১৮ আগস্ট ২০২৬

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ শর্তে ঝুলছে তারেক রহমানের ভারত সফর

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২৬
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ শর্তে ঝুলছে তারেক রহমানের ভারত সফর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা চলছে। ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে এ বিষয়ে যোগাযোগও হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ এবং শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় সফরের পরিবেশ অনুকূল নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ।

আজ রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিমের বক্তব্যের পর এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে মূলত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কোনো কোনো প্রতিবেদনে আগের আলোচনার সূত্র ধরে সফরের সম্ভাব্য সময়, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের আমন্ত্রণ এবং দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

আজ রোববার ঢাকায় এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারত কয়েক সপ্তাহ ধরে সফরের সম্ভাবনা নিয়ে যোগাযোগ করলেও ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর পরিস্থিতি জটিল হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শহীদুল করিম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ওই প্রকাশ্য বক্তব্যের কারণে সফর আয়োজনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও জানান, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদেরও বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

কী বলছে ভারতীয় মিডিয়াগুলো
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’ পিটিআইয়ের বরাত দিয়ে তাদের শিরোনাম করেছে, ‘Bangladesh seeks ‘conducive environment’ from Centre for PM Tarique Rahman’s possible Delhi visit’। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের জন্য বাংলাদেশ ভারতের কাছে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আগের আলোচনার সূত্র ধরে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গত সপ্তাহে ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়।

হাসিনা ও পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত ভারত সফর করবেন না তারেক: ডনের প্রতিবেদনহাসিনা ও পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত ভারত সফর করবেন না তারেক: ডনের প্রতিবেদন
কিন্তু গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর ঢাকা এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ বলেছিল, ওই ঘটনা দেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭ আগস্ট জানায়, ওই অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের কোনো হাত ছিল না এবং শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্য সরকার সমর্থন করে না বলে জানায় দিল্লি।

দ্য প্রিন্ট শিরোনাম করেছে, ‘PM Tarique’s India trip hinges on ‘propitious environment, expedition of Hasina extradition’—Dhaka’। অর্থাৎ, তারেক রহমানের ভারত সফর নির্ভর করছে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের ওপর।

দ্য প্রিন্টও তাদের প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্যটি তুলে ধরেছে।

এর বাইরে দ্য প্রিন্ট গত ১৪ আগস্ট তাদের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ঢাকা ও নয়াদিল্লি কয়েক সপ্তাহ ধরে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের সময় নিয়ে আলোচনা করছে। ভারতের পক্ষ থেকে ২১ ও ২২ আগস্ট সফরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে সফর আয়োজনকে বেশি সুবিধাজনক মনে করা হচ্ছে।

এর পেছনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে সফর আয়োজনকে ঢাকার জন্য বেশি সুবিধাজনক মনে করা হচ্ছে।

দ্য প্রিন্ট আরও জানায়, ফেব্রুয়ারিতে ভারত তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ঢাকা শুধু বহুপক্ষীয় সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক নয়, পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সরকার নয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেবেন ভারতের আদালত: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসরকার নয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেবেন ভারতের আদালত: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
তবে আজ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্যের এসব সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ হয়ে যাচ্ছে। কারণ ঢাকা স্পষ্ট করেছে যে, ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত ভারত সফর করবেন না তারেক রহমান।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে দুই শর্ত
এনডিটিভি শিরোনাম করেছে, ‘Bangladesh Lists 2 Riders For PM Rahman's India Visit. One Is Hasina Return’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে অগ্রগতি না হলে তারেক রহমানের ভারত সফর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এনডিটিভি আরও জানায়, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে মার্চে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাদেরও বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে ঢাকা।

ইন্ডিয়া টুডে ও দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ
ইন্ডিয়া টুডে তাদের শিরোনামে বলেছে, ‘Bangladesh links Tarique Rahman's India visit to Hasina extradition demand’। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবির সঙ্গে তারেক রহমানের ভারত সফরকে যুক্ত করেছে বাংলাদেশ। তাদের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ঢাকার বক্তব্য অনুযায়ী সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে দ্য ওয়্যার তাদের শিরোনামে লিখেছে, ‘Dhaka Says Hasina's Press Meet in Delhi 'Vitiated' Bangladesh PM's India Trip, Seeks Extradition Update’।

