত জোট গঠন করাই হবে তার আসল পরীক্ষা।

প্রশ্নটা এখন আর কেবল নেতানিয়াহু টিকে থাকতে পারবেন কি না তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আসল বিষয় হলো, তার বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়া শক্তিগুলো পরবর্তীতে কী করা হবে সে বিষয়ে একমত হতে পারবে কি না। সূত্র: এনডিটিভি

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় গণবিয়ে, আনন্দ-আয়োজনের বিরল মুহূর্ত

প্রকাশ: শনিবার, নভেম্বর ০৭, ২০২৬
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় গণবিয়ে, আনন্দ-আয়োজনের বিরল মুহূর্ত

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আনন্দের বিরল এক মুহূর্তের সাক্ষী হলেন ফিলিস্তিনিরা। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন ২৫০ ফিলিস্তিনি দম্পতি। শুক্রবার গাজা সিটিতে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের গণবিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত মানবিক সহায়তা উদ্যোগ ‘অপারেশন নাইটলি নাইট ৩’-এর সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

‘থাওব আল ফারাহ’ বা ‘আনন্দের পোশাক’ স্লোগানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কনেরা ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি নকশিকাঁথার আদলে সূচিকর্ম করা পোশাক (তাতরিজ) পরে অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল ফুল। অন্যদিকে, বরদের পরনে ছিল আনুষ্ঠানিক স্যুট ও ঐতিহ্যবাহী কেফিয়াহ।

যুদ্ধ ও আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিয়ে পিছিয়ে দিতে বাধ্য হওয়া দম্পতিদের পাশে দাঁড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আয়োজিত এ গণবিয়ে সংগীত, আনন্দ-উৎসব ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে কিছুটা স্বস্তির সুযোগ পান গাজার বাসিন্দারা।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদে এমন আয়োজন নতুন করে আশার বার্তা দিয়েছে।

প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন, ভালোবাসা ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় যে থেমে নেই, ২৫০ দম্পতির এ গণবিবাহ যেন তারই এক প্রতীক।

হরমুজে ইরান কেন কাতার, ভারত, চীন ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে ছাড় দিচ্ছে?

প্রকাশ: শনিবার, নভেম্বর ০৭, ২০২৬
হরমুজে ইরান কেন কাতার, ভারত, চীন  ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে ছাড় দিচ্ছে?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তখন থেকেই নৌচলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। যুদ্ধের আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা জ্বালানি তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে যেতো।

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

আজ শুক্রবার কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, সম্প্রতি তেহরান চার দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দাম ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সিকে (আইএসএনএ) বলেছেন, ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজকে হরমুজ প্রণালিতে আরোপ করা বিধিনিষেধ থেকে ছাড় দিয়েছে ইরান। ‘এই দেশগুলোর জাহাজ অবাধে চলাচল করছে। যুক্তরাষ্ট্রও সেগুলোকে বাধা দিচ্ছে না।’

গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে এই চার দেশকে কেন ছাড় দেওয়া হয়েছে? আর অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় তাদের জাহাজগুলো কি সত্যিই অবাধে চলাচল করতে পারবে?

জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়ে বিনিময়ে কী পাচ্ছে ইরান?

সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার ও পার্লামেন্ট সদস্য হায়াত মোকাদ্দামের ভাষ্য, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাবে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে কাতার। দেশটি আগে থেকেই ইরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে।

হায়াত মোকাদ্দাম বলেন, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করবে তেহরান। তবে কাতারের জাহাজ বিনা ফিতে চলাচল করতে পারবে। ইরাকি জাহাজকে মাশুল দিতে হবে কি না, তা তিনি জানাননি।

সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মানবাধিকার অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক এবং ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক রুজবে পারসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের আইনপ্রণেতা যে কারণগুলো তুলে ধরছেন, সেগুলোই যদি ছাড় দেওয়ার পেছনের যুক্তি হয়, তাহলে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে।’

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি বলেন, ‘সম্ভবত ইরান এসব জাহাজকে বাধাহীনভাবে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে ট্রানজিট ফি বা পণ্যের মূল্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ আদায় করছে।’

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক এবং লিবিয়ায় অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে উলফগ্যাং পুস্তাই আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে তেহরান এই উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে। এই উদ্যোগ সফল হলে ইরান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে। ইরানের অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। দেশটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কেনে।’
এই চার দেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চারটি দেশই হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মিউ শু আল জাজিরাকে বলেন, অক্টোবরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন উপসাগরীয় অঞ্চলের ১ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।

ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক রুজবে পারসি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। অন্যদিকে, ইরান নিজে যেসব ওষুধ উৎপাদন করতে পারে না, সেগুলোর বড় উৎপাদক ভারত।’

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী কাতার আগস্টে এই প্রণালি দিয়ে কোনো এলএনজি পরিবহন করতে পারেনি। তবে অক্টোবরে দেশটি ১৮ লাখ টন এলএনজি পরিবহন করেছে বলে জানান শু।

একই সময়ে কাতারের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ দৈনিক ৫ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইরাকের ক্ষেত্রে তা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল হয়েছে।

শু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের উৎস শনাক্ত করতে পারেনি কেপলার। ফলে কাতার ও ইরাকের তেল পরিবহনের প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

পারসি বলেন, ‘ভারত ও কাতারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা তাদের বজায় রাখতে হবে। তবে ট্রাম্পের আচরণে দুই দেশই হতাশ হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাতারের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশটি এমন এক প্রতিবেশী, যাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

‘তাই ইরানের বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পাওয়ার ক্ষেত্রে চারটি দেশেরই কিছু সুবিধা রয়েছে। তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িত’, যোগ করেন তিনি।

এ ঘোষণা কি নতুন?

