দোহার ঐতিহাসিক ‘সুক ওয়াকিফ’ বাজারকে আধুনিকায়নের নামে ভেঙে ফেলার হাত থেকে বাঁচাতে কাতারের প্রয়াত 'ফাদার আমির' শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। বাজারটির প্রধান নকশাকার বা ডিজাইনার মুহাম্মদ আলী এই তথ্য প্রকাশ করেছেন।
কাতারের স্থানীয় দৈনিক আল-শার্ক-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে কাতারি শিল্পী ও প্রকৌশলী মুহাম্মদ আলী বলেন, নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে (২০০০ সালের দিকে) এই ঐতিহাসিক বাজারটি চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। ওই এলাকায় আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে বাজারটি পুরো ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

মুহাম্মদ আলী জানান, প্রয়াত ফাদার আমির কাতারের জাতীয় পরিচয় ধরে রাখার স্বার্থে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আধুনিক ডিজাইন এবং কোটি কোটি ডলারের আধুনিকায়ন প্রকল্প সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি পুরো বাজারটিকে তার আদি ও ঐতিহাসিক রূপে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ডিজাইন প্রত্যাখ্যান
দোহার সমুদ্র উপকূলের কাছে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র সুক ওয়াকিফ নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। বিকেল পাঁচটার মধ্যেই সেখানকার সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেত এবং কাদা ও নুড়িপাথর দিয়ে তৈরি পুরোনো ঐতিহাসিক ভবনগুলো আবহাওয়ার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
প্রকৌশলী মুহাম্মদ আলী জানান, প্রথমে ওই এলাকার জন্য আধুনিক সব কনসেপ্ট তৈরি করতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমির তাদের সমস্ত প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
আল-শার্ক-কে মুহাম্মদ আলী বলেন, "সুক ওয়াকিফকে রক্ষা করার ধারণাটি সরাসরি মহামান্য ফাদার আমিরের কাছ থেকে এসেছিল। তিনি এই বাজারটিকে কাতারের ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়ের একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে দেখতেন।"
২০০১ সালে মুহাম্মদ আলীকে বিকল্প নকশা জমা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৬৩ সাল থেকে তার বাবার এই বাজারে একটি দর্জির দোকান ছিল। নিজের শৈশবের স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে মোহামেদ আলী ১৯৬০-এর দশকের বাজারের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলে চারটি চিত্রকর্ম বা পেইন্টিং তৈরি করেন। ফাদার আমির তার মধ্যে থেকে একটি নকশা পছন্দ করেন এবং দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন।

প্রতিদিনের পরিদর্শন ও ঐতিহ্যবাহী উপাদানের ব্যবহার
২০০৩ সালে বাজারটির পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তবে শুরুতে বেশ কিছু আইনি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ছিল। বাজারের দোকানগুলো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়ায় পুরো এলাকায় একই ধরণের নকশা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই সমস্যার সমাধানে একটি বিশেষ প্রকৌশল দপ্তর থেকে বাজারের সব সম্পত্তি সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা হয়।
বাজারের ঐতিহাসিক সত্যতা ও প্রাচীন রূপ বজায় রাখতে আমির সব ধরণের আধুনিক নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। পুরো প্রকল্পে শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী উপাদান ব্যবহার করা হয়, যেমন:
-
হাতে খোদাই করা পাথর ও জিপসাম
-
ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টার
-
নুড়িপাথর এবং স্থানীয় কাঠ
মুহাম্মদ আলী উল্লেখ করেন, পুরো প্রকল্প চলাকালীন আমির অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ তদারকি করতেন এবং প্রায়ই না জানিয়ে পরিদর্শনে আসতেন।
তিনি বলেন, "মহামান্য আমির প্রায় প্রতিদিন বিকেলের নামাজের পর কাজ কতদূর এগোল তা দেখতে গাড়ি নিয়ে আসতেন। কোনো দরজা, খিলান বা স্থাপত্যের খুঁটিনাটি যদি ঐতিহাসিক নকশার সাথে না মিলত, তবে তিনি তা সাথে সাথে ভেঙে আবার নতুন করে তৈরির নির্দেশ দিতেন।"
উপসাগরীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণা
এই সফল সংস্কারের ফলে সুক ওয়াকিফ একটি মৃতপ্রায় বাণিজ্যিক এলাকা থেকে বর্তমান কাতারের প্রধান সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মুহাম্মদ আলী বলেন, এই প্রকল্পটি কেবল কাতারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি রোল মডেল বা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এটি দেখে প্রতিবেশী অন্যান্য উপসাগরীয় (Gulf) দেশগুলোও তীব্র আধুনিকায়নের মুখে তাদের নিজেদের প্রাচীন স্থাপত্য ও ইতিহাস রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।
ফাদার আমিরের প্রয়াণের পর তার অবদানের কথা স্মরণ করে মুহাম্মদ আলী তাকে "কাতারি ঐতিহ্যের ত্রাণকর্তা" হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, আমিরের এই দূরদর্শী নীতির কারণেই আগামী প্রজন্মের জন্য কাতারের জাতীয় স্মৃতি ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