দ্য ওয়্যার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতর বরাত দিয়ে লিখেছে, ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রক্রিয়াকে ‘বিনষ্ট’ করেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ থেকে ২৩ আগস্টের মধ্যে সফরের একটি সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো তারিখ চূড়ান্ত করা ছিল না।

আর সফরটি শুধু ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছিল না, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়, অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এই সফরের আলোচনায় ছিল।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: ভারতবাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: ভারত

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পর ঢাকা আরও জোরালোভাবে তাঁকে ফেরত চেয়ে আসছে। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধটি প্রযোজ্য আইন ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

গত ১০ আগস্ট ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পর তিনি বলেন, ভারতের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে এবং নয়াদিল্লি তারেক রহমানের সফরের অপেক্ষায় আছে। দুই দেশের মধ্যে কিছু সমস্যা থাকলেও সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে আজ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি সফরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের বিষয়টিও সামনে এনেছে ঢাকা।

ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র শহীদুল করিম বলেন, বাংলাদেশ তার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অব্যাহত রাখবে। এই নীতির ভিত্তি হবে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থ। প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নেও বাংলাদেশ আগ্রহী বলে জানান তিনি।

অর্থাৎ, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ ঢাকার দাবিগুলোতে নয়াদিল্লির অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে সফরের সময়সূচি এবং দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ।

ইসরায়েলের প্রত্যাখ্যানের পর কায়রোতে হামাসের সঙ্গে কুশনারের বৈঠক

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২৬
ইসরায়েলের প্রত্যাখ্যানের পর কায়রোতে হামাসের সঙ্গে কুশনারের বৈঠক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জ্যারেড কুশনার ইসরায়েলে পৌঁছেছেন। সোমবার (১৭ আগস্ট) তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে রোববার তিনি মিশরের রাজধানী কায়রোয় ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের নতুন নেতা খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন। গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

গত মাসে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ জানায়, গাজায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে তারা। তবে গত সপ্তাহে ইসরায়েল ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। পরিকল্পনাটিতে ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার এবং নতুন একটি বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজা পুনর্গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

রোববার আটটি মুসলিম দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়েছে।

এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, মিসরে হামাসের নতুন নেতা খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্পের জামাতা কুশনার। এরপর এক বিবৃতিতে হামাসের মধ্যস্থতাকারী বোর্ড অব পিসের প্রতি আহ্বান জানায়, তারা যেন ইসরায়েলকে পরবর্তী পদক্ষেপের রোডম্যাপ অনুমোদনে ‘বাধ্য’ করে।

তবে নেতানিয়াহুর সামনে রয়েছে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে তাকে। তার জোটে এমন কয়েকজন মন্ত্রী রয়েছেন, যারা গাজা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে।

অন্যদিকে, হামাস সত্যিই নিরস্ত্র হতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়েও অনেক ইসরায়েলি সন্দিহান।

গত বছর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর হামাসের নেতা হাইয়ার সঙ্গে কুশনারের বৈঠকটি এই পর্যায়ের প্রথম বৈঠক বলে মনে করা হচ্ছে।

বোর্ড অব পিসের দূত নিকোলায় ম্লাদেনভ ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও বৈঠকে ছিলেন বলে জানা গেছে। মিসর, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন। দেশ তিনটি শান্তি প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

বৈঠক নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে বৈঠকে হামাসের অস্ত্রসম্ভার নিষ্ক্রিয় করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মিসরে অবস্থানকালে কুশনার দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গেও বৈঠক করেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্লাদেনভ ও ব্লেয়ারও সোমবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়াই তাদের বৈঠকের লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এর আগে বলেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হতে হবে।

গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল বোর্ড অব পিসের গাজার জন্য ১৫ দফা নথি প্রত্যাখ্যান করছে। হামাস সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না।

এ অবস্থানের মাধ্যমে ইসরায়েল তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেরও বিরোধিতা করছে।