এই উদ্যোগ নতুন নয়। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর কিছু জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিতে শুরু করে। এপ্রিলে দেশটির সামরিক কমান্ড জানায়, ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ ইরাককে এ বিধিনিষেধ থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক পুস্তাই বলেন, ‘ইরাককে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে ইরান সম্ভবত তার পশ্চিমের প্রতিবেশী এবং শিয়াপ্রধান দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে চায়।’

জাহাজগুলো কি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এড়িয়ে চলাচল করতে পারবে?

এটি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা বা বন্দরগুলোতে প্রবেশ কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া ‘সব দেশের সব জাহাজের’ ওপর এই অবরোধ প্রযোজ্য হবে। তবে ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজের ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ কার্যকর হবে না।

সেন্টকম আরও জানিয়েছে, ‘বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী জাহাজ তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।’

তবে হায়াত মোকাদ্দাম এই ছাড় শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করা জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করেননি বলে জানান বিশ্লেষক পুস্তাই।

তিনি বলেন, ‘সমঝোতার বিষয়টি সত্যি হলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ওপরও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন ইরানের এই উদ্যোগ মেনে নিলে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।’

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে, ‘ইরান থেকে আসা বা ইরানের উদ্দেশে যাত্রা করা চীন ও ভারতের জাহাজও এই ছাড়ের আওতায় আসবে।’

পুস্তাই বলেন, ‘এই দেশগুলোর জাহাজ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা-ও স্পষ্ট নয়। এর অর্থ জাহাজের নিবন্ধিত পতাকাবাহী দেশ, মালিকানা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, নাকি অন্য কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা, তা জানা যায়নি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর শান্তি আলোচনায় বসার আগে অবরোধ প্রত্যাহার তেহরানের অন্যতম শর্ত। কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের একটি প্রস্তাব। এতে সাতটি শর্ত পূরণ করা হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে অবরোধ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

পুস্তাই বলেন, ‘মনে হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে চলাচল এবং তেল রপ্তানির বিষয়টি পারমাণবিক ইস্যু থেকে আলাদা রাখতে চাইছে ইরান।’

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াই বলে দেবে, এ কৌশল সফল হচ্ছে কি না।’

বিশ্বের তেলবাজারে কি এর কোনো প্রভাব পড়বে?

আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, আপাতত এসব ছাড়ের প্রভাব খুবই সীমিত।’

তিনি বলেন, ‘বাজার আবারও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে। আপাতত সবার নজর বৃহত্তর একটি চুক্তির সম্ভাবনার দিকে।’

তবে ছাড় পেলেই যে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নয়। কাতার গ্যাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি জানিয়েছে, গত ৩০ অক্টোবর উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ ‘আল মায়েদা’ অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে অক্টোবরে।

মধ্যপ্রাচ্যের পথে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘থিওডর রুজভেল্ট’

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ০৫, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের পথে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘থিওডর রুজভেল্ট’

ইরানের সঙ্গে তীব্র চলমান উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট’। ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতেই মূলত এ রণতরীটি মোতায়েন করা হচ্ছে। সবশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রণতরীটি ঘণ্টায় প্রায় ২৪ থেকে ৩১ নট গতিতে এগিয়ে চলছে।

নৌবহরের প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, বুধবার (৪ নভেম্বর) দক্ষিণ চীন সাগরে থিওডর রুজভেল্টের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। সেখান থেকে আরব সাগরে গিয়ে পৌঁছাতে রণতরীটির আরও কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে। তবে এটি এই মুহূর্তে সিঙ্গাপুরের কতটা কাছাকাছি রয়েছে কিংবা ঠিক কোন সময়ে আরব সাগরে নোঙর করবে, সে বিষয়ে স্বাধীন কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর আগে, ২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো নৌঘাঁটি থেকে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিল ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট। বিশাল এই রণতরীটি মূলত ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ-৯ এর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর বহরে যুক্ত রয়েছে বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ, বিপুল পরিমাণ যুদ্ধবিমান এবং বিভিন্ন সামরিক উড়োজাহাজ। মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে রণতরীটি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া ‘কিন সোর্ড ২৭’-এ সরাসরি অংশ নেয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি জোরদার করতেই থিওডর রুজভেল্টকে সেখানে পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সূত্রে আগেই জানা গিয়েছিল, নতুন রণতরীটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছালে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে তিনটিতে।

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চরম আকার ধারণ করছে, ঠিক তখনই নতুন করে রণতরী পাঠানোর এ খবর সামনে এল। ওয়াশিংটন সেখানে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে চাইছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর পর থিওডর রুজভেল্ট ঠিক কী ধরনের মিশন পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে পেন্টাগন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড