মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জ্যারেড কুশনার ইসরায়েলে পৌঁছেছেন। সোমবার (১৭ আগস্ট) তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে রোববার তিনি মিশরের রাজধানী কায়রোয় ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের নতুন নেতা খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন। গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
গত মাসে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ জানায়, গাজায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে তারা। তবে গত সপ্তাহে ইসরায়েল ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। পরিকল্পনাটিতে ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার এবং নতুন একটি বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজা পুনর্গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
রোববার আটটি মুসলিম দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়েছে।
এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, মিসরে হামাসের নতুন নেতা খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্পের জামাতা কুশনার। এরপর এক বিবৃতিতে হামাসের মধ্যস্থতাকারী বোর্ড অব পিসের প্রতি আহ্বান জানায়, তারা যেন ইসরায়েলকে পরবর্তী পদক্ষেপের রোডম্যাপ অনুমোদনে ‘বাধ্য’ করে।
তবে নেতানিয়াহুর সামনে রয়েছে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে তাকে। তার জোটে এমন কয়েকজন মন্ত্রী রয়েছেন, যারা গাজা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে।
অন্যদিকে, হামাস সত্যিই নিরস্ত্র হতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়েও অনেক ইসরায়েলি সন্দিহান।
গত বছর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর হামাসের নেতা হাইয়ার সঙ্গে কুশনারের বৈঠকটি এই পর্যায়ের প্রথম বৈঠক বলে মনে করা হচ্ছে।
বোর্ড অব পিসের দূত নিকোলায় ম্লাদেনভ ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও বৈঠকে ছিলেন বলে জানা গেছে। মিসর, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন। দেশ তিনটি শান্তি প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
বৈঠক নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে বৈঠকে হামাসের অস্ত্রসম্ভার নিষ্ক্রিয় করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মিসরে অবস্থানকালে কুশনার দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গেও বৈঠক করেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্লাদেনভ ও ব্লেয়ারও সোমবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়াই তাদের বৈঠকের লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এর আগে বলেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হতে হবে।
গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল বোর্ড অব পিসের গাজার জন্য ১৫ দফা নথি প্রত্যাখ্যান করছে। হামাস সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না।
এ অবস্থানের মাধ্যমে ইসরায়েল তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেরও বিরোধিতা করছে।
এদিকে, গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য নেতানিয়াহু নিজ সরকারের ভেতর থেকেও চাপের মুখে রয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ট্রাম্পের খসড়া পরিকল্পনাকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সময় হামাসের হাতে জিম্মি হওয়া রোম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে বেন-গভিরের একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকার ১৫ আগস্ট প্রচারিত হয়। সেখানে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কমানো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য রয়েছে, এটা কোনো গোপন বিষয় নয়।’ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বেন-গভির আরও বলেন, ‘লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড’ চালানো উচিত এবং ‘প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা’ করা উচিত। তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করে এমন ব্যক্তিদের মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, সেখানে এমন লোকও আছে যারা ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’। তারা ‘মানুষও নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও টাইমস অব ইসরায়েলও তার এসব মন্তব্যের খবর প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েল ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পর গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় সাময়িক বিরতি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই এই বিরতি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে পরে আবারও হামলা শুরু হয়েছে।
রোববার মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
গত বছরের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। তবে এরপরও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়েছে।
হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে। ইউনিসেফের হিসাবে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩০০ শিশু রয়েছে।
১৫ দফা পরিকল্পনা ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করার পরও হামলায় কিছুটা বিরতি দেখা গিয়েছিল। তবে পরে ইসরায়েলি হামলা আবার শুরু হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রোববার জানিয়েছে, তারা খান ইউনিস ও নুসেইরাতে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের ‘সন্ত্রাসীদের’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, খান ইউনিসের একটি তাঁবু শিবিরে বসবাসকারী কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এরপর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ শিশু রয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকেও নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
জাতিসংঘের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।