এদিকে, গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য নেতানিয়াহু নিজ সরকারের ভেতর থেকেও চাপের মুখে রয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ট্রাম্পের খসড়া পরিকল্পনাকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সময় হামাসের হাতে জিম্মি হওয়া রোম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে বেন-গভিরের একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকার ১৫ আগস্ট প্রচারিত হয়। সেখানে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কমানো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য রয়েছে, এটা কোনো গোপন বিষয় নয়।’ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বেন-গভির আরও বলেন, ‘লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড’ চালানো উচিত এবং ‘প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা’ করা উচিত। তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করে এমন ব্যক্তিদের মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, সেখানে এমন লোকও আছে যারা ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’। তারা ‘মানুষও নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও টাইমস অব ইসরায়েলও তার এসব মন্তব্যের খবর প্রকাশ করেছে।

ইসরায়েল ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পর গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় সাময়িক বিরতি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই এই বিরতি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে পরে আবারও হামলা শুরু হয়েছে।

রোববার মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

গত বছরের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। তবে এরপরও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়েছে।

হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে। ইউনিসেফের হিসাবে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩০০ শিশু রয়েছে।

১৫ দফা পরিকল্পনা ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করার পরও হামলায় কিছুটা বিরতি দেখা গিয়েছিল। তবে পরে ইসরায়েলি হামলা আবার শুরু হয়।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রোববার জানিয়েছে, তারা খান ইউনিস ও নুসেইরাতে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের ‘সন্ত্রাসীদের’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, খান ইউনিসের একটি তাঁবু শিবিরে বসবাসকারী কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।

এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এরপর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ শিশু রয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকেও নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।

জাতিসংঘের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

গাজায় প্রতিদিন ৩০-৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান বেন-গভিরের

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২৬

গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তিনি বলেছেন, হামলা শুধু তাৎক্ষণিকভাবে হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর প্রকাশ করেছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) প্রকাশিত একটি পডকাস্টে সাবেক ইসরায়েলি বন্দি রম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে আলাপকালে বেন-গভির এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যটি পরে ফিলিস্তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বেন-গভির বলেন, গাজার মানুষদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তাদের বেঁচে থাকাই উচিত নয়। এমনকি তাদের মানুষও মনে করা উচিত নয়।

গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ নিয়ে বেন-গভিরের এমন বক্তব্য অবশ্য নতুন নয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা এবং গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের চলে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।

বর্তমান যুদ্ধবিরতির আওতায় গাজায় সামরিক হামলা কমানোর সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করেছেন বেন-গভির। তার মতে, ইসরায়েলের উচিত আবারও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড শুরু করা এবং হামলা শুধু তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা।

তবে বেন-গভিরের হাতে সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তিনি অবশ্য ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য। এই মন্ত্রিসভাই দেশটির যুদ্ধ ও নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে।

আলাপচারিতায় সাবেক বন্দি ব্রাসলাভস্কি ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কাজে নিজে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য তিনি নিজ হাতে কাজটি করতে চান।

জবাবে বেন-গভির তাকে এ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

এ সময় বেন-গভির গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার বিষয়েও সমর্থন জানান। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে কথা বলেন। তিনি গাজাকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখেন বলেও মন্তব্য করেন।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন, কোনো ভূখণ্ড থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জোর করে বা পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া জাতিগত নির্মূলের আওতায় পড়তে পারে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য বেন-গভির আন্তর্জাতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং ইসরায়েলি কারাগারে তাদের পরিস্থিতি আরও কঠোর করার কথা বলার কারণেও তিনি বিতর্কের মুখে পড়েছেন।

তার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ তার অবস্থান বা কর্মকাণ্ডে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলই প্রধান বাধা: সৌদি, কাতারসহ ৮ দেশের যৌথ বিবৃতি

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করায় এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে আটটি মুসলিম দেশ।

গতকাল রবিবার দেওয়া ওই বিবৃতিতে সৌদি আরব, মিশর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।

এতে বলা হয়, “ইসরায়েলের এই অবস্থান শান্তি পরিকল্পনায় সরাসরি অস্বীকৃতি জানানোর সমতুল্য। এতে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নস্যাৎ হচ্ছে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি অর্জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা গোড়া থেকেই ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

“এই ধরনের প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে এটি নিশ্চিত হল যে, গাজা এবং বাদবাকী অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলে শান্তি আনার চেষ্টা বাধাগ্রস্ত করার জন্য এখন ইসরায়েলই দায়ী।”

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর ১৫ দফা পরিকল্পনা গত সপ্তাহেই প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাস পুরোপুরি অস্ত্রসমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না বলে জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

গত বছর ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই এ পরিকল্পনায় সম্মতি জানিয়েছিল, যার সূচনা হয়েছিল যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে। এই শান্তি পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ মিশর, কাতার, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফলে।

বিবৃতিতে ৮ মুসলিম দেশ বলেছে, “এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার মানে হল, শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে ইসরায়েলের প্রকাশ্য অস্বীকৃতি। তাছাড়া, এটি গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং স্থায়ী শান্তির পরিবেশ তৈরিতে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা বিপথগামী করার সরাসরি হুমকিস্বরূপও।"

দেশগুলোর মন্ত্রীরা শান্তি পরিকল্পনা এবং এর রোডম্যাপ অনুযায়ী ইসরায়েল যেন সব প্রতিশ্রুতি ও শর্ত মেনে চলে এবং আর কোনও বাধা সৃষ্টি করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের টেকসই ও সক্রিয় ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

শান্তি পরিকল্পনা অনবরত প্রত্যাখ্যান, বাধা দেওয়া, মেনে চলতে অস্বীকৃতি জানানো কিংবা বিলম্ব করা, মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি অবনতি এবং গাজা যুদ্ধ অবসানে বিঘ্নসহ যে কোনও পরিণতির জন্য ইসরায়েল সরাসরি ও পরিপূর্ণভাবে দায়ী থাকবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

মার্কিন সেনা হত্যা বা বন্দি করলে পুরস্কার ৩০ হাজার ডলার

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২৬
মার্কিন সেনা হত্যা বা বন্দি করলে পুরস্কার ৩০ হাজার ডলার

একজন মার্কিন সেনাকে হত্যা বা বন্দি করে ইরানের হাতে তুলে দিলে মিলবে ৩০ হাজার ডলার (বা ৫ বিলিয়ন তোমান)। আর এই কাজ কোনো নারী করলে পুরস্কারের অঙ্ক দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে ৬০ হাজার ডলারে।

খোদ ইরানের সামরিক বাহিনী দেশের নাগরিকদের জন্য এই অবিশ্বাস্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে।

ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি এই পুরস্কার ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনাকে উদ্ধৃত করে এএফপির খবরে বলা হয়েছে, নাগরিকদের কাছ থেকে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার 'প্রচুর অনুরোধ' আসার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মার্কিন সেনাদের কোথায় বা কখন আটক করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের মাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মার্কিন সেনা নামেনি।

জেরুজালেম পোস্টের খবর অনুযায়ী, পুরস্কার শুধু নগদ অর্থেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেনাপ্রধান হাতামি জানান, মার্কিন সেনাকে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি দ্বিগুণ দামে কিনে নেবে ইরান এবং ওই ব্যক্তিকে নতুন একটি অস্ত্র দেওয়া হবে। ব্যবহৃত অস্ত্রটি পরে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অসারতা এই যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর বা হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রবেশের আর কোনো অনুমতি নেই।

গত ১৭ জুন সই হওয়া ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ অনুযায়ী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ যখন শেষ হতে চলেছে, ঠিক তখনই এই ঘোষণা এলো। তবে এই যুদ্ধবিরতি বরাবরই বেশ নড়বড়ে ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এগোয়নি, বরং দক্ষিণ ইরান এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে থেমে থেমে গোলাগুলি চলেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যাদের সবাই ইরাক বা জর্ডানের মতো ইরানের বাইরের দেশগুলোতে মারা গেছেন।

আগুন জ্বালানোর আকুতি: গাজায় লাইটারই এখন ‘সোনা’

প্রকাশ: সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২৬
আগুন জ্বালানোর আকুতি: গাজায় লাইটারই এখন ‘সোনা’

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভয়াবহ সংকটের মধ্যে একটি সাধারণ লাইটারও এখন হয়ে উঠেছে জীবনধারণের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। রান্না, রুটি তৈরি, পানি গরম করা কিংবা শিশুর জন্য এক কাপ দুধ—সবকিছুর শুরু আগুন দিয়ে, আর সেই আগুন জ্বালাতে প্রয়োজন একটি লাইটার।

রোববার (১৬ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে আল-জাজিরা জানিয়েছে, গাজার ৪৬ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা রাবাব দেইফাল্লাহর কাছে এখন পুরোনো একটি জীর্ণ লাইটার অত্যন্ত মূল্যবান। কাঠের চুলায় আগুন ধরাতে তিনি বারবার সেটি চাপেন। যুদ্ধ শুরুর পর নতুন লাইটার কেনা কঠিন হয়ে পড়ায় তাঁর ছেলে কয়েকবার সেটি মেরামত করেছে।

রাবাব বলেন, ‘আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পুরোটাই আগুনের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আগুন জ্বালানোর শুরুটা একটি লাইটার দিয়ে, আর এই ছোট জিনিসটিই এখন গাজায় পাওয়া সবচেয়ে কঠিন জিনিসগুলোর একটি।’

যুদ্ধের আগে তিনটি লাইটার মাত্র এক শেকেলে পাওয়া যেত। এখন একটি নতুন লাইটারের দাম ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত উঠেছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় তিন থেকে চার হাজার টাকা। নতুন কেনার বদলে পুরোনো লাইটারটি মেরামত করতেই রাবাবকে সর্বশেষ ১২ ডলার খরচ করতে হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘এই টাকা কি লাইটারের পেছনে খরচ করব, নাকি এক ব্যাগ আটা কিনব?’

লাইটারের সংকটে অনেক পরিবার এখন মহা মূল্যবান এই বস্তুটিকে একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে। কখনো প্রতিবেশীর জ্বলন্ত আগুন থেকে একটি কার্ডবোর্ডে আগুন নিয়ে আসতে হচ্ছে। কখনো প্রতিবেশীর চুলায় গিয়ে খাবার রান্না করতে হচ্ছে। লাইটার না পেলে কোনো কোনো পরিবার দিনের পর দিন ঠান্ডা খাবার খেতেও বাধ্য হচ্ছে।

একই সংকটে রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মানসুর। জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ছয় সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই নারী মাটির চুলায় খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন। কিন্তু গ্যাসের সংকট এবং লাইটারের অভাবে তাঁর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। হাসনা বলেন, গ্রাস থাকলে চুলা জ্বালাতে সামান্য স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট, কিন্তু মাটির চুলায় আগুন ধরাতে লাইটারের মতো স্থিতিশীল আগুন প্রয়োজন।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ ও সীমান্তপথ বন্ধ থাকায় গাজায় প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৩০ হাজারের বেশি ট্রাক প্রবেশ করলেও দৈনিক গড়ে ১৯১ টির বেশি ট্রাক ঢোকেনি—যা যুদ্ধের আগের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

লাইটার না পাওয়ায় গাজায় নতুন একটি পেশারও জন্ম হয়েছে—লাইটার মেরামত। আল-কারমেল স্কুলের কাছে ছোট দোকান বসিয়ে ২৪ বছর বয়সী তামের আল-শাওয়িশ এখন এই কাজ করেই পরিবার চালান। নষ্ট লাইটার থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্য লাইটারে ব্যবহার করেন তিনি।

তামের বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের এমন কাজ করতে বাধ্য করেছে, যেসব কাজের কথা আমরা আগে কখনো ভাবিনি।’

বাস্তুচ্যুত বাবা শাদি আবু শামলা বলেন, একটি স্কুলে অসংখ্য পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। অথচ সেখানে মাত্র চারটি লাইটার আছে। সেগুলো এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে ঘুরে বেড়ায়। তিনি বলেন, ‘লাইটার এখন জীবনের মেরুদণ্ড। আপনার তাঁবুতে লাইটার থাকলে আপনি ঠিক আছেন। না থাকলে আপনি আটকে গেছেন।’

গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতা তাই কখনো কখনো একটি ছোট লাইটারের মূল্য দিয়েও মাপা যায়—যে লাইটারটি একটি পরিবারের খাবার, উষ্ণ পানি কিংবা শিশুর জন্য এক কাপ দুধের আশার আলো জ্বালায়।